সাক্ষাৎকার

‘আসাম ইস্যুতে চুপ থাকার সুযোগ নেই’

প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯

‘আসাম ইস্যুতে চুপ থাকার সুযোগ নেই’

এম. হুমায়ুন কবির

  এম. হুমায়ুন কবির

সম্প্রতি ভারতের আসাম রাজ্যে চূড়ান্ত জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) প্রকাশ করা হয়েছে। ওই তালিকায় বাদ পড়েছেন ১৯ লাখ ৬ হাজার মানুষ। এ নিয়ে চলছে নানা বিতর্ক। সমালোচনা চলছে বাংলাদেশেও। আসামের এনআরসি প্রকাশ এবং বাংলাদেশের ওপর এর প্রভাব নিয়ে সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এম. হুমায়ুন কবির। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তাসলিমা তামান্না

সমকাল: এনআরসির চূড়ান্ত তালিকায় ১৯ লাখেরও বেশি মানুষ বাদ পড়েছেন। তাদের সবাইকে এখন প্রমাণ করতে হবে, তারা ভারতীয়। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

হুমায়ুন কবির: এটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ার একটা প্রকাশ। এখানে অনেক বিষয় আছে। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে যদি দেখা হয় তাহলে ভারতে কিন্তু প্রায় ৪০ বছর ধরে বেআইনি অভিবাসী নিয়ে এক ধরনের রাজনীতি চলছে। ভারতের সব রাজনৈতিক দল বিশেষ করে আসাম, পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশ সংলগ্ন অন্যান্য অঞ্চলের অভিযোগ হলো, বাংলাদেশ থেকে অনেক অভিবাসী গিয়ে বেআইনিভাবে ভারতে থাকেন। যদিও এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ বেশ স্পষ্টভাবেই বলে আসছে, কোনো বাংলাদেশি বেআইনিভাবে ভারতে বসবাস করে না। বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে আসামে এনআরসি প্রকাশ, তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিরই একটা অনুষঙ্গ।

তবে এনআরসির তালিকা প্রকাশ রাজনৈতিক ধারাবাহিকতারই একটা অংশ। এটা এখন একটা আইনি প্রক্রিয়ায় রূপ নিয়েছে। প্রক্রিয়াটি ১৯৮৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকার, আসাম সরকার, সর্ব আসাম ছাত্র ইউনিয়ন ও সর্ব আসাম গণসংগ্রাম পরিষদের মধ্যে ‘আসাম চুক্তি’র মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল। ওই চুক্তিতে এআরসির কথা উল্লেখ ছিল। তারপর ভারতে অনেক সরকার বদল হয়েছে। কিন্তু এটা নিয়ে বেশি দূর এগোয়নি কেউ।

অতি সম্প্রতি বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরে অনুকূল রাজনৈতিক সহায়তা নিয়ে একটা বেসরকারি গ্রুপ সুপ্রিম কোর্টে এনআরসির আবেদন করে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারের সমর্থনে প্রশাসনই এটা করেছে। প্রায় দুই বছর ধরে থেমে থেমে এগিয়ে বিষয়টি এখন একটা অবস্থায় পৌঁছেছে। চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রায় ১৯ লাখ ৬ হাজার মানুষ তালিকাভুক্ত হতে পারেননি।

যেহেতু এটা আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এসেছে এবং প্রক্রিয়াটি আইনি ভিত্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছে- এ জন্য এটাকে আইনি কাঠামোগত দিক হিসেবে দেখা যেতে পারে। আরেকটা হচ্ছে সামাজিক বিষয়। যারা এনআরসির বাইরে আছে তাদের মধ্যে প্রচণ্ডভাবে একটা সামাজিক চাপ তৈরি হবে। যেমন- ১৯৮২ সালে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের নাগরিক তালিকা থেকে বাদ দেয়। পরে বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে তাদের অধিকার হরণ করতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত দমন-পীড়নের মাধ্যমে তাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

ভারতের অনেকে মনে করেন, এনআরসি থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিরা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য চেষ্টা করতে পারেন। সেই পদ্ধতি ইতিমধ্যে জানিয়েও দেওয়া হয়েছে। আবার অনেকে আশঙ্কা করেন, সবাই হয়তো সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে যেতে নাও পারেন বা সফল নাও হতে পারেন। কারণ যারা এই তালিকার বাইরে পড়েছেন তারা বেশিরভাই কিন্তু নিম্ন আয়ের, কম শিক্ষিত মানুষ, যাদের সুযোগ-সুবিধা কম। যেসব আইনি প্রক্রিয়া অর্থাৎ ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল, হাইকোর্ট কিংবা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত তাদের যেতে হবে- সেগুলো দীর্ঘসূত্রতার ও ব্যয়বহুল বিষয়। সে ক্ষেত্রে আর্থিকভাবে দুর্বল, কম শিক্ষিত, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষগুলো এই আইনি প্রক্রিয়ার সদ্ব্যবহার করতে পারবেন কি-না সেটা নিয়েই অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন। 

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য বলেছে, তালিকায় বাদ পড়ারা ভারতের নাগরিকত্ব হারাচ্ছেন- বিষয়টা তা না। সামগ্রিক বিবেচনায় বলা যায়, এনআরসি নিয়ে সামাজিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক পর্যায়ে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। 

সমকাল: অসমীয়া ও বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই আসামে একটা দ্বন্দ্ব চলছে। অন্যদিকে ধর্ম নিয়েও আছে অস্থিরতা। এনআরসি প্রকাশের ক্ষেত্রে বিজেপি সরকারের কী ধরনের রাজনীতি কাজ করছে বলে আপনি মনে করেন?

হুমায়ুন কবির: এখানে দুটি বিষয়ই কাজ করে। বিজেপি সর্বভারতে কাজ করার সময় যে রাজ্যের জন্য যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা ধরে তার সঙ্গে তাদের ধর্মীয় কর্মসূচি মিলিয়ে দেয়। এটাই তাদের কৌশল। সেই হিসেবে এখানে গোষ্ঠীভিত্তিক আসামি ও অ-আসামি বিষয়টাই প্রধান। গোষ্ঠীভিত্তিক অংশ অনেক শক্তিশালী হওয়ায় ১৯ লাখের মধ্যে প্রায় ১১ লাখ বাংলা ভাষাভাষী হিন্দু রয়েছে। বাকিদের কিছু রয়েছে মুসলমান ভাষাভাষী। এর সঙ্গে অবশ্য ধর্মীয় বিষয়টাও আছে। বিজেপির লোকেজনই এটা মানতে পারছে না। কেউ কেউ বলছে, হিন্দুরা হিন্দুস্তানে থাকবে না এটা হয় নাকি? এটা পরিবর্তন করতে হবে। 

এখানে জাতিতত্ত্ব যেমন একটা ব্যাপার, তেমনি ধর্মও একটা ব্যাপার। দুটি একসঙ্গে করে এই জিনিসটা তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে আসামের এই ফল বিজেপি যেভাবে আশা করেছিল সেভাবে আসেনি। আসামের অর্থমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা জানিয়েছেন, তারা এনআরসিতে সন্তুষ্ট নন। সামনে এটা নিয়ে কি করা যায় তারা চিন্তাভাবনা করছেন। তাতে হিন্দুরা যাতে বাদ না পড়ে সেটা নিশ্চিত করার জন্য তারা চেষ্টা করবেন।

সমকাল: আসামের অর্থমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এনআরসিতে বাদ পড়াদের মধ্যে ১৪-১৫ লাখ মানুষকে ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানিয়েছেন। এদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার, এতে বাংলাদেশের ওপর প্রভাব পড়বে না। আপনার বক্তব্য কী?

হুমায়ুন কবির: এটা আমরা দুই ভাবে দেখতে পারি। স্বল্প মেয়াদে যদি দেখা হয় তাহলে মন্ত্রী মহোদয়ের কথা অনুযায়ী বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে দীর্ঘমেয়াদে যদি দেখা হয়, তাহলে বিষয়টার আরেকটু ভেতরে গিয়ে দেখতে হবে। এখানে কয়েকটা বিষয় আছে। এনআরসি তালিকার বাইরে থাকা ব্যক্তিরা সমাজে বাস করে। সমাজ থেকে যখন ওদের ওপর নেতিবাচক চাপ আসতে থাকবে তখন সরকারের বলার দরকার নেই, নিজের জীবন, জানমাল বাঁচাতে নিরাপত্তার জন্য, তারা ব্যক্তিগতভাবেই সিদ্ধান্ত নেবে। সেই ক্ষেত্রে তারা যদি বাংলাদেশে হাজির হয় তাহলে ভারত সরকার বলতে পারে তারা ওদেরকে পাঠায়নি। সে ক্ষেত্রে নীতিগত অবস্থান ও বাস্তব অবস্থানের মধ্যে একটা ফারাক তৈরি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে আমাদের এটা মাথায় রাখতে হবে।

দ্বিতীয় হচ্ছে আইনি প্রক্রিয়া। এই আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে কতদিনে সেটা কি ফল দেবে কেউ জানে না। সত্যি সত্যি যদি কেউ আইনের বাইরে পড়ে যায় তখন তারা কি করবে সেটাও আমাদের জানা নেই। ভারত সরকারও হয়তো সেটা জানে না। এ ধরনের একটা ভবিষ্যতের চিন্তা আমাদের মাথায় রাখতে হবে।

সমকাল: সরকার হয়তো সঙ্গতকারণেই আসাম ইস্যুতে চুপ আছে। কিন্তু ডান ও বাম দলগুলো চুপ করে থাকার কারণ কী বলে মনে করেন?  

হুমায়ুন কবির: বাম ও ডান দল ব্যাপারটা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ওখানে কি হচ্ছে এটা নিয়ে সব পর্যায়ের মানুষ এখনও অবহিত নয়। এ ছাড়া জাতি হিসেবে আমরা খানিকটা আত্মমুখী। ফলে বাইরের পৃথিবীতে কী ঘটছে তা নিয়ে আমাদের সচেতনতা কম। রোহিঙ্গারা আসার আগে এসব ব্যাপারে আমাদের এত আগ্রহও ছিল না।

ভারতে কিন্তু তথাকথিত অনুপ্রবেশ নিয়ে তিন দশক ধরে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন, বিক্ষোভ, সংঘাত হয়েছে। আবার শান্তিপূর্ণ পরিবেশও ফেরত এসেছে। উত্তাল এই অবস্থাটা নিয়ে অনেকদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে নাড়াচাড়া হচ্ছে। সে হিসেবে বাংলাদেশ বিষয়টা নিয়ে অত অবহিত বা তৎপরও নয়। এ কারণে কেউ বুঝতে পারছে না এটার ফলাফল কী হতে পারে। 

সমকাল: মিয়ানমারে যখন রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব হরণ করে তখন এটি অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলে বাংলাদেশ কোনো কথা বলেনি। কিন্তু সমস্যাটি বাংলাদেশের কাঁধে চেপে বসেছে… সে ক্ষেত্রে আসামের এনআরসি ঘোষণা ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যা মনে করে বাংলাদেশের নির্লিপ্ত থাকা কতটা যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করেন?

হুমায়ুন কবির: গত দুই বছরে রোহিঙ্গাদের অভিজ্ঞতা কিন্তু আমাদের সজাগ করেছে। সেই সজাগ জায়গায় আমরা যেন আবার ঘুমিয়ে না যাই- এটা খেয়াল রাখতে হবে। ভারত বা মিয়ানমারে এক ধরনের উগ্র জাতীয়তাবাদী চিন্তাভাবনার উদ্ভব হচ্ছে, প্রসার হচ্ছে। এ কারণে এ ধরনের ঘটনা যখন ঘটে তখন ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ফলাফল বা  নীতিমালার ওপর বেশি ভরসা করা যায় না। অনেক সময় পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যখন প্রত্যাশার সঙ্গে ফলাফল মেলে না। সেই ধরনের পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে আশপাশের ঘটনাগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে।

আবেগতাড়িত না হয়ে বিষয়টাকে বাস্তবসম্মতভাবে বিচার বিশ্লেষণ করতে হবে। সম্ভব হলে কূটনৈতিকভাবে বিষয়গুলো নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। প্রয়োজনে নাগরিক সমাজকেও কিছুটা সরব হতে হবে, যাতে রোহিঙ্গাদের মতো কোনো পরিস্থিতি আমাদের ঘাড়ে এসে না পড়ে। 

সমকাল: এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের করণীয় কী বলে আপনি মনে করেন?

হুমায়ুন কবির: মনে রাখতে হবে, আমাদের জায়গা কম। এরকম একটা জনগোষ্ঠী যদি আমাদের ঘাড়ে এসে পড়ে তাহলে সেটা কী বিড়ম্বনার বিষয় হয় সেটা আমরা রোহিঙ্গাদের দিয়েই বুঝেছি। প্রতিবেশী দেশে যদি কোনো ধরনের সংঘাত বা অস্থিরতা দেখা দেয় সেটা যে কোনো বিচারে আমাদের জন্য চিন্তার কারণ হবে। বাস্তব অবস্থার বিবেচনায় যেটুকু উদ্যোগ নেওয়া দরকার সেটুকু উদ্যোগ নিতে হবে। সেটা কূটনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, নাগরিক- যে পর্যায়ে হোক না কেন, যেখানে যেটার প্রয়োজন সেভাবে সেটা কাজে লাগাতে হবে। ভাবাবেগ বা ধর্মীয় মূল্যবোধ নয়, বাস্তব অর্থে যেটা সমস্যা তার বাস্তবভিত্তিক সমাধানের জন্য যেটুকু উদ্যোগী ও সচেতন হওয়া দরকার সেটা আমাদের হতে হবে। 

কারণ রোহিঙ্গা ঘটনা থেকে এটা অন্তত পরিষ্কার হয়েছে, আমাদের চুপ করে থাকার সুযোগ নেই। কারণ আরও কয়েক লাখ লোক এলে সামাল দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই।

মন্তব্য


অন্যান্য