রংপুর

শুভ উদ্যোগ

চরের বাতিঘর লোকমান

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

চরের বাতিঘর লোকমান

শিশুদের স্কুলে যেতে উদ্বুদ্ধ করেন লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার লোকমান আলী- সমকাল

  আনোয়ার হোসেন স্বপন, লালমনিরহাট

সাদামাটা গড়নের পঞ্চাশোর্ধ্ব লোকটি চরের এ-মাথা ও-মাথা ছুটে বেড়ান। উদ্দেশ্য কোন শিশুটি অমনোযোগী, কার আর্থিক সমস্যা, কার বই-খাতাপত্র নেই ইত্যাদি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াতে চরের সুবিধাবঞ্চিত এসব শিশুকে তিনি নিয়ে আসেন তার জীর্ণ কুটিরে। গভীর মনোনিবেশে তাদের পড়া বুঝিয়ে দেন। সকাল ৭টা থেকে দিনব্যাপী চলে বিনামূল্যে তার এই শিক্ষা কার্যক্রম। তিস্তা চরাঞ্চলে শিক্ষার এ বাতিঘরের নাম লোকমান আলী। তিনি লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার তিস্তা তীরবর্তী মহিষখোচা ইউনিয়নের বারঘরিয়া আদর্শপাড়া গ্রামের মৃত কবিরাজ আবদার রহমানের ছেলে।

গত সোমবার সকালে মহিষখোচা ইউনিয়নের বারঘরিয়া এলাকায় তার জীর্ণ কুটিরে গিয়ে দেখা যায়, গোটা বিশেক শিশু ছেঁড়া চটের বস্তায় বসে পড়াশোনা করছে। তারা সবাই পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। তাদের প্রত্যেকেই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। সকাল ৭টায় শুরু হয় পড়াশোনা। চলে ১০টা পর্যন্ত। প্রথম সেশনে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা আসে। এখানকার ক্লাস শেষে যার যার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলে যায়। দ্বিতীয় সেশনে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীরা আসে দুপুর ২টায়। বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে লোকমান আলীর শিক্ষা কার্যক্রম। তাদের কাছে লোকমান আলী দাদুভাই, স্যার, কারও কাছে মামা বা ভাইয়া।

সেদিন গিয়ে দেখা যায়, লোকমান আলী ঘরের দরজাকে ব্ল্যাকবোর্ড বানিয়ে ছাত্রদের কখনও অঙ্ক শেখাচ্ছেন; কখনও ইংরেজি। এখানেই কথা হয় গোবরধন ইসমাইলপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসলিমার সঙ্গে। বছরখানেক আগে দিনমজুর বাবা আবু তালেব মারা গেছেন। বড় ভাই শাহিন ঢাকায় পোশাক কারখানায় কাজ করেন। চরম দারিদ্র্যের মাঝে তাসলিমার একমাত্র ভরসা লোকমান আলী। তাসলিমা জানায়, 'দাদু ভাই আমাদের বিনে পয়সায় লেখাপড়া শেখান। খোঁজ-খবর নেন, প্রয়োজনে কাগজ ও কলম সরবরাহ করেন।'

দক্ষিণ বালাপাড়া গ্রামের নববিয়া জামে মসজিদের ইমাম খান জাহান আলী জানান, লোকমানের নিজের বসতভিটা নেই। অন্যের জমিতে তার বসবাস। চরম দারিদ্র্যের মাঝে লোকমান তার অবৈতনিক শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। কোনো শিক্ষার্থী না এলে তাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে প্রয়োজনে জোর করে ক্লাসে নিয়ে আসেন তিনি।

এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ আব্দুর রউফ জানান, এ এলাকায় অনেক শিক্ষিত ও অবস্থাপন্ন মানুষ রয়েছেন। কিন্তু লোকমান আলী একজনই। তার জন্য আমরা গর্ব করি।

মহিষখোচা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সরওয়ার আলম বলেন, লোকমান আলী কলেজে এসে ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ার খোঁজ-খবর নিয়ে থাকেন। পড়াশোনার ব্যাপারে শিক্ষকদেরও তিনি পরামর্শ দেন। এ রকম আলোকিত মানুষ সমাজে আরও থাকলে দেশে দ্রুত শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়বে।

মহিষখোচা ইউপি চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক চৌধুরী বলেন, লোকমান আলী দরিদ্র। তবে মানবিক গুণাবলিতে তিনি পাহাড়সম। ইউনিয়ন পরিষদ তাকে সাহায্য দিতে চাইলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, রাতের খাবার তার ঘরে রয়েছে। সাহায্য দিতে চাইলে তার চেয়ে দরিদ্র অন্য কাউকে দিতে।

লোকমান আলীর জীবনের কাহিনীও কুসুমাস্তীর্ণ নয়। ১৯৯২ সালে তিস্তার করাল গ্রাসে গোবরধন এলাকায় তার বসতভিটা ও আট বিঘা জমি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। বারঘরিয়া আদর্শপাড়া এলাকায় অন্যের দেওয়া চার শতক জমিতে বাড়ি করে শুরু হয় লোকমানের জীবন-সংগ্রাম। দারিদ্র্যের কশাঘাতে টিকতে না পেরে ১৯৯৬ সালে ১৪ দিনের শিশুসন্তানকে রেখে স্ত্রী চলে যান। বসতভিটা, আবাদি জমি সব হারিয়ে লোকমান আলী নতুন এক যুদ্ধে নামেন। সন্তানদের মানুষ করতে হবে। লোকমান আলী নিজে স্কুলের গণ্ডি পেরোতে না পারলেও তার চার ছেলেমেয়েকে করেছেন প্রতিষ্ঠিত। বড় ছেলে নূর আলম ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাস করে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। মেয়ে লতিফা বেগম লালমনিরহাট নেছারিয়া কামিল মাদ্রাসার আরবি বিভাগের প্রভাষক। অন্য দুই ছেলে নূরুল হুদা ও নূরন্নবী পড়াশোনা করছেন।

বড় ছেলে ডা. নূর আলম বলেন, 'আমার বাবার মতো দায়িত্বশীল বাবা সমাজে বিরল। চরম দারিদ্র্যের মাঝে আমরা বড় হয়েছি। সকাল ৬টা থেকে ৮টা পর্যন্ত বাবার সঙ্গে আমরা চার ভাইবোন মাদুর তৈরির কাজ শেষে স্কুলে যেতাম। স্কুল থেকে ফিরে আবারও দু-একঘণ্টা মাদুর তৈরি করতাম। তারপর রাতে পড়তে বসতাম। সেই মাদুর হাটে বিক্রি করে যে টাকা আয় হতো তা দিয়েই আমাদের লেখাপড়া ও কোনোমতে খাওয়া-দাওয়ার খরচ চলত। এসবের মধ্যে বাবা অন্য শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার খোঁজখবর রাখতেন।'

যাকে নিয়ে এত আলোচনা সেই প্রচারবিমুখ লোকমান আলী বলেন, 'আর্থিক দৈন্য সাময়িক। মনের দিক দিয়ে উঁচু না হলে সমাজে ভালো কাজ করা সম্ভব নয়। আমার ছেলেমেয়েরা দিনে একবার ভাত খেয়েছে। রাতে ওদের পড়াতে দিয়ে মা রান্না শুরু করত। ভাতের লোভে বাচ্চারা আমার পড়াশোনা করত।'

অন্যের শিশুদের শিক্ষার ব্যাপারে কেন আগ্রহী হলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, চরাঞ্চলের অধিকাংশ শিশুর বাবা-মায়েরা শ্রমজীবী এবং তারা এলাকার বাইরে কাজ করে থাকেন। এ অবস্থায় ওদের দেখভাল করার উপযুক্ত লোক থাকে না। আমি ওদের বাবা-মা হয়ে ওই জায়গাটায় কাজ করার চেষ্টা করি।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে লোকমান জানান, ডাক্তার ছেলের বেতনের একটি অংশ নিয়ে অবৈতনিক এই শিক্ষা কার্যক্রম তিনি আরও জোরদার করবেন।

ছেলের এমন কর্মকাণ্ডে খুশি লোকমান আলীর মা বয়োবৃদ্ধ নবিউন নেছাও। তিনি বলেন, 'বাহে, ধনে নয়, মনে বড় হতে হবে।'

মন্তব্য


অন্যান্য