সাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকার: মিজানুর রহমান

মানুষের জন্য কাজ করতে জনপ্রতিনিধি না হলেও চলে

প্রকাশ : ১১ মে ২০১৯ | আপডেট : ১১ মে ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষের জন্য কাজ করতে জনপ্রতিনিধি না হলেও চলে

  অমিতোষ পাল

সম্প্রতি ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালককে প্রতিষ্ঠানটির পানি দিয়ে শরবত বানিয়ে পান করাতে গিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছেন জুরাইনের বাসিন্দা মিজানুর রহমান। এমন সাহসী কাজ এটাই তার প্রথম নয়। এলাকাবাসীর সমস্যা যেখানে, সেখানেই দেখা মেলে তার। দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো কার্যক্রমের বিরুদ্ধে দানা বাঁধা আন্দোলনেও অংশ নেন তিনি। মানুষের জন্য কাজ করতে চাইলে জনপ্রতিনিধি না হলেও চলে বলে মনে করেন তিনি।

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে  মিজানুর রহমান গ্রেফতারও হয়েছেন একাধিকবার। প্রতিবাদমূলক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার একপর্যায়ে পুলিশের জলকামানের ওপরে উঠে প্রতিবাদ জানিয়ে এর আগে ব্যাপকভাবে আলোচিত হন তিনি। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমেও বিভিন্ন সময় স্থান পেয়েছে তার এসব খবর। সুইডেনের পত্রিকা রিপাবলিক থেকে তিনি পেয়েছেন পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে গেরিলা যোদ্ধার স্বীকৃতি।

গতকাল বৃহস্পতিবার দীর্ঘক্ষণ কথা হয় এ প্রতিবেদকের সঙ্গে। তার আগে ফোনে যোগাযোগ করতেই মিজানুর রহমান জানান, বাবার রেখে যাওয়া সঞ্চয় থেকে মাসে কিছু অর্থ পান। সেই টাকা তুলতে মতিঝিল যাবেন। জীবন বীমা ভবনের নিচতলায় রিসিপশনে বসে কথা বলার আশ্বাস দেন। সেখানে আলাপের শুরুতেই বলেন, মা ও শ্বশুরের বাড়ি ভাড়ার আয় দিয়ে চলে তার সংসার। ব্যবসা-বাণিজ্য কিছু করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সব জায়গায় অসফল হয়েছেন। স্টেশনারি দোকান, ফটোস্ট্যাট, মোবাইল ফোন কোম্পানির এজেন্ট- বিভিন্ন সময় এরকম উদ্যোগ নিলেও তিনি কোথাও সফলতা পাননি। পরে দোকান ভাড়া দিয়ে দেন। একপর্যায়ে রেন্ট-এ-কারের গাড়িও চালান। তবে সেখানেও সুবিধা করতে পারেননি।

মিজানুর রহমান জানান, সিনেমা-নাটক নির্মাণ নিয়ে খানিকটা পড়াশোনাও করেছেন। কাজ করেছেন বিটিভিতেও। তবে চাকরি-বাকরি ও ব্যবসা তাকে টানে না। বরং ভালো লাগে সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে আন্দোলন করতে। গত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনে তাকে এলাকাবাসী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর পদে দাঁড় করিয়েছিল। তিনি শর্ত দিয়েছিলেন, নির্বাচন করলেও কোনো টাকা-পয়সা খরচ করতে পারবেন না। এলাকার লোকজন সাড়ে তিন লাখ টাকা চাঁদা তুলে নির্বাচনে খরচ করেছিল। 'ফিল্ড'ও ভালো ছিল। কিন্তু দুপুরের পরপরই নির্বাচনের পরিবেশ খারাপ করে ফেলে সরকার সমর্থক কিছু বখাটে। এ জন্য নির্বাচনে আর জেতা হয়নি। অবশ্য মিজানুর রহমান মনে করেন, মানুষের জন্য কিছু করতে চাইলে জনপ্রতিনিধি হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এ ক্ষেত্রে আন্তরিকতাই বড়।

মাদারীপুরের রাজৈর থানার মুজরাইলকান্দি গ্রামে পৈতৃক বাড়ি হলেও মিজানুর রহমানের জন্ম ঢাকার জুরাইনে। পারিবারিকভাবে সবাই আওয়ামী লীগের অনুসারী। কলেজজীবনে ছাত্রলীগে যুক্ত হন তিনি। অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) ৮৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ডিসিসি নির্বাচনে দিনরাত কাজ করেছেন মোহাম্মদ হানিফকে জয়ী করতে। ১৯৯৩ সালের দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির জন্য গড়ে ওঠা আন্দোলনেও মাঠে ছিলেন তিনি। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন প্রতিহত করার জন্য জুরাইন এলাকার আওয়ামী লীগের নেতাদের নিয়ে গঠিত ১০ সদস্যের কমিটির সদস্যও ছিলেন মিজানুর রহমান। ১৯৯৭ সালের দিকে বিদ্যুতের প্রচণ্ড সংকট দেখা দিলে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও করেন। কিন্তু তখন সরকারি দলের গুণ্ডাপাণ্ডারাই তাদের ওপর হামলা চালিয়ে আহত করে। স্থানীয় এমপির কাছে বিচার চেয়েও পাননি তিনি। সেই থেকে মিজানুর রহমান রাজনীতির প্রতি বিমুখ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, এমপি সাহেব নির্বাচনের আগে যেমন ছিলেন, ভোটে জয়ী হওয়ার পর তার সঙ্গে তাকে মেলাতে পারছিলাম না।

মিজানুর রহমান বলেন, '২০১৭ সালে ২৬ জানুয়ারি সুন্দরবন রক্ষায় রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের দাবিতে সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি হরতাল ডাকে। তাদের ওপর আক্রমণের খবর শুনে চলে যাই শাহবাগে। পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর টিয়ার শেল নিক্ষেপ করতে থাকে। প্রতিবাদ করতে গিয়ে পুলিশের জলকামানের সামনে বন্ধু মাহতাব দাঁড়িয়ে যায়। পুলিশ বুট দিয়ে আঘাত করতে করতে তাকে ব্যাপকভাবে মারধর করে। তা আর সহ্য করতে পারিনি। লাফিয়ে জলকামানের ওপরে উঠে পড়ি। উঠতে না উঠতেই পুলিশ পা ধরে টানাটানি শুরু করে। নিচে নামিয়েই শুরু করে লাঠিপেটা ও বুটের লাথি। সেখানই জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফিরলে নিজেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বেডে দেখতে পাই। তবে পুলিশ সেই গভীর রাতেই ছেড়ে দেয়। ওই বছরের ৫ অক্টোবর সুইডেনের পত্রিকা রিপাবলিকে পরিবেশ রক্ষায় গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে বিশ্বের পাঁচ পরিবেশ আন্দোলনকারীর মধ্যে আমার নামটাও প্রকাশ করে।'

তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটির আন্দোলনে সব সময়ই থাকেন মিজানুর রহমান। ফুলবাড়ীসহ বিভিন্ন লংমার্চেও যোগ দিয়েছেন। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিলের দাবিতেও আন্দোলনে থেকেছেন। এসব কারণে তাকে হামলা-মামলার শিকার হতে হয়েছে। তবে কোনো মামলাই ধোপে টেকেনি। মিজানুর রহমান বলেন, 'জুরাইন এলাকায় কয়েকজন নারী মাদক ব্যবসা করত। গেলাম প্রতিবাদ করতে। উল্টো সেই মহিলারা আমার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা ঠুকে দিল। বললাম, মামলা দাও, লড়ব। একপর্যায়ে দেখি তারাই মামলাটা তুলে নিল।'

জুরাইনে এখন পানি সংকট আরও বেড়েছে বলে জানান মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, প্রধান সড়ক ছাড়া অলিগলিতে পানি পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও পানের অযোগ্য। শরবত পান করানোর ঘটনার পর ওয়াসার কিছু লোকজন তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। স্পেশাল ব্রাঞ্চের একজন ফোন দিয়ে তার সম্পর্কে জানতে চায়। তাকে সব খুলে বলেন তিনি। কর্মকর্তা জানান, ঠিক আছে, সঠিক কাজই করেছেন। জুরাইনের ঘটনার পর তার শ্বশুরবাড়ি ও মায়ের বাড়ির আশপাশে অচেনা লোকের যাতায়াত বেড়েছে।

১৯৭৪ সালে জন্ম নেওয়া মিজানুর রহমান ভালোবেসে বিয়ে করেছেন জুরাইনের শামিম হাসেম খুকিকে। তিন মেয়ের মধ্যে প্রথম যমজ দুই মেয়ে বর্তমানে বদরুন্নেসা কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী। ছোট মেয়ের স্কুলে ভর্তির বয়স হয়নি। মিজানুর রহমান বলেন, আশির দশক থেকে আন্দোলন করছি। প্রভাবশালী একজন তাদের বাড়ির একাংশ দখল করে ফেলেছিল। তখনই প্রতিবাদ করেন তিনি। ১৯৮৮ সালের বন্যায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) বাঁধে ব্যাপক বন্যা হলো। মূল বাঁধের ওপর বালুর বাঁধ দেওয়ার কাজে নেমে পড়লাম। এলাকার মাদক, আবর্জনা, সন্ত্রাসসহ যে কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করি। স্কুল-কলেজের দেয়ালে লিখেও প্রতিবাদ জানাই। বিভিন্ন উৎসব-পার্বণে বইমেলা, রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করি। এসব কাজে এলাকার মানুষ সঙ্গে আছে। এবার নিরাপদ পানির জন্য আন্দোলন শুরু করেছেন তারা, যা সফল না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরবেন না। তিনি মনে করেন, ঢাকা ওয়াসার এমডি যে কথা বলেছেন, সে জন্য তার ক্ষমা চাওয়া উচিত এবং পদত্যাগ করা উচিত।

মন্তব্য


অন্যান্য