বন্দর নগরী

ঘুষের টাকা নিয়েই তারা হাওয়া হয়ে যান

চট্টগ্রাম বন্দরে কাস্টমস কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ

প্রকাশ : ০৪ আগষ্ট ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঘুষের টাকা নিয়েই তারা হাওয়া হয়ে যান

  সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম বন্দরে আসা প্রতিটি জাহাজে নিয়ম অনুযায়ী একজন প্রিভেন্টিভ অফিসার নিয়োগ দেয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। জাহাজে থাকা সব পণ্য ঘোষণা অনুযায়ী ঠিক আছে কি-না, ঘোষণার অতিরিক্ত কোনো পণ্য নামানো হচ্ছে কি-না, শুল্ক্কায়ন-সংক্রান্ত কাগজপত্র ঠিকভাবে দাখিল না করে কেউ কোনো পণ্য নামাচ্ছে কি-না- এ বিষয়গুলো সার্বক্ষণিক তদারক করার কথা প্রিভেন্টিভ অফিসারের। সব পণ্য নামিয়ে জাহাজ বন্দর না ছাড়া পর্যন্ত এ কর্মকর্তার থাকার কথা জাহাজেই। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতি বছর গড়ে সাড়ে তিন হাজার জাহাজ এলেও কোনো জাহাজেই এ দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছেন না কাস্টমসের প্রিভেন্টিভ অফিসাররা। শিপিং এজেন্ট কিংবা আমদানিকারকের কাছ থেকে ঘুষ বাবদ 'স্পিডমানি' নিয়েই জাহাজ থেকে হাওয়া হয়ে যান তারা। আর এ সুযোগেই কাজ সারে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আনা জালিয়াতচক্র।

সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য মূলধনি যন্ত্রপাতি আনার ঘোষণা দিয়ে জাহাজভর্তি মদ নিয়ে আসা পানামার পতাকাবাহী জাহাজ 'এমভি কিউ জি শান'-এ কাস্টমসের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিভেন্টিভ অফিসারও পণ্য খালাসের সময় ছিলেন না ঘটনাস্থলে। এ কারণে ৬৬৯টি বক্সে এক হাজার ৪০৬ টন মেশিনারিজ আনার ঘোষণা দিয়ে দুটি লাইটারেজ বার্জে প্রায় ৬০০ বক্স মদের চালান খালাসও করে নিয়ে যায় জালিয়াতচক্র। অবশিষ্ট পণ্য তৃতীয় লাইটারেজ বার্জে নামানোর সময় একটি বক্স ভেঙে মদের বোতল বেরিয়ে পড়লে তা দেখে ফেলেন বন্দরের ওয়াচম্যানরা। তখন আর ঘটনা ধামাচাপা দিতে পারেনি কেউ।

জানতে চাইলে জেটিতে কর্মরত কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার সাধন কুমার কুণ্ডু বলেন, বন্দরে নোঙর করা প্রতিটি জাহাজে কাস্টমসের একজন প্রিভেন্টিভ অফিসার থাকেন। এই জাহাজ বন্দর ত্যাগ না করা পর্যন্ত জাহাজে তার অবস্থান করার কথা। মদের চালান আসা জাহাজটিতে প্রিভেন্টিভ অফিসার কে ছিলেন তা আমরা খতিয়ে দেখব। দায়িত্বে অবহেলা পেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

একই প্রসঙ্গে কাস্টমসের সহকারী কমিশনার (প্রিভেন্টিভ) মাহবুবুর রহমান বলেন, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা পর্যায়ের একজনকে সাধারণত জাহাজে বোর্ডিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। মদের চালান খালাস হওয়া জাহাজে কে দায়িত্বে ছিলেন তা আমি জানি না। জেটির সহকারী  কমিশনার মিজানুর রহমানও বলতে পারেননি দায়িত্বপ্রাপ্ত বোর্ডিং কর্মকর্তার নাম। তিনি এফ ডিভিশনে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। জেটির এফ ডিভিশনের রাজস্ব কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেন চৌধুরীকে ফোন করলে তিনি রিসিভ করেননি। তবে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শাহজাহান সিরাজ বলেন, মদের চালান আসা জাহাজটি বন্দরের বহির্নোঙরে আসার পর প্রিভেন্টিভ অফিসার ছিলেন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম। জেটিতে পণ্য খালাসের সময় কে দায়িত্বে ছিলেন তা আমি জানি না।

শরিফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বহির্নোঙরে দায়িত্ব পালনের কথা স্বীকার করে বলেন, জাহাজটি জেটিতে আনা পর্যন্ত আমি দায়িত্বে ছিলাম। এরপর এই দায়িত্ব নেন গেট শাখার এক কর্মকর্তা। আমি তার নাম জানি না।

গেট শাখার রাজস্ব কর্মকর্তা নন্দী বাবু জানান, মদের চালান আসা সেই জাহাজ জেটিতে আসার পর দায়িত্বে ছিলেন ইরফান চৌধুরী নামের এক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা। ইরফান চৌধুরী দায়িত্বে থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, এটা সত্য যে, জাহাজটিতে আমি সার্বক্ষণিক ছিলাম না। দুই লাইটারেজ পণ্য খালাসের সময়ও ছিলাম না। লোকবল সংকটের কারণে গেটে ছিলাম তখন।

শিপিং এজেন্ট ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং বন্দরের নিরাপত্তা দপ্তরের একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরে আসা বেশিরভাগ জাহাজেই সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন না কাস্টমসের কোনো প্রিভেন্টিভ অফিসার। আমদানিকারক কিংবা তার মনোনীত প্রতিনিধির কাছ থেকে ঘুষ বাবদ স্পিডমানি নিয়েই জাহাজ থেকে নেমে পড়েন তারা। এই স্পিডমানির পরিমাণ জাহাজ ও পণ্য ভেদে ১০ হাজার থেকে শুরু করে লাখ টাকাও হয়। মদের চালান আসা জাহাজেও এভাবে প্রিভেন্টিভ অফিসারকে ম্যানেজ করে বিপাশা এন্টারপ্রাইজ খালাস করে নেয় দুই বার্জভর্তি চালান। একটি বক্স ভেঙে মদের বোতল বের হয়ে না এলে তৃতীয় চালানটিও নির্বিঘ্নে খালাস করে নিত তারা।

শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আহসানুল হক চৌধুরী বলেন, 'চট্টগ্রাম বন্দরে আসা বিদেশি জাহাজের কোনোটিতেই কাস্টমসের কোনো প্রিভেন্টিভ কর্মকর্তা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করেছেন কি-না তা নিয়ে আমি সন্দিহান। নিয়ম রক্ষার জন্য জাহাজে গিয়ে স্বাক্ষর করে ঘুষের টাকা নিয়ে নেমে পড়েন তারা। ঘুষের এ লেনদেন ওপেন সিক্রেট।

পণ্য খালাসের দায়িত্বে থাকা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মাহমুদ ইমাম বিলুও একই কথা বলেন।

মন্তব্য


অন্যান্য