রাজনীতি

বিএনপির ৫ এমপি

তারা এখন 'একঘরে'

প্রকাশ : ১৪ মে ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

তারা এখন 'একঘরে'

  কামরুল হাসান

কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সব নেতাকর্মী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন বিএনপির নির্বাচিত এমপিরা। সম্প্রতি তারা দলীয় সিদ্ধান্তে শপথ নিয়ে যোগ দিয়েছেন জাতীয় সংসদ অধিবেশনে। তবে এসব এমপিকে দলের কোনো কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে না। এমনকি সর্বশেষ ওলামা-মাশায়েখ ও এতিমদের সঙ্গে বিএনপির ইফতার মাহফিলে এবং দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ৩৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত যৌথ সভাতেও অনুপস্থিত ছিলেন তারা।

বিএনপির বিভিন্ন নেতা জানান, দলীয় সিদ্ধান্তে নির্বাচিত এমপিরা জাতীয় সংসদে যোগ দিলেও তৃণমূল নেতাকর্মীরা তা মানতে নারাজ। তারা মনে করছেন, দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে বাধ্য করে এমপিরা এ শপথ নিয়েছেন। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে তাদের শপথ নেওয়াকে ভালোভাবে নিচ্ছেন না তারা। কেন্দ্রীয় নেতারাও দলের শপথ নেওয়া এমপিদের মেনে নিতে পারছেন না। তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগও রাখছেন না। এ অবস্থায় ৫ এমপি এখন অনেকটাই 'একঘরে' হয়ে পড়েছেন।

স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, দলের সিদ্ধান্তে সংসদে না যাওয়ার অবস্থান নেওয়া হয়েছিল। এখন দলের সিদ্ধান্তে শপথ নেওয়া হয়েছে। এর বাইরে এ ব্যাপারে আর কোনো বক্তব্য নেই।

এর আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলকে প্রত্যাখ্যান করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিত এমপিরা সংসদে যাবে না বলে ঘোষণা দেন। নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্ট থেকে আটজন এমপি নির্বাচিত হন। তার মধ্যে দু'জন গণফোরামের এবং বিএনপির ছয়জন। বিএনপির ছয় এমপির মধ্যে ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে নির্বাচিত এমপি জাহিদুর রহমান ২৬ এপ্রিল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। এ কারণে তখন তাকে বহিস্কারও করা হয়। সাংবিধানিকভাবে শপথ নেওয়ার শেষ দিন ২৯ এপ্রিল শপথ নেন চার এমপি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উকিল আব্দুস সাত্তার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের হারুনুর রশীদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের আমিনুল ইসলাম ও বগুড়া-৪ আসনের মোশারফ হোসেন। পরে দলটির পক্ষ থেকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবাদ সম্মেলনে জানান, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশেই বিএনপি সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এমপি নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও 'দলীয় সিদ্ধান্তে' মির্জা ফখরুল শপথ নেওয়া থেকে বিরত থাকেন।

সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য জানান, পরিবারের কোনো সন্তান অমতে কোনো কাজ করলে মান-ইজ্জত রক্ষায় অভিভাবকরা তা মেনে নেন। তবে স্বাভাবিক সম্পর্ক আর তৈরি হয় না। বিএনপির নির্বাচিত এমপিদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। নির্বাচনের পর তারা সংসদে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নেন। দলের সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে তারা বিভিন্ন বক্তব্যও দিতে থাকেন।

দলকে বাধ্য করার জন্য একটি দূরত্বও তৈরি করেন তারা।

এ সময় দলীয় কর্মসূচি থেকেও দূরে থাকেন তারা।

এভাবে বিএনপির নির্বাচিত এমপিরা পরিকল্পিতভাবে শপথ নেওয়ার পথ তৈরি করতে পারলেও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আস্থা অর্জন করতে পারেননি। বিশেষত বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব হারুনুর রশীদ শপথ নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় শীর্ষ নেতারাও হতাশ এবং বিব্রত হন। তার স্ত্রী, সাবেক এমপি ও কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দা আশিফা আশরাফী পাপিয়ার ভূমিকা নিয়েও অসন্তুষ্ট তারা। নেতারা মনে করছেন, শপথ নেওয়ার ক্ষেত্রে এই পরিবার দলের সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থাশীল থাকলে অন্য এমপিরাও অনেকটা নিরুৎসাহিত হতেন। এই নেতাদের মতে, যে কোনো পরিস্থিতিতে শপথ নেওয়ার জন্য নির্বাচিত এমপিরা একজোট হয়ে বিএনপির হাইকমান্ডের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছেন এবং এতে তারা সফলও হয়েছেন। এমন প্রেক্ষাপটে দলের নেতৃত্বের চেইন অব কমান্ড ঠিক রাখতে এবং দলকে বিভাজনের হাত থেকে রক্ষা করতে শেষ মুহূর্তে শপথ নেওয়ার সিদ্ধান্ত দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

তবে শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই এ সিদ্ধান্ত দেওয়ায় দলের মধ্যে নানা বিভ্রান্তি দেখা দেয়। দলের মহাসচিবকেও কেউ কেউ দোষারোপ করেন। যদিও কেউ কেউ বলছেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে বলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সবার সঙ্গে আলোচনা করতে পারেননি।

এদিকে শপথ ইস্যুতে ইতিমধ্যে ২০ দলীয় জোটের মধ্যেও ভাঙন দেখা দিয়েছে। 'একতরফা শপথ' নেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিএনপির দীর্ঘ ১৯ বছরের মিত্র রাজনৈতিক দল ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থের বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) জোট ত্যাগ করে। এককভাবে শপথের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টেও অন্য শরিকদের সঙ্গে শীতল সম্পর্ক দেখা দেয় বিএনপির। এ ব্যাপারে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী সমকালকে বলেন, নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করার পর কারও সঙ্গে আলোচনা না করেই ফ্রন্টের সাত সদস্য শপথ নিয়েছেন। যারা শপথ নিয়েছেন, তারা ভবিষ্যতে মীরজাফরের চেয়েও বেশি নিন্দিত হবেন।

বিএনপি নেতারা জানান, এ পরিস্থিতিতে নির্বাচিত এমপিদের নিয়ে যে ধরনের উচ্ছ্বাস সৃষ্টি হয়, তার বিপরীত অবস্থা দেখা দিয়েছে দলে। অন্যদিকে, এমপিরাও একলা চলো নীতিতে পথ হাঁটছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের হারুনুর রশীদ শপথ নেওয়ার পর এলাকায় গিয়ে পৌর পার্কে নিজের অনুসারীদের নিয়ে সভা করেন। এ সভায় সদর থানা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছাড়া অন্য কোনো নেতাকর্মীর উপস্থিতি ছিল না। জেলা বিএনপির নেতারাও তাকে এড়িয়ে চলছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের আমিনুল ইসলাম জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। তিনিও একই দিন শপথ নেন। শপথ নেওয়ার পর তার নির্বাচনী এলাকায় নাচোল ও গোমস্তাপুরে মতবিনিময় সভা করেন তিনি। তবে এসব সভায় নিজের অনুসারী বাদে অন্য কোনো নেতাকর্মী ছিলেন না। তবে তিনি সমকালকে জানান, নির্বাচনী এলাকার সাধারণ মানুষ তাদের সঙ্গে রয়েছেন।

জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম টিপু বলেন, শপথ নেওয়া এমপিদের নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ না করলেও নেতাকর্মীরা তাদের কাছে যাচ্ছেন। তবে জেলার নেতাকর্মীরা তুলনামূলকভাবে কম যাচ্ছেন।

বগুড়া জেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা জানান, নির্বাচিত এমপি মোশারফ হোসেন দলীয় সিদ্ধান্তে শপথ নেওয়ার কথা বলছেন। তবে কোন পরিস্থিতিতে দল এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা বিবেচনা করছেন না।

জেলা বিএনপির একজন নেতা জানান, নির্বাচনী এলাকার নেতাকর্মীরাও মোশারফের শপথ মেনে নিতে পারেননি। তাদের সঙ্গে এমপির কোনো যোগাযোগ নেই বলে তিনি জানান।

তবে মোশারফ হোসেনের দাবি, তিনি শপথ নিয়ে এলাকায় আসার পথে শত শত নেতাকর্মী তাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। গত শুক্রবারও তিনি কাহালু এলাকায় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সভা করেছেন। সব নেতাকর্মী তার সঙ্গেই রয়েছেন।

ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে বিএনপির এমপি জাহিদুর রহমান দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে শপথ নেওয়ায় তাকে দল থেকে বহিস্কার করা হয়। নির্বাচনী এলাকায় জেলা ও উপজেলা সমন্বয় কমিটির সভায় তিনি নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন। জাহিদুর রহমান সমকালকে জানান, তিনি তিন দিন ধরে এলাকায় কাজ করছেন।

তবে জেলা বিএনপির সভাপতি মো. তৈমুর রহমান জানান, জাহিদুর রহমানের বহিস্কারাদেশ এখনও প্রত্যাহার করা হয়নি। জেলার নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উকিল আব্দুস সাত্তার শপথ না নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিলেও শেষ পর্যন্ত দলের সিদ্ধান্তে জাতীয় সংসদে যান। তবে তিনি এখনও এলাকায় যাননি। দু-একদিনের মধ্যেই এলাকায় যাবেন বলে সমকালকে জানান তিনি।

জেলা বিএনপির সভাপতি হাফিজুর রহমান মোল্লা জানান, কেন্দ্র থেকে কোন অবস্থায় শপথ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সে বিষয়ে এখনও তারা পরিপূর্ণ কিছু জানেন না। বিভিন্ন চাপের মুখে হয়তো তারা এ শপথ নিয়েছেন।

সাংগঠনিক সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম জানান, প্রত্যেক নেতাকর্মীর সঙ্গে একাধিক মামলা, হামলা আর কারা নির্যাতন জড়িয়ে আছে। এ অবস্থায় উচ্ছ্বাস আসে না। শপথ নেওয়ার পর এমপির নিজের এলাকাতেও কোনো উচ্ছ্বাস নেই।

মন্তব্য


অন্যান্য