সাক্ষাৎকার

অগ্রাধিকার খাত ১০ সুশাসন ও মানবাধিকার

সব আপসকামিতার ঊর্ধ্বে উঠতে হবে সরকারকে

বিশেষ সাক্ষাৎকার : সুলতানা কামাল

প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

সব আপসকামিতার ঊর্ধ্বে উঠতে হবে সরকারকে

  শেখ রোকন

মানবাধিকার আন্দোলনের নেত্রী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেছেন, সরকার আন্তরিক হলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ত্রুটিগুলো শুধরে নিতে পারে। আগামী নির্বাচনগুলোতেও এসবের পুনরাবৃত্তি এড়াতে পারে। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় মন্ত্রীদের অঙ্গীকারকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, আন্তরিকতা থাকলে সুশাসন ও মানবাধিকারের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে নতুন মেয়াদে সরকার অনন্য উদাহরণ তৈরি করতে পারে। সমকালের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাপটে জনসাধারণের অধিকার ও ভূমিকা গৌন হওয়া চলবে না। তা খোদ প্রশাসনের জন্যও দীর্ঘমেয়াদে কল্যাণকর হয় না। জনসাধারণের জন্য দুর্নীতির জালমুক্ত জীবন ও জীবিকাকে সরকারের নতুন মেয়াদে অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। নারী, সংখ্যালঘু, পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন তিনি। তার মতে সরকারকে সব আপসকামিতার উর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে।

সুলতানা কামাল বলেন, পরবর্তী সব নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করতে হলে বিগত নির্বাচনের ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করতে হবে সবার আগে। ত্রুটিগুলোর যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে ব্যাপারে সরকার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচেষ্ট থাকতে হবে। তবে সবকিছুর আগে স্বীকার করতে হবে যে, বিগত নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেও অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ত্রুটিপূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে সতর্কতা বার্তা উচ্চারিত হওয়া সত্ত্বেও এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্তরা সেগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেননি। বরং আত্মরক্ষামূলক উত্তর ও অজুহাত খাড়া করেছেন।

সমকালের প্রশ্নের জবাবে সুলতানা কামাল বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হওয়া সত্ত্বেও আমরা যে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন পেয়েছি- এ কথা বলা যাচ্ছে না। আমি যেহেতু মানবাধিকার নিয়ে কাজ করি, অনেকে তাদের অভিজ্ঞতার কথা আমাকে জানিয়েছেন। আমার ব্যক্তিগত পরিচিত কয়েকজনও ভোট দিতে গিয়ে নিজের ভোট দিতে পারেননি। পরিচিত কয়েকজন পোলিং অফিসার আমার প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, তারা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেননি। নির্বাচনের আগে-পরে যেসব সংবাদ প্রকাশ হয়েছে, ভোটাধিকারের ব্যাপারে সেগুলো আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। কারণ আমরা চাই, আমাদের পছন্দের রাজনৈতিক দলই জিতুক। কিন্তু দক্ষতা ও সততা বজায় রেখেই তাদের অবস্থান সংহত হোক। আগামী নির্বাচনগুলোতে সেটাই যাতে প্রতিফলিত হয়, এই প্রত্যাশা করি নতুন সরকারের কাছে।

ক্ষমতাসীন ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী মনোনয়নের ধরন নিয়েও সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন তোলেন সুলতানা কামাল। তিনি বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমন কিছু প্রার্থী মনোনয়ন পেয়েছেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনকারী একটি দেশের জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্য হতে পারেন না। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন প্রক্রিয়া এমন যে, সেখানে জনসাধারণের পছন্দ-অপছন্দ, এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোর মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের পছন্দ-অপছন্দেরও জায়গা নেই। ওপর থেকে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়, তাকে নিয়েই নির্বাচনে অবতীর্ণ হতে হয় নেতাকর্মীদের। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রার্থীদের রাজনৈতিক যোগ্যতা, সততা ও নিষ্ঠার পরিবর্তে অন্য অনেক বিবেচনা কাজ করে থাকে। আগামী নির্বাচনে এর পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়।

সুলতানা কামালের মতে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা মাত্রাতিরিক্ত অনুভূত হয়েছে। নির্বাচনের মূল নায়ক ভোটাররা। কিন্তু এবারের নির্বাচনে যেন জনসাধারণ গৌণ হয়ে পড়েছিল।

তিনি বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো অবশ্যই আমাদের শাসন ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এসব বাহিনী গড়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধে জনসাধারণের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার মধ্য দিয়ে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সব বাহিনীর সুনির্দিষ্ট কর্মপরিধি রয়েছে। তার বাইরের তৎপরতা সবসময় যথার্থ হয় না বলে আমি মনে করি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মপরিধি বহির্ভূত ব্যবহার রাষ্ট্র পরিচালনায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তা সবসময় রাষ্ট্র, জনসাধারণ, এমনকি খোদ প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্যও কল্যাণকর হয় না।

সুলতানা কামাল মনে করেন, টানা তৃতীয় মেয়াদে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণকারী আওয়ামী লীগ সরকারের সামনে বেশ কয়েকটি জরুরি কর্তব্য দাঁড়িয়ে গেছে। এসবের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। তিনি বলেন, নতুন সরকারে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের প্রায় সবাই তাদের প্রাথমিক বক্তব্যে পরিস্কারভাবে বলেছেন, তারা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চান। এসব বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, সুশাসন প্রতিষ্ঠার দায়িত্বকে তারা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন।

নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়কে 'যথার্থ উপলব্ধি' হিসেবে স্বাগত জানিয়ে সুলতানা কামাল প্রশ্ন তোলেন- 'সুশাসন' বলতে তারা মানুষের জীবনের কোন কোন দিক নিশ্চিত করতে চাইছেন? তার মতে, এর অর্থ হওয়া উচিত এমন একটি সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে সবাই একটি নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে নিশ্চিন্তে বসবাস করবে। সকালে ঘর থেকে বের হয়ে সন্ধ্যায় নিরাপদে ঘরে ফিরে আসতে পারবে।

সুলতানা কামাল মনে করেন, ব্যক্তি ও সম্পত্তির নিরাপত্তার বাইরেও সুশাসন মানে নির্বিঘ্ন জীবিকা, চলাফেরা এবং মত প্রকাশের অধিকার। তার মতে, নতুন সরকার এমন সব বিষয়ে অগ্রাধিকার দেবে, যাতে করে পথে কর্মঘণ্টার অযথা অপচয় না হয়। বেপরোয়া যানবাহনের দুর্ঘটনায় প্রাণ দিতে না হয়।

গত কয়েক বছরে নানা ফোনালাপ ফাঁস ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘন বলে সুলতানা কামাল মনে করেন। তিনি বলেন, সরকারের নতুন মেয়াদে এ ধরনের কর্মকাণ্ড হ্রাস পাবে। তিনি বলেন- কোথায় কী কথা বললাম, সেই কারণে গুম হবো, না গ্রেফতার হবো, না প্রাণ দেব, সেই দুশ্চিন্তায় যেন নাগরিকদের দিনাতিপাত করতে না হয়।

সুলতানা কামাল বলেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে এদেশের নাগরিকদের পরিশ্রম ও মেধার বিনিময়ে। সরকারের অগ্রাধিকার থাকা উচিত যাতে করে সবাই তাদের উপার্জনের অর্থ দিয়ে মোটামুটি স্বাধীনভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে। স্বল্প হলেও যাতে সঞ্চয় করতে পারে ভবিষ্যতের জন্য। তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় যাতে কোনো দুর্নীতিবাজের কারণে খোয়া না যায়। রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে নাগরিকদের যে অধিকার, দুর্নীতিবাজদের জালে জড়িয়ে সেই প্রাপ্য থেকে সাধারণ মানুষ যেন বঞ্চিত না হয়। কোনো কারণে দুর্নীতির ঘটনা ঘটলেও সুলতানা কামাল আওয়ামী লীগ সরকারের নতুন মেয়াদে দেখতে চান যে, সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের কাছ থেকে দ্রুততার সঙ্গে কার্যকর প্রতিকার পেয়েছে।

সুলতানা কামাল প্রত্যাশা করেন, নাগরিকরা ন্যায় বিচারের প্রত্যাশা যেন হারিয়ে না ফেলে। যেসব মন্ত্রী সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা যেন তাদের দৃষ্টি থেকে হারিয়ে না যায়। যেসব প্রতিশ্রুতি নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা দিচ্ছেন, সেগুলোর বাস্তবায়নে দৃঢ়তা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে নতুন সরকার কতটা প্রস্তুত, সেই প্রশ্ন রাখেন তিনি।

সুলতানা কামাল আশা করেন, নারী কিংবা অন্য কোনো পরিচয়ের কারণে দেশের কোনো নাগরিক যেন নির্যাতিত, নিপীড়িত, অবহেলিত ও বঞ্চিত বোধ না করেন। তিনি বলেন, এটাই মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এটাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মর্মার্থ। সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে সুলতানা কামাল আহ্বান জানান, তারা যেন জনসাধারণের মধ্যে সংখ্যালঘু হিসেবে পরিচিতদের আস্থা অর্জনে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সমতল ও পাহাড়ের আদিবাসীদের উন্নয়ন সাধন ও অধিকার রক্ষায় বিশেষ মনোযোগ দিন। তিনি বলেন, সংখ্যালঘু, আদিবাসীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে উত্থাপিত দাবির মধ্যে রয়েছে তাদের জন্য বিশেষ কমিশন গঠন; তাদের ভূমি সমস্যার সমাধান করা ও আর্থ-সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা। এসব দাবি পূরণে নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তিনি মনে করেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে স্বাক্ষরিত শান্তি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে নতুন সরকার একটি অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে।

সুলতানা কামাল প্রত্যাশা করেন, সরকারকে সব আপসকামিতার ঊর্ধ্বে উঠে এবং সংবিধানের সঙ্গে সরকারের নীতি ও কর্মসূচির সামঞ্জস্য রাখতে অবিলম্বে সব ক্ষেত্রে জাতীয় নারী নীতির প্রতিফলন ঘটানো হবে।

সুলতানা কামাল স্বীকার করেন, সরকারের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবং সবগুলো রাতারাতি মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য ও দৃশ্যমান উদ্যোগের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় সরকারের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা প্রকাশের সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ যে পথে হাঁটা শুরু করেছিল, আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে যে পথ ধরে হাঁটতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, সেই পথে বাধা আসতে পারে। কৌশলগত কারণে কখনও কখনও গতি শ্নথ হতে পারে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের প্রতিজ্ঞা ত্যাগ করে উল্টো পথে হাঁটা কখনোই কাম্য হতে পারে না।

মন্তব্য


অন্যান্য