সাক্ষাৎকার

'আমরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে ব্যবসা করতে আসিনি'

প্রকাশ : ১৯ জুন ২০১৯ | আপডেট : ১৯ জুন ২০১৯

'আমরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে ব্যবসা করতে আসিনি'

অধ্যাপক ভিনসেন্ট চ্যাং

  অনলাইন ডেস্ক

অধ্যাপক ভিনসেন্ট চ্যাং এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন স্তরে কাজ করছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে তিনি বাংলাদেশের বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে যোগ দেন। ঢাকায় আসার আগে তিনি চীনের শেনজেনে ‘দ্য চায়নিজ ইউনিভার্সিটি অব হংকং’য়ে প্রাকটিসেজ অব ম্যানেজমেন্ট ইকোনমিকস বিভাগে অধ্যাপক এবং ইনস্টিটিউশনাল ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান ছিলেন। তার আগে তিনি ওমানের মাসকটে ‘ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস টেকনোলজি’তে প্রতিষ্ঠাকালীন প্রেসিডেন্ট এবং পরিকল্পনা পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। অধ্যাপক চ্যাং যুক্তরাষ্ট্রের ‘ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি’ (এমআইটি) থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া’ থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কম্পিউটার সায়ন্সে আরেকটি পিএইচডি সম্পন্ন করেন। বাংলাদেশে তার অভিজ্ঞতা, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ভাবনা এবং উচ্চশিক্ষার নানা বিষয়ে সম্প্রতি কথা হয় তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তাসলিমা তামান্না

সমকাল: মাসেক তিনেক হলো ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছেন। বাংলাদেশ কেমন দেখছেন?

ভিনসেন্ট চ্যাং: যানজট আর শব্দ ও বায়ু দূষণ ছাড়া বাংলাদেশে সব কিছুই আমার ভালো মনে হয়েছে। যদি কাঠামোগতভাবে ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’ ক্যাটাগরি করা হয় তাহলে বলবো— অন্য শহরের তুলনায় ঢাকা ‘সি’ ক্যাটাগরির। এছাড়া যাতায়াত ব্যবস্থা এবং বায়ু ও শব্দ দূষণের দিক দিয়েও ঢাকা ‘সি’ ক্যাটাগরির।

শহরের এই অবকাঠামোর মধ্যে ব্র্যাক বিশ্বদ্যিালয়ের অবকাঠামো বেশ আকর্ষণীয়। বলছি না, এটি শহরের সেরা স্থানে রয়েছে। হয়তো নান্দনিক সৌন্দর্যেও পিছিয়ে। তবে অন্যান্য স্থানের তুলনায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নত। ভালো যেটা তা হলো, এদেশের মানুষ। তারা নিজেদের এবং দেশের অবস্থা পরিবর্তন করতে চায়। মার্কিন সংস্কৃতিতেও এই ব্যাপারটি কাজ করে।

সমকাল: ঢাকা ছাড়া বাংলাদেশের অন্য কোথাও কি গেছেন?

ভিনসেন্ট চ্যাং:  ঢাকার বাইরে এখন পর্যন্ত শুধু কক্সবাজার রোহিঙ্গা শিবিরে যাওয়া হয়েছে। তবে বাংলাদেশ মানে তো শুধু ঢাকা আর কক্সবাজারে সীমাবদ্ধ নয়, ঘুরে দেখার মতো নিশ্চয়ই অনেক জায়গা রয়েছে। সেসব জায়গায় এখনও যাওয়া হয়নি। ইচ্ছা রয়েছে যাওয়ার।

সমকাল: ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আপনার তো অনেক পরিকল্পনা রয়েছে… 

ভিনসেন্ট চ্যাং: হ্যাঁ, আমি এখানে নতুন কিছু যোগ করতে চাই। এজন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিতে হবে। আর সে লক্ষ্যেই কাজ শুরু করেছি। যেমন, এখানে ‘ভাইস প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক’ নামে একটি পদ সৃষ্টি করতে যাচ্ছি, যা হবে উপ-উপাচার্য পদের সমমানের। তার কাজ হবে বিশ্বের বিভিন্ন নামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংযোগ তৈরি করা। এছাড়া বিভিন্ন দেশের অধ্যাপকদের আমরা এখানে নিয়ে আসবো। বিদেশি শিক্ষার্থীও ভর্তি করা হবে। আর ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যাবে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ ব্যাপারে বিনিময় প্রোগাম চালু হবে।

সমকাল: দেশের প্রথম সারির বেরসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ব্র্যাকও রয়েছে। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন?

ভিনসেন্ট চ্যাং: এটি অবশ্যই ভালো লাগার ব্যাপার। কিন্তু এ নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতে চাই না। কারণ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশে সেরা হতে পারে, গোটা বিশ্বে নয়। বৈশ্বিক মানদণ্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার আসলে বিরাট পার্থক্য রয়েছে।

সমকাল: এই মান উন্নত করার উপায় কী তাহলে?

ভিনসেন্ট চ্যাং: খুবই সহজ। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিতে হবে। জায়গা করতে হবে বিশ্ব মানচিত্রে।

আন্তর্জাতিক পর্যায় বলতে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কথাই বলতে চেয়েছি। আমরা নিজেদের মধ্যে তুলনা করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়কে ভালো বলছি। কিন্তু যখন বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে তুলনা করি তখন বিশাল পার্থক্য দেখা যায়। তাই বিশ্বের সেরাদের তালিকায় গণ্য হতে চাই।

সমকাল: এক্ষেত্রে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে বলে মনে করেন?

ভিনসেন্ট চ্যাং: কিছু চ্যালেঞ্জ তো রয়েছেই। কেননা উচ্চশিক্ষা একটি বৈশ্বিক বিষয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতে বিশ্বের সেরা রিসোর্স পারসনরা আসতে পারেন সেজন্য প্রথমে এখানে পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ধারাবাহিকভাবে এখানে ভালো কিছু বিভাগ চালু হবে। লোকজন নিয়োগেরও চিন্তা করছি, যাতে বিদেশি শিক্ষার্থীরা আসতে আগ্রহ প্রকাশ করে। যত বেশি বিদেশি শিক্ষার্থী আসবে দেশি শিক্ষার্থীরা তত বেশি বিশ্ব সম্পর্কে জানতে পারবে। আমাদের শিক্ষার্থীদের জানার পরিধিটা বাড়ানো প্রয়োজন।

সমকাল: বাংলাদেশে বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্বদ্যিালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাস, ল্যাব ও প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই। আপনার মতামত কী?

ভিনসেন্ট চ্যাং: এখনও অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। তবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাস তৈরির কাজ চলছে। দুই বছরের মধ্যে ওই কাজ শেষ হবে বলে আশা করছি। 

সমকাল: অনেকেই বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ক্লাসরুম নির্ভর। আপনি কি একমত? 

ভিনসেন্ট চ্যাং: শিক্ষার্থীরা সমাজেরই একটা অংশ। কিছুদিন আগে ওরিয়েন্টশন ক্লাসে আমি শিক্ষার্থীদের বলেছি— গ্রাজুয়েশন শেষ করার আগে তাদেরকে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকে কিছুদিন কাটাতে হবে, যাতে তারা বাস্তব জীবন সম্পর্কে জানতে পারে। সবার জন্য এটা বাধ্যতামূলক করতে চাই। আমি জানি, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী সচ্ছল পরিবার থেকে এসেছে। বাস্তব জীবন সম্পর্কে তাদের ধারণা কম। এ বছরই প্রোগ্রামটা চালু করতে চাচ্ছি। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সমাজ সম্পর্কে জানতে পারবে।

সমকাল: বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা আন্তর্জাতিক মানের করতে কী করা প্রয়োজন?

ভিনসেন্ট চ্যাং: প্রথমত আইনি কাঠামো প্রয়োজন। যেমন ধরুন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অধীনে সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এখানে এমন অনেক নীতিমালা আছে যেগুলোর আধুনিকায়ন জরুরি। গোটা বিশ্ব পরিবর্তন হচ্ছে, তাই না? কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এখনও তা থেকে অনেক দূরে। আমি এখানে নতুন এসেছি। হয়তো সরকার বিষয়টা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করছে।

অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে যারা ব্যবসা করছে। আমরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে ব্যবসা করতে আসিনি। আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়কে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই। তাছাড়া আরেকটা ব্যাপার হলো যে, একটা বিশ্ববিদ্যালয় আরেকটি থেকে আলাদা। তাই সবাইকে এক কাঠিতে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে সবাই-ই কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া ভিসাসহ অন্যান্য নীতিমালাগুলোও প্রয়োজন মতো শিথিল করতে হবে, যাতে ভালো প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসতে পারে।

সমকাল: শিক্ষার্থীদের নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

ভিনসেন্ট চ্যাং: তারা ভালো মানুষ ও ভালো নাগরিক হিসেবে বেড়ে উঠুক। তাদেরকে সব পরীক্ষায় জিপিএ-৪ পেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। বরং তারা ভালো মানুষ হয়ে বেড়ে উঠুক। মানুষের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন হোক।

সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

ভিনসেন্ট চ্যাং: ধন্যবাদ।

মন্তব্য


অন্যান্য