বন্দর নগরী

পরিকল্পিত নগর গড়তে তৈরি করা পাঁচ মাস্টারপ্ল্যানের একটিও বাস্তবায়ন হয়নি

চার কারণে ডুবছে চট্টগ্রাম

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০১৯

চার কারণে ডুবছে চট্টগ্রাম

(ঘড়ির কাঁটা অনুযায়ী) চাক্তাই খাল দখল করে নির্মিত হচ্ছে অট্টালিকা। বহুতল ভবনের কারণে গইন্যা খালের পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চাক্তাই খাল দখল করতে পাড়ে তৈরি করা হয়েছে বাঁশের ঘের। মাটি ফেলে ভরাটের কারণে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে মহেশখালের পানিপ্রবাহ - ফাইল ছবি

  সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম ওয়াসার ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বলছে, ৪২ শতাংশ পানি প্রবাহের ক্ষমতা হারিয়েছে নগরের প্রধান খালগুলো। রাস্তার পাশে থাকা ড্রেনের মধ্যে ৩২ শতাংশ বন্ধ হয়ে গেছে অথবা কার্যক্ষমতা হারিয়েছে। পানিপ্রবাহের কার্যকারিতা হারিয়েছে ১৯ শতাংশ কালভার্টও। এখন এগুলোর ওপর দিয়েই প্রবাহিত হচ্ছে পানি। নগরীকে জলাবদ্ধতামুক্ত করতে হলে রাস্তার পাশের ৯০ শতাংশ বিদ্যমান ড্রেন সংস্কার ও ৫৫ শতাংশ অতিরিক্ত ড্রেন খনন করতে হবে জরুরিভিত্তিতে। তিনটি নতুন খাল ও ৩০টি নতুন সেকেন্ডারি খাল খননেরও সুপারিশ আছে। আছে নগরের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়া ১২টি খাল পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তার কথাও। কিন্তু মাস্টারপ্ল্যানে থাকা এসব সুপারিশ ধরে কাজ না হওয়া, খাল দখল করে একর পর এক স্থাপনা নির্মাণ ও খালের পাড়ে থাকা অবৈধ স্থাপনা নির্বিচারে উচ্ছেদ করতে না পারায় সামান্য বৃষ্টিতেই এখন ডুবে যাচ্ছে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম। প্রসঙ্গত চট্টগ্রামকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে এ পর্যন্ত মোট পাঁচটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হলেও কোনোটিই বাস্তবায়ন করা হয়নি যথাযথভাবে।

এ প্রসঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী আলী আশরাফ বলেন, '১৯৬৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট পাঁচটি মাস্টারপ্ল্যানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু দায়িত্বশীলদের কেউই এ মহাপরিকল্পনা ধরে শহরকে সাজায়নি। এটিরই খেসারত হিসেবে হারিয়ে গেছে ১২টি খাল। এখন বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি একাকার হয়ে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে পুরো শহর। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ হতে হলে আরএস জরিপের (রিভাইজড সার্ভে) অনুযায়ী হারিয়ে যাওয়া সেই ১২টি খাল পুনরুদ্ধার করতে হবে। নতুন খাল খনন করতে হবে। নতুন মাস্টারপ্ল্যান ধরে দখলদারদেরও উচ্ছেদ করতে হবে।' তিনি জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়েছে। অতি জোয়ারে নগরের ১৯ শতাংশ কালভার্টের ওপর দিয়েই এখন প্রবাহিত হয় খালের পানি। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে মাথায় রাখতে হবে এসবও।

চট্টগ্রামকে পরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়তে ৪৮ বছর আগে প্রণয়ন করা হয়েছিল মাস্টারপ্ল্যান। ১৯৬৯ সালে সেই মাস্টারপ্ল্যানে নগরের ৩৪টি খাল চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম ওয়াসা প্রণীত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যানে খাল পাওয়া গেছে ২২টি। ৪৮ বছরের ব্যবধানে নগরের মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে ১২টি খাল। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্বিচারে দখল ও রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ার তিন কারণে এসব খাল হারিয়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ কারণে এখন সামান্য বৃষ্টিতেই কোমরপানিতে ডুবছে বন্দরনগর চট্টগ্রাম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একই কারণে বিলীন হওয়ার পথে আছে বিদ্যমান খালগুলোও। নতুন ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, এসব খালও পানিপ্রবাহের ক্ষমতা হারিয়েছে ৪২ শতাংশ।

চট্টগ্রাম নগরকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে পাকিস্তানি শাসনামলে তৈরি করা হয় মাস্টারপ্ল্যান। এ জন্য ১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান ভিত্তিক প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান জন আর স্নেল তৈরি করে 'স্টর্ম ড্রেনেজ অ্যান্ড ফ্ল্যাড কন্ট্রোল, মাস্টার প্ল্যান অ্যান্ড ফিজিবিলিটি রিপোর্ট ফর চিটাগং'। এ ফিজিবিলিটি স্টাডিতে চট্টগ্রাম শহরের কালুরঘাট থেকে নেভাল একাডেমি ৩৪টি খালের মুখ চিহ্নিত করা হয়েছিল। খালগুলো নগরের বিভিন্ন এলাকায় প্রবাহিত হয়ে কর্ণফুলী নদীতে যুক্ত হয়েছিল। এরপর ১৯৭২ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড, ১৯৮৬ সালে লুইস বার্জার, ১৯৯৫ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম ওয়াসা মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে। এর মধ্যে ১৯৬৯, ১৯৯৫ ও ২০১৭ সালের মাস্টারপ্ল্যানে ছিল নগরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার আদ্যোপান্ত পরিকল্পনা।

সর্বশেষ ২০১৭ সালে চিটাগাং ওয়াটার সাপ্লাই ইমপ্রুভমেন্ট অ্যান্ড স্যানিটেশন প্রকল্পের আওতায় ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে চট্টগ্রাম ওয়াসা। বাংলাদেশ প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান অ্যাকোয়া কনসালট্যান্ট অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েট অ্যান্ড ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউওএম)-এর সহায়তায় এবং ডেনমার্কের প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান গ্রন্টমি দীর্ঘ দুই বছর সমীক্ষা শেষে এ মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করে। এ সমীক্ষায় মাত্র ২২টি খালের সন্ধান মিলেছে। ১২টি খালের কোনো অস্তিত্বই পায়নি প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব খালের বেশিরভাগ হচ্ছে নগরের ফিরিঙ্গি বাজার, ফিশারিঘাট, অভয়মিত্রঘাট, সদরঘাট ও মাঝিরঘাট এলাকায়। আরএস জরিপে এসব খালের অস্তিত্ব থাকলেও বিএস জরিপে জালিয়াতির মাধ্যমে ভিটাবাড়ি দেখিয়ে খালগুলো দখল করা হয়েছে। প্রথমে খালের দু'পাড় দখল করেছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। এরপর খাল সরু হয়ে গেলে উপরে স্ল্যাব দিয়ে অস্থায়ী স্থাপনা করা হয়েছে। একপর্যায়ে সেই অস্থায়ী স্থাপনার স্থলে গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল ভবন। সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের নজরদারি না থাকায় রক্ষণাবেক্ষণও করা হয়নি খালগুলো।

জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি অধ্যাপক সিকান্দার খান বলেন, 'যথাযথভাবে ফিজিবিলিটি স্টাডি না করেই জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে দিয়ে পাঁচ হাজার ৬১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। এ প্রকল্পের অধীনে মোট ৩৬টি খাল সংস্কারের কথা থাকলেও এখনও সবগুলোর কাজ শেষ করতে পারেনি সিডিএ। অথচ তাদের প্রকল্প শেষ হতে আর সময় আছে মাত্র এক বছর।'

জানা গেছে, সিডিএ প্রাথমিকভাবে মহেশখাল, খন্দকিয়া খাল, নাছির খাল, চাক্তাই খাল, বির্জা খাল, রাজাখালী খাল-১, রাজাখালী খাল-২, হিজড়া খাল, কলাবাগিচা খাল, ডোমখাল, বামুনশাহী খাল, বাকলিয়া খাল, নোয়া খাল, মির্জা খাল, মরিয়মবিবি খাল ও রাজাখালী খাল-৩ সংস্কারের কাজ করেছে। ৩৬টি খালের সবক'টি যথাযথভাবে সংস্কার না হওয়ায় এবং খালপাড়ে থাকা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করতে না পারায় সামান্য বৃষ্টিতে এখন তলিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রামের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা। জোয়ারের সঙ্গে বৃষ্টির পানি একাকার হয়ে এখন ডুবে থাকছে এখানকার স্কুল কলেজ। ডুবে থাকছে হাসপাতালও।

মন্তব্য


অন্যান্য