নদীতে কুড়ানো নুড়ি

'লদীর ফটো তুল্যা কি করবেন'

প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০১৯

'লদীর ফটো তুল্যা কি করবেন'

বগুড়ার সারিয়াকন্দিতে যমুনা-বাঙালি নদীর 'ফিস পাস'- ছবি লেখক

  শেখ রোকন

নদীতে নানা ধরনের 'সুরক্ষা' স্থাপনা দেখেছি- ড্যাম, ব্যারাজ, টি-ড্যাম, গ্রোয়েন, বেড়িবাঁধ, আড়িবাঁধ, হার্ড পয়েন্ট। নানা নাম নানা কাজ বা একই স্থাপনার ভিন্ন ভিন্ন নাম। সেদিক থেকে বগুড়ার সারিয়াকান্দির 'ফিস পাস' সত্যিই নতুন ছিল। চাইছিলাম ভালোভাবে ছবি তুলতে। কিন্তু বারবারই 'মানবিক বিঘ্ন' ঘটছিল।

২০০৪ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের কথা। হাইওয়ের যানজট ঠেলে মধ্যরাত গড়িয়ে বগুড়া শহরে পৌঁছেছিলাম। বাইপাসের কাছে গজানো অভিজাত হোটেলে ঢুকে মধ্যরাতেই 'ব্রেকিং নিউজ' দেখেছিলাম সারিয়াকান্দির চন্দনবাইশা ইউনিয়নের শেখপাড়ার কাছে বেড়িবাঁধ ভেঙেছে।

শরতের সোনাভরা রোদে আমনের ক্ষেত, পাট পচানো জলাভূমি পাশ কাটিয়ে বগুড়া থেকে গাবতলী, সারিয়াকান্দি হয়ে বেড়িবাঁধ ধরে যমুনা-বাঙালির প্রায় মিলনস্থল কুতুবপুরের দিকে যেতে যেতে আখতারুজ্জামন ইলিয়াসের কথা মনে পড়েছিল। এই অঞ্চলের পটভূমিতে 'পায়ের নিচে জল' ছোটগল্পে তিনি লিখেছিলেন- 'ওপারে মথুরাপাড়া ঘেঁষে নদীর গা একেবারেই এলিয়ে দেওয়া, কিন্তু এদিকে আসতে আসতে যমুনা তার কোঁকড়া কোঁকড়া ঢেউ ঝাঁকিয়ে নিজের সীমানাকে অস্বীকার করে।'

ইলিয়াস এই গল্প লিখেছিলেন আশির দশকের গোড়ায়। যমুনা এতদিনে আরও এগিয়েছে। আরও জমি-জিরাত, বাড়ি-ঘর খেয়ে এগিয়েছে বাঁধের দিকে। কোথাও কোথাও বাঁধ ধরেও ফেলেছে। যমুনার 'আগ্রাসন' ঠেকাতে সারিয়াকান্দিতে বাঁধ ছাড়াও নির্মিত হয়েছে তিন-চারটি গ্রোয়েন। কালীতলায় নির্মিত বৃহত্তম গ্রোয়েনটিতে গিয়ে নিজেও দেখেছি সেখানে যমুনা খানিকটা বশ মেনেছে। যদিও ভাঙন থামায়নি। গ্রোয়েন বা অন্যান্য সুরক্ষা স্থাপনা এড়িয়ে অন্যত্র ভাঙছে।


সারিয়াকান্দিতে বিশাল যমুনার সমান্তরালে প্রবাহিত ছোট্ট নদী 'বাঙালি'। কুতুবপুরে দুই নদী ক্রমেই কাছাকাছি হতে থাকে। সেখানে ভাঙন ঠেকাতে নানা ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ২০০০ সালে কুতুবপুর ইউনিয়নের দেবডাঙ্গায় প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয়ে 'ফিস পাস' নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। খোপ খোপ কংক্রিটের কাঠামো ও স্লুইস গেট ব্যবস্থায় ফিস পাসের কাজ কেবল যমুনা বাঙালির মধ্যে মাছ চলাচল স্বাভাবিক রাখা নয়, পানি ছেড়ে দিয়ে ভাঙনের চাপও কমানো। কিন্তু সর্বশেষ দুই নদী ১০০ মিটার দূরত্বে এসে ঠেকেছে।

ফিস পাস সংলগ্ন স্থাপনার প্রভাবে কি-না, জানা নেই। যমুনা খানিকটা চর ফেলে অন্যদিকে ঘুরে গেছে। যদিও যমুনার মতি বোঝা ভার! কুতুবপুরেই নব্বই দশকের গোড়ায় নির্মিত অপর একটি ফিস পাস ভেঙে ফেলেছিল এই নদী। খোদা নাখাস্তা, যদি ১০০ মিটার দূরত্ব ঘুচে যায়, তাহলে বিপুল স্রোতের ভার নিতে হবে ছোট্ট বাঙালিকে। এর প্রতিক্রিয়ায় বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকার সড়ক, সেতু, জনপদ, ফসলের মাঠ তছনছ হয়ে যেতে পারে।

ফিস পাসে গিয়ে 'মানবিক বিঘ্ন' হচ্ছে, এক স্থানীয় তরুণ বারংবার ফ্রেমের মধ্যে এসে পড়ছিলেন। শুকনো চেহারা। গায়ে আধময়লা চেক শার্ট, পরনে লুঙ্গি। তাকে সরিয়ে দিলে সরে যান। কিন্তু একটি 'ভালো ফ্রেম' ধরতে গেলেই দেখা যায়, আবার এসে পড়েছেন। খানিকটা যেন মজাও করছিলেন। বলেন- 'লদীর ফটো তুল্যা কি করবেন, হামার ফটো তোলেন আগে।'

তাকে বোঝাই, এই 'ফিস পাস' কতটা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। যমুনা ও বাঙালি নদীর মধ্যে চলাচলকারী মাছের জন্য কতটা তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি পাল্টা যুক্তি দেখান- "মাছ তো 'পাস' হয়াই যাইবে, মানুষ যাইবে কুটি?"

তাই তো! দুই নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলকে আমি মাঝে মধ্যেই মজা করে 'মেসোপটেমিয়া' বলি। যমুনা ও বাঙালির মধ্যবর্তী অঞ্চলে আটকা পড়া মানুষগুলো কোথায় যাবে? ভাঙনপীড়িত মানুষ পাশে রেখে, মৎস্যসম্পদের প্রতি আমার এই মনোযোগ কতটা সঙ্গত?

উত্তর না পেয়ে তরুণ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সরে যান। ফিস পাসের রেলিং ধরে বাঙালি নদীর দিকে তাকিয়ে থাকেন। নিচে মহোৎসাহে এক একটি খোপ পাড়ি দিয়ে মাছেরা ছুটে চলছে যমুনা থেকে বাঙালির দিকে। সেসব মাছের সামান্য অংশ জাল দিয়ে বা খালি হাতেই ধরতে পেরে আরও কিছু তরুণ-তরুণী নরক গুলজার করে তুলছে। যেন মহোৎসব।

শেখ রোকন : লেখক ও গবেষক

skrokon@gmail.com




মন্তব্য যোগ করুণ