সাক্ষাৎকার

বাংলা ভাষাকে ধারণ করে রেখেছে বাংলাদেশ: গর্গ চট্টোপাধ্যায়

প্রকাশ : ১২ নভেম্বর ২০১৮ | আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০১৮

বাংলা ভাষাকে ধারণ করে রেখেছে বাংলাদেশ: গর্গ চট্টোপাধ্যায়

গর্গ চট্টোপাধ্যায়

  অনলাইন ডেস্ক

গর্গ চট্টোপাধ্যায়। ইন্ডিয়ান স্টাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এবং ভাষা অধিকার আন্দোলনের কর্মী। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মস্তিষ্ক বিজ্ঞানে পিএইচডি করছেন। থাকছেন কলকাতায়। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ঢাকা লিট ফেস্ট-২০১৮ উপলক্ষে বাংলাদেশে এসেছিলেন গর্গ চট্টোপাধ্যায়। এ সময় তার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সমকালের মিছিল খন্দকার।  

সমকাল: আপনাকে প্রথমেই যে প্রশ্নটা করতে চাই, এই যে বাংলাদেশ বাংলা ভাষাকেন্দ্রিক রাষ্ট্র, অন্যদিকে কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটা রাজ্য। আপনি কথা প্রসঙ্গে বলেছেন যে, কলকাতা তথা বাংলা পুঁজি ও হিন্দি ভাষার আগ্রাসনের শিকার। এখন এ কারণে পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষাভাষীরা কি এক ধরনের আঞ্চলিকতার মধ্যে পড়ে গেছে- আপনার কী মনে হয়?
গর্গ চট্টোপাধ্যায়: এ দেশে সংবিধান অনুযায়ী যেমন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ, আবার পশ্চিমবঙ্গে সংবিধান অনুযায়ী ভাষার ভিত্তিতে ঘটিত রাজ্য রেনডম না। পশ্চিমবঙ্গ ভাষাভিত্তিক রাজ্য ঠিক আছে। ভারতের রাজ্যগুলো অধিকাংশই ভাষার ভিত্তিতে ঘটিত, প্রেক্ষিত কোথাও অনুপস্থিত নয়। কিন্তু আবার পশ্চিমবঙ্গে বাংলা এবং বাঙালি কোণঠাসা হয়ে পড়ছে এটাও ঠিক। কারণ ওখানে পুঁজিবাজার, চাকরি বেশিরভাগই হিন্দিভাষী ও ইংরেজি জানাদের দখলে। এখন অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ যদি অন্য ভাষার মানুষের হাতে থাকে তবে আপনি কোনঠাসা হবেনই। 

সমকাল:
আচ্ছা। তাহলে ওখানে বাংলা ভাষাভাষী লেখকরা কী ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন এর মাধ্যমে?
গর্গ চট্টোপাধ্যায়: তারা লিখছে। তবে পয়সাওয়ালা পাঠক ওই ধরনের বই পাচ্ছে না। কারণ তাদের মন ইংরেজি, হিন্দিতে চলে গেছে। আর এই শ্রেণী কিন্তু বাংলা ছাড়া বাঁচতে পারে। এইখানে যেহেতু অন্য ভাষার আগ্রাসন নেই তাই প্রেক্ষিত অনুযায়ী মূলধারার লোকজন মূলত বাংলা ভাষারই থেকে যাচ্ছে।

সমকাল:
এই যে ঢাকা লিট ফেস্ট নামে ইন্টারন্যাশনাল একটা ফেস্ট হচ্ছে। বাংলা ভাষার লেখক, অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে আপনি এই ফেস্টটাতে বাংলা ভাষার লেখকদের প্রাধান্য কতটা বলে মনে করেন?
গর্গ চট্টোপাধ্যায়: কলকাতায়ও দু'টি লিট ফেস্ট হয়। সেই লিট ফেস্টের স্পন্সর বাঙালি না, বয়ানে বাংলা না, সেই লিট ফেস্টের দর্শন বাঙালি না, সেই লিট ফেস্টের ভবিষ্যৎ বাংলা না, সেই লিট ফেস্টের কল্পনা বাঙালি না। দিল্লিতে, বেঙ্গালুরুতে, চেন্নাইতে যে অর্থে লিট ফেস্ট হয়, কলকাতায়ও হচ্ছে ওই একই অর্থে। অর্থাৎ সেখানে যে মাটির প্রেক্ষিত সেইটা অনুপস্থিত। তার মানে যে, সেখানে বাংলায় সেশন হয় না তা নয়। প্রেক্ষিত আর সেশন হওয়ার তফাৎ আছে। এই যে সামনের যে ছেলেটা জিন্স প্যান্ট পড়েছে সে কিন্ত সাহেব হয়ে যায় নাই। কারণ তার প্রেক্ষিত বদল হয় নাই। ফলে এটা একটা আবরণ। আর ওখানে আমরা দেখি উল্টো। প্রেক্ষিতটাই নেই। এর মূল কারণ হচ্ছে সেখানে হিন্দি সম্রাজ্যবাদের চাপে ও নিপীড়নে বাংলা ও বাঙালি আত্মবিশ্বাস হারিয়েছে। আমরা যখন হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ বলি- এক্ষেত্রে সম্রাজ্যবাদ কোনো একমুখী সাংস্কৃতিক আগ্রাসন না। এটা পুঁজির আগ্রাসন, এটা বাজারের আগ্রাসন, এটা রাষ্ট্রীয় আগ্রাসন- সব রকম। অর্থাৎ আজকে এইখানে ঢাকা লিট ফেস্টে এসে যে স্পন্সর দেখবেন, পর পর যে স্টল বা তাঁবুগুলো করেছে- এসব কিছুর মালিক বাঙালি। এর মানে এই নয় যে, বাংলাদেশে বিদেশি মালিকানার কোম্পানি নাই। কিন্তু মূল বিষয়টা বাঙালির হাতে। বাংলাদেশ বাংলা ভাষাকে ধারণ করে রেখেছে। পুঁজি, বাজার, চাকরি- এই তিনে আমরা যদি ত্রিভূজ বৃত্ত আঁকি, সেখানে বাঙালি মালিকানা, দাপট এবং আধিপত্য যথেষ্ট এখানে। এইটা পশ্চিমবাংলার ক্ষেত্রে ভয়ংকরভাবে অনুপস্থিত। অনুপস্থিত হবার কারণে প্রেক্ষিত বাংলা থাকে না, বাঙালি থাকে না। টাকা আছে, সুদৃশ্য ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল আছে, আমি হয়ত বলবো বাংলা একাডেমির থেকেও অনেক সুন্দর দেখতে জায়গাটা- সেই সেটিংয়ে লিস্ট ফেস্ট আছে। কিন্তু সেই লিট ফেস্টের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ ও তার বাঙালির কোনো হৃদয়ের সংযোগ নাই। 

সমকাল:
আপনি বলতে চাইছেন যে, ঢাকা লিস্ট ফেস্টের সঙ্গে বাংলা ও বাঙালির হৃদয়ের সংযোগ আছে; ইন্টারন্যাশনাল এ ফেস্টের প্রেক্ষিত বাংলা- এটা  প্রতিফলিত হচ্ছে?
গর্গ চট্টোপাধ্যায়: সব জায়গায় প্রতিফলিত হচ্ছেই। যখন কোনো ধর্মীয় বা কোনো পলিটিক্যাল প্রোগ্রাম হয় কিংবা কোনো উৎসব হয়, তখন তাঁবুগুলোর যে ডিজাইনগুলো করা হয় এইখানে যে তাঁবুগুলো তাতে সেই একই ডিজাইনে করা হয়েছে। মানে এর বেশভূষা সবকিছুতেই বাংলাদেশ প্রতিফলিত হচ্ছে। 

সমকাল:
এই ফেস্টে অনেক ইন্টারন্যাশনাল লেখক-শিল্পী এসেছেন, তাদের নিয়ে যেসব সেশন হচ্ছে তার বেশিরভাগই ইংরেজিতে। সেই সঙ্গে অনেক সেশন বাংলায়ও হচ্ছে। কিন্তু বাংলায় যে সেশনগুলো হচ্ছে, ইন্টারন্যাশনাল যারা অ্যাটেন্ড করেছেন তারা তো বাংলা জানেন না, আবার ওইসব সেশনে তাদের উপস্থিতিও থাকে না। তাহলে এই ফেস্টের মাধ্যমে কি আমাদের বাংলা লেখাপত্র তাদের কাছে পৌঁছাতে পারছেন?
গর্গ চট্টোপাধ্যায়: আমি বলবো, এই ধরনের লিট ফেস্টে যেখানে বাংলা আছে, ইংরেজি আছে, বাঙালি আছে, ইংরেজিতে লেখা লোকজন আছে- আসলে এই ধরনের জায়গায় দুটো জিনিস হয়- বাঙালি যায় বিশ্বের কাছে, আর বিশ্ব আসে বাঙালির কাছে। এই দুটো প্রক্রিয়া কিন্তু যুগপথ ঘটতে থাকে।

সমকাল:
বাংলা লেখাপত্র তাহলে কিভাবে ওদের সঙ্গে কমিউনিকেট করবে বা করতে পারে এই ফেস্টের মাধ্যমে?
গর্গ চট্টোপাধ্যায়: আসলে এক্ষেত্রে সবসময় যেটা হয়, সমাজে যে অংশ ইংরেজিতে পারদর্শী তারা এক্ষেত্রে সাঁকো হিসেবে কাজ করে। বৃহত্তর বাঙালি গণসমাজ এবং এই আন্তর্জাতিক বৃত্তটার মাঝে যে শ্রেণীকে আপনি গালি দিতে পারেন আবার চাইলে তাদের একটি সংযোগকারী সাঁকো হিসেবে দেখতে পারেন। এটা আপনার দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে। যে কারণে আমরা দেখতে পারছি, এখানে আগামী প্রকাশনীর পাশেই জামিল কমিক্সের স্টল। এই আগামী প্রকাশনী আর জামিল কমিক্সের কাছাকাছি থাকাটার মাধ্যমে কিন্তু এক ধরণের সংহতিও গড়ে উঠছে।

সংশ্লিষ্ট খবর


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

সব আপসকামিতার ঊর্ধ্বে উঠতে হবে সরকারকে


আরও খবর

সাক্ষাৎকার

অগ্রাধিকার খাত ১০ সুশাসন ও মানবাধিকার

সব আপসকামিতার ঊর্ধ্বে উঠতে হবে সরকারকে

বিশেষ সাক্ষাৎকার : সুলতানা কামাল

প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

  শেখ রোকন

মানবাধিকার আন্দোলনের নেত্রী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেছেন, সরকার আন্তরিক হলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ত্রুটিগুলো শুধরে নিতে পারে। আগামী নির্বাচনগুলোতেও এসবের পুনরাবৃত্তি এড়াতে পারে। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় মন্ত্রীদের অঙ্গীকারকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, আন্তরিকতা থাকলে সুশাসন ও মানবাধিকারের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে নতুন মেয়াদে সরকার অনন্য উদাহরণ তৈরি করতে পারে। সমকালের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাপটে জনসাধারণের অধিকার ও ভূমিকা গৌন হওয়া চলবে না। তা খোদ প্রশাসনের জন্যও দীর্ঘমেয়াদে কল্যাণকর হয় না। জনসাধারণের জন্য দুর্নীতির জালমুক্ত জীবন ও জীবিকাকে সরকারের নতুন মেয়াদে অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। নারী, সংখ্যালঘু, পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন তিনি। তার মতে সরকারকে সব আপসকামিতার উর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে।

সুলতানা কামাল বলেন, পরবর্তী সব নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করতে হলে বিগত নির্বাচনের ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করতে হবে সবার আগে। ত্রুটিগুলোর যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে ব্যাপারে সরকার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচেষ্ট থাকতে হবে। তবে সবকিছুর আগে স্বীকার করতে হবে যে, বিগত নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেও অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ত্রুটিপূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে সতর্কতা বার্তা উচ্চারিত হওয়া সত্ত্বেও এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্তরা সেগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেননি। বরং আত্মরক্ষামূলক উত্তর ও অজুহাত খাড়া করেছেন।

সমকালের প্রশ্নের জবাবে সুলতানা কামাল বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হওয়া সত্ত্বেও আমরা যে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন পেয়েছি- এ কথা বলা যাচ্ছে না। আমি যেহেতু মানবাধিকার নিয়ে কাজ করি, অনেকে তাদের অভিজ্ঞতার কথা আমাকে জানিয়েছেন। আমার ব্যক্তিগত পরিচিত কয়েকজনও ভোট দিতে গিয়ে নিজের ভোট দিতে পারেননি। পরিচিত কয়েকজন পোলিং অফিসার আমার প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, তারা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেননি। নির্বাচনের আগে-পরে যেসব সংবাদ প্রকাশ হয়েছে, ভোটাধিকারের ব্যাপারে সেগুলো আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। কারণ আমরা চাই, আমাদের পছন্দের রাজনৈতিক দলই জিতুক। কিন্তু দক্ষতা ও সততা বজায় রেখেই তাদের অবস্থান সংহত হোক। আগামী নির্বাচনগুলোতে সেটাই যাতে প্রতিফলিত হয়, এই প্রত্যাশা করি নতুন সরকারের কাছে।

ক্ষমতাসীন ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী মনোনয়নের ধরন নিয়েও সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন তোলেন সুলতানা কামাল। তিনি বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমন কিছু প্রার্থী মনোনয়ন পেয়েছেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনকারী একটি দেশের জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্য হতে পারেন না। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন প্রক্রিয়া এমন যে, সেখানে জনসাধারণের পছন্দ-অপছন্দ, এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোর মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের পছন্দ-অপছন্দেরও জায়গা নেই। ওপর থেকে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়, তাকে নিয়েই নির্বাচনে অবতীর্ণ হতে হয় নেতাকর্মীদের। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রার্থীদের রাজনৈতিক যোগ্যতা, সততা ও নিষ্ঠার পরিবর্তে অন্য অনেক বিবেচনা কাজ করে থাকে। আগামী নির্বাচনে এর পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়।

সুলতানা কামালের মতে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা মাত্রাতিরিক্ত অনুভূত হয়েছে। নির্বাচনের মূল নায়ক ভোটাররা। কিন্তু এবারের নির্বাচনে যেন জনসাধারণ গৌণ হয়ে পড়েছিল।

তিনি বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো অবশ্যই আমাদের শাসন ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এসব বাহিনী গড়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধে জনসাধারণের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার মধ্য দিয়ে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সব বাহিনীর সুনির্দিষ্ট কর্মপরিধি রয়েছে। তার বাইরের তৎপরতা সবসময় যথার্থ হয় না বলে আমি মনে করি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মপরিধি বহির্ভূত ব্যবহার রাষ্ট্র পরিচালনায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করতে পারে। তা সবসময় রাষ্ট্র, জনসাধারণ, এমনকি খোদ প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্যও কল্যাণকর হয় না।

সুলতানা কামাল মনে করেন, টানা তৃতীয় মেয়াদে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণকারী আওয়ামী লীগ সরকারের সামনে বেশ কয়েকটি জরুরি কর্তব্য দাঁড়িয়ে গেছে। এসবের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। তিনি বলেন, নতুন সরকারে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের প্রায় সবাই তাদের প্রাথমিক বক্তব্যে পরিস্কারভাবে বলেছেন, তারা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চান। এসব বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, সুশাসন প্রতিষ্ঠার দায়িত্বকে তারা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন।

নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়কে 'যথার্থ উপলব্ধি' হিসেবে স্বাগত জানিয়ে সুলতানা কামাল প্রশ্ন তোলেন- 'সুশাসন' বলতে তারা মানুষের জীবনের কোন কোন দিক নিশ্চিত করতে চাইছেন? তার মতে, এর অর্থ হওয়া উচিত এমন একটি সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে সবাই একটি নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে নিশ্চিন্তে বসবাস করবে। সকালে ঘর থেকে বের হয়ে সন্ধ্যায় নিরাপদে ঘরে ফিরে আসতে পারবে।

সুলতানা কামাল মনে করেন, ব্যক্তি ও সম্পত্তির নিরাপত্তার বাইরেও সুশাসন মানে নির্বিঘ্ন জীবিকা, চলাফেরা এবং মত প্রকাশের অধিকার। তার মতে, নতুন সরকার এমন সব বিষয়ে অগ্রাধিকার দেবে, যাতে করে পথে কর্মঘণ্টার অযথা অপচয় না হয়। বেপরোয়া যানবাহনের দুর্ঘটনায় প্রাণ দিতে না হয়।

গত কয়েক বছরে নানা ফোনালাপ ফাঁস ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘন বলে সুলতানা কামাল মনে করেন। তিনি বলেন, সরকারের নতুন মেয়াদে এ ধরনের কর্মকাণ্ড হ্রাস পাবে। তিনি বলেন- কোথায় কী কথা বললাম, সেই কারণে গুম হবো, না গ্রেফতার হবো, না প্রাণ দেব, সেই দুশ্চিন্তায় যেন নাগরিকদের দিনাতিপাত করতে না হয়।

সুলতানা কামাল বলেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে এদেশের নাগরিকদের পরিশ্রম ও মেধার বিনিময়ে। সরকারের অগ্রাধিকার থাকা উচিত যাতে করে সবাই তাদের উপার্জনের অর্থ দিয়ে মোটামুটি স্বাধীনভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে। স্বল্প হলেও যাতে সঞ্চয় করতে পারে ভবিষ্যতের জন্য। তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় যাতে কোনো দুর্নীতিবাজের কারণে খোয়া না যায়। রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে নাগরিকদের যে অধিকার, দুর্নীতিবাজদের জালে জড়িয়ে সেই প্রাপ্য থেকে সাধারণ মানুষ যেন বঞ্চিত না হয়। কোনো কারণে দুর্নীতির ঘটনা ঘটলেও সুলতানা কামাল আওয়ামী লীগ সরকারের নতুন মেয়াদে দেখতে চান যে, সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের কাছ থেকে দ্রুততার সঙ্গে কার্যকর প্রতিকার পেয়েছে।

সুলতানা কামাল প্রত্যাশা করেন, নাগরিকরা ন্যায় বিচারের প্রত্যাশা যেন হারিয়ে না ফেলে। যেসব মন্ত্রী সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা যেন তাদের দৃষ্টি থেকে হারিয়ে না যায়। যেসব প্রতিশ্রুতি নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা দিচ্ছেন, সেগুলোর বাস্তবায়নে দৃঢ়তা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে নতুন সরকার কতটা প্রস্তুত, সেই প্রশ্ন রাখেন তিনি।

সুলতানা কামাল আশা করেন, নারী কিংবা অন্য কোনো পরিচয়ের কারণে দেশের কোনো নাগরিক যেন নির্যাতিত, নিপীড়িত, অবহেলিত ও বঞ্চিত বোধ না করেন। তিনি বলেন, এটাই মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এটাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মর্মার্থ। সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে সুলতানা কামাল আহ্বান জানান, তারা যেন জনসাধারণের মধ্যে সংখ্যালঘু হিসেবে পরিচিতদের আস্থা অর্জনে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সমতল ও পাহাড়ের আদিবাসীদের উন্নয়ন সাধন ও অধিকার রক্ষায় বিশেষ মনোযোগ দিন। তিনি বলেন, সংখ্যালঘু, আদিবাসীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে উত্থাপিত দাবির মধ্যে রয়েছে তাদের জন্য বিশেষ কমিশন গঠন; তাদের ভূমি সমস্যার সমাধান করা ও আর্থ-সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা। এসব দাবি পূরণে নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তিনি মনে করেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে স্বাক্ষরিত শান্তি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে নতুন সরকার একটি অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে।

সুলতানা কামাল প্রত্যাশা করেন, সরকারকে সব আপসকামিতার ঊর্ধ্বে উঠে এবং সংবিধানের সঙ্গে সরকারের নীতি ও কর্মসূচির সামঞ্জস্য রাখতে অবিলম্বে সব ক্ষেত্রে জাতীয় নারী নীতির প্রতিফলন ঘটানো হবে।

সুলতানা কামাল স্বীকার করেন, সরকারের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবং সবগুলো রাতারাতি মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য ও দৃশ্যমান উদ্যোগের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় সরকারের সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা প্রকাশের সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ যে পথে হাঁটা শুরু করেছিল, আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে যে পথ ধরে হাঁটতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, সেই পথে বাধা আসতে পারে। কৌশলগত কারণে কখনও কখনও গতি শ্নথ হতে পারে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের প্রতিজ্ঞা ত্যাগ করে উল্টো পথে হাঁটা কখনোই কাম্য হতে পারে না।

পরের
খবর

গতি বাড়ানোই আমার লক্ষ্য : পরিকল্পনামন্ত্রী


আরও খবর

সাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকার

গতি বাড়ানোই আমার লক্ষ্য : পরিকল্পনামন্ত্রী

প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন

পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেছেন, ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পের গতি বাড়ানোই হবে তার মূল লক্ষ্য। যারা প্রকল্পগুলোর সঙ্গে যুক্ত তারা সবাই অভিজ্ঞ। তাই গতি বাড়াতে নতুন করে চাকা আবিস্কার করতে হবে না। যে চাকা আছে তার গতি আরও বাড়াতে পারলেই সাফল্য আসবে।

সমকালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, মেগা প্রকল্পে অর্থায়ন একটি বড় বিষয়। অর্থায়ন জোগানের দায়িত্ব অর্থ মন্ত্রণালয়ের। কোন প্রকল্পে কত বরাদ্দ এবং কি পরিমাণে ছাড় হবে, তা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে হয়। কোনো অবস্থাতেই অর্থাভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন ঝুঁকির মধ্যে পড়তে দেওয়া হবে না। যে কোনোভাবেই ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পগুলো গুণগতমান ঠিক রেখেই দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।

এমএ মান্নান বলেন, তিনি দ্রুততার সঙ্গে কাজ করতে পছন্দ করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, গতিই জীবন। তার কাজে এ বিশ্বাসের প্রতিফলন থাকবে। তবে বাস্তবায়নকারী সংস্থাসহ অন্যদেরও জোর প্রচেষ্টা থাকতে হবে। তিনি জানান, নির্ধারিত মেয়াদ ২০১৯ সালে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ করা সম্ভব হবে না। যে কোনোভাবেই ২০২০ সালে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হবে বলে তিনি আশাবাদী। তবে পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও দেরি হবে। কারণ রেল সংযোগের অর্থায়ন নিয়ে জটিলতার কারণে প্রকল্পটি বিলম্বে শুরু হয়েছে। অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে এর বিলম্ব হয়নি। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার আমলতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এটি হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর হারিয়ে যাচ্ছে না উল্লেখ করে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, একসঙ্গে দুই কাজ করতে গেলে সমস্যা হয়। ইতিমধ্যে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপন প্রকল্প অনেক এগিয়ে গেছে। এর বাস্তবায়ন কাজেও গতি বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে সোনাদিয়ার গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপন করা প্রযুক্তিগতভাবে অনেক জটিল হবে। এ কারণে খুব সাবধানে এগোতে হবে।

তিনি বলেন, মেট্রোরেল প্রকল্পটি সময়মতো শেষ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি ছিল। কিন্তু গুলশানে হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার কারণে সম্ভাবনাময় প্রকল্পটির বাস্তবায়ন দুই বছর পিছিয়ে গেছে। একইভাবে জাপানের অর্থায়নে মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণও পিছিয়ে গেছে। পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেন, এলএনজি প্রকল্পটিও পিছিয়ে আছে। এটা নিয়ে তিনি সবার সঙ্গে বৈঠকে করবেন। প্রকল্পটি নিয়ে আমাদের বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের খুব আগ্রহ রয়েছে।

দোহাজারী হতে ঘুমধুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণের কারণে বিলম্ব হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ এ দেশে দীর্ঘদিনের সমস্যা। এ সমস্যা দূর করতে বহু আইন বদলাতে হবে। এটা অনেক দীর্ঘ মেয়াদের কাজ।

পরের
খবর

জঞ্জাল সরানোর এটাই শেষ সুযোগ


আরও খবর

সাক্ষাৎকার

অগ্রাধিকার খাত ৯ সড়ক ও পরিবহন

জঞ্জাল সরানোর এটাই শেষ সুযোগ

বিশেষ সাক্ষাৎকার : ড. সামছুল হক

প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

  রাজীব আহাম্মদ

'তৃতীয় বিশ্বে টানা দুইবার ক্ষমতায় থাকা অনেক বড় ব্যাপার। আওয়ামী লীগ সেখানে টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসেছে। সরকার দাবি করছে, খুবই সবল তারা। রাজধানীর প্রাণঘাতী গণপরিবহনে এ সরকার যদি শৃঙ্খলা ফেরাতে পারে, তা হলে তাদের দাবির যথার্থতা প্রমাণ হবে। এবার যদি পরিবহন খাতের নৈরাজ্য ও অনিয়ম-দুর্নীতি দূর না হয়, তা হলে হয়ত আর কখনোই হবে না; গত কয়েক দশকে ভ্রান্তনীতির কারণে এ খাতে যে জঞ্জালের পাহাড় সৃষ্টি হয়েছে, তা আর কখনোই সাফ করা সম্ভব হবে না।

এটাই শেষ সুযোগ।'


সমকালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক। রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থা, যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন ও মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলেন তিনি।

রাজধানীর সড়কে বিশৃঙ্খলার জন্য বাস্তবতাবর্জিত 'রুট পারমিট'কে দায়ী করেন সামছুল হক। তিনি বলেছেন, ঢাকার মতো মাত্র ৩০৬ বর্গকিলোমিটারের ছোট শহরে রুটের সংখ্যা ২৭৬। এত রুট পৃথিবীর কোনো শহরে নেই। যার যখন ইচ্ছা হয়েছে পরিবহন ব্যবসায় নেমেছেন। নতুন নতুন রুটের অনুমোদন নিয়েছেন। যারা অনুমোদনের দায়িত্বে রয়েছেন, তাদের এ বিষয়ে পেশাগত শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা নেই। তা ছাড়া যিনি চেয়েছেন তাকেই অনুমোদন দিতে হয়েছে রাজনৈতিক চাপেও। রাজধানীতে রুটের সংখ্যা পাঁচ থেকে ছয়ে নামিয়ে আনা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

সামছুল হক বলেন, বাস রুট র‌্যাশনালাইজ পদ্ধতিতে একটি রুটে একটি কোম্পানির বাস চলবে। এতে প্রতিযোগিতা থাকবে না। যাত্রী পেতে রেষারেষি হবে না। ওভারটেক করার প্রবণতা থাকবে না। ঢাকায় রুটের ছড়াছড়ির কারণেই বাসে বাসে রেষারেষি, প্রতিযোগিতা ও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটছে।

রাজধানীতে বাসের রুটের সংখ্যা কমিয়ে এনে 'বাস রুট র‌্যাশনালাইজেশনের' প্রস্তাব করা হয়েছে এক দশক আগে। ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভা থেকে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু এখনও কাজ শুরু হয়নি। সামছুল হক বলেন, বাংলাদেশে সুপারিশের কোনো অভাব নেই। সমস্যা চিহ্নিত করা হয়, সমাধানও চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু বাস্তবায়নের সময় উল্টোপথে হাঁটা হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ যদি বাস্তবায়ন না হয়, তা হলে কার নির্দেশে কাজ হবে!

ঢাকার পরিবহনের দায়িত্বে রয়েছে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ অন্তত এক ডজন সংস্থা। সামছুল হক বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের একটিরও সক্ষমতা নেই। ট্রাফিক বাতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব এমন ব্যক্তির হাতে, যার এ বিষয়ে কোনো পড়াশোনাও নেই, দক্ষতাও নেই। প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে, নয়ত কোনো কাজ হবে না।

এ পরিস্থিতির জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দায়ী করেন সামছুল হক। তিনি বলেন, দেশে উন্নয়নের একটি ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়েছে। সব সংস্থা ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে করতে চায়। কারণ, এগুলো দৃশ্যমান বিশাল অবকাঠামো। এগুলো করলে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত লাভও হয়। তাই বলা হয়, বড় অবকাঠামো মানেই বড় উন্নয়ন। অথচ ব্যবস্থাপনার দিকে কোনো নজর নেই। কোনো টাকা খরচ না করেই বাস রুট পুনর্বিন্যাস, সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত ও লেন পদ্ধতি চালু করার মতো কাজ সম্ভব। এভাবে অর্ধেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। কোনো প্রকল্প নয়, নীতি সংস্কার করে এ কাজগুলো করা সম্ভব।

রাজধানীতে প্রাইভেটকার নিরুৎসাহিত করে গণপরিবহনকে প্রাধান্য দেওয়ার সুপারিশ করা হয় ১৯৯৮ সালের 'ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানে'। কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) ও সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনাতেও (আরএসটিপি) গণপরিবহনকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো হচ্ছে বলে মনে করেন সামছুল হক। তিনি বলেন, এসটিপি ও আরএসটিপিতে গণপরিবহনবান্ধব মেট্রোরেল ও বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) করার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু তা না করে করা হয়েছে ফ্লাইওভার। বিআরটির কাজের গতি নেই। ঢাকায় আটটি ফ্লাইওভার করে প্রাইভেটকারকে উৎসাহিত করা হয়েছে। আটটি ফ্লাইওভার নির্মাণের পরও ঢাকায় গাড়ির গতি গত দেড় দশকে এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। তার মানে ফ্লাইওভার যানজট না কমিয়ে বাড়িয়েছে। অথচ এখনও ফ্লাইওভার বানানোর প্রতিযোগিতা থেকে কর্মকর্তারা বের হতে পারেননি। বিআরটির জন্য নির্ধারিত করিডোরে কাকরাইল থেকে ঝিলমিল পর্যন্ত আরেকটি ফ্লাইওভার করা হয়েছে। ফ্লাইওভার ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে ঢাকা বরং থমকে গেছে।

মহাসড়ক নির্মাণে উচ্চ ব্যয় এবং এর দুরবস্থার জন্যও নীতি দুর্বলতা ও সুশাসনের অভাবকে দায়ী করেন সামছুল হক। সমকালকে তিনি বলেন, পরিবহন খাতের সংস্থাগুলোর মধ্যে একমাত্র সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের দক্ষ ও প্রয়োজনীয় পেশাগত শিক্ষিত জনবল রয়েছে। কিন্তু এ সংস্থাটির জনবলকে কাজে লাগানোই হয় না। মহাসড়ক নির্মাণের মূল দায়িত্ব পালন করে পরামর্শক সংস্থাগুলো। যদিও বাংলাদেশে কোনো ভালো পরামর্শক প্রতিষ্ঠানই আসে না। বরং যেসব পরামর্শক আসে, তাদের কারণে কাজের গুণগত মান রক্ষা করা যায় না। প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন হয় না। ফলে প্রকল্প ব্যয় বাড়তে থাকে। এ কারণে বাংলাদেশে সড়ক নির্মাণ ব্যয় পৃথিবীতে সর্বোচ্চ। মহাসড়কের দুর্বলতার জন্য দীর্ঘ নির্মাণ সময়কে দায়ী করেন সামছুল হক। তিনি বলেন, পাঁচ-ছয় বর্ষা ধরে কাজ করা হয়। কাজ শেষ হতে না হতেই রাস্তা ভাঙতে শুরু করে।

মহাসড়কে নৈরাজ্যের জন্য দায়ী কে?-এমন প্রশ্নের উত্তরে আইন প্রয়োগের দুর্বলতাকে দায়ী করে সামছুল হক বলেন, পৃথিবীর কোনো মহাসড়কের পাশেই স্থাপনা থাকে না। অথচ এ দেশে মহাসড়কের পাশে হাটবাজার, দোকানপাট, রাজনৈতিক কার্যালয়, গাড়িঘর, কারখানা সব রয়েছে। মহাসড়কের পাশে এত ঘন স্থাপনা থাকায় বৃষ্টি হলে রাস্তা থেকে পানি নিস্কাশনের পথই থাকে না। পানি না সরলে রাস্তা ভাঙবেই। মহাসড়কের পাশের জায়গা সরকারি, সেখানকার স্থাপনাগুলো নিশ্চিতভাবেই অবৈধ। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে টাকার দরকার হয় না। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা, সাহস ও রাজনৈতিক সমর্থন। বর্তমান সরকার গণতান্ত্রিক, তারা যদি এ কাজ করতে না পারে তা হলে কে করবে!

সড়কের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সামছুল হক। তিনি বলেন, একটি চাকার ট্রাকের পণ্য পরিবহনের ক্ষমতা ১৫ টন। এ ট্রাককে ২২ টন পণ্য বহনের অনুমতি দিয়েছে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। এর চেয়ে অবৈজ্ঞানিক কাজ আর হতে পারে না। সারা বিশ্বে যদি এই ট্রাক ১৫ টনের বেশি পণ্য বহনের অনুমতি না পায়, বাংলাদেশে কেন পাবে? বলা হয়, ব্যবসায়ীদের চাপে অতিরিক্ত পণ্য বহনের অনুমতি দিতে বাধ্য হয় মন্ত্রণালয়। যদি মন্ত্রণালয়কে ব্যবসায়ীদের চাপই সইতে হয়, তা হলে সরকার থাকার কি দরকার? অতিরিক্ত পণ্যবাহী যানবাহন রাস্তা ভাঙছে, দুর্ঘটনা ঘটছে। মহাসড়কের অধিকাংশ ট্রাক, বাস, কাভার্ডভ্যান, লরির বডি বা নকশা ঠিক না থাকলেও বছরের পর বছর সড়কে চলছে। বিআরটিএ থেকে ফিটনেস সনদ পাচ্ছে! বছর শেষে দাবি করছে, তারা সফল সংস্থা, কারণ সরকারি কোষাগারে হাজার কোটি টাকা জমা দিতে পেরেছে। অথচ বিআরটিএর দায়িত্ব সরকারের জন্য আয় করা নয়, সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষা করা।

সারাদেশে অন্তত ১৫ লাখ অবৈধ যানবাহন চলছে। ইজিবাইক আমদানিতে বাধা না থাকলেও সড়কে চলাচল নিষিদ্ধ। ড. সামছুল হক বলেন, নৈরাজ্যের সবচেয়ে বড় উদাহরণ এটি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যখন ইজিবাইক আমদানির অনুমোদন দিয়েছে তারা চিন্তাই করতে পারেনি এ বাহনটি কী ভয়ঙ্কর সমস্যা তৈরি করবে ভবিষ্যতে। এখন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়, সর্বোচ্চ আদালত থেকে নির্দেশনা দিয়েও কাজ হচ্ছে না। কারণ, হিসেবে বলা হচ্ছে, এসব অবৈধ যান বন্ধ করলে ১০ থেকে ১৫ লাখ মানুষ বেকার হয়ে যাবেন। ২০ বছর পর কী হবে এখনই চিন্তা করতে হবে, কারণ এটাই শেষ সুযোগ।