সাক্ষাৎকার

বিশেষ সাক্ষাৎকার: ডা. রশিদ-ই মাহবুব

স্বাস্থ্য খাতকে জনমুখী করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে

প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০১৯ | আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাস্থ্য খাতকে জনমুখী করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে

  রাজবংশী রায়

স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন সূচকে গত কয়েক বছর বাংলাদেশ বেশ উন্নতি করলেও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এখনও পুরোপুরি জনমুখী করা যায়নি বলে মনে করেন চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব। তার মতে, স্বাস্থ্যসেবা পেতে সাধারণ মানুষ পদে পদে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন; কিন্তু তা দূর করতে সরকারের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ভোগান্তি কমিয়ে স্বাস্থ্য খাতকে জনমুখী করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। সমকালের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে বিএমএর সাবেক সভাপতি ডা. রশিদ-ই মাহবুব এসব কথা বলেন।

প্রতিটি বিভাগীয় শহরে ক্যান্সার ও কিডনি হাসপাতাল এবং জেলা সদর হাসপাতালে কিডনি ইউনিট প্রতিষ্ঠা-সংক্রান্ত আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের বাস্তবায়ন চান এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, সরকারকে এখন এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে হলে ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, সিওপিডিসহ অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনের তুলনায় সরকারি বরাদ্দের অপ্রতুলতা সুচিকিৎসার নিশ্চিত করার পথে প্রধান অন্তরায় উল্লেখ করে বিএমএর সাবেক সভাপতি বলেন, পাবলিক খাতের সেবার চাহিদা জনগণের মধ্যে বেশি। কিন্তু এখানে বাজেটের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। সরকারি বরাদ্দ এবং ব্যয় হওয়া অর্থ- এ দুটির হিসাব করলে দেখা যায়, ৬৭ শতাংশ অর্থ মানুষ তার নিজের পকেট থেকে ব্যয় করে। বিষয়টি সরকারকে দেখতে হবে। সরকারকে বিনিয়োগ বাড়ানো কিংবা ভর্তুকি দেওয়ার চিন্তাভাবনা করতে হবে।

সরকারি ও বেসরকারি কোনো স্বাস্থ্য খাতই জনবান্ধব নয় উল্লেখ করে রশিদ-ই মাহবুব বলেন, সরকারি খাতে যে অবকাঠামো আছে, তা যথেষ্ট নয়। সরকারি হাসপাতালে ৪২ হাজার এবং বেসরকারি খাতে সমসংখ্যক শয্যা ধরা হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। সরকারি হাসপাতালগুলো বেশিরভাগই ভবনসর্বস্ব। কোনো জায়গায় ভবন নেই, আবার কোনো কোনো জায়গায় পর্যাপ্ত জনবল নেই। কিছু কিছু জায়গায় রোগীদের অতিরিক্ত ভিড়ে সেবাদান প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হচ্ছে। আবার বেসরকারি খাতে যতটুকু সেবা আছে, তা অত্যন্ত উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে। বিত্তবান ব্যক্তিরাই মূলত ব্যয়বহুল এ সেবা নিতে পারেন। তা ছাড়া বেসরকারি খাত জনবান্ধব নয়। পাঁচতারা মানের হাসপাতালগুলোতে কিছু ব্যবসা হয়। কিন্তু দেশের আনাচে-কানাচে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যে হাসপাতাল-ক্লিনিক গড়ে উঠেছে সেগুলোর ওপর কোনো মনিটরিং নেই। অবৈধ পন্থায় এগুলো বছরের পর বছর ধরে চলছে। এসব হাসপাতালে মানুষ সুচিকিৎসা পায় না।

সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে কী কী বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন- এমন প্রশ্নের জবাবে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, এ জন্য চাহিদা অনুযায়ী হাসপাতালে শয্যাসংখ্যা থাকতে হবে। প্রয়োজনীয় ওষুধের পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, প্যারামেডিকস, টেকনিশিয়ানসহ প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামো থাকতে হবে। এর কোনো একটির ঘাটতি হলে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অথচ পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে- প্রায় সব উপাদানেই কম-বেশি ঘাটতি রয়েছে।

দেশের জরুরি চিকিৎসার মান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ডা. রশিদ-ই মাহবুব। বলেন, কোনো মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি কোথায় চিকিৎসা নেবেন, তা জানেন না। সরকারি-বেসরকারি যত হাসপাতাল আছে, সেগুলোতে জরুরি চিকিৎসাসেবা এখনও তেমন শক্তিশালীভাবে গড়ে ওঠেনি। জরুরি বিভাগগুলোতে কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। থাকলে অনেক মানুষের জীবন রক্ষা পেত।

সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি নিয়েও কথা বলেন রশিদ-ই মাহবুব। তিনি বলেন, সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি নামে সরকারের চলমান প্রকল্পটি এখনও কোনো দৃশ্যমান ফ্রেমে আসেনি। টাঙ্গাইলের তিনটি উপজেলায় একটি পাইলট প্রকল্প চালু করা হয়েছে। ওই প্রকল্পের সর্বশেষ কী অবস্থা, সে সম্পর্কে কেউ জানেন না। সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা দেওয়ার জন্য যে অবকাঠামো ও জনবল প্রয়োজন তা দেওয়া হয়নি। সরকারি অর্থে ওই প্রকল্প চলছে। তার মানে, সরকারি টাকায় সরকারি প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সেবাগ্রহণের জন্য ভিড় বাড়তে পারে, কিন্তু তাতে তো সেবার পরিধি বাড়ছে না।

চিকিৎসা শিক্ষার মান সম্পর্কে জানতে চাইলে রশিদ-ই মাহবুব বলেন, বর্তমান চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নতুন নতুন সরকারি মেডিকেল কলেজ গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু এসব কলেজে পাঠদানের শিক্ষকের সংকট রয়েছে। বিশেষ করে বেসিক বিষয়গুলো পড়ানোর মতো শিক্ষক নেই। এর পরও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় অনেক মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একদিকে শিক্ষক নেই, অন্যদিকে মেডিকেল কলেজের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। এতে মেডিকেল শিক্ষার মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিষয়টি এমন যে, চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থায় শুধু বই পড়ে জ্ঞানার্জন করানো হয়। কিন্তু বাস্তব প্রায়োগিক জ্ঞানার্জনের তেমন ব্যবস্থা নেই। প্রায়োগিক দক্ষতা ছাড়া শুধু জ্ঞানার্জন করে চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব নয়। এসব চিকিৎসকরা ডিগ্রি সম্পন্ন করে চিকিৎসাসেবায় কতটুকু অবদান রাখতে পারবেন, সে বিষয়ে সংশয় রয়েছে। আবার যতজন চিকিৎসক ডিগ্রি নিয়ে প্রতিবছর বের হচ্ছেন, সেই সংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে টেকনিশিয়ান, প্যারামেডিক্স, নার্সসহ চিকিৎসাসেবার সহযোগী পর্যায়গুলো পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ চিকিৎসাসেবা একটি দলগত বিষয়। তাই চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত সব আনুষঙ্গিক বিষয়ের সমন্বয় করতে হবে।

মেডিকেল কলেজের শিক্ষক বিশেষ করে মৌলিক বিষয়ের শিক্ষকদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কিংবা প্রশাসনিক দায়িত্বে পদায়নের বিষয়টি কতটুকু যুক্তিযুক্ত- এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. রশিদ-ই মাহবুব জানান, এটিকে তিনি সমর্থন করেন না। একদিকে মেডিকেল কলেজে শিক্ষক সংকট, অন্যদিকে শিক্ষকদের ডিজি, এডিজিসহ পরিচালকের বিভিন্ন পদে পদায়ন করা হয়েছে। এটি সরকারের দ্বিমুখী নীতি। এটি হতে পারে না। মাঠ পর্যায়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কর্মকর্তা, সিভিল সার্জন, সহকারী পরিচালক ও উপপরিচালক পদে যারা দায়িত্ব পালন করেন, তাদেরই প্রশাসনিক এসব দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া উচিত। তারা স্বাস্থ্য প্রশাসনে কাজ করবেন। অন্যদিকে, শিক্ষকরা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসক তৈরির কাজে নিয়োজিত থাকবেন। এমনই হওয়ার কথা।

গ্রামের কর্মস্থলে চিকিৎসকরা থাকতে চান না- এটি বেশ পুরনো অভিযোগ। চিকিৎসকরা কেন গ্রামে থাকতে চান না? কীভাবে গ্রামে চিকিৎসকদের ধরে রাখা যায়?- এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. রশিদ-ই মাহবুব বলেন, অন্য চাকরিজীবীরা গ্রামে গেলেও চিকিৎসকরা যেতে চান না। কিন্তু কেন চান না, সেটির তো নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। সরকার কি কখনও এটি জানার চেষ্টা করেছে? বরং তাদের জোর করে গ্রামে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে; কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। এটি ব্লেম গেমে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসক ভিকটিম হয়েছেন। তারা জনগণের শত্রুতে পরিণত হয়েছেন। কেউ যদি গ্রামে কাজ করার পরিবেশ না পান কিংবা ভবিষ্যৎ দেখতে না পান, তা হলে যেতে চাইবেন কেন? আবার সব চিকিৎসক তো সরকারি অর্থে পড়াশোনাও করেন না। অনেকে পড়াশোনা করেন বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে। তাই জোর করার বদলে তাদের উদ্বুদ্ধ করে কর্মস্থলে রাখার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় বিশেষ করে যন্ত্রপাতি ক্রয়ে বিভিন্ন সময় অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়- এসব দুর্নীতি বন্ধ করতে আপনার পরামর্শ কী?- এমন প্রশ্নের জবাবে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, কেনাকাটায় শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারলে স্বাস্থ্যসেবা হুমকির মুখে পড়বে। মূল কথা, অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে।

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে কমিউনিটি ক্লিনিক বিশ্বে অন্যান্য দেশের কাছে রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাও অন্যান্য দেশকে এই মডেল অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেন। এই কমিউনিটি ক্লিনিকের সেবার মান সম্পর্কে জানতে চাইলে রশিদ-ই মাহবুব বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে কমিউনিটি ক্লিনিক একটি বড় ভূমিকা পালন করছে, এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে এটি একজন প্রোভাইডারের হাতে ন্যস্ত করে রাখা হয়েছে। যার চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে কোনো মৌলিক জ্ঞানই নেই। এ ধরনের ব্যক্তিকে দিয়ে কতদিন স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া যাবে? এসডিজি অর্জন করতে গেলে তো এতে চলবে না। তাই পেশাদার জনশক্তির বিষয়ে ভাবতে হবে। কমিউনিটি ক্লিনিকে এখনই যদি চিকিৎসা চাওয়া হয়, সেটি দেওয়া সম্ভব হবে না। তবে এটি পরিকল্পনায় রাখতে হবে। কমিউনিটি ক্লিনিক এখন ট্রাস্ট করা হয়েছে। সরকারি বরাদ্দে এ কমিউনিটি ক্লিনিক চলবে। কিন্তু সরকার কখনও পরিবর্তন হলে তখন বরাদ্দ অব্যাহত থাকবে কি-না, তার নিশ্চয়তা নেই। ২০০১ সালে সরকার পরিবর্তনের পর কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছিল। তাই সরকার পরিবর্তন হলে এটি অব্যাহত থাকবে কি-না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

দেশের ওষুধ খাত অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। দেশের চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। বর্তমানে উৎপাদিত ওষুধ দিয়ে দেশের চাহিদা মেটানোর পরও বিশ্বের প্রায় দেড়শ'র ওপর বিভিন্ন দেশে ওষুধ রফতানি করা হচ্ছে। যদিও গত কয়েক বছরে ওষুধের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।

ওষুষের মূল্য স্বাভাবিক রাখতে কী করণীয়?- এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. রশিদ-ই মাহবুব বলেন, ওষুধের মূল্য নাগালে রাখতে পারলে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় অনেকাংশে কমত। একজন ব্যক্তি নিজের পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ করেন ৬৭ শতাংশ। এ ব্যয়ের ৪৪ শতাংশই চলে যায় ওষুধ ক্রয়ে। গত কয়েক বছর ওষুধের দাম হু-হু করে বেড়েছে। ওষুধের এই মূল্য বৃদ্ধির জন্য সরকারই দায়ী। কারণ ১৯৯২ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি আদেশে ওষুধের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা কোম্পানিগুলোর হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেই থেকে কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন সময়ে নিজেদের ইচ্ছামতো ওষুধের মূল্য বাড়িয়েছে। সরকারকে এ বিষয়টি অবশ্যই দেখতে হবে।

আগামী ২০৩০ সালে মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে হলে করণীয় কী- এমন প্রশ্নের জবাবে বিএমএর সাবেক এই সভাপতি বলেন, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এমডিজি) স্বাস্থ্যের যে উপাদানগুলো ছিল, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) কিন্তু একই উপাদান নেই। কমিউনিক্যাবল রোগের সমস্যাগুলোর সমাধান, মা ও শিশুমৃত্যুর বিভিন্ন সূচকসহ নিরাপদ পানি সরবরাহ করা, টিকাদান কর্মসূচি এমডিজিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসডিজিতেও এই বিষয়গুলো সেভাবে থাকবে না। নিরাপদ পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থাপনাকে এসডিজিতে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। ক্যান্সার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, সিওপিডিসহ নন-কমিউনিক্যাবল ডিজিজ বা অসংক্রামক ব্যাধি সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। এ রোগগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো- এগুলো সারাজীবন বহন করে চলতে হয়। সুতরাং এ রোগগুলো হওয়ার আগেই প্রতিরোধ করতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো, এই রোগগুলো মোকাবেলায় আমরা কতটুকু প্রস্তুত? অসংক্রামক রোগ বেড়ে যাওয়ায় আইসিইউ এখন বেশি প্রয়োজন হবে। তবে আইসিইউ চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। মোট শয্যাসংখ্যার কমপক্ষে চার শতাংশ আইসিইউ প্রয়োজন হবে। কিন্তু আইসিইউ চালু করলেই তো হবে না। এর সঙ্গে জনবল গুরুত্বপূর্ণ। নিউরো ও কার্ডিয়াক সিওপিডি রোগীকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারকে এ জন্য দ্রুত কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট খবর


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

সব আপসকামিতার ঊর্ধ্বে উঠতে হবে সরকারকে


আরও খবর

সাক্ষাৎকার

অগ্রাধিকার খাত ১০ সুশাসন ও মানবাধিকার

সব আপসকামিতার ঊর্ধ্বে উঠতে হবে সরকারকে

বিশেষ সাক্ষাৎকার : সুলতানা কামাল

প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

  শেখ রোকন

মানবাধিকার আন্দোলনের নেত্রী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেছেন, সরকার আন্তরিক হলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ত্রুটিগুলো শুধরে নিতে পারে। আগামী নির্বাচনগুলোতেও এসবের পুনরাবৃত্তি এড়াতে পারে। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় মন্ত্রীদের অঙ্গীকারকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, আন্তরিকতা থাকলে সুশাসন ও মানবাধিকারের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে নতুন মেয়াদে সরকার অনন্য উদাহরণ তৈরি করতে পারে। সমকালের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাপটে জনসাধারণের অধিকার ও ভূমিকা গৌন হওয়া চলবে না। তা খোদ প্রশাসনের জন্যও দীর্ঘমেয়াদে কল্যাণকর হয় না। জনসাধারণের জন্য দুর্নীতির জালমুক্ত জীবন ও জীবিকাকে সরকারের নতুন মেয়াদে অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। নারী, সংখ্যালঘু, পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন তিনি। তার মতে সরকারকে সব আপসকামিতার উর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে।

সুলতানা কামাল বলেন, পরবর্তী সব নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করতে হলে বিগত নির্বাচনের ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করতে হবে সবার আগে। ত্রুটিগুলোর যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে ব্যাপারে সরকার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচেষ্ট থাকতে হবে। তবে সবকিছুর আগে স্বীকার করতে হবে যে, বিগত নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেও অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ত্রুটিপূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে সতর্কতা বার্তা উচ্চারিত হওয়া সত্ত্বেও এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্তরা সেগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেননি। বরং আত্মরক্ষামূলক উত্তর ও অজুহাত খাড়া করেছেন।

সমকালের প্রশ্নের জবাবে সুলতানা কামাল বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হওয়া সত্ত্বেও আমরা যে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন পেয়েছি- এ কথা বলা যাচ্ছে না। আমি যেহেতু মানবাধিকার নিয়ে কাজ করি, অনেকে তাদের অভিজ্ঞতার কথা আমাকে জানিয়েছেন। আমার ব্যক্তিগত পরিচিত কয়েকজনও ভোট দিতে গিয়ে নিজের ভোট দিতে পারেননি। পরিচিত কয়েকজন পোলিং অফিসার আমার প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, তারা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেননি। নির্বাচনের আগে-পরে যেসব সংবাদ প্রকাশ হয়েছে, ভোটাধিকারের ব্যাপারে সেগুলো আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। কারণ আমরা চাই, আমাদের পছন্দের রাজনৈতিক দলই জিতুক। কিন্তু দক্ষতা ও সততা বজায় রেখেই তাদের অবস্থান সংহত হোক। আগামী নির্বাচনগুলোতে সেটাই যাতে প্রতিফলিত হয়, এই প্রত্যাশা করি নতুন সরকারের কাছে।

ক্ষমতাসীন ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী মনোনয়নের ধরন নিয়েও সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন তোলেন সুলতানা কামাল। তিনি বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমন কিছু প্রার্থী মনোনয়ন পেয়েছেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনকারী একটি দেশের জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্য হতে পারেন না। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন প্রক্রিয়া এমন যে, সেখানে জনসাধারণের পছন্দ-অপছন্দ, এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোর মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের পছন্দ-অপছন্দেরও জায়গা নেই। ওপর থেকে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়, তাকে নিয়েই নির্বাচনে অবতীর্ণ হতে হয় নেতাকর্মীদের। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রার্থীদের রাজনৈতিক যোগ্যতা, সততা ও নিষ্ঠার পরিবর্তে অন্য অনেক বিবেচনা কাজ করে থাকে। আগামী নির্বাচনে এর পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়।

সুলতানা কামালের মতে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা মাত্রাতিরিক্ত অনুভূত হয়েছে। নির্বাচনের মূল নায়ক ভোটাররা। কিন্তু এবারের নির্বাচনে যেন জনসাধারণ গৌণ হয়ে পড়েছিল।

তিনি বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো অবশ্যই আমাদের শাসন ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এসব বাহিনী গড়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধে জনসাধারণের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার মধ্য দিয়ে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সব বাহিনীর সুনির্দিষ্ট কর্মপরিধি রয়েছে। তার বাইরের তৎপরতা সবসময় যথার্থ হয় না বলে আমি মনে করি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মপরিধি বহির্ভূত ব্যবহার রাষ্ট্র পরিচালনায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তা সবসময় রাষ্ট্র, জনসাধারণ, এমনকি খোদ প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্যও কল্যাণকর হয় না।

সুলতানা কামাল মনে করেন, টানা তৃতীয় মেয়াদে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণকারী আওয়ামী লীগ সরকারের সামনে বেশ কয়েকটি জরুরি কর্তব্য দাঁড়িয়ে গেছে। এসবের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। তিনি বলেন, নতুন সরকারে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের প্রায় সবাই তাদের প্রাথমিক বক্তব্যে পরিস্কারভাবে বলেছেন, তারা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চান। এসব বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, সুশাসন প্রতিষ্ঠার দায়িত্বকে তারা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন।

নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়কে 'যথার্থ উপলব্ধি' হিসেবে স্বাগত জানিয়ে সুলতানা কামাল প্রশ্ন তোলেন- 'সুশাসন' বলতে তারা মানুষের জীবনের কোন কোন দিক নিশ্চিত করতে চাইছেন? তার মতে, এর অর্থ হওয়া উচিত এমন একটি সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে সবাই একটি নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে নিশ্চিন্তে বসবাস করবে। সকালে ঘর থেকে বের হয়ে সন্ধ্যায় নিরাপদে ঘরে ফিরে আসতে পারবে।

সুলতানা কামাল মনে করেন, ব্যক্তি ও সম্পত্তির নিরাপত্তার বাইরেও সুশাসন মানে নির্বিঘ্ন জীবিকা, চলাফেরা এবং মত প্রকাশের অধিকার। তার মতে, নতুন সরকার এমন সব বিষয়ে অগ্রাধিকার দেবে, যাতে করে পথে কর্মঘণ্টার অযথা অপচয় না হয়। বেপরোয়া যানবাহনের দুর্ঘটনায় প্রাণ দিতে না হয়।

গত কয়েক বছরে নানা ফোনালাপ ফাঁস ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘন বলে সুলতানা কামাল মনে করেন। তিনি বলেন, সরকারের নতুন মেয়াদে এ ধরনের কর্মকাণ্ড হ্রাস পাবে। তিনি বলেন- কোথায় কী কথা বললাম, সেই কারণে গুম হবো, না গ্রেফতার হবো, না প্রাণ দেব, সেই দুশ্চিন্তায় যেন নাগরিকদের দিনাতিপাত করতে না হয়।

সুলতানা কামাল বলেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে এদেশের নাগরিকদের পরিশ্রম ও মেধার বিনিময়ে। সরকারের অগ্রাধিকার থাকা উচিত যাতে করে সবাই তাদের উপার্জনের অর্থ দিয়ে মোটামুটি স্বাধীনভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে। স্বল্প হলেও যাতে সঞ্চয় করতে পারে ভবিষ্যতের জন্য। তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় যাতে কোনো দুর্নীতিবাজের কারণে খোয়া না যায়। রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে নাগরিকদের যে অধিকার, দুর্নীতিবাজদের জালে জড়িয়ে সেই প্রাপ্য থেকে সাধারণ মানুষ যেন বঞ্চিত না হয়। কোনো কারণে দুর্নীতির ঘটনা ঘটলেও সুলতানা কামাল আওয়ামী লীগ সরকারের নতুন মেয়াদে দেখতে চান যে, সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের কাছ থেকে দ্রুততার সঙ্গে কার্যকর প্রতিকার পেয়েছে।

সুলতানা কামাল প্রত্যাশা করেন, নাগরিকরা ন্যায় বিচারের প্রত্যাশা যেন হারিয়ে না ফেলে। যেসব মন্ত্রী সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা যেন তাদের দৃষ্টি থেকে হারিয়ে না যায়। যেসব প্রতিশ্রুতি নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা দিচ্ছেন, সেগুলোর বাস্তবায়নে দৃঢ়তা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে নতুন সরকার কতটা প্রস্তুত, সেই প্রশ্ন রাখেন তিনি।

সুলতানা কামাল আশা করেন, নারী কিংবা অন্য কোনো পরিচয়ের কারণে দেশের কোনো নাগরিক যেন নির্যাতিত, নিপীড়িত, অবহেলিত ও বঞ্চিত বোধ না করেন। তিনি বলেন, এটাই মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এটাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মর্মার্থ। সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে সুলতানা কামাল আহ্বান জানান, তারা যেন জনসাধারণের মধ্যে সংখ্যালঘু হিসেবে পরিচিতদের আস্থা অর্জনে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সমতল ও পাহাড়ের আদিবাসীদের উন্নয়ন সাধন ও অধিকার রক্ষায় বিশেষ মনোযোগ দিন। তিনি বলেন, সংখ্যালঘু, আদিবাসীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে উত্থাপিত দাবির মধ্যে রয়েছে তাদের জন্য বিশেষ কমিশন গঠন; তাদের ভূমি সমস্যার সমাধান করা ও আর্থ-সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা। এসব দাবি পূরণে নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তিনি মনে করেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে স্বাক্ষরিত শান্তি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে নতুন সরকার একটি অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে।

সুলতানা কামাল প্রত্যাশা করেন, সরকারকে সব আপসকামিতার ঊর্ধ্বে উঠে এবং সংবিধানের সঙ্গে সরকারের নীতি ও কর্মসূচির সামঞ্জস্য রাখতে অবিলম্বে সব ক্ষেত্রে জাতীয় নারী নীতির প্রতিফলন ঘটানো হবে।

সুলতানা কামাল স্বীকার করেন, সরকারের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবং সবগুলো রাতারাতি মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য ও দৃশ্যমান উদ্যোগের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় সরকারের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা প্রকাশের সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ যে পথে হাঁটা শুরু করেছিল, আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে যে পথ ধরে হাঁটতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, সেই পথে বাধা আসতে পারে। কৌশলগত কারণে কখনও কখনও গতি শ্নথ হতে পারে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের প্রতিজ্ঞা ত্যাগ করে উল্টো পথে হাঁটা কখনোই কাম্য হতে পারে না।

পরের
খবর

গতি বাড়ানোই আমার লক্ষ্য : পরিকল্পনামন্ত্রী


আরও খবর

সাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকার

গতি বাড়ানোই আমার লক্ষ্য : পরিকল্পনামন্ত্রী

প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন

পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেছেন, ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পের গতি বাড়ানোই হবে তার মূল লক্ষ্য। যারা প্রকল্পগুলোর সঙ্গে যুক্ত তারা সবাই অভিজ্ঞ। তাই গতি বাড়াতে নতুন করে চাকা আবিস্কার করতে হবে না। যে চাকা আছে তার গতি আরও বাড়াতে পারলেই সাফল্য আসবে।

সমকালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, মেগা প্রকল্পে অর্থায়ন একটি বড় বিষয়। অর্থায়ন জোগানের দায়িত্ব অর্থ মন্ত্রণালয়ের। কোন প্রকল্পে কত বরাদ্দ এবং কি পরিমাণে ছাড় হবে, তা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে হয়। কোনো অবস্থাতেই অর্থাভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন ঝুঁকির মধ্যে পড়তে দেওয়া হবে না। যে কোনোভাবেই ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পগুলো গুণগতমান ঠিক রেখেই দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।

এমএ মান্নান বলেন, তিনি দ্রুততার সঙ্গে কাজ করতে পছন্দ করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, গতিই জীবন। তার কাজে এ বিশ্বাসের প্রতিফলন থাকবে। তবে বাস্তবায়নকারী সংস্থাসহ অন্যদেরও জোর প্রচেষ্টা থাকতে হবে। তিনি জানান, নির্ধারিত মেয়াদ ২০১৯ সালে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ করা সম্ভব হবে না। যে কোনোভাবেই ২০২০ সালে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হবে বলে তিনি আশাবাদী। তবে পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও দেরি হবে। কারণ রেল সংযোগের অর্থায়ন নিয়ে জটিলতার কারণে প্রকল্পটি বিলম্বে শুরু হয়েছে। অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে এর বিলম্ব হয়নি। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার আমলতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এটি হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর হারিয়ে যাচ্ছে না উল্লেখ করে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, একসঙ্গে দুই কাজ করতে গেলে সমস্যা হয়। ইতিমধ্যে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপন প্রকল্প অনেক এগিয়ে গেছে। এর বাস্তবায়ন কাজেও গতি বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে সোনাদিয়ার গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপন করা প্রযুক্তিগতভাবে অনেক জটিল হবে। এ কারণে খুব সাবধানে এগোতে হবে।

তিনি বলেন, মেট্রোরেল প্রকল্পটি সময়মতো শেষ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি ছিল। কিন্তু গুলশানে হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার কারণে সম্ভাবনাময় প্রকল্পটির বাস্তবায়ন দুই বছর পিছিয়ে গেছে। একইভাবে জাপানের অর্থায়নে মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণও পিছিয়ে গেছে। পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেন, এলএনজি প্রকল্পটিও পিছিয়ে আছে। এটা নিয়ে তিনি সবার সঙ্গে বৈঠকে করবেন। প্রকল্পটি নিয়ে আমাদের বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের খুব আগ্রহ রয়েছে।

দোহাজারী হতে ঘুমধুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণের কারণে বিলম্ব হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ এ দেশে দীর্ঘদিনের সমস্যা। এ সমস্যা দূর করতে বহু আইন বদলাতে হবে। এটা অনেক দীর্ঘ মেয়াদের কাজ।

পরের
খবর

জঞ্জাল সরানোর এটাই শেষ সুযোগ


আরও খবর

সাক্ষাৎকার

অগ্রাধিকার খাত ৯ সড়ক ও পরিবহন

জঞ্জাল সরানোর এটাই শেষ সুযোগ

বিশেষ সাক্ষাৎকার : ড. সামছুল হক

প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

  রাজীব আহাম্মদ

'তৃতীয় বিশ্বে টানা দুইবার ক্ষমতায় থাকা অনেক বড় ব্যাপার। আওয়ামী লীগ সেখানে টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসেছে। সরকার দাবি করছে, খুবই সবল তারা। রাজধানীর প্রাণঘাতী গণপরিবহনে এ সরকার যদি শৃঙ্খলা ফেরাতে পারে, তা হলে তাদের দাবির যথার্থতা প্রমাণ হবে। এবার যদি পরিবহন খাতের নৈরাজ্য ও অনিয়ম-দুর্নীতি দূর না হয়, তা হলে হয়ত আর কখনোই হবে না; গত কয়েক দশকে ভ্রান্তনীতির কারণে এ খাতে যে জঞ্জালের পাহাড় সৃষ্টি হয়েছে, তা আর কখনোই সাফ করা সম্ভব হবে না।

এটাই শেষ সুযোগ।'


সমকালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক। রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থা, যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন ও মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলেন তিনি।

রাজধানীর সড়কে বিশৃঙ্খলার জন্য বাস্তবতাবর্জিত 'রুট পারমিট'কে দায়ী করেন সামছুল হক। তিনি বলেছেন, ঢাকার মতো মাত্র ৩০৬ বর্গকিলোমিটারের ছোট শহরে রুটের সংখ্যা ২৭৬। এত রুট পৃথিবীর কোনো শহরে নেই। যার যখন ইচ্ছা হয়েছে পরিবহন ব্যবসায় নেমেছেন। নতুন নতুন রুটের অনুমোদন নিয়েছেন। যারা অনুমোদনের দায়িত্বে রয়েছেন, তাদের এ বিষয়ে পেশাগত শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা নেই। তা ছাড়া যিনি চেয়েছেন তাকেই অনুমোদন দিতে হয়েছে রাজনৈতিক চাপেও। রাজধানীতে রুটের সংখ্যা পাঁচ থেকে ছয়ে নামিয়ে আনা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

সামছুল হক বলেন, বাস রুট র‌্যাশনালাইজ পদ্ধতিতে একটি রুটে একটি কোম্পানির বাস চলবে। এতে প্রতিযোগিতা থাকবে না। যাত্রী পেতে রেষারেষি হবে না। ওভারটেক করার প্রবণতা থাকবে না। ঢাকায় রুটের ছড়াছড়ির কারণেই বাসে বাসে রেষারেষি, প্রতিযোগিতা ও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটছে।

রাজধানীতে বাসের রুটের সংখ্যা কমিয়ে এনে 'বাস রুট র‌্যাশনালাইজেশনের' প্রস্তাব করা হয়েছে এক দশক আগে। ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভা থেকে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু এখনও কাজ শুরু হয়নি। সামছুল হক বলেন, বাংলাদেশে সুপারিশের কোনো অভাব নেই। সমস্যা চিহ্নিত করা হয়, সমাধানও চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু বাস্তবায়নের সময় উল্টোপথে হাঁটা হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ যদি বাস্তবায়ন না হয়, তা হলে কার নির্দেশে কাজ হবে!

ঢাকার পরিবহনের দায়িত্বে রয়েছে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ অন্তত এক ডজন সংস্থা। সামছুল হক বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের একটিরও সক্ষমতা নেই। ট্রাফিক বাতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব এমন ব্যক্তির হাতে, যার এ বিষয়ে কোনো পড়াশোনাও নেই, দক্ষতাও নেই। প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে, নয়ত কোনো কাজ হবে না।

এ পরিস্থিতির জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দায়ী করেন সামছুল হক। তিনি বলেন, দেশে উন্নয়নের একটি ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়েছে। সব সংস্থা ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে করতে চায়। কারণ, এগুলো দৃশ্যমান বিশাল অবকাঠামো। এগুলো করলে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত লাভও হয়। তাই বলা হয়, বড় অবকাঠামো মানেই বড় উন্নয়ন। অথচ ব্যবস্থাপনার দিকে কোনো নজর নেই। কোনো টাকা খরচ না করেই বাস রুট পুনর্বিন্যাস, সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত ও লেন পদ্ধতি চালু করার মতো কাজ সম্ভব। এভাবে অর্ধেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। কোনো প্রকল্প নয়, নীতি সংস্কার করে এ কাজগুলো করা সম্ভব।

রাজধানীতে প্রাইভেটকার নিরুৎসাহিত করে গণপরিবহনকে প্রাধান্য দেওয়ার সুপারিশ করা হয় ১৯৯৮ সালের 'ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানে'। কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) ও সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনাতেও (আরএসটিপি) গণপরিবহনকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো হচ্ছে বলে মনে করেন সামছুল হক। তিনি বলেন, এসটিপি ও আরএসটিপিতে গণপরিবহনবান্ধব মেট্রোরেল ও বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) করার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু তা না করে করা হয়েছে ফ্লাইওভার। বিআরটির কাজের গতি নেই। ঢাকায় আটটি ফ্লাইওভার করে প্রাইভেটকারকে উৎসাহিত করা হয়েছে। আটটি ফ্লাইওভার নির্মাণের পরও ঢাকায় গাড়ির গতি গত দেড় দশকে এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। তার মানে ফ্লাইওভার যানজট না কমিয়ে বাড়িয়েছে। অথচ এখনও ফ্লাইওভার বানানোর প্রতিযোগিতা থেকে কর্মকর্তারা বের হতে পারেননি। বিআরটির জন্য নির্ধারিত করিডোরে কাকরাইল থেকে ঝিলমিল পর্যন্ত আরেকটি ফ্লাইওভার করা হয়েছে। ফ্লাইওভার ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে ঢাকা বরং থমকে গেছে।

মহাসড়ক নির্মাণে উচ্চ ব্যয় এবং এর দুরবস্থার জন্যও নীতি দুর্বলতা ও সুশাসনের অভাবকে দায়ী করেন সামছুল হক। সমকালকে তিনি বলেন, পরিবহন খাতের সংস্থাগুলোর মধ্যে একমাত্র সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের দক্ষ ও প্রয়োজনীয় পেশাগত শিক্ষিত জনবল রয়েছে। কিন্তু এ সংস্থাটির জনবলকে কাজে লাগানোই হয় না। মহাসড়ক নির্মাণের মূল দায়িত্ব পালন করে পরামর্শক সংস্থাগুলো। যদিও বাংলাদেশে কোনো ভালো পরামর্শক প্রতিষ্ঠানই আসে না। বরং যেসব পরামর্শক আসে, তাদের কারণে কাজের গুণগত মান রক্ষা করা যায় না। প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন হয় না। ফলে প্রকল্প ব্যয় বাড়তে থাকে। এ কারণে বাংলাদেশে সড়ক নির্মাণ ব্যয় পৃথিবীতে সর্বোচ্চ। মহাসড়কের দুর্বলতার জন্য দীর্ঘ নির্মাণ সময়কে দায়ী করেন সামছুল হক। তিনি বলেন, পাঁচ-ছয় বর্ষা ধরে কাজ করা হয়। কাজ শেষ হতে না হতেই রাস্তা ভাঙতে শুরু করে।

মহাসড়কে নৈরাজ্যের জন্য দায়ী কে?-এমন প্রশ্নের উত্তরে আইন প্রয়োগের দুর্বলতাকে দায়ী করে সামছুল হক বলেন, পৃথিবীর কোনো মহাসড়কের পাশেই স্থাপনা থাকে না। অথচ এ দেশে মহাসড়কের পাশে হাটবাজার, দোকানপাট, রাজনৈতিক কার্যালয়, গাড়িঘর, কারখানা সব রয়েছে। মহাসড়কের পাশে এত ঘন স্থাপনা থাকায় বৃষ্টি হলে রাস্তা থেকে পানি নিস্কাশনের পথই থাকে না। পানি না সরলে রাস্তা ভাঙবেই। মহাসড়কের পাশের জায়গা সরকারি, সেখানকার স্থাপনাগুলো নিশ্চিতভাবেই অবৈধ। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে টাকার দরকার হয় না। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা, সাহস ও রাজনৈতিক সমর্থন। বর্তমান সরকার গণতান্ত্রিক, তারা যদি এ কাজ করতে না পারে তা হলে কে করবে!

সড়কের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সামছুল হক। তিনি বলেন, একটি চাকার ট্রাকের পণ্য পরিবহনের ক্ষমতা ১৫ টন। এ ট্রাককে ২২ টন পণ্য বহনের অনুমতি দিয়েছে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। এর চেয়ে অবৈজ্ঞানিক কাজ আর হতে পারে না। সারা বিশ্বে যদি এই ট্রাক ১৫ টনের বেশি পণ্য বহনের অনুমতি না পায়, বাংলাদেশে কেন পাবে? বলা হয়, ব্যবসায়ীদের চাপে অতিরিক্ত পণ্য বহনের অনুমতি দিতে বাধ্য হয় মন্ত্রণালয়। যদি মন্ত্রণালয়কে ব্যবসায়ীদের চাপই সইতে হয়, তা হলে সরকার থাকার কি দরকার? অতিরিক্ত পণ্যবাহী যানবাহন রাস্তা ভাঙছে, দুর্ঘটনা ঘটছে। মহাসড়কের অধিকাংশ ট্রাক, বাস, কাভার্ডভ্যান, লরির বডি বা নকশা ঠিক না থাকলেও বছরের পর বছর সড়কে চলছে। বিআরটিএ থেকে ফিটনেস সনদ পাচ্ছে! বছর শেষে দাবি করছে, তারা সফল সংস্থা, কারণ সরকারি কোষাগারে হাজার কোটি টাকা জমা দিতে পেরেছে। অথচ বিআরটিএর দায়িত্ব সরকারের জন্য আয় করা নয়, সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষা করা।

সারাদেশে অন্তত ১৫ লাখ অবৈধ যানবাহন চলছে। ইজিবাইক আমদানিতে বাধা না থাকলেও সড়কে চলাচল নিষিদ্ধ। ড. সামছুল হক বলেন, নৈরাজ্যের সবচেয়ে বড় উদাহরণ এটি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যখন ইজিবাইক আমদানির অনুমোদন দিয়েছে তারা চিন্তাই করতে পারেনি এ বাহনটি কী ভয়ঙ্কর সমস্যা তৈরি করবে ভবিষ্যতে। এখন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়, সর্বোচ্চ আদালত থেকে নির্দেশনা দিয়েও কাজ হচ্ছে না। কারণ, হিসেবে বলা হচ্ছে, এসব অবৈধ যান বন্ধ করলে ১০ থেকে ১৫ লাখ মানুষ বেকার হয়ে যাবেন। ২০ বছর পর কী হবে এখনই চিন্তা করতে হবে, কারণ এটাই শেষ সুযোগ।