রাজনীতি

জাপায় সমঝোতা টিকবে ক'দিন

রওশন এরশাদকে বিরোধীদলীয় নেতা ও জিএম কাদেরকে উপনেতা করতে স্পিকারকে চিঠি, রংপুর-৩ আসনে উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থী সাদ

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাপায় সমঝোতা টিকবে ক'দিন

ফাইল ছবি

  সমকাল প্রতিবেদক

জাতীয় পার্টির (জাপা) অভ্যন্তরীণ বিরোধ আপাতত মিটলেও এর স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় রয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, এই সমঝোতা টিকবে ক'দিন। জিএম কাদের ও রওশনপন্থিদের সমঝোতার টেবিলে আনতে সরকারের ভূমিকাকেও ভালোভাবে নেননি জাপার নেতাকর্মীরা।

জিএম কাদের জাপার চেয়ারম্যান, রওশন এরশাদ বিরোধীদলীয় নেতা- এ সূত্রে দেবর-ভাবির মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। গত রাতে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর কাছে দেওয়া এক চিঠিতে রওশন এরশাদকে বিরোধীদলীয় নেতা ও জিএম কাদেরকে উপনেতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। জিএম কাদের এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেন এবং তার নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির একটি প্রতিনিধি দল সেটা স্পিকারের কাছে পৌঁছে দেন।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে শূন্য রংপুর-৩ আসনে রওশনপুত্র রাহাগীর আল মাহি সাদ জাপার প্রার্থী হচ্ছেন। সাদকে প্রার্থী করতে জিএম কাদের রাজি হলেও তার অনুসারীরা অখুশি। দল ছাড়ার হুমকি দিয়েছেন কেউ কেউ। গতকাল জাপার বনানী কার্যালয়ের সামনে 'আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত মানি না' বলে স্লোগান দেন বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা।

১৯৯৬ সালে রাজনীতিতে আসার পর থেকেই বিরোধ চলছে জিএম কাদের ও রওশন এরশাদের মধ্যে। এরশাদ জীবদ্দশায় বিরোধ সামলে চললেও তার মৃত্যুর পর জাপার চেয়ারম্যান ও বিরোধীদলীয় নেতার পদ নিয়ে দেবর-ভাবির বিরোধ চরমে পৌঁছে। ১৮ জুলাই জিএম কাদেরকে জাপার চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হলে তা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বিবৃতি দেন এরশাদপত্নী রওশন।

বিরোধীদলীয় নেতা হতে চেয়ে গত মঙ্গলবার জিএম কাদের স্পিকারকে চিঠি দিলে জাপায় বিস্ম্ফোরণোন্মুখ অবস্থার সৃষ্টি হয়। রওশন স্পিকারকে পাল্টা চিঠি দেন। তাকে জাপার চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন তার অনুসারীরা। দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষমতা চেয়ে দু'জন পাল্টাপাল্টি চিঠি দেন নির্বাচন কমিশনে।

এ অবস্থায় জাপা আরেক দফা ভাঙনের মুখোমুখি হয়। কিন্তু সরকারের মধ্যস্থতায় গত শনিবার পরিস্থিতি হঠাৎ পাল্টে যায়। রওশন ও কাদেরের প্রতিনিধিরা আলোচনার টেবিলে বসেন। জিএম কাদেরকে জাপার চেয়ারম্যান পদে মেনে নেন রওশনপন্থিরা। রওশনকে বিরোধীদলীয় নেতা পদে মেনে নেন কাদেরপন্থিরা।

ওই বৈঠকে উপস্থিত ১০ নেতার ছয়জনের সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল। তারা প্রত্যেকেই স্বীকার করেছেন, সরকারের মধ্যস্থতায় বৈঠক হয়েছে। কাদেরপন্থিরা বলেছেন, সরকারের সমর্থন রয়েছে রওশনের পক্ষে। এ কারণেই তার দাবি মেনে তাকে বিরোধীদলীয় নেতা করতে হয়েছে। সাদকে মনোনয়ন দিতে হয়েছে। এ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না জিএম কাদেরের সামনে।

কাদের ও রওশন উভয় পক্ষের নেতারাই জানিয়েছেন, বৈঠকের আগে গণভবনে যান জাপার মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ। সেখান থেকেই সিদ্ধান্ত আসে কে বিরোধীদলীয় নেতা হবেন আর কে হবেন জাপার চেয়ারম্যান। বৈঠক ছিল আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।

তবে কাদেরপন্থিদের অভিযোগ, রওশনপন্থিদের সব দাবি তারা মেনে নিয়েছেন। রংপুরের নেতাকর্মীরা প্রবল বিরোধিতা করলেও সাদকে মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু রওশনপন্থিরা শেষ মুহূর্তে এসে জিএম কাদেরের বিরোধীদলীয় উপনেতা হওয়ার বিষয়টি ঝুলিয়ে দিয়েছে।

গতকাল রোববার সংসদের লবিতে মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ সাংবাদিকদের বলেন, সংসদীয় দলের সভায় সর্বসম্মতিক্রমে রওশন এরশাদ বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। তাকে বিরোধীদলীয় নেতার স্বীকৃতি দিতে স্পিকারকে চিঠি দেবেন জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের।

এর আগে সংসদ থেকে বেরিয়ে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য আবু হোসেন বাবলা বলেন, জিএম কাদের উপনেতা নির্বাচিত হয়েছেন। এ নিয়ে কোনো সন্দেহ, সংশয় নেই।

জাপা সূত্রের খবর, প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এবং মসিউর রহমান রাঙ্গাঁও উপনেতা হতে চেয়েছিলেন। জিএম কাদেরপন্থিদের মধ্যে কাজী ফিরোজ রশীদেরও প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার এ পদের আগ্রহ ছিল।

আগের রাতের বৈঠকের সিদ্ধান্ত গতকাল বনানী কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে জানান রাঙ্গাঁ। তিন দিনের আড়াল ভেঙে সামনে আসা এ নেতা বলেন, সাদকে রংপুর-৩ আসনে মনোনয়ন দেওয়ার পক্ষে প্রস্তাব দিয়েছেন জিএম কাদের। তাকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দলের তরফ থেকে।

এদিকে রংপুরের নেতারা সাদের বিরোধিতা করছেন, তাকে বহিরাগত আখ্যা দিয়েছেন রংপুর মহানগর ও জেলার নেতারা। রংপুর সিটির মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেছেন, সাদকে মনোনয়ন দিলে নেতাকর্মীরা তার পক্ষে নামবে না। যারা তাকে মনোনয়ন দেবে, তাদেরই পাস করানোর দায়িত্ব নিতে হবে।

এর জবাবে রাঙ্গাঁ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, কোনো বিরোধ নেই। কোনো বিরোধ থাকবে না। যদিও সে সময়ে বনানী কার্যালয়ের বাইরে নেতাকর্মীরা রওশন এরশাদ ও সাদকে সরকারের 'এজেন্ট' আখ্যা দিয়ে স্লোগান দিচ্ছিলেন।

গত তিন দিন অদৃশ্য থাকা সম্পর্কে রাঙ্গাঁ বলেন, দুই পক্ষের সমঝোতা করাতেই তিনি আড়ালে ছিলেন। পরিবারে বাবা-মায়ের মধ্যে ঝগড়া হলে সন্তান যেমন বিপদে পড়ে, তিনিও একই রকম বিপদে ছিলেন। তার দাবি, এখন আর জাপায় বিরোধ নেই।

তবে গত বছর জাপা থেকে পদত্যাগ করা রিন্টু আনোয়ার সমকালকে বলেছেন, দেবর-ভাবির ব্যক্তিগত চাওয়া পূরণ হওয়ায় সমঝোতা হয়েছে। তবে এ সমঝোতাও তাদের নিজেদের ইচ্ছায় হয়নি। সরকারের মধ্যস্থতায় হয়েছে। কতদিন টিকবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

জাপার সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক এমপি নওয়াব আলী আব্বাস খান বলেছেন, জাতীয় পার্টিতে যারা আছেন, তাদের অধিকাংশ আছেন নিজেদের স্বার্থ পূরণে। ক্ষমতা থেকে পতনের পর জাপা স্বাধীনভাবে রাজনীতি করেনি। শেষ ১০ বছরে স্বকীয়তা ও জনসমর্থনও হারিয়েছে। এ দলে যা সিদ্ধান্ত হয়, তা বাইরে থেকে আসে। এবারের সমঝোতাও তেমন একটা কিছু। স্বার্থে আঘাত লাগলেই আর টিকবে না।

এখনও জাপার কেন্দ্রীয় পদে অবস্থানকারী কোনো নেতা নাম প্রকাশ করে এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তবে সাবেক একজন মহাসচিব সমকালকে বলেছেন, লেজুড়বৃত্তিই জাপার নিয়তিতে পরিণত হয়েছে। দল শেষ হয়ে গেছে। যতদিন টিকে থাকবে, জাপাকে ততদিন এভাবেই টিকে থাকতে হবে।

তবে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জাপায় বিরোধ ও সমঝোতাকে দেখছেন দলটির অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে। তিনি বলেছেন, এতে সরকারের নাক গলানোর কিছু নেই। যাকেই জাপা নেতা নির্বাচন করবে, আওয়ামী লীগ তাকে অভিনন্দন জানাবে।

মন্তব্য


অন্যান্য