প্রবাস

ভিজিট ভিসায় প্রতারণার ফাঁদ

ঝুঁকিতে আমিরাতের শ্রমবাজার

প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঝুঁকিতে আমিরাতের শ্রমবাজার

  কামরুল হাসান জনি, দুবাই

'দাদু, ব্যালেন্স লাগবে, ব্যালেন্স?' দুবাইয়ের সোনাপুর লেবার ক্যাম্প সংলগ্ন ইউএই এক্সচেঞ্জের সামনে থেকে ভেসে এলো এই শব্দ। অঞ্চলটি দুবাইয়ে বাংলাবাজার নামেও পরিচিত। সিলেটের বানিয়াচং থানার মোরছালিন এভাবেই গ্রাহক খুঁচ্ছেন। মাত্র দুই মাস আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই আসেন ১৮ বছর বয়সী মোরছালিন। এক লাখ ২০ হাজার টাকায় ভিজিট (ভ্রমণ) ভিসা নিয়ে আমিরাত এসে এখন তিনি হকারিতে ব্যস্ত। অন্য প্রান্ত থেকে 'চাবি, ডলার' বলে হাঁকডাক দিচ্ছিলেন কুমিল্লার বেলাল হোসেন। দুই মাস আগে ভিজিট ভিসায় আমিরাতে এসেছেন তিনি। কথায় কথায় আরবি শব্দ উচ্চারণ শুনে জিজ্ঞাসা করতেই জবাব দিলেন, তিন বছর কাতার ছিলেন। সেখান থেকে দেশে গিয়ে আবার দুবাই এসেছেন। দুবাই আসতে তার খরচ হয়েছে এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা। ভিজিট ভিসা হওয়ায় কাজ নেই। কাজের জন্য আকামার ব্যবস্থা করতে হবে।

এই ভিসায় আমিরাতে গেলে শুধু বিনিয়োগকারী হিসেবে আকামা ও থাকার অনুমতি পাওয়া যায়। তার জন্য খরচ হবে আরও প্রায় তিন লাখ টাকা। এই টাকা জোগাড় করতেই হকারি করছেন তারা। দেশে টাকা পাঠান কি-না জানতে চাইলে বেলাল বলেন, 'এখানে নিজেই চলতে পারি না। মাস শেষে কার্ড কিনতে হয়, রুম ভাড়া সাড়ে ৪০০ দিরহাম, ২০০ দিরহাম খাবার খরচ। কঠিন পরিস্থিতিতে দিন কাটছে।'

কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার মোহাম্মদ টিপু। তিনি ব্যস্ত মোবাইল ব্যালেন্স নিয়ে। কথা বলে জানা গেল, এক লাখ ৩০ হাজার টাকা খরচ করে আমিরাতে পা রাখেন তিনি। দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে তার ভিজিট ভিসার মেয়াদ। কাজের ভিসার ব্যবস্থা করা নিয়ে চিন্তিত তিনি।

বাংলাদেশে অন্যতম রেমিট্যান্স প্রেরণকারী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজার বন্ধ রয়েছে দীর্ঘ সাত বছর। পাশাপাশি বন্ধ রয়েছে দেশটিতে অভ্যন্তরীণভাবে মালিক পরিবর্তনের সুযোগ। ভিসা জটিলতা খুলবে, খুলছে করেও খোলেনি। বৈধ পথে এখন শ্রমিক ভিসা নেই বললেই চলে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছর এ পর্যন্ত আমিরাতে গিয়েছেন দুই হাজার ১৬২ জন বাংলাদেশি। আর দেশটি থেকে চলতি বছর বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠানো হয় প্রায় ১৮০ কোটি ডলারের বেশি।

আমিরাতে ভ্রমণ ভিসার প্রক্রিয়া শিথিল থাকার সুযোগ নিয়েছেন মোরছালিন, বেলাল ও টিপুর মতো অসংখ্য তরুণ। স্বভাবতই এই ভিসায় কাজের অনুমতি থাকে না। এক মাস বা তিন মাসের নির্ধারিত সময়ের জন্য দেওয়া হয় এ ভিসা। মেয়াদ শেষ হলে আরও দু'বার পাওয়া যায় নবায়নের সুযোগ। কিন্তু সেই সময় শেষে অবস্থান করলে গুনতে হবে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা।

মূলত একটি ভিজিট ভিসার পেছনে খরচ হয় মাত্র ১৫-১৬ হাজার টাকা। এই সুযোগকে পুঁজি করে ফায়দা লুটছে এক শ্রেণির দালালচক্র। বাংলাদেশিদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তারা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দালালচক্র বিভিন্নভাবে প্রতারণার ফাঁদ খুলে বসেছে। অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভ্রমণ ভিসা দিয়ে কাজ ও আকামা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিসহ লোভনীয় প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। এ ফাঁদে পা দিয়ে আমিরাতে পাড়ি দিচ্ছে তরুণ-যুবকরা। তাদের কিছু সংখ্যক পরে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ করে দেশটিতে বিনিয়োগকারীর ভিসা নিয়ে থেকে গেলেও একটি বড় অংশই ভ্রমণ ভিসার মেয়াদ শেষ হলে অবৈধ হয়ে যাচ্ছে।

দেশটিতে অবস্থানরত প্রবাসীরা বলছেন, ভ্রমণ ভিসায় এসে কাজ পাওয়া কঠিন। তাছাড়া অবৈধ বাংলাদেশিদের সংখ্যা বাড়লে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে আমিরাতে অবস্থানরত শ্রমিকদের ক্ষেত্রে দেশটির প্রশাসন যে কোনো সময় কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।


মন্তব্য


অন্যান্য