সংসদ

শেষ হলো দশম সংসদ অধিবেশন

বিতর্কে শুরু হলেও স্বস্তিতে শেষ

প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০১৮ | আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিতর্কে শুরু হলেও স্বস্তিতে শেষ

  মসিউর রহমান খান

চরম রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় শুরু হওয়া দশম সংসদের যাত্রা শেষে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে সরকার ও বিরোধী দল। গতকাল সোমবার ৪১০তম কার্যদিবস শেষ করার মধ্য দিয়ে পাঁচ বছর পূর্ণ করল এই সংসদ। যদিও শুরুতে এই সংসদের যাত্রা নিয়ে নানা ধরনের শঙ্কা বিরাজ করছিল। সরকারি দল ও বিরোধী দলের চিফ হুইপরা মনে করছেন, সংসদ নেতা শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই সফল পরিসমাপ্তি ঘটেছে এই সংসদের।

সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, ২০১৪ সালে প্রথম বছরে ৩৬ কার্যদিবসে মাত্র ১৯টি বিল পাস হলেও সর্বশেষ ২৩তম অধিবেশনে ৮ কার্যদিবসে পাস হয়েছে ১৯টি বিল। ২০১৪ সালের ২৯ জানুয়ারি শুরু হওয়া এই সংসদের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল সংবিধানের ষোড়শতম সংশোধনী বিল পাস। বিচারপতিদের জবাবদিহি সংসদের  কাছে ফিরিয়ে আনা সংক্রান্ত এই সংশোধনী আদালত অবৈধ ঘোষণা করেন। এর জের ধরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

দশম সংসদকে কার্যকর দাবি করে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী সমকালকে বলেন, নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংসদের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের প্রশ্নোত্তরে বিরোধীদলীয় সদস্যরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। পাশাপাশি সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণও ছিল। এসব প্রক্রিয়াতেই নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়। তিনি আরও বলেন, দশম সংসদে কোনো মুলতবি প্রস্তাব নেওয়া হয়নি, কারণ যে নোটিশগুলো পাওয়া গেছে তা গ্রহণের মতো কোনো বিষয় ছিল না।

এ ছাড়া সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির গত পাঁচ বছরে চারবার সংসদের বৈঠক থেকে ওয়াক আউট করলেও তাদের পরিচয় সংকটে ভুগতে হয়েছে। এমনকি বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ নিজেই সংসদের বৈঠকে নিজেদের পরিচয় সংকটের কথা তুলে ধরে এ থেকে রেহাই পেতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। স্বতন্ত্র সদস্যদের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি ইস্যুতে সংসদের বৈঠক মুলতবি করে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হলেও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এমন কোনো নোটিশ পাওয়া যায়নি বলে সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে।

জাতীয় পার্টির ওয়াক আউটের ইস্যুগুলোর মধ্যে ছিল- ব্যাংক কোম্পানি আইন পাসের প্রতিবাদ, বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর প্রতিবাদ, বিমানের তৎকালীন চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিনের অপসারণের দাবি এবং বিচারপতিদের বেতন-ভাতা বাড়ানো সম্পর্কিত বিলের প্রতিবাদ।

বিশ্নেষকরা অবশ্য বলছেন, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পরস্পরকে প্রশংসা ও সহায়তার এমন নজির সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে বিরল। সংসদীয় কার্যক্রমের অন্যতম মৌলিক কার্যক্রম বিতর্ক ছিল এই সংসদে পুরোপুরি অনুপস্থিত। সরকারের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের সমালোচনার বদলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমর্থন দিয়েছে বিরোধী দল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একে অপরকে প্রশংসায় ভাসিয়েছে।

সরকারি দলের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ বলেন, বর্তমান সংসদের শুরুতে নানা অনিশ্চয়তা ছিল- এটা সত্য। কিন্তু সফলভাবে পাঁচ বছর পার করে সেই অনিশ্চয়তার কথা এখন আর কেউ বলবেন না। এই সংসদের পুরো মেয়াদে বিরোধী দল তাদের গঠনমূলক ভূমিকার মাধ্যমে সংসদের কার্যক্রমকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে।

বিরোধী দলের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম ওমর বলেন, এই সংসদের বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টি জাতিকে একটি ইতিবাচক রাজনীতি দেওয়ার চেষ্টা করেছে। অতীতে সংসদের বিরোধী দলগুলোর আচরণকে দেশের মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বর্তমান সংসদের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, জাপার সদস্যরা তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়েছেন। তবে এটা নির্ভর করছে সরকার কীভাবে এই আলোচনাকে গ্রহণ করেছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, দীর্ঘদিনের সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেও তার বিনিময় কি মূল্য দিতে হয়েছে সেটাও দেখতে হবে। কারণ এটা পেতে গিয়ে সংসদের একটি মৌলিক দায়িত্ব বিসর্জন দিতে হয়েছে। সংসদের মৌলিক দায়িত্ব নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে তারা কতটা ভূমিকা পালন করেছে সেই বির্তক থেকেই যাবে। তিনি বলেন, যদিও গণমাধ্যমসহ অন্যদের সমালোচনার মুখে শেষের দিকে বিরোধী দল কিছুটা সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। তবে শুরু থেকেই বিরোধী দলকে আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগতে দেখা গেছে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে অধিকাংশ দলের বর্জনের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত হয়েছিল দশম জাতীয় সংসদ। ওই ভোটে ১৫৩ জন সাংসদ নির্বাচিত হন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। শুরুতে ভোট বর্জনের ঘোষণা দিলেও এইচএম এরশাদের দল জাপা বিরোধী দলের আসনে বসে। একই সঙ্গে তারা সরকারেরও শরিক। এরশাদ নিজেও মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হন। দলের আরও তিনজন নেতা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হন।

জানা গেছে, দশম সংসদে মোট ২৩ বার অধিবেশন বসেছে। আর কার্যদিবস ছিল ৪১০টি। এই সময় বিল পাওয়া গিয়েছিল ১৯৮টি। যার মধ্যে পাস হয়েছে ১৯৩টি। প্রত্যাহার হয়েছে চারটি। আর একটি নিষ্পন্ন হয়নি।

এর আগে নবম সংসদের বিরোধী দল ৩৪২ কার্যদিবসের মধ্যে মাত্র উপস্থিত ছিল ৭৬ কার্যদিবস। অন্যদিকে দশম সংসদের বিরোধী দল কোনোদিনই বর্জন করেনি। বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ সংসদে ছিলেন ২৪২ কার্যদিবস। গত নবম সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া উপস্থিত ছিলেন মাত্র ১০ কার্যদিবস। দশম সংসদে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন ৩৩৮ কার্যদিবস। এই পাঁচ বছরে সবচেয়ে বেশিদিন সংসদের বৈঠকে উপস্থিতি ছিলেন কুমিল্লার সরকারি দলের দুই সাংসদ অধ্যাপক আলী আশরাফ এবং সুবিদ আলী ভূঁইয়া। তারা দু'জনই গত ২২তম অধিবেশন পর্যন্ত ৩৭৮ কার্যদিবস সংসদের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়ায় তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে জাতীয় সংসদে বেশ কয়েকটি ধন্যবাদ প্রস্তাব পাস হয়। এর মধ্যে 'সাউথ সাউথ কো-অপারেশন ভিশনারি অ্যাওয়ার্ড,' 'চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ পুরস্কার', আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ সংস্থার (আইটিইউ) 'আইসিটি টেকসই উন্নয়ন' পুরস্কার এবং প্লানেট ফিফটি ফিফটি চ্যাম্পিয়ন অ্যান্ড এজেন্ট অব চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড পাওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে আলাদা আলাদা চারটি ধন্যবাদ প্রস্তাব নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা হয় ২০১৫ সালে।

বিতর্কিত আইন : দশম সংসদের শেষ সময়ে আইন প্রণয়নের হিড়িক পড়ে। মোট ১৮ কার্যদিবসের দুটি অধিবেশনে ৩৭টি আইন পাস করা হয়। এর মধ্যে ১০ কার্যদিবসের ২২তম অধিবেশনে ১৮টি এবং ৮ কার্যদিবসের শেষ অধিবেশনে ১৯টি আইন পাস হয়। ব্যাংক কোম্পানি আইনে সংশোধনীর মাধ্যমে বেসরকারি ব্যাংকে পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ দেওয়া হয় দশম সংসদে।

ফৌজদারি অপরাধে সরকার বা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া আদালতে অভিযোগপত্র গৃহীত হওয়ার আগে সরকারি কর্মচারীদের গ্রেফতার করা যাবে না এমন বিধান রেখে করা হয় সরকারি চাকরি আইন। এই বিধানটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে অভিহিত করেছেন একাধিক সাংসদ।

হেফাজতে ইসলামের দাবি পুরোপুরি মেনে নিয়ে কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ স্তরের শিক্ষা সনদের স্বীকৃতি সংক্রান্ত আইন পাস হয় এই সংসদে। অন্যদিকে সম্পাদক পরিষদ, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলের উদ্বেগ আপত্তি উপেক্ষা করে এই সংসদে পাস হয় বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। এই আইন স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করবে বলে মনে করে সম্পাদক পরিষদ।

মন্তব্য


অন্যান্য