প্রবাস

স্বপ্নভঙ্গের বাড়ি ফেরা

প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০১৯ | আপডেট : ০৩ জুলাই ২০১৯

স্বপ্নভঙ্গের বাড়ি ফেরা

ছবি: সমকাল

  সৈয়দ আনাস পাশা, ইউকে থেকে

ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে শুরু থেকেই সমর্থকদের স্বপ্ন দেখায় সাহস যুগিয়েছেন টাইগাররা। এই স্বপ্ন মাঝে মাঝে ঝাপসা হলেও মঙ্গলবার ভারত-বাংলাদেশ ম্যাচের আগ পর্যন্ত পুরোপুরি ভঙ্গ হয়নি। বরং আফগানিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও সাউথ আফ্রিকার সঙ্গে খেলায় এই স্বপ্নের রঙ আরো দূত্যি ছড়িয়েছে। 

সর্বশেষ বাংলাদেশ-ভারত এবং বাংলাদেশ-পাকিস্তানের ম্যাচ নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন লাল-সবুজের সমর্থকরা। এ দুটো ম্যাচে জিততে পারলে সেমি ফাইনালের হাতছানি ছিলো বাংলাদেশের সামনে। বার্মিংহামের এজবাস্টন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ভারতের বিপক্ষে হারার কারণে শেষ পর্যন্ত এটি হয়নি। তাই স্টেডিয়াম থেকে স্বপ্নভঙ্গের কষ্ট নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন টাইগার সমর্থকরা।

ভারতের বিপক্ষে ২৮ রানে হেরে সেমির দৌঁড় থেকে ছিটকে পড়লেও বাংলাদেশের বিশ্বকাপ মিশন এখনো শেষ হয়নি। পাকিস্তানের বিপক্ষে আরও একটি ম্যাচ বাকি। 

এবারের বিশ্বকাপে টাইগার সমর্থকদের নিখাদ দেশপ্রেম প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ববাসী। মাশরাফি বাহিনী ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের যে ক্রিকেট গ্রাউন্ডেই ম্যাচ খেলেছে, সেখানেই সমস্ত আবেগ, উচ্ছ্বাস নিয়ে উপচে পড়েছে ব্রিটেনের প্রবাসী বাঙালিরা। শুধুই কি ব্রিটেনপ্রবাসী? ইউরোপের বিভিন্ন দেশ- এমন কি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া থেকেও প্রবাসী বাঙালিরা ছুটে এসেছেন তাদের প্রিয় বাংলাদেশ দলকে সমর্থন দিতে। আর বাংলাদেশের টাইগার ভক্তদের কথা উল্লেখ না করলে তো নয়ই। তাদের অনেকে দেশ থেকে দলে দলে ইংল্যান্ডে ছুটে এসেছেন। 

বার্মিংহামে ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচেও এর ব্যাতিক্রম ছিলো না। সাড়ে ২৪ হাজার আসনবিশিষ্ট এজবাস্টন ক্রিকেট গ্যালারিতেও বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন তারা। গ্যালারি ভারতীয়দের দখলে থাকলেও বাংলাদেশি সমর্থকরাও সমান তালে গলা ফাটিয়ে উৎসাহ দিয়েছেন টাইগারদের।

বাংলাদেশকে নিয়ে ভারত যে কম আতঙ্কে ছিলো না, এজবাস্টনে ভারত সমর্থকদের প্রস্তুতিপূর্ণ উপস্থিতি ও বাঁধভাঙা উল্লাস তার প্রমাণ দেয়। তবে মুস্তাফিজ যখন একে একে ভারতের ৫ ব্যাটসম্যানকে সাজঘরে ফেরালেন, তখন ভারতীয় সমর্থকদের গলা স্তিমিত ছিল। আর টাইগার সমর্থকদের উচ্ছ্বাসধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়েছিল স্টেডিয়াম। কিন্তু বাংলাদেশের টপঅর্ডার ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায় পরে এই প্রতিধ্বনি মিলিয়ে যায়। 

ছবি: সমকাল

ব্রিটেনের বিভিন্ন শহর থেকে লাল-সবুজের সমর্থকরা উপস্থিত হয়েছিলেন এজবাস্টনে। কেউ কেউ নিজ উদ্যোগে কোচভর্তি সমর্থক নিয়ে মিছিলসহকারে ঢুকেছিলেন এজবাস্টন ক্রিকেট গ্যালারিতে, কিন্তু বেরিয়েছেন ভাঙা মনে। 

বিশ্বকাপ শুরুর এক বছর আগেই স্ত্রী ও নিজের জন্য বাংলাদেশের ৯টি ম্যাচের টিকেট কিনে রেখেছিলেন সত্যবাণী পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আবু মুসা হাসান। ব্রিটেনে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে ক্রিকেট বিশ্লেষক হিসেবে পরিচিত হাসান প্রতিটি খেলার পরই প্রশংসা করেছেন টাইগারদের। আশাবাদের কথা শুনিয়ে সমকালকে বলেছিলেন, ইন্ডিয়া ও পাকিস্তানের সঙ্গে জিতলেই আমাদের বিশ্বকাপ পাওয়া হয়ে যাবে, আমি আশাবাদী আমাদের ছেলেরা তা পারবে।

মঙ্গলবার এজবাস্টন থেকে এই আবু মুসা হাসানও বেরিয়েছেন ভাঙা মন নিয়ে। বললেন, সব আশায় পানি ঢেলে দিয়েছে আমাদের টপঅর্ডার ব্যাটসম্যানরা। তামিম, সৌম্য, মুশফিক, লিটনের কাছে এমন খেলা আশা করিনি আমরা। 

তিনি আরও বলেন, ক্রিকেটে একটি কথা আছে ‘ক্যাচ ইজ ম্যাচ’। তামিম যখন ক্যাচটা মিস করলো তখনই বুঝে গেছি আজ দিনটা আমাদের নয়। তামিমের কাছে প্রত্যাশা ছিলো অনেক বেশি। সাব্বির, সাইফুদ্দিন পারলে টপঅর্ডার ব্যাটসম্যানরা পারবেনা কেন? একমাত্র সাকিব ছাড়া বাকি সবাই এক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

৫ জুলাই পাকিস্তানের সঙ্গে টাইগারদের বিজয় কামনা করে তিনি বলেন, সেমি ফাইনালের সুযোগ হাতছাড়া হলেও পাকিস্তানের সঙ্গে খেলায় টাইগারদের বিজয় দেখার অপেক্ষায়ই আছি।

৩০ জুন লন্ডনে ছিলো বৈশাখি মেলা। দক্ষিন এশিয়ার বাইরে বাঙালির সর্ববৃহৎ এই মিলন মেলায় হাজারো দর্শকের মন মাতিয়েছেন ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া এই প্রজন্মের আরবান রাইজিং স্টারখ্যাত শিল্পী নিশ। তিনি মঞ্চে উঠেছিলেন সাকিবের ৭৫ নম্বর জার্সি পড়ে। গানের ফাঁকে ভক্তদের বলেছিলেন, আমাদের ক্রিকেট সূর্য সাকিব বাংলাদেশ টিমকে নিয়ে হাঁটছে সেমির পথে, তাদের সফলতার জন্য প্রার্থনা করুন। 

ভারতের সঙ্গে হারার পর সেই নিশেরও মনে ভেঙেছে। সমকালকে তিনি বলেন, ক্রিকেট হলো বহির্বিশ্বে জন্ম ও বেড়ে ওঠা আমাদের প্রজন্মের অবলম্বন। সব নেতিবাচক খবরকে চাপা দিয়ে বাংলাদেশকে উজ্জ্বলভাবে আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরে এই ক্রিকেট। শিকড়ভূমি বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের ধরে রাখার অবলম্বন টাইগার বাহিনী যখন খারাপ সময় অতিবাহিত করে তখন আমরাও চাপ অনুভব করি। ইন্ডিয়ার সঙ্গে হারার পর সেই খারাপ সময়টিই এখন অতিবাহিত করছি আমরা। নিশ আশা প্রকাশ করেন, সেমির সুযোগ হাতছাড়া হলেও পাকিস্তানের সঙ্গে জিতে বাংলাদেশের সমর্থকদের আবারও চাঙ্গা করে তুলবে মাশরাফিবাহিনী।

টাইগাররাও জানে, এখন সমর্থকদের একটাই আশা, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জয়। 'একাত্তরের চেতনা, ক্রিকেট মাঠের প্রেরণা'- এই স্লোগান নিয়ে টাইগাররা কি পারবে লর্ডসে আবারও জ্বলে উঠতে, পারবে কি সমর্থকদের বিশ্বকাপের শেষ প্রত্যাশা পূরণ করতে? সেজন্য ৫ জুলাই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

মন্তব্য


অন্যান্য