রাজনীতি

ফের আলোচনায় ছাত্রলীগ, আগাম সম্মেলনের হাওয়া

কমিটি ভাঙার বিষয়ে সিদ্ধান্ত আকারে কোনো কথা হয়নি -ওবায়দুল কাদের

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফের আলোচনায় ছাত্রলীগ, আগাম সম্মেলনের হাওয়া

  সমকাল প্রতিবেদক

ফের আলোচনায় ছাত্রলীগ। সংগঠনটির দুই শীর্ষ নেতা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার অসন্তোষের খবর প্রকাশের পর থেকে চলছে ব্যাপক তোলপাড়। গুঞ্জন উঠেছে, মেয়াদপূর্তির ১১ মাস আগেই ছাত্রলীগের সম্মেলন হতে পারে।

গত শনিবার গণভবনে আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ড ও  স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের যৌথ সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এ সময় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার জন্য গণভবনে গিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। তবে আওয়ামী লীগের তিন জ্যেষ্ঠ নেতার পরামর্শে তারা চলে আসেন সেখান থেকে।

শনিবার রাতেই এ খবর জানাজানি হয়ে যায়। তোলপাড় দেখা দেয় সংগঠনে। পক্ষে-বিপক্ষে লেখালেখি শুরু হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বিতর্কিত নেতাদের সরাতে ও সংগঠনকে গতিশীল করতে ছাত্রলীগের আগাম সম্মেলনের দাবিও জানান অনেকে। গতকাল রোববার দিনভর এ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত ছিল।

এ প্রসঙ্গে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানী অবশ্য গতকাল রোববার সাংবাদিকদের বলেছেন, সন্তান ভুল করলে মা অসন্তোষ প্রকাশ করতেই পারেন। সেটাই প্রধানমন্ত্রী করেছেন। আর ছাত্রলীগের কমিটি ভেঙে দেওয়ার কথাও প্রধানমন্ত্রী রাগের মাথায়ই বলেছেন।

ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে আগে থেকেই নানা সমালোচনা হচ্ছিল। বিতর্কিত ব্যক্তিদের কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা দেওয়া ও অনৈতিক আর্থিক লেনদেন, সম্মেলনের পরও একাধিক শাখায় কমিটি না দেওয়া, দুপুরের আগে ঘুম থেকে না ওঠা, গণমাধ্যমকর্মীদের এড়িয়ে চলা কিংবা ফোন না ধরা, সংগঠনের একাধিক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়েও নির্ধারিত সময়ের অনেক পর উপস্থিত হওয়া অথবা অনুপস্থিত থাকা ইত্যাদি অভিযোগ নিয়ে সমালোচনায় মুখর ছিলেন খোদ সংগঠনের নেতাকর্মীরাই। এরই মধ্যে ছাত্রলীগ সভাপতির বিয়ের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। পাশাপাশি দুই নেতার বিরুদ্ধে সংগঠনের নেত্রীদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার অভিযোগ ওঠায় ক্ষুব্ধ হন অনেকেই। শনিবার আওয়ামী লীগের যৌথ সভায় কয়েকজন নেতা এসব বিষয়ও তুলে ধরেন।

এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল সচিবালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত রবার্ট মিলারকে সৌজন্য সাক্ষাৎ দেওয়ার পর সাংবাদিকদের জানান, মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকে ছাত্রলীগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে কমিটি ভাঙার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফোরামও এটি (মনোনয়ন বোর্ডের সভা) নয়।

প্রধানমন্ত্রী সভায় ক্ষুব্ধ হয়ে কমিটি ভাঙার নির্দেশ দিয়েছেন কি? এ প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের জানান, এ ধরনের কিছু হলে সাংবাদিকরা অবশ্যই জানতে পারবেন। তবে মনোনয়ন বোর্ডের সভায় প্রসঙ্গত অনেক কথা ও আলোচনা হলেও ছাত্রলীগের কমিটি ভাঙার বিষয়ে সিদ্ধান্ত আকারে কোনো কথা হয়নি। দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করা এ মুহূর্তে তার পক্ষে ঠিক হবে না- এ কথা জানিয়ে তিনি বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত কমিটি ভাঙার বিষয়টি সিদ্ধান্ত আকারে না আসছে, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় না যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এর সত্যতা তিনিও স্বীকার করবেন না।

ছাত্রলীগের কর্মকা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ কি-না- এমন প্রশ্নের জবাবে সেতুমন্ত্রী বলেন, কিছু কিছু ব্যাপারে এমন হতেই পারে। ছাত্রলীগের বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত কোনো ব্যাপার নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কনসার্ন হতেই পারেন, এটা খুব স্বাভাবিক।

'ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে ওবায়দুল কাদের গণভবন থেকে চলে যেতে বলেছেন'- এমন খবর প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, তাদের চলে যেতে বলব কেন? প্রধানমন্ত্রীর ওখানে বিভিন্ন জেলার নেতারা দেখা করতে গেছেন, ছাত্রলীগও গেছে। প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতে যারা গেছেন, তাদের আমি কীভাবে বলি, তোমরা এখান থেকে চলে যাও? আসলে কিছু কিছু খবর হাওয়া থেকে পাওয়া যায়, হয় একটা, আসে আরেকটা। বাস্তবতা ভিন্ন।

ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির বিভিন্ন কর্মকা নিয়ে আপনি সন্তুষ্ট কি? এমন প্রশ্নে ওবায়দুল কাদের জানান, যেগুলো সন্তোষ প্রকাশ করার মতো, সেগুলোতে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। আর যেগুলো লোকে পছন্দ করে না, সেগুলো তিনিও পছন্দ করবেন না। ছাত্রলীগকে সতর্ক ও সাবধান হতে এবং ভালো খবরের শিরোনাম হয়ে সুনামের ধারায় ফিরে আসতে বলেন তিনি।

গত বছরের ১১ ও ১২ মে ছাত্রলীগের ২৯তম জাতীয় সম্মেলন শীর্ষ দুই পদে নতুন নেতা নির্বাচন করা ছাড়াই শেষ হয়। সম্মেলনের কাউন্সিল অধিবেশনে কমিটি ঘোষণার দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন সারাদেশ থেকে আসা কাউন্সিলররা। সম্মেলনের আড়াই মাস পর একই বছরের ৩১ জুলাই রেজওয়ানুল হক চৌধুরীকে সভাপতি ও গোলাম রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদক করে দু'বছর মেয়াদি আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়।

এরও এক বছর পর চলতি বছরের ১৩ মে ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। তবে সেটি পুনর্গঠনের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন পদবঞ্চিত কিংবা প্রত্যাশিত পদ না পাওয়া নেতারা। তারা অভিযোগ করেন, বিবাহিত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী, চাকরিজীবী ও বিভিন্ন মামলার আসামিসহ নানা অভিযোগে বিদ্ধ অনেককে পদ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বঞ্চিত করা হয়েছে অনেক ত্যাগী নেতাকে। এ নিয়ে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের সঙ্গে মারামারিও বাধে কমিটিতে পদ পাওয়া নেতাদের। কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার একপর্যায়ে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে যোগ্য ও দক্ষদের কমিটিতে ঠাঁই করে দেওয়ার আশ্বাসে পিছু হটেন বিক্ষুব্ধরা।

আগাম সম্মেলনের দাবি : কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের হিসেবে ছাত্রলীগের দু'বছর মেয়াদি কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছরের ৩০ জুলাই বা আরও প্রায় ১১ মাস পরে। কিন্তু সংগঠনের বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে উত্থাপিত নানা অভিযোগসহ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আগাম সম্মেলনের দাবি উঠেছে সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্য থেকেই।

এ প্রসঙ্গে ছাত্রলীগের গত কমিটির কর্মসূচি ও পরিকল্পনা সম্পাদক এবং নতুন কমিটিতে পদবঞ্চিতদের মুখপাত্র রাকিব হোসেন সমকালকে বলেন, তারা (সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক) ছাত্রলীগকে কলঙ্কিত করেছেন। ছাত্রলীগে থাকার যোগ্যতা তাদের নেই। অচিরেই তাদের অপসারণ দাবি করছি। পাশাপাশি আগাম সম্মেলনেরও দাবি জানাচ্ছি- যেখানে ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন করা হবে।

মন্তব্য


অন্যান্য