খুলনা

আঞ্চলিক রাজনীতি-২: খুলনা

খুলনা আওয়ামী লীগে নতুন মেরুকরণ

নেতাকর্মীরা ঝুঁকছেন এমপিদের দিকে

প্রকাশ : ২৫ জুন ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

খুলনা আওয়ামী লীগে নতুন মেরুকরণ

  মামুন রেজা ও হাসান হিমালয়, খুলনা

সাম্প্রতিক সংসদ নির্বাচনের পর খুলনায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ঘটেছে। কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন মহানগর সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান ও তার অনুসারীরা। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে নতুন নেতৃত্ব প্রত্যাশীদের মধ্যে। স্থবির হয়ে পড়েছে জেলা ও নয়টি উপজেলায় দলীয় কার্যক্রম। এ অবস্থায় সাধারণ নেতাকর্মীরা মহানগর ও জেলার শীর্ষ নেতাদের বদলে নিজ নিজ এলাকার সংসদ সদস্যের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন।

অন্যদিকে, ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো বিভাগীয় এ নগরীতে অনেকটাই নিষ্ফ্ক্রিয়। খুলনায় জোটের ৭টি শরিক দলের অস্তিত্ব রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- ওয়ার্কার্স পার্টি, ন্যাপ, সাম্যবাদী দল, জাসদ, গণতন্ত্রী পার্টি, জাকের পার্টি ও জাতীয় পার্টি (জেপি)। তবে নির্বাচনের পর থেকে ওয়ার্কার্স পার্টির দলীয় কর্মকাণ্ড অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। অন্য ৬টি দলের অস্তিত্বও বলা চলে নামে মাত্র।

এমপিকে ঘিরে সাংগঠনিক বলয় :দশম সংসদ নির্বাচনে খুলনা-২ (খুলনা সদর ও সোনাডাঙ্গা) আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান। তবে একাদশ সংসদ নির্বাচনে নানা কারণে দলীয় মনোনয়ন পাননি তিনি। দলে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন  এক সময়কার প্রভাবশালী এ নেতা। এ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ সালাহ উদ্দিন জুয়েলকে ঘিরে দলে সাংগঠনিক প্রভাব বলয় গড়ে উঠেছে।

এর আগে নেতাকর্মীরা মহানগর সভাপতি ও সিটি মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক এবং সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজানের নেতৃত্বাধীন দুটি গ্রুপে বিভক্ত ছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের পর মিজানের অনুসারীদের কেউ কেউ তালুকদার আবদুল খালেক অথবা শেখ সালাহ উদ্দিন জুয়েলের দিকে ঝুঁকে পড়েন। আর তাই মিজানের বাড়ি ও ব্যক্তিগত কার্যালয় এখন আর সারাদিন নেতাকর্মীদের পদচারণায় মুখরিত হয় না। তবে সিটি মেয়র খালেক ও সংসদ সদস্য জুয়েলের মধ্যে সুসম্পর্ক রয়েছে।

মহানগরের অন্য আসন খুলনা-৩-এর অন্তর্ভুক্ত খালিশপুর, দৌলতপুর ও খানজাহান আলী থানার নেতাকর্মীরা এ আসনের তিনবারের সংসদ সদস্য ও শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানের পেছনে রয়েছেন। মূলত মন্নুজান সুফিয়ানকে ঘিরেই এখানকার সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড আবর্তিত হচ্ছে।

এ ছাড়া দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলার নেতাকর্মীরা খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও হুইপ পঞ্চানন বিশ্বাস এবং রূপসা-তেরখাদা-দিঘলিয়া উপজেলার নেতাকর্মীরা খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও শিল্পপতি আবদুস সালাম মুর্শেদীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে ব্যস্ত। ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার নেতাকর্মীরা আগে থেকেই খুলনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক মৎস্যমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছেন। এদিকে কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলার নেতাকর্মীরা খুলনা-৬ আসনে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত এমপি শেখ মো. আকতারুজ্জামান বাবুর প্রতি আনুগত্য দেখাতে শুরু করেছেন।

খুলনা জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে ৮টিতেই নির্বাচিত চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগের। তারাও স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলছেন। বিশেষত ডুমুরিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন স্থগিত থাকায় সেখানকার দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী সবাই স্থানীয় এমপির সঙ্গে সখ্য বজায় রেখে চলছেন।

মেয়াদোত্তীর্ণ মহানগর ও পাঁচ থানার কমিটি :খুলনায় আওয়ামী লীগের মহানগর ও পাঁচটি থানা কমিটির মেয়াদ এর মধ্যেই পার হয়ে গেছে। মহানগর শাখার সম্মেলন হয়েছিল ২০১৪ সালের ২৯ নভেম্বর। এর প্রায় দু'বছর পর ২০১৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর পূর্ণাঙ্গ মহানগর কমিটি অনুমোদন পায়। এ অবস্থায় আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে মহানগর কমিটির সম্মেলন হতে পারে।

তবে মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি পদে বর্তমান সভাপতি ও সিটি মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক ছাড়া সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে এখনও কারও নাম শোনা যায়নি। সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হিসেবে বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান ছাড়াও খুলনা সদর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলামের নাম আলোচনায় রয়েছে। নিচের দিকের বিভিন্ন পদে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনকারী নেতারা আরও ভালো পদ পাওয়ার আশা করছেন।

তালুকদার আবদুল খালেক সমকালকে বলেছেন, দলের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। সবকিছু ঠিকমতো চলছে। সম্মেলন হলে দল আরও গতিশীল হবে।

মিজানুর রহমান মিজান জানান, শিগগিরই দলের সদস্য সংগ্রহের জন্য ফরম বিতরণ শুরু করবেন তারা। এ জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে পৃথক তালিকা তৈরির কাজ চলছে। দল পুনর্গঠনের উদ্যোগে নেতাকর্মীরা চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। দলের মধ্যে আপনি কোণঠাসা কিনা?- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দলের মধ্যে অনেক কিছুই ঘটে। সবকিছু খোলাখুলি বলতে হয় না; বলা যায় না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী দলের কাজ করছেন বলে জানান তিনি।

এ প্রসঙ্গে সাইফুল ইসলাম জানান, আসন্ন সম্মেলনে তিনি মহানগরের সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হবেন। কাউন্সিলরদের প্রত্যক্ষ ভোটে নেতা নির্বাচন করা হবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।

সম্মেলন চাইছেন জেলা নেতাকর্মীরাও :খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ ত্রিবার্ষিক সম্মেলন হয়েছিল ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি। এ সময় জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শেখ হারুনুর রশীদ সভাপতি ও এসএম মোস্তফা রশিদী সুজা (প্রয়াত সংসদ সদস্য) সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। একই বছরের ২৭ নভেম্বর কেন্দ্র থেকে জেলা শাখার ৭১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন করা হয়। ইতিমধ্যে এ কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পড়েছে। জেলার ৯টি উপজেলার ৮টি পূর্ণাঙ্গ কমিটিও মেয়াদোত্তীর্ণ। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে আহ্বায়ক কমিটি পাইকগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

দলের নেতাকর্মীরা এতদিন ২০১৫ সালের সম্মেলনে নির্বাচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বাধীন দুটি গ্রুপে বিভক্ত ছিলেন। এরই মধ্যে কিডনিসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা রশিদী সুজা গত বছরের ২৭ জুলাই মারা যান। তার পর থেকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুজিত কুমার অধিকারী। এর আগে ২০১৭ সালের ২৬ নভেম্বর জেলা আওয়ামী লীগের আরেক যুগ্ম সম্পাদক গাজী আবদুল হাদীও মারা গেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের কয়েক নেতা বলেছেন, সাধারণ সম্পাদক সুজা মারা যাওয়ার পর থেকেই জেলা আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। কমে গেছে সভা-সমাবেশ। এদিকে এক বছর আগে কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও সম্মেলনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। সম্মেলন হলে নতুন নেতৃত্ব তৈরির পথ সুগম হবে।

মূল পদে সম্ভাব্য প্রার্থী : সম্মেলন কবে হবে, তা নিশ্চিত না হলেও মূল পদে সম্ভাব্য প্রার্থী কারা হতে পারেন, তা নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে নানা আলোচনা। সভাপতি পদে এখনও একক প্রার্থী হিসেবে আলোচিত হচ্ছে বর্তমান সভাপতি শেখ হারুনুর রশীদের নাম। সাধারণ সম্পাদক পদে খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও শিল্পপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী, জেলা কমিটির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সুজিত কুমার অধিকারী, সাংগঠনিক সম্পাদক ও খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মো. আকতারুজ্জামান বাবু এবং আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান জামালের নাম ব্যাপক আলোচনায় রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে শেখ হারুনুর রশীদ বলেন, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী সেপ্টেম্বর কিংবা অক্টোবরে জেলা-উপজেলা কমিটিগুলোর সম্মেলন হবে। জেলায় বেশ কয়েকজন সাধারণ সম্পাদক হওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তবে কারও নাম বলতে চাই না।

আবদুস সালাম মুর্শেদী এমপি জানান, কেন্দ্রীয় কমিটি যদি মনে করে, তাকে দায়িত্ব দিলে সংগঠন শক্তিশালী হবে, তাহলে তিনি সে দায়িত্ব নেবেন। তিনি প্রত্যাশা করছেন, নতুন-পুরনো নেতাদের নিয়ে শক্তিশালী কমিটি হবে।

সুজিত কুমার অধিকারী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি দলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ও সক্রিয়। এ বিবেচনায় এবারের সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হবেন তিনি।

শেখ মো. আকতারুজ্জামান বাবু এমপি বলেন, সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হলেও প্রধানমন্ত্রী এবং এ অঞ্চলের অভিভাবক শেখ হেলাল উদ্দিন এমপির সম্মতি না পেলে তিনি প্রার্থী হবেন না।

কামরুজ্জামান জামাল বলেন, দলের সব কর্মকাণ্ডে তিনি নিয়মিত অংশ নিয়ে থাকেন। দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী হতে আগ্রহী তিনি।

মন্তব্য


অন্যান্য