রংপুর

যে কোনো মূল্যে এরশাদের সমাধি রংপুরে করার ঘোষণা

প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০১৯

যে কোনো মূল্যে এরশাদের সমাধি রংপুরে করার ঘোষণা

রংপুরে এরশাদের পল্লী নিবাসের লিচু বাগানে কবর খোঁড়ার কাজ চলছে- সমকাল

  রংপুর প্রতিনিধি

শোক ও ক্ষোভে উত্তাল রংপুর। জাতীয় পর্টির (জাপা) চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে রংপুরে সমাহিত করতে না দিলে, রক্তের বন্যা বইয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। এরশাদের সমাধি নিয়ে সকল ষড়যন্ত্র রুখে দিতে এবং যে কোনো মূল্যে এরশাদের সমাধি রংপুরে করার জন্য রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের নেতাকর্মীরা প্রস্তুত রয়েছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে এরশাদের জানাজা সম্পন্ন করতে কালেক্টর ঈদগাহ ময়দানে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আর তার দাফন কার্য সম্পন্ন করতে পল্লী নিবাস বাসভবনের পার্শ্বে তার নিজ হাতে গড়া লিচু বাগানে সমাধির প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।

এরশাদের মৃত্যুতে রংপুরজুড়ে চলছে শোকের মাতম। নগর জুড়ে লাগানো হয়েছে শোক পতাকা। মোড়ে মোড়ে মাইকে বাজানো হচ্ছে কোরআন তেলাওয়াত। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, পেশাজীবি সংগঠনের শোক ব্যানারে ছেয়ে গেছে রংপুরের রাস্তাঘাট, অলি-গলিসহ সর্বত্রই। মাইকে এরশাদের জানাজার সময়সূচি ঘোষণা করে জানাজায় শরীক হওয়ার আহ্বান জানাতে নগরজুড়ে চলছে সমানতালে প্রচারণা।  সেন্ট্রাল রোডস্থ দলীয় কার্যালয় ছেয়ে গেছে নেতাকর্মীদের শোক ব্যানারে। দলীয় কার্যালয়ে তোলা হয়েছে শোক পতাকা। কালো ব্যাচ ধারণ করে শোক প্রকাশ করছে নেতাকর্মীরা।

দলীয় কার্যালয়ে জরুরী সংবাদ সম্মেলন: সোমবার সকালে দলীয় কার্যালয়ে রংপুর-রাজশাহী বিভাগ জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে জরুরি সংবাদ সম্মেলন হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে নেতাকর্মীরা যে কোন মূল্যে এরশাদের সমাধি রংপুরে করা হবে বলে ঘোষণা দেন। বাধা আসলে শক্ত হাতে প্রতিহত করার হুশিয়ারিও দেন তারা।

মহানগর জাতীয় পার্টির সভাপতি ও সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, উত্তরাঞ্চলের মানুষ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে লালন করে রেখেছিলো। তাই আমরা চাই, তার সমাধি রংপুরে হোক। আমরা প্রিয় নেতার সমাধি করতে ঢাকায় ২টি স্থান পছন্দ করেছিলাম, সেখানে তাকে জায়গা দেওয়া হয়নি। তাকে বনানী সামরিক কবরস্থানে দাফন করে সাধারণ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করার একটি অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। শরীরের এক ফোঁটা রক্ত থাকতে সেখানে আমরা তাকে সমাহিত করতে দিব না।

তিনি বলেন, মঙ্গলবার যথাযোগ্য মর্যাদায় আমাদের প্রিয়নেতার মরদেহ ক্যান্টনমেন্ট থেকে নিয়ে কালেক্টর ঈদগাহ মাঠে নিয়ে আসা হবে। সেখানে বৃহৎ জানাজা হবে। যখন এরশাদের দুঃসময় ছিলো তখন লাখো জনতার ঢল নেমেছিলো, সেটি আমরা মঙ্গলবার দেখতে পাবো। যে পল্লী নিবাস থেকে তিনি রাজনীতি করেছেন, যে পল্লী নিবাসকে তিনি নতুনভাবে গড়েছেন, সেখানেই তাকে সমাহিত করা হবে।

মোস্তফা আরও বলেন, কেন্দ্রের গুটি কয়েক নেতাকর্মীদের দালালীপনা, স্বার্থান্বেষী সিদ্ধান্তের কারণে এরশাদের মরদেহ ঢাকায় ফেরত নেয়ার চেষ্টা চলছে। ঢাকায় দাফনের চেষ্টা চালালে রক্ত দিয়ে এর প্রতিবাদ করা হবে। এরশাদের সাথে তার হাজার সৈনিককে দাফন করে তবেই লাশ ঢাকায় নিয়ে যেতে হবে। পর্দার আড়ালে যেসব মুখোশধারী নেতারা কলকব্জা নাড়ছে, তাদেরকে আমরা চিহ্নিত করেছি। সময় মত দাঁত ভাঙ্গা জবাব দেয়া হবে।  কোন উপায় নেই এখান থেকে পল্লীবন্ধুকে নিয়ে যাওয়ার। রংপুরের মানুষ ফুঁসে উঠলে কি অবস্থা হয় বিগত দিনের ইতিহাস ঘাটলে বোঝা যায়। প্রধানমন্ত্রী রংপুরের পুত্রবধু, তিনি আমাদের মনের কথা বোঝেন। আমরা যেন শান্তিপূর্ণভাবে পল্লীবন্ধুকে রংপুরে দাফন করতে পারি সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ তিনি নেবেন বলে আশা করছি।

জাতীয় পার্টির মহানগর সাধারণ সম্পাদক এসএম ইয়াসির বলেন, এরশাদের লাশ ঢাকা থেকে রংপুরে না আনার ষড়যন্ত্র চলছে। আবহাওয়া খারাপের অজুহাত দেখিয়ে লাশ না আনার পায়তারা চলছে। লাশ নিয়ে আসা নিয়ে ষড়যন্ত্র করা হলে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে লাগাতার হরতাল-অবরোধ কর্মসূচী পালন করা হবে।

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুর রশিদ বলেন, বঙ্গবন্ধুর সমাধি যদি তার জন্মভূমি টুঙ্গিপাড়ায় হতে পারে, জিয়াউর রহমান একজন জেনারেল হয়ে যদি তার সমাধি সংসদ ভবনের পার্শ্বে উন্মুক্ত স্থানে হতে পারে, তবে একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি হয়ে এরশাদকে কেন বনানী কবরস্থানে বন্দী করে রাখা হবে।

জানাজার প্রস্তুতি: জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রতি কোরবানি ঈদের নামাজ আদায় করতেন রংপুর কালেক্টরেট ঈদগাহ ময়দানে। ২০০৬ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি এ মাঠের মেহরাবের উদ্বোধনও করেন। সেই মেহরাবের সামনেই তার লাশ রাখা হবে। সেজন্য ত্রিপলের নিচে সামিয়ানা ও তার নিচে আলাদা করে একটি মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে তার লাশ রাখার জন্য। তার পাশে সাদা কাপড় দিয়ে বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়েছে। গোটা মাঠজুড়ে প্যান্ডেল লাগানো হয়েছে। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে মাঠটি। জানাজার নামাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে চারদিকে মাইকের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিপুল লোক সমাগমের কথা চিন্তা করে মাঠের পার্শ্ববর্তী রংপুর সরকারি কলেজের রাস্তায়ও মাইক লাগিয়েছে স্থানীয় জাতীয় পার্টি।

প্রস্তুত প্রশাসন: এরশাদের সমাধি নিয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত না মিললেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতার জন্য পুরো প্রস্তুতি গ্রহণ করার কথা জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক সৈয়দ ফরহাদ হোসেন বলেন, কেন্দ্রীয় জাতীয় পার্টি থেকে চিঠি পায়নি জেলা প্রশাসন। চিঠি পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এর জন্য আমাদের সকল প্রস্তুতি রয়েছে।

ভারতের দিনহাটায় শোক: এরশাদের জন্মস্থান আদি পৈত্রিক বাড়ি দিনহাটায় শোকের মাতম চলছে। দিনহাটার এই কৃতি মানুষটি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ায় শোক পালন করছে ওই এলাকার মানুষ। এরশাদকে শেষবারের মত দেখতে তার ভাতিজা আহসান হাবীব ছুটে এসেছেন রংপুরের পল্লী নিবাসে। তিনি সিটি মেয়রকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।

আহসান হাবীব বলেন, ‌‘রোববার চাচার মৃত্যুর খবর দিনহাটায় পৌছালে সেখানে শোকের ছায়া নেমে আসে। তিনি যে স্কুলে লেখাপড়া করেছেন দিনহাটা উচ্চ বিদ্যালয় সাথে সাথে ছুটি ঘোষণা করা হয়। সোমবারও স্কুল বন্ধ রয়েছে। একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির মৃত্যু হয়েছে, আমাদের দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এখানে তার কিছুই নেই। যেটি দেখে আমি খুবই মর্মাহত হয়েছি। বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবেও তার কবর জনসম্মুখে হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্ত কি হচ্ছে তা আমি বুঝতে পারছি না।’

পল্লী নিবাসে এরশাদের সমাধির প্রস্তুতি: এদিকে এরশাদের পল্লী নিবাস বাসভবনের পার্শ্বে এরশাদের বাবার নামে করা মকবুল হোসেন জেনারেল ও ডায়াবেটিক হাসপাতালের লিচু গাছের তলায় এরশাদের সমাধিস্থল রচনা করতে স্থান নির্ধারণ করে কবর খোড়ার কাজ শুরু হয়েছে। বিকেলে সিটি কর্পোরেশনের মেয়রসহ স্থানীয় জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা সেখানে গিয়ে জায়গা নির্ধারণ করে দেন। এরশাদের নিজ হাতে লাগানো লিচুবাগানেই তাকে সমাহিত করার আয়োজন করা হয়েছে।

মন্তব্য


অন্যান্য