খুলনা

আঞ্চলিক রাজনীতি-২: খুলনা

বিএনপিতে হতাশা, দল ছাড়ার চিন্তা অনেকের

গোপনে তৎপর জামায়াত

প্রকাশ : ২৫ জুন ২০১৯ | আপডেট : ২৫ জুন ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিএনপিতে হতাশা, দল ছাড়ার চিন্তা অনেকের

  খুলনা ব্যুরো

স্থবিরতা বিরাজ করছে খুলনা মহানগর ও জেলা বিএনপিতে। তৃণমূল পর্যায়ে নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন দলটির অধিকাংশ নেতাকর্মী। হতাশায় রয়েছেন তারা। গত নির্বাচনের পর দল ছেড়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেও যোগ দিয়েছেন বেশ কয়েকজন নেতা। দল ছাড়ার কথা ভাবছেন আরও অনেকে। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে চলছে নগর বিএনপি। আর মামলা ও গ্রেফতারে দুর্বল হয়ে পড়েছে জামায়াতে ইসলামী। এখন দলটির কার্যক্রম চলছে 'নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলোর' মতো গোপনে। নেতাকর্মীদের অধিকাংশই রয়েছেন গা-ঢাকা দিয়ে। তবে গোপনেই দলীয়  তৎপরতা চালাচ্ছেন তারা। অন্যদিকে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট দুটি এখন পুরোপুরি নিষ্ফ্ক্রিয়।

মহানগর বিএনপির সর্বশেষ দ্বিবার্ষিক সম্মেলন হয়েছিল ২০০৯ সালের ২৫ নভেম্বর। ওই সম্মেলনে নজরুল ইসলাম মঞ্জু সভাপতি ও মনিরুজ্জামান মনি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেলেও আর সম্মেলনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে নগর যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও মহিলা দলের কমিটিও।

২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় কমিটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করেন। এর কিছুদিন পর তারা দু'জন কমিটিতে ২৭ জনকে বিভিন্ন পদে অন্তর্ভুক্ত করেন। ওই বছরের ডিসেম্বরে ১৮১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। বিএনপির কমিটি দুই বছর মেয়াদের, সে অনুযায়ী কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সম্মেলন ছাড়াই ৯ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয় রূপসা উপজেলায়। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ কমিটি আর হয়নি। নির্বাচনের পর উপজেলা কিংবা ইউনিয়ন কমিটিগুলোর একটি সভাও হয়নি। দীর্ঘদিন দলীয় কর্মকাণ্ড না থাকার কথা স্বীকার করে রূপসা উপজেলা বিএনপির সভাপতি জুলফিকার আলী জুলু ও সাধারণ সম্পাদক মোল্লা সাইফুর রহমান সমকালকে বলেন, কেন্দ্রীয় কোনো নির্দেশনা না থাকায় তারা সভা-সমাবেশ করেননি।

দাকোপ উপজেলা বিএনপির কার্যালয় দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ। দলীয় কার্যালয়ে যান না কোনো নেতাকর্মী। সংসদ নির্বাচনের পর থেকে তেমন কোনো কার্যক্রম নেই পাইকগাছা, কয়রা, বটিয়াঘাটা, তেরখাদা, দীঘলিয়া, ফুলতলা ও ডুমুরিয়া উপজেলা বিএনপির।

শুধু জেলার ৯টি উপজেলাতেই নয়, দলীয় কর্মকাণ্ড ঝিমিয়ে পড়েছে জেলা পর্যায় এবং মহানগর কমিটি ও নগরীর পাঁচটি থানায়ও। মহানগর ও জেলা বিএনপি কার্যালয়ে আগের মতো নেতাকর্মীদের আনাগোনা নেই। নগরীর থানা পর্যায়ের দলীয় কার্যালয়গুলোও দিনভর ফাঁকা থাকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির দুই নেতা বলেন, নির্বাচনে খুলনা বিভাগে বিএনপি একটি আসনেও বিজয়ী হতে পারেনি। বিএনপির জয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। সংসদ নির্বাচনে ভোট ডাকাতি হওয়ায় বিএনপি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে যায়নি। বিএনপির সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও পুলিশের চাপে কিছু কিছু নেতাকর্মী দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন না।

এ ব্যাপারে মহানগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু সমকালকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শুধু নগর বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৯৭টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় যাদের আসামি করা হয়, তাদের অনেকেই এখনও পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের ৩৫-৪০ জন নেতা এখনও কারাগারে রয়েছেন। গ্রেফতার আতঙ্কে অনেকে গত এক বছর বাড়িতে ঘুমান না। দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা নেই বলে দাবি করেন তিনি।

তবে জেলা বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনা বলেন, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী তারা উপজেলাগুলোর তৃণমূল পর্যায় থেকে দল পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। এর ফলে নেতাকর্মীরা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছেন এবং হতাশা কেটে যাচ্ছে। ডুমুরিয়া, ফুলতলা ও দাকোপ উপজেলা এবং চালনা পৌরসভা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। বাকিগুলোতে শিগগিরই আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হবে।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমীর এজাজ খান বলেন, দলের এই দুঃসময়ে আমরা আরও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছি। জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক আবু হোসেন বাবু বলেন, শিগগিরই উপজেলাগুলোতে কাউন্সিলরদের ভোটে নেতা নির্বাচন করা হবে। উপজেলাগুলোর পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের পর জেলা বিএনপির সম্মেলন করা হবে।

এলাকায় নেই এমপি প্রার্থীরা : খুলনা-১ (দাকোপ-বটিয়াঘাটা) আসন থেকে সংসদ সদস্যপদে নির্বাচন করেছিলেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমীর এজাজ খান। নির্বাচনের পর মাত্র দু-তিন দিন নির্বাচনী এলাকায় গেছেন তিনি। খুলনা-৩ (খালিশপুর, দৌলতপুর ও খানজাহান আলী থানা) আসনে নির্বাচন করেন রকিবুল ইসলাম বকুল। নির্বাচনের পর মাঝেমধ্যে এলাকায় আসেন। খুলনা-৪ (রূপসা, তেরখাদা ও দীঘলিয়া) আসনে নির্বাচন করেছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় তথ্যবিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল। নির্বাচনের পর সেই যে তিনি এলাকা ছেড়েছেন, আর আসেননি। তবে নির্বাচনের পর থেকে সব সময়ই এলাকায় রয়েছেন খুলনা-২ আসনে বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু। শক্তভাবে দলের হাল ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তিনি।

দলত্যাগ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েক দিন পর কয়রা উপজেলা বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের ছয় নেতা দল থেকে পদত্যাগ করেন। তারা হলেন- জেলা বিএনপির উপদেষ্টা ও উত্তর বেদকাশী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সরদার মতিয়ার রহমান, তার ছেলে কয়রা উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ কাজল, উত্তর বেদকাশী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এস কে আরিফুল ইসলাম, কয়রা উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি মো. আজিজুল ইসলাম, কয়রা সদর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. ইউনুস আলী মোল্লা ও সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ শাহাজান সিরাজ।

গত ২৪ মার্চ বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত খুলনা সিটি করপোরেশনের সাতজন কাউন্সিলর আওয়ামী লীগে যোগ দেন। তারা হলেন- ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. সাইফুল ইসলাম, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ প্রিন্স, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সুলতান মাহমুদ পিন্টু, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের এইচ এম ডালিম, ১২ নম্বর ওয়ার্ডের মনিরুজ্জামান মনির, ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের আনিসুর রহমান বিশ্বাস ও ২০ নম্বর ওয়ার্ডের শেখ মো. গাউসুল আজম। এর আগে গত ২৬ ডিসেম্বর খুলনা-৩ আসনে বিএনপির সাবেক এমপি কাজী সেকেন্দার আলী ডালিমের ছেলে কাজী রিয়াজ সুমন আওয়ামী লীগে যোগ দেন।

বিএনপির নেতাকর্মীদের দলত্যাগ প্রসঙ্গে মহানগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, দলের দুঃসময়ে যারা অন্য দলে যোগ দিয়েছেন তারা ভীরু, কাপুরুষ ও লোভী।

জামায়াতের কার্যক্রম গোপনে : যুদ্ধাপরাধ ইস্যু এবং পরে দলের নিবন্ধন বাতিল হওয়ার পর থেকে খুলনা জেলা ও মহানগরীতে প্রচণ্ড চাপে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির অধিকাংশ কর্মীই গা-ঢাকা দিয়ে রয়েছেন। প্রকাশ্যে দলটির কোনো সভা-সমাবেশ নেই। তবে থেমে নেই তাদের কর্মকাণ্ড। গোপনে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে ধর্মভিত্তিক এই রাজনৈতিক দলটি।

আগে নগরীর রয়্যাল মোড়ের পাশে ছিল জামায়াতের কার্যালয় এবং সিটি কলেজ মোড়ে ছিল ছাত্রশিবিরের কার্যালয়। ১০ বছর ধরে নেই সেই কার্যালয়। এখন গোপনে নেতাদের বাড়িতে সীমিত পরিসরে হয় দলীয় সভা। এ ছাড়া বেশির ভাগ নেতাই পরিবর্তন করেছেন তাদের মোবাইল নম্বর।

সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-৫ (ফুলতলা-ডুমুরিয়া) আসন থেকে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও মহানগর কমিটির সাবেক আমির মিয়া গোলাম পরওয়ার ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন। এ ছাড়া কারাগারে থেকে খুলনা-৬ (পাইকগাছা-কয়রা) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেন মহানগর জামায়াতের আমির মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। ওই নির্বাচনে দু'জনই বিপুল ভোটে পরাজিত হন।

এর আগে কয়রা উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন খুলনার দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমির আ খ ম তমিজ উদ্দিন। সর্বশেষ নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জামায়াতের একজন নেতা বলেন, ১০ বছর ধরে বিএনপির চেয়েও বেশি চাপে রয়েছে জামায়াত। দলের কোনো নেতাকর্মীই বাড়িতে থাকতে পারেন না। পুলিশ ধরতে পারলেই নাশকতার গায়েবি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে চালান দেয় বলে অভিযোগ তার।

এ ব্যাপারে মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান অজ্ঞাত স্থান থেকে মোবাইল ফোনে বলেন, পুলিশের চাপের কারণে তারা স্বাভাবিকভাবে দলীয় কার্যক্রম চালাতে পারছেন না। তবে তাদের কর্মকাণ্ড থেমে নেই।

জোটের চিত্র : বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের পাঁচটি দলের অস্তিত্ব রয়েছে খুলনায়। সেগুলো হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী, বিজেপি, ইসলামী ঐক্যজোট, মুসলিম লীগ ও লেবার পার্টি। এ ছাড়া সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দুটি দলের অস্তিত্ব রয়েছে খুলনায়। সেগুলো হচ্ছে জাসদ (রব) ও নাগরিক ঐক্য। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ইস্যুতে বিএনপির সঙ্গে এখন জামায়াতের টানাপড়েন চলছে। 'পুলিশি ঝামেলা এড়াতে' স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা জামায়াত নেতাকর্মীদের এড়িয়ে চলেন। তা ছাড়া জোটগত রাজনীতিও নিষ্ফ্ক্রিয়। গত সংসদ নির্বাচনের পর খুলনায় জোটের কোনো সভা হয়নি।

তবে নগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু দাবি করেন, জামায়াতসহ জোটভুক্ত দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হয়। তারা আমাদের কর্মসূচিতে আসে, আমরাও যাই। খুলনায় দল বা জোটের মধ্যে কোনো দূরত্ব নেই।

মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান দাবি করেন, বিএনপিসহ জোটের অন্য কোনো শরিকের সঙ্গে কোনো সমস্যা নেই। সব দলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।


মন্তব্য


অন্যান্য