রাজনীতি

যত ধ্বংসের চেষ্টা হয়েছে, তত উজ্জ্বল হয়েছে আওয়ামী লীগ: শেখ হাসিনা

প্রকাশ : ২৪ জুন ২০১৯ | আপডেট : ২৪ জুন ২০১৯

যত ধ্বংসের চেষ্টা হয়েছে, তত উজ্জ্বল হয়েছে আওয়ামী লীগ: শেখ হাসিনা

সোমবার আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় সভাপতির ভাষণ দেন শেখ হাসিনা। ছবি: ফোকাস বাংলা

  সমকাল প্রতিবেদক

আওয়ামী লীগকে হীরার সঙ্গে তুলনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, হীরা যত কাটা হয়, তত বেশি উজ্জ্বল হয়। আওয়ামী লীগের ওপর বারবার নির্যাতন হয়েছে। নেতাকর্মীদের ওপর অনেক আঘাত এসেছে। তবু ৭০ বছর ধরে দলটি টিকে রয়েছে। আওয়ামী লীগের ওপর যত বেশি আঘাত এসেছে, জনগণের ভালোবাসা এবং নির্যাতনের শিকার অসংখ্য নেতাকর্মীর বলিদানে দলটি ততই শক্তিশালী হয়েছে। যতই ধ্বংসের চেষ্টা হয়েছে, দলটি ততই আরও উজ্জ্বল হয়েছে।

জাতির পিতার ত্যাগের আদর্শ অনুসরণ করে নেতাকর্মীদের দেশের সেবা ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু বলে গেছেন, মহৎ অর্জনের জন্য মহান ত্যাগের প্রয়োজন হয়। তাই সবাইকে বড় অর্জনের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হবে, মুজিব আদর্শে দীক্ষিত হতে হবে। ইনশাআল্লাহ, জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা হবেই।

আওয়ামী লীগের ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সোমবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি অর্জনের ইতিহাসে আওয়ামী লীগের নাম সমুজ্জ্বল। আওয়ামী লীগের ইতিহাসের সঙ্গে মানুষের কল্যাণ, মুক্তি ও স্বাধীনতার ইতিহাস জড়িত। অন্য কোনো দলের নেতাকর্মীরা দেশ ও দেশের মানুষের জন্য এত আত্মত্যাগ করেননি।

শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে জনগণের জন্য কাজ করে, মানুষ কিছু পায়। জনগণের জন্য কাজ করে বলেই আওয়ামী লীগের ওপর বারবার আঘাত এসেছে। যারা জনগণের বিপক্ষে, তারাই এই দলটির ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালায়। আওয়ামী লীগের ওপর আঘাত এসেছে, নির্যাতন হয়েছে। তা সত্ত্বেও এই দলটির হাতেই বাংলাদেশের উন্নয়ন ও মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে।

১৯৪৮ সালে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর অসংখ্য নেতাকর্মী হত্যার বিবরণ তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পাকিস্তানিরা আওয়ামী লীগের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' পড়লে জানা যায়, দলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হককে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। নির্যাতনে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। এরপর তার কোনো খোঁজ ছিল না। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি গ্রামের বাড়ি চলে গিয়েছিলেন এবং সেখানেই মারা যান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় গুণ মানুষের প্রতি তার দরদ, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ। মানুষের জন্য অনেক ভালোবাসা রয়েছে বলেই নেতাকর্মীরা এত নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ওপর অত্যাচার হয়েছে, খুঁজে খুঁজে তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে। পঁচাত্তরের পর যখন যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারাই আওয়ামী লীগের ওপর নির্যাতন করেছে।

তিনি আরও বলেন, ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ও আগের সরকারের লোকদের কিছু বলা হয়নি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলেও তাদের ওপরই নির্যাতন চালানো হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের শিকড় এতই গভীরে প্রোথিত যে শত ষড়যন্ত্র করেও কেউ উপড়ে ফেলতে পারেনি; বরং দলটির ওপর যত আঘাত এসেছে, ভাঙার চেষ্টা করা হয়েছে- আওয়ামী লীগ তত শক্তিশালী হয়েছে। তাই গত ৭০ বছরের ইতিহাসে উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও সুসংগঠিত রাজনৈতিক দলের নাম আওয়ামী লীগ।

মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন এবং সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে দেশের সর্ববৃহৎ ও প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন বাংলা স্বাধীনতা হারায়। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে এই ভূখণ্ডের স্বাধীনতারও যোগসূত্র রয়েছে। আওয়ামী লীগই এই ভূখণ্ডকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে গড়ে তুলতে বঙ্গবন্ধু অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা ভাসানী যখন দল ছেড়ে যান, তখন সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়ার পর মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধু সারাদেশ ঘুরে দলকে সুসংগঠিত করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ১০ বছরে বাংলাদেশের চিত্রই পাল্টে গেছে। সারাবিশ্বে বাংলাদেশ এখন সম্মান পাচ্ছে। কারণ, বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। আজ প্রতিটি মানুষের ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ। সরকার দারিদ্র্যের হার ৪১ ভাগ থেকে ২১ ভাগে নামিয়ে এনেছে। এই হার আরও নামানো হবে। একজন মানুষও আর অতিদরিদ্র থাকবে না, গৃহহারা থাকবে না। প্রতিটি মানুষকে ঘর করে দেওয়া হবে।

আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, একেকটা অর্জন যখন হয়, তখন মনে হয় নিশ্চয়ই বাবা (বঙ্গবন্ধু) বেহেশত থেকে দেখছেন। তিনি দেখছেন, তার দেশের মানুষ এখন না খেয়ে থাকে না। কেউ ছেঁড়া কাপড় পরে চলে না। সব সময় মনে করি, দেশের একটি মানুষ কষ্ট পেলেও বঙ্গবন্ধুর আত্মা কষ্ট পাবে। দেশের এই উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহত রাখতে হবে।

বারবার ভোট দিয়ে দেশসেবার সুযোগ দেওয়ায় জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে বলেই দেশের এত উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু আমরা কোনো অহমিকা করব না, মাটিতে মিশে থাকব। দেশের মানুষ যেন সারাবিশ্বে মাথা উঁচু করে মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে, সেটাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য।

বিএনপি-জামায়াত জোটের ওপর দেশবাসী বিশ্বাস-আস্থা হারিয়ে ফেলেছে বলে মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনটা দেখতে হবে। সেটাতে তো আর কাউকে দোষ দিতে পারবে না। কারণ, খালেদা জিয়ার পছন্দের ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিন আর ইয়েস উদ্দিনদের অধীনেই ওই নির্বাচন হয়েছিল। সেই নির্বাচনে খালেদা জিয়ার দল মাত্র ২৯ আসন পেয়েছিল। জনগণের আস্থা-বিশ্বাস তারা হারিয়ে ফেলেছিল। ক্ষমতায় থাকতে বল্কগ্দাহীন দুর্নীতি-লুটপাট, গ্রেনেড হামলা, জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ সৃষ্টি, হাওয়া ভবন খুলে দেশের মানুষের সম্পদ লুণ্ঠন করে বিদেশে পাচার এবং দুঃশাসন সৃষ্টির ঘটনায় মানুষ বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রতি অতিষ্ঠ ছিল। তাই মানুষ নির্বাচনে তাদের প্রত্যাখ্যান করে।

দলকে শক্তিশালী করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের প্রত্যেক নেতাকর্মীকে জাতির পিতার আদর্শ বুকে ধারণ করে জনকল্যাণে কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এ দলটির পূর্বসূরিরা যেভাবে আত্মত্যাগ করে গেছেন, সবাইকে তাদের আদর্শ নিয়ে চলতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণমানুষের দল আওয়ামী লীগ দেশকে কেবল উন্নতই করছে না, শত বছরের পরিকল্পনাও দিয়েছে। আগামী একশ' বছরের জন্য ডেল্টা প্ল্যান করেছে। ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী, ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং ২০৭১ সালে স্বাধীনতার শতবর্ষ পালিত হবে। ২০৭১ সাল পর্যন্ত বেঁচে থাকব না। তবু আগামী প্রজন্মের জন্য ও দেশের উন্নয়নে ডেল্টা প্ল্যানটা যেন বাস্তবায়ন হয়।

এর আগে সভামঞ্চে উঠেই শেখ হাসিনা দলের সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠ সদস্য ও সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরেন। সাজেদা চৌধুরীও আওয়ামী লীগ সভাপতিকে জড়িয়ে ধরে আদর করেন।

সভায় সূচনা বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। বক্তব্য দেন দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মোহাম্মদ নাসিম, ইতিহাসবিদ-কলামিস্ট অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি এ কে এম রহমতুল্লাহ এবং দক্ষিণের সভাপতি হাজি আবুল হাসনাত। সভা পরিচালনা করেন দলের প্রচার সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন।

মন্তব্য


অন্যান্য