একাদশ সংসদ নির্বাচন

বিরোধীদলীয় নেতা

রওশন না কাদের

প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারি ২০১৯ | আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

রওশন না কাদের

  সমকাল প্রতিবেদক

অনেকে জানতে চান একাদশ জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা কে হচ্ছেন। ৩০ ডিসেম্বর ভোটে ২২ আসন পেয়ে সংসদে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় পার্টির সংসদীয় দলের নেতাই এ পদে বসতে যাচ্ছেন। এটা তো সহজ হিসাবের কথা। তবে হিসাবটা একটু জটিল। জাতীয় পার্টির সংসদীয় দলের নেতা কে হবেন তা এখনও নিশ্চিত নয়। পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিরোধীদলীয় নেতার পদে তার ভাই জিএম কাদেরকে চান। তবে এরশাদপত্নী বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদও এ পদের দাবিদার। একাদশ সংসদ নির্বাচনে ২৫৬ আসন নিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি পেয়েছে মাত্র ৫টি আসন। বিএনপিকে ছাপিয়ে ২২ আসন পেয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হয়েছে জাতীয় পার্টি। দলটি সরকারে অংশ নেবে, নাকি বিরোধী দলে থাকবে- আজ শপথ শেষে সংসদীয় দলের সভায় সে সিদ্ধান্ত হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ।

তবে জাতীয় পার্টির নবনির্বাচিত এমপির অধিকাংশই দশম সংসদের মতো এবারও মন্ত্রিসভা ও বিরোধী দলে দ্বৈত ভূমিকায় থাকতে চান। গতকাল বুধবার দলের এমপি ও প্রেসিডিয়াম সদস্যদের যৌথসভায় এ মতামত দেন তারা।

বিএনপিবিহীন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ৩৪ আসন পেয়েছিল নির্বাচন বর্জন করা এরশাদের জাতীয় পার্টি। এবার আসন কমেছে ১২টি। ২২ আসন পেয়ে দলটি সংসদে প্রধান বিরোধী দল হতে পারবে কি-না সে বিতর্কও রয়েছে। তবে আইনে বাধা নেই বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহ্‌দীন মালিক।

১৯৭৩ সালের নির্বাচনে ২৯৩ আসন পেয়েছিল আওয়ামী লীগ। স্বতন্ত্র, ন্যাপ ও জাসদ পায় বাকি সাত আসন। বিরোধী সাত এমপি আতাউর রহমান খানকে তাদের নেতা নির্বাচিত করেন। তাকে বিরোধীদলীয় নেতার মর্যাদা দিতে স্পিকারকে চিঠি দিয়েছিলেন তারা। আতাউর রহমানকে বিরোধীদলীয় নেতার মর্যাদা দিতে আপত্তি করেছিলেন সেই সময়কার সংসদ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার যুক্তি ছিল- বিরোধী দল গঠনে কমপক্ষে ২৫ আসন পেতে হবে। তিনি বিরোধী সাত এমপিকে 'বিরোধী সংসদীয় গ্রুপ' হিসেবে গণ্য করতে বলেন। প্রথম ও স্বল্প মেয়াদের ষষ্ঠ সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার পদ শূন্য ছিল।

তবে সংবিধানে বিরোধী দল গঠনে আসন সংখ্যার বাধ্যবাধকতা নেই। এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৮ সালের একতরফা নির্বাচনে ১৯ আসন পেয়েছিল 'সম্মিলিত বিরোধী দল' নামের ৭২ দলের জোট। জোটের প্রধান আ স ম আবদুর রব বিরোধীদলীয় নেতা হয়েছিলেন। জাতীয় পার্টির আসন সংখ্যা ছিল ১৯-এর বেশি, তাই বিরোধী দল গঠনে বাধা নেই বলে মনে করছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা। সংসদের কার্যপ্রণালিবিধিতে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বৃহত্তম দলের নেতাকে বিরোধীদলীয় নেতার স্বীকৃতি দেবেন স্পিকার। বিরোধী দল হতে হলে কত আসন পেতে হবে, তা বলা নেই।

ভারতের সংবিধানে বিরোধী দল হতে লোকসভার মোট আসনের অনূ্যন ১০ শতাংশ অর্থাৎ ৫৫টি আসনে জয়ী হতে হয়। সর্বশেষ নির্বাচনে ৪৪ আসন পাওয়া কংগ্রেস এ কারণে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পায়নি। কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোট ইউপিএ ৬০ আসন পেলেও ভারতের লোকসভায় বিরোধীদলীয় নেতার পদ শূন্য রয়েছে। কংগ্রেসের সংসদীয় দলের নেতা মল্লিকার্জুন খারগে সংসদীয় গ্রুপের নেতার স্বীকৃতি পেয়েছেন।

বাংলাদেশের সংবিধানে সংখ্যার বাধা না থাকায় জাতীয় পার্টির প্রধান বিরোধী দল হতে বাধা নেই। তবে কে হচ্ছেন বিরোধীদলীয় নেতা, এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছেন না জাতীয় পার্টির নেতারা। এরশাদ গত মঙ্গলবার 'উইল' করেছেন, তার অবর্তমানে জিএম কাদেরই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান। এ থেকে স্পষ্ট- নিজের ছোট ভাইকেই বিরোধীদলীয় নেতার পদে চান এরশাদ।

এরশাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য সমকালকে বলেছেন, জিএম কাদেরকে উত্তারাধিকারী মনোনীত করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে জাতীয় পার্টির সংসদীয় দলের প্রধান ও বিরোধীদলীয় নেতা পদে জিএম কাদেরকেই চাইছেন এরশাদ।

তবে এরশাদের চাওয়া পূরণে বাধাও রয়েছে। জাতীয় পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকেই জিএম কাদেরকে নেতা হিসেবে মানতে প্রস্তুত নন। নির্বাচনের আগে জিএম কাদেরকে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষমতা দিতে চেয়েছিলেন এরশাদ। কিন্তু দলের নেতাদের আপত্তিতে তা ভেস্তে যায়।

জাতীয় পার্টির নবনির্বাচিত একজন এমপি, যিনি রওশন এরশাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত, তিনি সমকালকে জানিয়েছেন, রওশন এরশাদ নিজেই বিরোধীদলীয় পদে থাকতে চান। তিনি সমকালকে বলেছেন, বিরোধীদলীয় নেতা কে হবেন তা শুধু এরশাদ ও জাতীয় পার্টির এমপিদের ওপর নির্ভর করছে না। এখানে সরকারেরও একটা গ্রিন সিগন্যালের বিষয় আছে। রওশন এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ। তাই তার সম্ভাবনাই বেশি।

দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে দূরত্ব ও ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করায় জিএম কাদের বিরোধীদলীয় নেতা হতে আওয়ামী লীগের সমর্থন পাবেন কি-না তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। তবে এ নিয়ে মুখ খোলেননি তিনি। গত মঙ্গলবার তিনি সমকালকে বলেছিলেন, 'জাতীয় পার্টির সংসদীয় দলের সদস্যরা ঠিক করবেন কে হবেন বিরোধীদলীয় নেতা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তাই হয়ে থাকে।'

জাতীয় পার্টি প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসবে কি-না তাও এখনও নিশ্চিত নয়। গতকাল দলের এমপি ও প্রেসিডিয়ামের যৌথ সভায় অধিকাংশ নেতা সরাসরি সরকারে থাকার পক্ষে মত দেন। জিএম কাদেরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় নবনির্বাচিত ১৪ এমপি উপস্থিত ছিলেন। তবে এরশাদ, রওশনসহ শীর্ষ নেতারা ছিলেন অনুপস্থিত।

সভায় প্রেসিডিয়াম সদস্য সালমা ইসলাম বলেন, বিগত ১০ বছরে তিনি দলের জন্য অনেক শ্রম দিয়েছেন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে তিনি মনোনয়ন পাননি। স্বতন্ত্র নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছেন। কারণ দল তার পাশে ছিল না। তিনি দাবি করেন, বিএনপি থেকে মনোনয়নের প্রস্তাব পেয়েছিলেন তিনি।

ঢাকা-৪ আসন থেকে জয়ী সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা সভায় বলেন, মহাজোটে থাকার কারণেই তারা এমপি হতে পেরেছেন। মহাজোট নেত্রী শেখ হাসিনা এখন রাজনীতি করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে। বিষয়টি উপলব্ধি করতে হবে। আবেগ দিয়ে রাজনীতি হয় না। সরকারেই থাকতে হবে।

প্রেসিডিয়াম সদস্য আজম খানও সরকারে থাকার পক্ষে মত দেন। আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য শফিকুল ইসলাম বলেন, গতবারের মতো এবারও সরকার ও বিরোধী দল দুই ভূমিকাতেই থাকা উচিত। নইলে জাতীয় পার্টি টিকতে পারবে না।

প্রেসিডিয়াম সদস্য এ টি ইউ তাজ রহমান দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি বলেন- হয় সরকারে, নয় বিরোধী দলে থাকতে হবে। বিরোধী দলে থাকলে মন্ত্রিত্ব নেওয়া উচিত হবে না। বিরোধী দলে থেকে মন্ত্রিত্ব নিলে জনগণের কাছে গুরুত্ব থাকে না। তবে নবনির্বাচিত এমপি মুজিবুল হক চুন্নু, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, আহসান আদেলুর রহমান, পনিরউদ্দিন আহমেদসহ অধিকাংশই মন্ত্রিত্ব নেওয়ার পক্ষে মত দেন। গোলাম কিবরিয়া টিপু মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ তদন্তে কমিটি করার দাবি জানান। ঢাকা-৬ আসনের এমপি কাজী ফিরোজ রশীদ উপস্থিত থাকলেও বক্তব্য দেননি।

সভার পর জিএম কাদের সাংবাদিকদের বলেন, শপথ নিয়ে সংসদীয় দলের সভায় সিদ্ধান্ত হবে জাতীয় পার্টি কোন ভূমিকায় থাকবে। জাতীয় পার্টি মহাজোটের শরিক। মহাজোটের বাকি শরিকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নির্বাচন করেছে। তাই তাদের সঙ্গেও আলোচনা হবে জাতীয় পার্টির ভবিষ্যতের ভূমিকা নির্ধারণে।

মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ বলেছেন, জাতীয় পার্টি এখন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল। সংসদীয় দলের সদস্যরা মহাজোটের সঙ্গে আলোচনা করে আগামী সংসদে জাতীয় পার্টির ভূমিকা কী হবে তার নির্ধারণ করবেন।

মন্তব্য


অন্যান্য