নদীতে কুড়ানো নুড়ি

মিছিল দিয়া কি নদীর পানি পরিষ্কার হইবে?

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০১৯ | আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০১৯

মিছিল দিয়া কি নদীর পানি পরিষ্কার হইবে?

  শেখ রোকন

বাহাদুর শাহ পার্ক থেকে বুড়িগঙ্গার সদরঘাট 'নদীর জন্য পদযাত্রা' প্রথমবার সহজ ছিল না। স্বীকার করে বলি, কর্মসূচি শুরুর আগ পর্যন্ত নিজের মধ্যেই দ্বিধা ছিল। একটা নতুন ধরনের কর্মসূচিতে কতটা সংগঠন সাড়া দেবে? আমাদের পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বিভিন্ন দিবসে মূলত 'মানববন্ধন' করে অভ্যস্ত। তারও প্রায় নির্দিষ্ট দুটি স্থান রয়েছে; হয় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে, না হয় শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে। এর বাইরে যানজট ঠেলে পুরান ঢাকায় তারা যাবেন? মিডিয়াও কি সেখানে যেতে উৎসাহিত হবে?

আমরা চাচ্ছিলাম 'নদীর জন্য পদযাত্রা' যে কোনো মূল্যে প্রতিবছর একই রুটে অনুষ্ঠিত হবে। আমরা চাচ্ছিলাম, এর মধ্য দিয়ে একটা 'ঐতিহ্য' সূচিত হোক। আমাদের সাংস্কৃতিক জীবন থেকে নদী যখন ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে, তখন আবার তাকে যথাসম্ভব দৃশ্যমান করে তুলতে ধারাবাহিকতার বিকল্প নেই। বিক্ষিপ্ততা যথাসম্ভব পরিহার করতে হবে।

সবচেয়ে বড় 'কনসার্ন' ছিল ঐক্য ধরে রাখা। নানা নেতৃত্বের ও মতের এত সংগঠনের সবার সন্তুষ্টি যে সহজ নয়, বলা বাহুল্য। আগের রাতে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে পরামর্শ করলাম, আমরা যত পারি ব্যাকগ্রাউন্ডে কাজ করব। সবারই 'স্টেক' যাতে নিশ্চিত হয়, সেটা নির্বিঘ্ন করাই হবে আমাদের মূল দায়িত্ব।


উন্মূল উৎকণ্ঠা, অযুত অব্যবস্থাপনা, সমূহ সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত 'পদযাত্রা' শুরু হলো। পেছনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে যেন দিব্যচোখে দেখতে পাচ্ছিলাম, ছোট্ট এই মিছিল বাংলাদেশের নদী আন্দোলনের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। আমার চিন্তায় ছেদ ঘটাল পদযাত্রায় হঠাৎ দ্বিধা-বিভক্তি। সামনের সারিতে কী ঘটেছিল, আজও কাউকে জিজ্ঞেস করা হয়নি; পেছন থেকে দেখছিলাম, একটি দল সদরঘাট টার্মিনালে গিয়ে ঢুকছে; অপর একটি দল ডান দিকে মোড় নিয়ে ওয়াইজঘাটের দিকে যাচ্ছে। আমি পেছন থেকে চিৎকার করে থামতে বলছিলাম; কিন্তু রাজপথের কোলাহলে ও হ্যান্ডমাইকের আওয়াজে তা চাপা পড়ে গেল।

অদূর থেকে দেখলাম, একটি গ্রুপ সদরঘাটের জেটিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে; অপরটি ওয়াইজঘাট বা বাদামতলীর দিকে নদীর পাড়ে গিয়ে থেমেছে। একদলের সামনে বাংলা 'কমন ব্যানার' এবং অপর দলের সামনে ইংরেজি 'কমন ব্যানার'। দুই ব্যানারেই অংশগ্রহণকারী সংগঠনগুলোর নাম; কিন্তু কোনোটিই পরিপূর্ণ নয়। দ্বিধায় পড়ে গেলাম, কোনটায় গিয়ে দাঁড়ানো উচিত হবে? প্রশ্নটা ভাষার নয়, ভারসাম্যের; ঐকান্তিকতা নয়, ঐক্যের।

নিজে নিজেই সাব্যস্ত করলাম, আমি বরং আরেকটু ভাবি। পাশেই ঝালমুড়ির ডালি নিয়ে দাঁড়ানো এক বয়স্ক ব্যক্তি। মুড়িওয়ালা চাচা সম্ভবত আমার ঘর্মাক্ত মুখ ও দ্বিধা থরো থরো পদক্ষেপ লক্ষ্য করেছিলেন।

: চাচা, কিয়ের মিছিল?

: নদীর মিছিল।

: তো কী হইছে?

: না, কিছু হয় নাই। ঝালমুড়ি দ্যান।

: মিছিল তো ভাগ হয়া গ্যাছে গা! তিনি নিপুণ হস্তে পেঁয়াজ কুচি করতে করতে বলেন।

: তাড়াতাড়ি দ্যান! তার সঙ্গে আলাপে উৎসাহ পাই না।

: হোনেন, তাড়াহুড়া কইর‌্যা লাভ নাই। নদী কি আর এক বছরে পরিষ্কার হইবো?

: কত বছর লাগবে? এবার একটু আগ্রহী হই।

: হেইডা আমি কইমু ক্যামনে?

: আমরা পরিষ্কার বুড়িগঙ্গা দেখে যেতে পারব?

: কামে লাইগ্যা থাকলে পারবেন। হেইকাল থাহি দেহি ব্যানার আহে আর যায়। কাম তো দেহি না! মিছিল দিয়া কি নদীর পানি পরিষ্কার হইবে! লন, মুড়ি খান!

আমি পাশের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে ভাবতে থাকি, ঝালমুড়ি খেতে খেতে।


লেখক ও গবেষক

skrokon@gmail.com

মন্তব্য


অন্যান্য