আন্তর্জাতিক

কলকাতায় বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার পেছনে কোন রাজনীতি

প্রকাশ : ১৬ মে ২০১৯

কলকাতায় বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার পেছনে কোন রাজনীতি

বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙ্গার প্রতিবাদে শিলিগুড়িতে মোমবাতি জ্বালিয়ে বিক্ষোভ— গেটি ইমেজেস

  অনলাইন ডেস্ক

বাংলার নবজাগরণের পথিকৃৎ ধরা হয় যাদের সেই  রাজা রামমোহন রায় বা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরদের মূর্তি গত শতকের সত্তরের দশকে নকশাল আন্দোলনের সময় অনেকবার ভাঙা হয়েছে। নকশাল আন্দোলনের ঘোষিত নীতিই ছিল সেটা।

কিন্তু প্রায় চার দশক পর মঙ্গলবার বিদ্যাসাগরের একটি মূর্তি ভাঙা হয় কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজের ভেতরে।

অভিযোগ উঠছে, বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহর নেতৃত্বে একটি বিশাল মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের একাংশই ওই কলেজে ঢুকে হামলা চালায়, ভাঙচুর করে, মোটরসাইকেলে আগুন দিয়ে দেয় আর তারপর বিদ্যাসাগরের একটি আবক্ষ মূর্তিও ভেঙে ফেলা হয়।

স্থানীয় এবং জাতীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতেও দেখা গেছে, গেরুয়া পোশাক পরিহিত কিছু যুবক উন্মত্তের মতো পাথর ছুঁড়ছে, বাঁশ দিয়ে কলেজের গেটে আঘাত করছে।

বিজেপি অবশ্য বলছে, কলেজের ভেতরে লাগানো ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ফুটেজ প্রকাশ্যে এলেই প্রমাণ হবে যে কারা বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙেছে।

দাবি আর পাল্টা দাবি চলতে থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের একটা বড় অংশের মানুষ বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার ঘটনায় অত্যন্ত ক্ষুব্ধ।

কলকাতার প্রবীণ সাংবাদিক শিখা মুখার্জী বলেন, 'বাঙালীদের মধ্যে চূড়ান্ত রাজনৈতিক বিভেদ থাকতে পারে, কিন্তু একটা জায়গা তো আমরা এক– আমাদের পরিচয় আমরা বাঙালি! আর সেই বাঙালি পরিচয়ের একটা অন্যতম দিক হল বিদ্যাসাগর।'

মূর্তিভাঙ্গার ঘটনার বিরুদ্ধে কলকাতায় বামফ্রন্টের বিক্ষোভ— গেটি ইমেজেস

তিনি বলেন, 'আমরা আজ যা, তা অনেকটাই তার অবদান– সেই বর্ণপরিচয় থেকে যার শুরু। সেই জায়গাটায় যদি কেউ হাত দেয়, তাহলে অত্যন্ত ক্ষোভ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। আর বিজেপির নেতারা বোঝেনইনি যে বিদ্যাসাগর নিয়ে আমাদের সেন্টিমেন্টটা। তাই তাদের পক্ষে ওই মূর্তি ভেঙে ফেলাটা কোনো ব্যাপারই নয় যেন। কেউ বিশ্বাসই করবে না যে তৃণমূল কংগ্রেস ওটা ভেঙেছে।'

নারী আন্দোলনের কর্মী অধ্যাপিকা শাশ্বতী ঘোষ বিদ্যাসাগরের ধর্মনিরপেক্ষতা আর যুক্তি নিরপেক্ষতার বড় সমর্থক। তার কথায়, 'এর আগে সত্তরের দশকেও তো বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা হয়েছে। বাঙালি সংস্কৃতিতে কোনো নতুন ব্যাপার নয়। বিদ্যাসাগরকে কি বাঙালি কোনোদিনই তার প্রাপ্য সম্মান দিয়েছে? তার জীবৎকালেও তো বিদ্যাসাগরের নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে, নানা ভাবে অপমান করা হয়েছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে বলুন, ব্যবসার ক্ষেত্রে বলুন, সতীদাহের প্রশ্নে হোক, বিধবা বিবাহের প্রসঙ্গে হোক বা তার সঙ্গে বাঙালি সমাজ অসদাচরণ করেই এসেছে। তার ব্যক্তিত্বকে বাঙালি সমাজ মেনে নিতে পারে নি কখনই।'

বাঙালি সমাজ কতটা বিদ্যাসাগরকে মেনে নিয়েছে বা সনাতন হিন্দু ধর্ম তার জীবৎকালেও কত দুর্ব্যবহার করেছে, তা গবেষণার বিষয়, কিন্তু ভোট প্রচারের একেবারে শেষ বেলায় কেন বিদ্যাসাগরকে নিয়ে এত তীব্র অশান্তি সৃষ্টি হল?

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশ্বজিত ভট্টাচার্যের কাছে। তিনি বলেন, 'উত্তর ভারতের নানা রাজ্যে বিজেপির যে অ্যাগ্রেসিভ পশ্চার বা আগ্রাসী মনোভাব আমরা দেখি, এখন পশ্চিমবঙ্গেও তাদের সেই মনোভাব লক্ষ্য করছি আমরা। এর একটা মূল কারণ হল, এ রাজ্যে বিজেপির যে নতুন ভোটব্যাংক, তার একটা বড় অংশ প্রাক্তন বামপন্থী কর্মী সমর্থকদের। এই অংশটা মনে করছে বিজেপির সঙ্গে থাকলেই তৃণমূল কংগ্রেসকে উচিত শিক্ষা দেওয়া যাবে।'

'তাই তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর থেকে যে একটা আগ্রাসী অবস্থান নিয়েছিল বামপন্থীদের ব্যাপারে, তারই এখন প্রত্যুত্তর দিচ্ছে পুরণো বামপন্থী ভোটব্যাঙ্ক। দুই তরফেই এই একই স্ট্র্যাটেজি নেওয়া হয়েছে,' যোগ করেন বিশ্বজিত ভট্টাচার্য।

বিজেপি আর তৃণমূল কংগ্রেস– দুই তরফেই দাবি আর পাল্টা দাবির মধ্যে সামাজিক মাধ্যমেও মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকেই ব্যাপক চর্চা চলছে এই ঘটনার। একদিকে যেমন বাংলার বাইরের অনেক মানুষ ফেসবুক টুইটারে প্রশ্ন তুলছেন– কে এই বিদ্যাসাগর, অনেকে গুগল সার্চ করছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাম।

বেশ কিছু তথাকথিত হিন্দুত্ববাদী সামাজিক মাধ্যম প্রোফাইল থেকে আবার রূঢ় ভাষা ব্যবহার করে মন্তব্য করা হচ্ছে যে বিদ্যাসাগর সনাতন হিন্দুধর্ম বিরোধী ছিলেন, কারণ তিনি সতীদাহ প্রথা রদ করা বা বিধবা বিবাহ প্রচলনের মতো কর্মকাণ্ডের পুরোভাগে ছিলেন।

যদিও ওই প্রোফাইলগুলোর মালিকরা সত্যিই হিন্দুত্ববাদী কী না, তা যাচাই করা যায়নি। এই প্রসঙ্গে সাংবাদিক শিখা মুখার্জী বলছিলেন, 'এই যারা হিন্দুত্ব নিয়ে রাজনীতি করে, তাদের তো সনাতন হিন্দু ধর্মের ব্যাপারে বিদ্যাসাগরের মতো পণ্ডিতদের তো সহ্য না করতে পারাটাই স্বাভাবিক। সনাতন হিন্দু ধর্মে অগাধ পাণ্ডিত্য থাকা স্বত্ত্বেও তিনি একের পর এক সমাজ সংস্কারের কাজ করেছেন, নবজাগরণ ঘটিয়েছেন। এজন্য সেই সময়ের তথাকথিত হিন্দু সমাজ বিদ্যাসাগরকে কম অপমান তো করেনি!'

ঘটনা নিয়ে দুই তরফে দাবিপাল্টা দাবি চলতে থাকলেও, অনেকেই মনে করছেন পুলিশ প্রশাসন যদি আরও সক্রিয় হতো, তাহলে হয়তো মধ্য কলকাতার পরিস্থিতি এতটা অশান্ত হয়ে উঠত না মঙ্গলবার। সূত্র: বিবিসি বাংলা

মন্তব্য


অন্যান্য