সংসদ

একাদশ সংসদ নির্বাচন

শতভাগ ভোট ২১৩ কেন্দ্রে

৬ মাস পর ইসির ওয়েবসাইটে কেন্দ্রভিত্তিক ফল প্রকাশ

প্রকাশ : ৩০ জুন ২০১৯ | আপডেট : ৩০ জুন ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

শতভাগ ভোট ২১৩ কেন্দ্রে

  মসিউর রহমান খান

একাদশ সংসদ নির্বাচনের ছয় মাস পর নির্বাচন কমিশন (ইসি) তার ওয়েবসাইটে ভোটের বিস্তারিত ফল প্রকাশ করেছে। এতে দেখা গেছে, ১০৩টি নির্বাচনী আসনের ২১৩টি কেন্দ্রেই শতভাগ ভোট পড়েছে। ১৪টি আসনের সব কেন্দ্রেই ভোট পড়েছে ৯০ থেকে ৯৯ দশমিক ৯৯ ভাগ। এমন কেন্দ্রের সংখ্যা রয়েছে সাত হাজার ৬৮৯টি। গত বছর ৩০ ডিসেম্বর এই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, শতভাগ ভোট পড়া অস্বাভাবিক। কারণ, বাংলাদেশের ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রবাসী। অনেকে মারা গেছেন। কেউ কেউ নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের কারণে ভোট দিতে পারেন না। তাই শতভাগ ভোট পড়া অসম্ভব বিষয়। ৯০ ভাগের বেশি ভোট পড়ার ঘটনা সন্দেহজনক। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করা দলগুলো অভিযোগ করেছে, আগের রাতেই ব্যালটে সিল দিয়ে বাক্স ভরা হয়েছিল।

নির্বাচন কমিশনের অন্যতম সদস্য রফিকুল ইসলামও মনে করেন, কোনো কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়া স্বাভাবিক ঘটনা নয়। তবে ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ভোটের এই হিসাবে শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। তিনি জানান, শতভাগ ব্যালটের হিসাব মানে শতভাগ ভোটারের উপস্থিতি প্রমাণ করে না। কারণ অনেক কেন্দ্রে নানা কারণে ব্যালট বাতিলের ঘটনা ঘটে। নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ব্যালটের হিসাব বুঝিয়ে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তারা বাতিল ব্যালটও গুনে দেন। যেসব কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে, সেখানে বাতিল ব্যালটের সংখ্যাটাও আমলে নিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ইসির প্রকাশিত ফল পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সারাদেশে মোট ভোটকেন্দ্র ছিল ৪০ হাজার ১৫৫টি। এর মধ্যে শতভাগ ভোট পড়েছে ২১৩টি কেন্দ্রে। ৯০ থেকে ৯৯ দশমিক ৯৯ ভাগ ভোট পড়েছে সাত হাজার ৬৮৯টি কেন্দ্রে। ৯৯ ভাগ বা তার বেশি ভোট পড়েছে এমন কেন্দ্রের সংখ্যা ১২৭টি। ৮০ থেকে ৮৯ দশমিক ৯৯ ভাগ ভোট পড়েছে ১৫ হাজার ৭১৯টি কেন্দ্রে, ৭০ থেকে ৭৯ দশমিক ৯৯ ভাগ ভোট পড়েছে ১০ হাজার ৭৩টি কেন্দ্রে, ৬০ থেকে ৬৯ দশমিক ৯৯ ভাগ ভোট পড়েছে তিন হাজার ৯২০টি কেন্দ্রে, ৫০ থেকে ৫৯ দশমিক ৯৯ ভাগ ভোট পড়েছে এক হাজার ৬১০টি কেন্দ্রে, ৪০ থেকে ৪৯ দশমিক ৯৯ ভাগ ভোট পড়েছে ৫৯৯টি কেন্দ্রে, ৩০ থেকে ৩৯ দশমিক ৯৯ ভাগ ভোট পড়েছে ২২২টি কেন্দ্রে, ২০ থেকে ২৯ দশমিক ৯৯ ভাগ ভোট পড়েছে ৭৯টি কেন্দ্রে, ১০ থেকে ১৯ দশমিক ৯৯ ভাগ ভোট পড়েছে ২০টি কেন্দ্রে এবং ১০ ভাগের কম ভোট পড়েছে ১১টি কেন্দ্রে।

বিস্তারিত ফল প্রকাশে ইসির দেরি ও শতভাগ ভোটার উপস্থিতি সম্পর্কে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সমকালকে বলেন, 'এটি একটি অস্বাভাবিক ও অভূতপূর্ব ঘটনা। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো নির্বাচনেই অতীতে কোনো কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে বলে তার জানা নেই। এখন দেখতে হবে শতভাগ ভোটার উপস্থিতির ওই কেন্দ্রের তালিকার ভোটারদের সবাই বেঁচে আছেন কি-না। কেউ বিদেশে রয়েছেন কি-না। ভোটের দিন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ছিলেন কি-না। সেটা অবশ্যই যথাযথ অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিতে হবে। এই শতভাগ ভোট পড়ার ঘটনা প্রমাণ করছে যে, আগের রাতেই ভোট দেওয়া হয়েছে। ভোটের দিনে ভোট জালিয়াতি হয়েছে বলে যে অভিযোগ ছিল তা অমূলক নয়।' তিনি আরও বলেন, 'ইসি এই তালিকা প্রকাশে এতদিন অনেক টালবাহানা করেছে। শেষ পর্যন্ত ফল প্রকাশ পাওয়ায় মানুষ ভোটের চিত্র সম্পর্কে একটি ধারণা পাচ্ছে।'

এক বা একাধিক কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে এমন আসনগুলোর মধ্যে রয়েছে- রংপুর-৫ আসনে নয়টি কেন্দ্র, ব্রাক্ষ্ণণবাড়িয়া-২ আসনে আটটি কেন্দ্র, চট্টগ্রাম-৮ আসনে সাতটি, দিনাজপুর-১ আসনে চারটি, দিনাজপুর-২ আসনে তিনটি, দিনাজপুর-৪ আসনে দুটি, দিনাজপুর-৬ আসনে একটি, নীলফামারী-৩ আসনে একটি, লালমনিরহাট-১ আসনে দুটি, লালমনিরহাট-৩ আসনে ছয়টি, রংপুর-১ আসনে দুটি, রংপুর-২ আসনে সাতটি, রংপুর-৪ আসনে তিনটি, রংপুর-৬ আসনে ছয়টি, কুড়িগ্রাম-৩ আসনে দুটি, গাইবান্ধা-৪ আসনে চারটি, বগুড়া-১ আসনে দুটি, বগুড়া-২ আসনে একটি, বগুড়া-৫ আসনে দুটি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনে তিনটি, নওগাঁ-২ আসনে দুটি, নওগাঁ-৩ আসনে চারটি, নওগাঁ-৪ আসনে তিনটি, রাজশাহী-৬ আসনে দুটি, নাটোর-১ আসনে একটি, সিরাজগঞ্জ-১ আসনে একটি, সিরাজগঞ্জ-২ আসনে একটি, সিরাজগঞ্জ-৩ আসনে তিনটি, সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে একটি, সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে একটি, সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে তিনটি, মেহেরপুর-২ আসনে একটি, যশোর-৩ আসনে একটি, বাগেরহাট-২ আসনে একটি, খুলনা-৬ আসনে একটি, বরিশাল-১ আসনে দুটি, বরিশাল-৩ আসনে একটি, টাঙ্গাইল-৫ আসনে একটি, টাঙ্গাইল-৬ আসনে একটি, জামালপুর-৪ আসনে তিনটি, শেরপুর-১ আসনে দুটি, ময়মনসিংহ-১ আসনে একটি, ময়মনসিংহ-২ আসনে চারটি, ময়মনসিংহ-৪ আসনে একটি, ময়মনসিংহ-৬ আসনে দুটি, ময়মনসিংহ-৭ আসনে একটি, ময়মনসিংহ-৮ আসনে দুটি, ময়মনসিংহ-৯ আসনে একটি, ময়মনসিংহ-১০ আসনে চারটি, ময়মনসিংহ-১১ আসনে একটি, নেত্রকোনা-৫ আসনে একটি, মানিকগঞ্জে-১ আসনে একটি, মানিকগঞ্জ-২ আসনে তিনটি, মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে দুটি, মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে দুটি, মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে তিনটি, ঢাকা-১ আসনে একটি, ঢাকা-৪ আসনে একটি, ঢাকা-১২ আসনে একটি, ঢাকা-১৮ আসনে একটি, ঢাকা-১৯ আসনে একটি, ঢাকা-২০ আসনে একটি, গাজীপুর-১ আসনে তিনটি, গাজীপুর-২ আসনে একটি, গাজীপুর-৩ আসনে একটি, নরসিংদী-৩ আসনে তিনটি, নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে একটি, ফরিদপুর-২ আসনে দুটি, মাদারীপুর-১ আসনে একটি, মাদারীপুর-২ আসনে একটি, সুনামগঞ্জ-২ আসনে একটি, সুনামগঞ্জ-৫ আসনে দুটি, সিলেট-১ আসনে দুটি, সিলেট-৩ আসনে দুটি, সিলেট-৪ আসনে চারটি, সিলেট-৫ আসনে একটি, সিলেট-৬ আসনে একটি, মৌলভীবাজার-৩ আসনে দুটি, হবিগঞ্জ-৩ আসনে একটি, হবিগঞ্জ-৪ আসনে একটি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে দুটি, কুমিল্লা-১ আসনে একটি, কুমিল্লা-৭ ও কুমিল্লা-১০ আসনে একটি, চাঁদপুর-৩ আসনে তিনটি, ফেনী-১ আসনে একটি, ফেনী-২ আসনে একটি ও ফেনী-৩ আসনে দুটি, নোয়াখালী-২ আসনে একটি, নোয়াখালী-৬ আসনে একটি, লক্ষ্মীপুর-১ আসনে একটি, চট্টগ্রাম-৫ আসনে চারটি, চট্টগ্রাম-১০ আসনে দুটি, চট্টগ্রাম-১১ আসনে একটি, চট্টগ্রাম-১২ আসনে একটি, চট্টগ্রাম-১৪ আসনে দুটি, চট্টগ্রাম-১৫ আসনে একটি, কক্সবাজার-১ আসনে তিনটি, কক্সবাজার-২ আসনে দুটি, কক্সবাজার-৩ আসনে চারটি, কক্সবাজার-৪ আসনে একটি, খাগড়াছড়িতে একটি ও বান্দরবানে একটি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, ইসির এই হিসাব বিশ্বাস করার প্রশ্নই আসে না। ভোটারদের উপস্থিতি ১৫ থেকে ২০ ভাগের বেশি হয়নি। এগুলো ম্যানুপুলেট করা হয়েছে। এ জন্য প্রকাশ করতে এত সময় লেগেছে। কারণ এত সময় নেওয়ার কথা নয়। সব কেন্দ্রের ভোট ওইদিনই গণনা করা হয়েছে। ব্যালট পেপারও জমা হয়ে গেছে। শুধু যোগ করতে এত সময় লাগার কথা নয়। এক সপ্তাহের মধ্যে সাধারণত এসব কাজ শেষ করে ফল প্রকাশের কথা।

সম্প্রতি ৩০০ আসনের কেন্দ্রভিত্তিক ফল নির্বাচন কমিশন নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করলেও এর আগে ৩০ ডিসেম্বর ভোটের পরই কেন্দ্রে কেন্দ্রে ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে এসব ফল প্রকাশ করা হয়। ইসির হিসেবে দেখা গেছে, এই নির্বাচনে সব কেন্দ্র মিলিয়ে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ৮০ দশমিক ২০ ভাগ। ৩০০ আসনের ৪০ হাজার ১৫৫ কেন্দ্রে মোট ভোটার ছিল ১০ কোটি ৪১ লাখ ৫৬ হাজার ২৬৯ জন। এর মধ্যে ভোট পড়েছে ৮ কোটি ৩৫ লাখ ৩২ হাজার ৯১১টি। বাতিল হয়েছে ৮ লাখ ৮৭ হাজার ৬৯০ ভোট।

নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলওয়ারি হিসেবে ভোটের হিসাবে আওয়ামী লীগ ৬১৫২৪২১৩ ভোট; বিএনপি ৯৯৮৫২০২ ভোট; জাতীয় পার্টি ৪৪০৭৯৩০ ভোট; এলডিপি পেয়েছে ৫৪,০৩১ ভোট; জেপি ১৯৭৪৮৭ ভোট; সাম্যবাদী দল ৩৮৭ ভোট; কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ১৪৪১১৫ ভোট; সিপিবি ৫৫৪২১ ভোট; গণতন্ত্রী পার্টি ১৬৪১ ভোট; ন্যাপ ১০০৩০ ভোট; ওয়ার্কার্স পার্টি ৬৪৬৮৪৪ ভোট; বিকল্পধারা ৫৬৫৯৪০ ভোট; জাসদ ৬৫১০১৭ ভোট; জেএসডি ১১৫০১৩ ভোট; জাকের পার্টি ১০৯৪৪০ ভোট; বাসদ ১৭৩৯৬ ভোট; বিজেপি ৪০১০০ ভোট; তরিকত ফেডারেশন ২৪৪৫১৭ ভোট; বাংলাদেশ খিলাফত আন্দোলন ৯৭৯৬ ভোট; মুসলিম লীগ ১৫২৯৩ ভোট; এনপিপি ৩৬৬১১ ভোট; জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ২১৮০০৯ ভোট; গণফোরাম ৫০১৭৩৭ ভোট; গণফ্রন্ট ৫২৭৭ ভোট; পিডিপি ৬১১৩ ভোট; বাংলাদেশ ন্যাপ ৩৫১৩ ভোট; বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি ২৩৮০১ ভোট; ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ ৩১৪৬৮ ভোট; কল্যাণ পার্টি ৪৪৪৩৬ ভোট; ঐক্যজোট ১১৩২৮ ভোট; বাংলাদেশ খিলাফত মজলিস ৫০১৭১ ভোট; ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১২৫৫৩৭৩ ভোট; ইসলামী ফ্রন্ট ৬০৩৭২ ভোট; জাগপা ৩৭৯৮ ভোট; বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ১৭২৬৩ ভোট; খিলাফত মজলিস ৬৯৮৩৮ ভোট; বিএনএফ ১৩২৮৯ ভোট, মুক্তিজোট ১২১৯ ভোট ও স্বতন্ত্র ১৪৯৮৪০১ ভোট।

মন্তব্য


অন্যান্য