সাক্ষাৎকার

অগ্রাধিকার খাত ৪ অর্থনীতি

ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে

বিশেষ সাক্ষাৎকার : মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে

  আনোয়ার ইব্রাহীম

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম মনে করেন, সরকারের ধারাবাহিকতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ইতিবাচক দিক। একটা নির্বাচন শেষে নতুন সরকার এসেছে। তবে চ্যালেঞ্জও আছে। রফতানি খাতে সাম্প্রতিক উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্থনীতিতে একটা স্বস্তির বাতাস দিচ্ছে। রেমিট্যান্স আয়েও ভালো প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। রেমিট্যান্স বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ক্ষেত্রে স্বস্তিদায়ক অবস্থা থাকবে।

সমকালকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, অর্থনীতিতে চ্যালেঞ্জের অন্যতম হলো বেসরকারি বিনিয়োগে এক ধরনের স্থবিরতা। ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত ২২ থেকে ২৩ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ আছে। জায়গার অপ্রতুলতা এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এখনও রয়েছে। অবকাঠামো বিশেষত পরিবহন ও বন্দরে সমস্যা আছে। বড় সমস্যা হলো- বিশ্বব্যাংকের ডুইং বিজনেস সূচক অনুযায়ী, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের ঘাটতি আছে। ১৯০ দেশের মধ্যে আমাদের অবস্থান ১৭৬তম। সুশাসনের

যেসব সূচক আছে, সেগুলোতেও অবস্থান বেশ নিচের দিকে।

মির্জ্জা আজিজের মতে, ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। মূল সমস্যা হলো খেলাপি ঋণ। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বিতরণ করা ঋণের মধ্যে খেলাপি ছিল ৮ দশমিক ৮০ শতাংশ। গত সেপ্টেম্বরে যা বেড়ে ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ হয়েছে। টাকার অঙ্কে খেলাপি ঋণ ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে রয়েছে অবলোপন করা ৩৭ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। এর ফলে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য

করা যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বেশ সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। যেমন- আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে যাবে, যা এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। কারণ মানুষের মধ্যে ব্যাংক খাত নিয়ে কিছুটা অনাস্থা তৈরি হয়েছে। ব্যাংক যদি আমানত না পায়, তবে সে ঋণও দিতে পারবে না। আমরা এখনই দেখছি, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। গত নভেম্বরে এক্ষেত্রে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ শতাংশ, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রার অনেক নিচে। মনে রাখতে হবে, দেশে শিল্পে বিনিয়োগে এখনও মূল অর্থায়ন আসে ব্যাংক খাত থেকে। এ খাতের প্রতি মানুষের আস্থা কমতে থাকলে ব্যাংক ঋণ প্রদানের ক্ষমতা হারাবে। ফলে বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতই অর্থায়নের কাজটি করে আসছে। ব্যাংক খাতে যে অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে, তাতে শুধু এ খাত নয়, সার্বিক অর্থনীতিতেও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তবে আরও খারাপ কিছু হওয়ার আগেই সরকারকে সতর্ক হতে হবে। অতীতে যা অনিয়ম হয়েছে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। 'নতুন করে আর কোনো অনিয়ম নয়' এমন মনোভাব নিয়ে এখনই দৃশ্যমান কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে। নতুন সরকারের শুরুতেই মন্দ লোকদের কবল থেকে ব্যাংক খাতকে মুক্ত করতে হবে। অন্যদিকে বিনিয়োগের বিকল্প উৎস শেয়ারবাজারের অবস্থাও ভালো নয়। গত বছরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ৮৫৮ পয়েন্ট হারিয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতিকে ইঙ্গিত করে। এর ওপর আমাদের উদ্যোক্তারা মূলধনের প্রয়োজনে নানা কারণে শেয়ারবাজারমুখী হতে আগ্রহী নন। আস্থার পরিবেশ না পেলে ভালো উদ্যোক্তারা স্বাভাবিকভাবে আরও নিরুৎসাহিত হবেন।

মির্জ্জা আজিজ এসব সমস্যা থেকে বের হওয়ার কিছু সুপারিশ করেন। তার মতে, প্রথমত, ব্যাংক খাতকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অযোগ্য ও অদক্ষ প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। একই কারণে ঋণ আদায়ে নমনীয় আচরণ পরিহার করা অত্যন্ত জরুরি। দ্বিতীয়ত, সম্পর্কজনিত ঋণ প্রদান বন্ধ করা। যেমন- কোনো ব্যাংকের পরিচালক তার আত্মীয়-স্বজনদের নামে ঋণ দিচ্ছেন। আবার এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন, ফেরত দিচ্ছেন না। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যাংক খাতে সুশাসন জোরদার করতে হবে। ব্যাংকগুলোর পর্ষদে যাতে সৎ, যোগ্য ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা থাকেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। তা হলো খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা থেকে বের হয়ে আসা। দেখা যাচ্ছে, অর্থঋণ আদালতে হাজার হাজার মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে অনেক টাকা আদায় আটকে যাচ্ছে। আইনি মারপ্যাঁচের সুযোগ যাতে কেউ নিতে না পারে, তার জন্য প্রক্রিয়াটির দীর্ঘসূত্রতা কীভাবে কমানো যায়, তা খুঁজে দেখতে হবে। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি হচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে ত্বরিত গতিতে ও দৃশ্যমান শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এসব উদ্যোগ নিলে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন না থাকার একটি বড় কারণ, রাজনৈতিক বিবেচনায় একের পর এক ব্যাংক অনুমোদন। গত মেয়াদে নয়টি ব্যাংক দেওয়ার পর সরকার আবারও নতুন তিনটি ব্যাংক দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছে। এরই মধ্যে একটি ব্যাংক অনুমোদনও পেয়ে গেছে। এটা আমাদের খুব খারাপ দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের এই ছোট অর্থনীতিতে এত বেশি ব্যাংকের কোনো প্রয়োজন নেই। এটা করে সরকার ব্যাংক খাততে দুর্বল করে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে সুশাসনের কথা যদি বলাই হয়, তবে সরকারকে এক্ষেত্রে 'রাজনৈতিক বিবেচনা' বাদ দিতে হবে। তা না হলে ব্যাংক খাতে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে না। রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ প্রদানও বন্ধ হবে না। সদ্য সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত কিছুদিন আগেও বলেছিলেন, ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে তিনি একটা কর্মপরিকল্পনা তার উত্তরসূরির জন্য রেখে যাবেন। আমরা সেই কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছেন বলে এখনও শুনিনি। তিনি বলেছিলেন, দুর্বল ব্যাংক কোম্পানিগুলোকে একীভূত (মার্জার) করতে উদ্যোগ নেবেন। এক্ষেত্রে আইন নেই, সে আইন করারও কোনো উদ্যোগ এখন পর্যন্ত আমরা দেখিনি।

ব্যাংকের পাশাপাশি শেয়ারাবাজার নিয়ে কথা বলেন মির্জ্জা আজিজ। শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাবেক এই চেয়ারম্যান বলেন, এখানে ভালো মানের নতুন কোম্পানি খুব একটা বেশি আসছে না। বাজার এখনও অবমূল্যায়িত। সার্বিক মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই ১৫-এর সামান্য বেশি। এটা খুব একটা বেশি নয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর হিসাব বিবেচনায় নিলে এটা ২০ পর্যন্ত যেতে পারে। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার অভাব আছে। এটা পুনরুদ্ধার করতে হবে। এ ছাড়া নতুন ভালো কোম্পানি বাজারে আনতে হবে। বহুজাতিক কোম্পানি আরও বেশি করে আনতে হবে। দেশীয় ভালো কোম্পানি বিশেষ করে ওষুধ খাতে অনেক ভালো কোম্পানি আছে। এগুলোকে বাজারে আনতে হবে। একইভাবে সরকারি ভালো কোম্পানিগুলোকে আনতে হবে।

বাজেট ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা বলেন, বাজেটের ঘাটতি মেটাতে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ গ্রহণ বাড়িয়ে দিয়ে সরকার সবচেয়ে ব্যয়বহুল পথ অনুসরণ করছে। এর প্রভাবে আমাদের রাজস্ব বাজেটের ২২ থেকে ২৩ শতাংশ চলে যাচ্ছে সুদ পরিশোধে। বাজেটের এত বড় অংশ সুদ পরিশোধ খাতে যাওয়ায় সরকারের প্রাধিকার খাতগুলোতে বরাদ্দ কমছে। যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দারিদ্র্য বিমোচন খাতে সরকার কম খরচ করছে। আবার গত অর্থবছরের তুলনায় এবার রাজস্ব আদায় কম হচ্ছে। এর মধ্যে সরকার নানা কারণে শিল্পোদ্যোক্তাদের কর ছাড় দিয়ে যাচ্ছে। এতে রাজস্ব আদায় আরও কমবে। ঘাটতি বাজেট মেটাতে সঞ্চয়পত্রে নির্ভরশীলতা আরও বাড়তে পারে।

মন্তব্য


অন্যান্য