খুলনা

খুলনার শিল্পাঞ্চলজুড়ে হাহাকার

প্রকাশ : ১৩ মে ২০১৯ | আপডেট : ১৩ মে ২০১৯

খুলনার শিল্পাঞ্চলজুড়ে হাহাকার

খুলনার নতুন রাস্তা মোড়ে গাছের গুঁড়িতে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করেন পাটকল শ্রমিকরা- সমকাল

  খুলনা ব্যুরো

স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে মিলের কলোনিতে থাকেন প্লাটিনাম জুট মিলের শ্রমিক সিরাজুল ইসলাম। রোজার প্রথম দিন থেকে সেহরিতে তাদের ভাতের সঙ্গে জোটে শুধু আলুভর্তা কিংবা ডাল। আর তিনি সন্ধ্যায় ইফতারি করেন অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে নতুন রাস্তা মোড়ে সড়ক অবরোধস্থলে। পরিবারের সদস্যরা ইফতার করেন শুধু চিড়া-চিনি দিয়ে। সিরাজুল ইসলাম জানালেন, ১২ সপ্তাহ মজুরি পাই না। এভাবে কতদিন চলবে?

ক্রিসেন্ট জুট মিলের শ্রমিক ইয়ার আলী স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে থাকেন দীঘলিয়া উপজেলার সেনহাটী গ্রামে। ১২ সপ্তাহ মজুরি না পাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এখন। তিনি বলেন, 'প্রথমদিকে দোকান থেকে বাকিতে চাল-ডাল কিনতাম। এখন দোকানিরা আর বাকিতে চাল-ডাল দিচ্ছেন না। গত কয়েকদিন প্রতিবেশীদের বাড়ি থেকে চাল-ডাল ধার করে রান্না করছে স্ত্রী। এক ছেলে ও এক মেয়ের লেখাপড়ার খরচ দিতে পারছি না।

শুধু এই দুই শ্রমিকই নন; খুলনা-যশোরের রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকলের প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক পরিবারে চলছে এমন দুর্দশা। খুলনার খালিশপুর ও আটরা এবং যশোরের রাজঘাট শিল্পাঞ্চলে দেখা দিয়েছে হাহাকার। ৯টি পাটকলের শ্রমিকদের ৮ থেকে ১২ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া রয়েছে। বকেয়া মজুরি প্রদানের দাবিতে গত ৫ মে থেকে শ্রমিকরা উৎপাদন বন্ধ রেখে ধর্মঘট পালন এবং প্রতিদিন খুলনার নতুন রাস্তা, আটরা শিল্প এলাকা এবং রাজঘাট এলাকায় খুলনা-যশোর মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করছেন।

সোমবার বিকেল ৪টায় ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, খালিশপুর, দৌলতপুর ও স্টার জুট মিলের শ্রমিকরা মিছিল সহকারে খুলনার নতুন রাস্তার মোড়ে জড়ো হন। এরপর সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন। শ্রমিকরা সড়কের ওপর আসর ও মাগরিবের নামাজ আদায় এবং ইফতার করেন। অন্য দুটি শিল্প এলাকায়ও একই কর্মসূচি পালিত হয়। অবরোধের কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হয় সড়ক ও রেলপথের যাত্রীদের।

শ্রমিকরা জানান, তারা নিজেরা চাঁদা তুলে এবং এলাকার দোকানিরা কিছু আর্থিক সহযোগিতা করছেন। সেই টাকায় তারা প্রতিদিন রাস্তার ওপর বসে ইফতার করছেন।

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সিবিএ-নন সিবিএ পরিষদের আহ্বায়ক মো. সোহরাব হোসেন সমকালকে বলেন, 'গত ১৫ এপ্রিল বিজেএমসিতে বৈঠকে ২৫ এপ্রিলের মধ্যে শ্রমিকদের সব বকেয়া টাকা পরিশোধের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। শ্রমিকরা সময়মতো মজুরি না পেয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। এ অবস্থায় বকেয়া সব টাকা একসঙ্গে প্রদান না করা পর্যন্ত এ আন্দোলন চালিয়ে যাব আমরা।'

বাংলাদেশ পাটকল শ্রমিক লীগের খুলনা-যশোর আঞ্চলিক কমিটির আহ্বায়ক মো. মুরাদ হোসেন বলেন, 'শ্রমিকরা পরিবারের সদস্যদের মুখে ভাত তুলে দিতে পারছে না। তারা এখন বাড়ি যেতেও সংকোচ বোধ করে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত পাটকলে ধর্মঘট চলবে।'

প্লাটিনাম জুট মিলের শ্রমিক মিজানুর রহমান ও হাবিবুর রহমান বলেন, রুজি-রুটির জন্য মিলে কাজ করি। সপ্তাহ শেষে মজুরি দিয়ে সংসার চালাতাম। কিন্তু নিয়মিত মজুরি না দেওয়ায় দোকান থেকে বাকিতে পণ্য নিয়ে চালাচ্ছিলাম। এখন অনেক টাকা বকেয়া পড়েছে। এভাবে চললে না খেয়ে মরতে হবে।'

বিজেএমসি সূত্রে জানা যায়, মিল চালু থাকলে ৯টি পাটকলে প্রতিদিন প্রায় ১০০ টন পাটজাত পণ্য উৎপাদন হতো। যার মূল্য প্রায় ১ কোটি টাকা। শ্রমিক ধর্মঘটের কারণে এ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

বিজেএমসির খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, খুলনার ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, স্টার, খালিশপুর, দৌলতপুর, ইস্টার্ন, আলিম এবং যশোরের জেজেআই ও কার্পেটিং জুট মিলে স্থায়ী শ্রমিক রয়েছেন ১৩ হাজার ১৭০ জন এবং বদলি শ্রমিক সংখ্যা ১৭ হাজার ৪১৩ জন। শ্রমিকদের ৯ থেকে ১২ সপ্তাহের মজুরি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৪ মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। তাদের পাওনার পরিমাণ প্রায় ৬০ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে বিজেএমসির খুলনা আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, 'আন্তর্জাতিক বাজারে পাটজাত পণ্যের চাহিদা কমে গেছে। সে কারণে সময়মতো পণ্য বিক্রি করতে না পারায় আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছে। মিলগুলো সময়মতো শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করতে পারছে না। সার্বিক বিষয়টি বিজেএমসির প্রধান কার্যালয়কে জানানো হয়েছে।'

ব্যবসায় স্থবিরতা: এদিকে পাটকলগুলোর শ্রমিকদের মজুরি বকেয়া থাকায় খালিশপুর শিল্পাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যে পড়েছে বিরূপ প্রভাব। বেচাকেনা নেমে গেছে অর্ধেকেরও নিচে।

খালিশপুর জুট মিল সংলগ্ন ফারুক স্টোরের মালিক আফতাব হোসেন সমকালকে বলেন, '১০ বছর ধরে এখানে ব্যবসা করছি। কখনও এত খারাপ পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি। মিল থেকে মজুরি না দেওয়ায় শ্রমিকরা বাজার-সদাই করছে না। খালিশপুরের অধিকাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেই এখন এ রকম অবস্থা।'

ক্রিসেন্ট জুট মিলের সামনের সড়কে অবস্থিত আবদুর রব স্টোরের মালিক মো. রবিউল ইসলাম বাবু বলেন, 'শ্রমিকরা নিয়মিত মজুরি না পাওয়ায় ব্যবসা বন্ধের উপক্রম। আগে যেখানে দৈনিক কয়েক হাজার টাকার মালামাল বিক্রি হতো, এখন সেখানে ৫০০ টাকাও হয় না। আগে রোজার সময়ে একজন কর্মচারী রাখতে হতো, আর এখন ক্রেতাশূন্য দোকানে আমি একাই থাকি।'

মন্তব্য


অন্যান্য