সাক্ষাৎকার

অগ্রাধিকার খাত: দুর্নীতি দমন

দুদককে সরকারের প্রভাবমুক্ত করে শক্তিশালী করতে হবে

বিশেষ সাক্ষাৎকার: ড. ইফতেখারুজ্জামান

প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুদককে সরকারের প্রভাবমুক্ত করে শক্তিশালী করতে হবে

  হকিকত জাহান হকি

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে প্রয়োজনে সরকারকে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করাতে হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না। দুর্নীতিবাজদের পরিচয়, অবস্থানের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করতে হবে। সরকারের প্রভাবমুক্ত করে দুদককে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। সবাইকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দিতে হবে। সেবা খাত শতভাগ ডিজিটাল পদ্ধতির আওতায় আনা জরুরি। বৈষম্যমূলক সরকারি চাকরি আইন বাতিল করাসহ দুর্নীতি দমনে অবশ্যই ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে সবার আগে। এগুলো করতে পারলে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা সম্ভব। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে এমন অভিমত দিয়েছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে প্রতিবার আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে দেখা যায়। তবে পাঁচ বছর মেয়াদে রাষ্ট্রের 'ক্রনিক ডিজিজ' নামক দুর্নীতি বন্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপ সেভাবে চোখে পড়েনি। একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগের এবারের ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা বলা হয়েছে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে  আওয়ামী লীগ সরকারে এসেছে। এখন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পালা। এ অবস্থায় দুর্নীতি দমনের বিভিন্ন দিক নিয়ে সমকালের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।

তিনি বলেন, দুর্নীতি দমনে চারটি বিষয়কে প্রাধান্য দিতে হবে। এগুলো হলো- রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও এর কার্যকর প্রতিফলন, পরিচয় ও অবস্থানের ঊর্ধ্বে থেকে দুর্নীতিবাজদের বিচারের আওতায় আনা, দুর্নীতি দমনে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো।

আওয়ামী লীগের ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বিষয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যকে উদ্ৃব্দত করে বলেন, এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, 'বাংলাদেশের মাটিতে দুর্নীতিবাজদের স্থান হবে না।' এ কথাটি যখন সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বলা হয়, তখন জনগণ এটাকে রাজনৈতিক ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবেই দেখতে চায়। ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি একটি কাগুজে কথা। একে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে যারা উচ্চপর্যায়ে থেকে দুর্নীতি করেন, বড় বড় দুর্নীতির সঙ্গে যারা জড়িত, পরিচয় ও অবস্থানের ঊর্ধ্বে থেকে তাদের বিচারের আওতায় আনার সৎসাহস ও দৃঢ়তা দেখাতে হবে। তাহলে জিরো টলারেন্স নীতি অর্থবহ হবে। আর যদি আগের ধারা অব্যাহত থাকে, যেমন দেখা গেছে বেসিক ব্যাংক বা সোনালী ব্যাংক, শেয়ার মার্কেটে জালিয়াতি, ঋণখেলাপি- এ ধরনের ক্ষেত্রে যারা মূল হোতা, তারা সরকারের ছত্রছায়া পেয়েছে। শুধু তাই নয়, এর মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কাউকে কাউকে গুরুত্বপূর্ণ পদেও অধিষ্ঠিত করা হয়েছে।

দুদককে শক্তিশালী করার পাশাপাশি জনসচেতনতা জোরদার করার কথা বলা হয়েছে ইশতেহারে। এ ব্যাপারে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যারা দুর্নীতি করে, তাদের ধরার জন্য মূল দায়িত্ব পালন করছে দুদক। তাই রাষ্ট্রের এই প্রতিষ্ঠানকে সরকারের প্রভাবমুক্ত রেখে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করতে হবে। এর আগে দেখা গেছে, সরকারের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ চাপের মুখে দুদক যথাযথ ভূমিকা পালন করতে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছে। আর এটিই হলো দুদককে কার্যকর করার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়। যেসব ক্ষেত্রে সরকারি দলের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটছে, সেসব ক্ষেত্রে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি দুদক। এ ক্ষেত্রে সরকারের উচিত দুদককে আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া। দুদকের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কর্মকর্তাকে মনোনীত করা যাবে না। অবশ্য এটি পুরোপুরি সরকারের ওপরও নির্ভর করে না। দুদকেরও মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে।

তিনি বলেন, অবস্থা দেখে মনে হয়, দুদক মনে করে কমিশন একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। সব দেশেই দুদকের মতো প্রতিষ্ঠান সরকার তৈরি করে এবং তা সরকারের অর্থেই চলে। অথচ তারা স্বাধীন। তারা সরকারকেও জবাবদিহির আওতায় আনে। এটা তাদের ম্যান্ডেড। এ বিষয়টি দুদককে মনে রাখতে হবে।

দুর্নীতিবিরোধী জনসচেতনতা বিষয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জনগণ যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়ায়, তবে দুর্নীতির ব্যাপকতা বাড়বে- এটাই স্বাভাবিক। সাধারণ মানুষ দুর্নীতির কারণে অতিষ্ঠ, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রিত হোক, তারা সেটাই চায়। তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণের রাস্তায় নামার উপযোগী পরিবেশ নেই। যারা কথা বলে তাদের হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার, তাদের রাষ্ট্রদ্রোহী বলার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। যে কোনো সময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বললেই সেটাকে ষড়যন্ত্র বলে উপস্থাপন করা হয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষের সোচ্চার হওয়ার অর্থটা হলো- মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে। এই স্বাধীনতা সাম্প্রতিককালে খর্ব হতে দেখা গেছে।

আওয়ামী লীগের ইশতেহারে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি চালুর মাধ্যমে দুর্নীতি ক্রমান্বয়ে শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, দুর্নীতি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার ঘোষণার মধ্য দিয়ে একটু বেশিই আশার কথা বলা হয়েছে। পৃথিবীর কোনো দেশেই দুর্নীতি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। তবে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের অন্যতম হাতিয়ার আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি। এ সরকারের একটা সুবিধা আছে। আর তা হলো- তাদের হাইপ্রোফাইল কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' গঠনের প্রতিশ্রুতি। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল পদ্ধতি চালু অত্যন্ত জরুরি। সমস্ত সেবা খাতে ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করতে হবে। সাম্প্রতিককালে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব সেবা খাতে ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করা হয়েছে সেখানে দুর্নীতির প্রবণতা কিছুটা কমেছে।

দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পাশাপাশি জনগণকে এগিয়ে আসার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে ইশতেহারে। এ বিষয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ নিয়ে সরকারকে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ, অংশীজন, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যমসহ সংশ্নিষ্ট ক্ষেত্রে অভিজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। দেশের তরুণ সমাজকে সম্পৃক্ত করতে হবে।

দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন নির্মূলে সরকারের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতির বিষয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে সুন্দর সুন্দর কথা শোনার সুযোগ হয় দেশবাসীর। তবে প্রকৃত অর্থে যারা দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়, এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে যাবে যে প্রক্রিয়ায় এবারের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে, সেটি। এই নির্বাচনের ফলাফলের জন্য যারা কাজ করেছেন, তাদের মধ্যে যদি এই মানসিকতা থাকে যে, সেটি হয়েছে নিজেদের অর্থ-সম্পদ বৃদ্ধির জন্য, সেটাই দুর্বৃত্তায়নের বড় সূত্র হবে। এটি নিয়ন্ত্রণ করার মতো সদিচ্ছা সরকারের থাকতে হবে।

সরকারি চাকরি আইন করে দুদকের ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে বলে মনে করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, আইনটি বৈষম্যমূলক ও সংবিধান পরিপন্থী। এটি রহিত করতে হবে। আইনের চোখে সবাই সমান বলে সংবিধানে জনগণকে যে অধিকার দেওয়া হয়েছে, সেই চেতনার সঙ্গে আইনটি সাংঘর্ষিক। আইনটি করে বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। আইনটি পাস হওয়ায় রাষ্ট্রের দুর্নীতিবিরোধী এই প্রতিষ্ঠানটি দুর্নীতির প্রমাণ হাতে পেয়েও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গ্রেফতার করতে পারছে না।

দুর্নীতি দমনে দুদক কতটুকু ভূমিকা রাখছে- এ প্রসঙ্গে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুদক সাম্প্রতিককালে কিছুটা সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেছে; কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে আরও কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, সরকার কোনো অন্যায় প্রশ্রয় দেবে না- এটি নিশ্চিত হলে দুর্নীতি দমনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সম্ভব হবে।

মন্তব্য


অন্যান্য