মুক্তমঞ্চ

মন্ত্রিসভায় একটি 'ধন্যবাদ' প্রসঙ্গ

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

মন্ত্রিসভায় একটি 'ধন্যবাদ' প্রসঙ্গ

  হিলাল ফয়েজী

'ধন্যবাদ' যিনি পেয়েছেন তিনি একজন 'সমুজ্জ্বল' মন্ত্রী। একসময় মন্ত্রীর বন্ধুপ্রতিম ছিলাম। তখন তিনি দলীয় কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীয় বিন্যাসে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। ভিন্ন ছাত্র ও অন্যবিধ সংগঠনের হলেও ব্যতিক্রমভাবে তার ব্যবহার, মাধুর্য ও অকৃত্রিম আন্তরিকতায় তাকে কাছের মানুষ ভেবে এসেছি। এমন ব্যক্তি যদি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর কাছে 'ধন্যবাদ' উপহার পান কোনো কৃতিময় কাজের জন্য, তাহলে আমরা কাছের মানুষরা তো খুশি হবোই। 'সমুজ্জ্বল' মন্ত্রী 'খাদ্যমন্ত্রী' ছিলেন। পরে এক দফা সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের হাল ধরেছেন।

তবে প্রাপ্ত 'ধন্যবাদ'টুকু মন্ত্রীর কাছে 'ধ্রুবতারা'সম হলেও দেশের কয়েকজন হিতবাদী গবেষক মানুষের বুকে শেলসম আঘাত হেনেছে। শেষোক্তদের শীর্ষ মানুষটিও আমার খুব কাছের। এ দেশে ভেজালবিরোধী জনযুদ্ধের দীর্ঘকালের কার্যত অধিনায়ক। মানববন্ধন, সেমিনার, পত্রপত্রিকা ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম চ্যানেলে, রচিত পুস্তক-প্রকাশনায় তিনি ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর খাদ্য ও ওষুধের ভেজাল সম্পর্কে দেশবাসীর অনেকের চোখ খুলে দিয়েছেন। খাদ্যের জন্য গ্রহণযোগ্য রঙের বদলে টেক্সটাইল রঙ মিশিয়ে ক্যান্সারের বিপদ কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, বছর বিশেক আগে তার কাছ থেকেই প্রথম শুনেছিলাম। আরও কত পণ্য, দইয়ের ওপর হলুদ রঙ, আম উৎপাদনের স্তরে স্তরে বিপজ্জনক কীটনাশক ব্যবহার, গল্গাইসামেট- এমনি কত কিছু। 'খাদ্য-সন্ত্রাস' নামে একটি পুস্তক ছাপিয়ে ভেজালের ভয়ঙ্কর জগৎ উন্মোচন করেছেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য অবসর নেওয়া ফার্মেসিবিষয়ক অধ্যাপক তিনি। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার থেকে কয়েকজন শিক্ষক-সাথি নিয়ে গভীর গবেষণায় কিছুকাল আগে জানালেন, বড় বড় কোম্পানির চমৎকার মোড়কের দুগ্ধ দেখে মুগ্ধ হওয়ার কোনো কারণ নেই। পাস্তুরিকৃত এসব দুগ্ধে অ্যান্টিবায়োটিকসহ বিপজ্জনক পদার্থ রয়েছে। আসলে যথাযথ পাস্তুরিকরণ প্রক্রিয়ায় উৎপাদন চলছে না। এ খবর সারাদেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিল। আদালত দুধ পরীক্ষার জন্য সরকারি ল্যাবরেটরিগুলোকে দায়িত্ব দিয়েও অনুরূপ রিপোর্ট পেয়ে ওইসব দুধ বাজারে বিক্রি নিষিদ্ধ করার হুকুমনামা জারি করলেন। এই দুগ্ধ উৎপাদনকারীরা বিশাল বিশাল চাঁই। খামারিরা দুধ বিক্রি করতে না পেরে হাটে-বাজারে ঢেলে দিচ্ছে- এমন সাজানো সংবেদনশীল প্রতিবেদন প্রধান প্রধান চ্যানেলে প্রচার করে উল্টো আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া হলো। সে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল সুদূর লন্ডনে। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর কাছে খবর পাওয়া গেল।

আমাদের কৃষিমন্ত্রীও একজন গবেষক পটভূমির ডক্টরেট ডিগ্রিধারী। তিনি ত্বরিতগতিতে আমাদের বাজারের প্যাকেট দুধ পাঠিয়ে দিলেন ভারতের তামিলনাড়ূ রাজ্যের রাজধানী চেন্নাইতে। আর চেন্নাইয়ের পরীক্ষাগার থেকে অতি দ্রুত এলো মহাসুসংবাদ। আমাদের বাজারের প্যাকেট দুধওয়ালারা সে সুসংবাদে সাফল্যের অট্ট নয়, অষ্টাশি হাসি হাসলেন। একেবারে সব দুধের নমুনাই শতকরা একশ' ভাগ ভালোর ওপর ভালো। কোনোই বিপদ নেই। সব সাদা, সাদা, সাদা। কোনোই ধাঁধা নেই। অতএব পাস্তুরিকৃত দুধের দশ নম্বর সংকেত নেমে হঠাৎ ফকফকা রৌদ্র নেমে এলো মাতৃভূমি বাংলাদেশে। আমাদের সরকারি গবেষণাগারগুলো পর্যন্ত বেকুব বনে গেল।


গ্রামীণ বাজারে দুধে পানি মেশানোর গল্প বহুকালের। যাদববাবুর পাটিগণিতের যুগেও দুধে পানি মেশানোর অঙ্ক মিলত। বাল্যবেলায় অমন প্রশ্নের জবাব দিয়েই আমাদের বড় হয়ে ওঠা। বাজারে গরুর দুধ থেকে চিংড়ি লাফিয়ে ওঠারও মজার গল্প আছে। এগুলো তৃণমূলের দরিদ্রদের হালকা দুর্নীতির মজাদার কথন। পাস্তুরিত দুধ আর খামার গড়ে ওঠার একাল তো হাজার কোটি টাকার বিষয়-আশয়। দরিদ্র দুগ্ধ বিক্রেতাদের নিয়ে হাসি-মশকরা চলে। কিন্তু পাস্তুরিত দুগ্ধের বিশাল চাঁই? এতটুকু স্পর্শ করলেই আগুন জ্বলে ওঠে।

তা ওই লজ্জা বা গল্গানি বা কুণ্ঠার কথাই বলি। ১৯৭১ থেকে ২০১৯। ৪৮ বছর। পাস্তুরিত দুধে বিপজ্জনক অ্যান্টিবায়োটিকের সন্ধান আমাদের সরকারি ল্যাবরেটরিগুলোই যখন জানাল, উচ্চ আদালত যখন শক্ত পদক্ষেপ নিলেন, তখন ড. রাজ্জাক কৃষিমন্ত্রী 'চেন্নাই' সনদ এনে একেবারে সাফ বলে দিলেন, আমাদের পাস্তুরিত দুধ একেবারে নিরাপদ। দুধে-ভাতে পূর্ব বাঙালিরা নিরাপদে হূষ্টপুষ্ট হয়ে ওঠো। এ দেশে এমন 'সনদ' দেওয়ার একটি প্রতিষ্ঠানও নেই? যে সরকারি গবেষণাগারগুলো পর্যন্ত হাইকোর্টে পাস্তুরিত দুধে অ্যান্টিবায়োটিক খুঁজে পাওয়ার ফলাফল জানাল, তাদের কী প্রতিক্রিয়া জানি না।

ফলে ঘটল কী? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য অবসর নেওয়া একজন অধ্যাপকের সমগ্র পেশাজীবনের ওপর 'ষড়যন্ত্রকারী'র তকমা দিয়ে দেওয়া হলো অবলীলায়। দুগ্ধ শিল্পওয়ালাদের মুগ্ধ অর্জন বটে। 'চেন্নাই' সনদে তারা এখন ফুরফুরে। এবার ক্ষমতাবান ডক্টরেটদের শুধাই- খবর নিন, দেশের কতভাগ লোক কী কী অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধক হয়ে পড়েছেন? সোজা ভাষায় এসব ওষুধে আর ধরে না। দুধ, মাছ, চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র কী ভয়ানক সর্বনাশ করে চলেছে- এসব কথা কী অমূলক? যদি তাই হয়, তাহলে তো ভাবনা নেই। কিন্তু সে গ্যারান্টিটা সরকারিভাবে ঘোষিত হোক। সম্মানিত কৃষিমন্ত্রী অনুরোধ করব, ওই গ্যারান্টি প্রদানটা একটু ভালো করে বুঝিয়ে বলুন আমাদের, যারা আমরা অজ্ঞ। সামান্যতেই ভয় পেয়ে যাই আম-জনতা হিসেবে।

অথচ শুনতে পাই, দুগ্ধ পাস্তুরিকরণের বিষয়ে শিল্পকারখানাগুলোতে আর কিছু ব্যবস্থা নিলেই বিষয়টির সুরাহা হয়ে যেত। সে ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত নন মহাশক্তিধর দুগ্ধ শিল্পপতিরা। এদিকে কৃত্রিম দুগ্ধ উৎপাদনের মহাবজ্জাতি শিল্পকারখানা ধরা খেয়েছে র‌্যাবের হাতে। কারখানার নাম নাকি বারো আওলিয়া। ১৮ কোটি লোকের বাজার বিশাল। মুনাফা মহানেরা কী যে করেন আর না করেন, ভাবনার অতীত।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী চারবার শপথ নিয়ে দেশ চালাচ্ছেন। অভাবনীয় উন্নতির নানাবিধ সুফল আমরা ভোগ করছি। বিস্মিত হয়ে যাই প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের সব ব্যাপারে এত বিস্তৃত বয়ানে তিনি সভাগুলোকে চমকে দেন। তার বাবা, আমাদের বাঙালি জাতিসত্তার মহানায়ক, তিনিও অনেক কথা, অনেক কিছুই মনে রাখতে পারতেন। বাবার গুণটি তার মেয়েটিও রাষ্ট্রকার্যে ফুটিয়ে তুলছেন। তারই কাছে অন্তিমে তাই দুটি অনুরোধ : এক. ক. প্রথমত, গবেষক-অধ্যাপক দলটির সঙ্গে আপনি বসুন, কথা বলুন। এই কথা বলাটি খুবই প্রয়োজনীয় বিবেচনা করছি। ওই গবেষণা গ্রুপটির মানসিক অবস্থা বিবেচনা করুন; খ. গবেষক-অধ্যাপক রচিত 'খাদ্য-সন্ত্রাস' পুস্তকটি পড়ার অনুরোধ জানাই।

দুই. 'চেন্নাই সনদের' ওপর নির্ভরতা ও গল্গানির হাত থেকে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশকে মুক্ত করতে অনতিবিলম্বে দেশের সব ক'টি বিভাগে স্বতন্ত্রভাবে একটি করে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির নির্ভরযোগ্য 'পরীক্ষাগার-ল্যাবরেটরি' স্থাপন করুন। দেশের বিমান-সমুদ্র এবং স্থলবন্দরগুলোতেও অনুরূপ পরীক্ষাগার স্থাপন করুন। দেশের ভেতরে যা উৎপাদিত হয়, সেসব পণ্য এবং বাইরে থেকে যা আমদানি হয়, সেসব পণ্য দ্রুতগতিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিশেষ ব্যবস্থা করুন। কার্যত 'ষড়যন্ত্র' শব্দটি তখন হয়তোবা তার ভিত্তি হারাবে। বড় চাঁইদের হাত থেকে খাদ্যপণ্য এবং ওষুধকে নিরাপদ করে  তুলতে এর বিকল্প কিছু থাকলে সে পদক্ষেপও নিতে পারেন।

ভেজালবিরোধী গণসংগ্রামের একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে এটুকুই আজ  বিনীত নিবেদন।

প্রকৌশলী, মুক্তিযোদ্ধা ও রম্য লেখক

মন্তব্য


অন্যান্য