বিনোদন

‘প্রতিনিয়ত ভাবি নতুন কী করা যায়’

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০১৯ | আপডেট : ১১ জুলাই ২০১৯

‘প্রতিনিয়ত ভাবি নতুন কী করা যায়’

সৈয়দ আবদুল হাদী

  রাসেল আজাদ বিদ্যুৎ

শিল্পের সঙ্গে বসবাস বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদীর। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে সঙ্গীতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন তিনি। কণ্ঠশিল্পীর বাইরে শিক্ষক, প্রযোজক, উপস্থাপক ও অনুষ্ঠান পরিকল্পক হিসেবেও তিনি প্রশংসা কুড়িয়েছেন। শিল্পীজীবনের দীর্ঘ পথপরিক্রমা, অর্জন ও অন্যান্য বিষয়ে কথা হয় তার সঙ্গে

পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে সঙ্গীতের সঙ্গে নিজেকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রেখেছেন। পেছনে ফিরে তাকালে এই দীর্ঘ সফর কেমন বলে মনে হয়?

মনে হয় শিল্পীজীবনের পুরো সফরটা কোনো চলচ্চিত্রের দৃশ্যপট। আমি কখনও শিল্পী হব- এমন ভাবনাও ছিল না। কিন্তু কীভাবে যেন সেটাই হয়ে গেল। কোনো মোহে নয়, কী এক ভালোবাসার আকুলতায় সঙ্গীতের সঙ্গে গড়ে উঠল সখ্য। বেতার, টিভি, চলচ্চিত্র, অ্যালবাম থেকে শুরু করে দেশ-বিদেশের মঞ্চ হয়ে উঠল আপন ঠিকানা। আর সেখানে কাজ করার পর রচিত হতে লাগল নতুন সব গল্প। যার প্রতিটি অধ্যায় ঘটনাবহুল। নতুন কিছু করার প্রত্যয়ে দিনরাত একাকার করেছি, আর তা করতে গিয়েই কত মানুষের সঙ্গেই না গড়ে উঠল বন্ধুত্ব। যারা ছিলেন খুব কাছের। একসঙ্গে যারা পথচলা শুরু করেছি, তাদের অনেকে বিদায় নিয়েছেন পৃথিবী থেকে। তবু এই পথচলা থামেনি। সময়ের সঙ্গে আমিও হেঁটে চলেছি, জানি না আর কতটা পথ পাড়ি দিতে পারব।

শিল্পী হওয়ার কথা না ভাবলেও গানে গানে পেরিয়ে এসেছেন দীর্ঘ পথ। ব্যক্তিজীবনে অনেক ত্যাগও স্বীকার করেছেন। এটা শুধুই গানের প্রতি ভালোবাসা থেকে?

এটা ভাবলে ভুল হবে না যে, গানের জন্যই অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছি। যখন কোনো কিছুর প্রতি অগাধ ভালোবাসা জন্ম নেয়, তখন সেই বিষয়টি থেকে কোনোভাবেই নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা যায় না। আমি যখন অনুভব করেছি, সঙ্গীত বাদ দিয়ে অন্য কিছু করা সম্ভব নয়, তখনই গানকে প্রাধান্য দিয়েছি। গানের জন্যই ছেড়ে দিয়েছি জগন্নাথ কলেজের শিক্ষকতা। ১৯৬৫ সালে বিটিভির অনুষ্ঠান প্রযোজক ছিলাম। অনেকের মতে শীর্ষ চার প্রযোজকের একজন ছিলাম আমি। তবু সেখান থেকে চলে আসতে দ্বিতীয়বার ভাবিনি। কারণ একটাই, কণ্ঠশিল্পী হিসেবে আরও অনেকটা পথ পাড়ি দিতে চেয়েছি। জানতাম, শুধু গান গেয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা সহজ কাজ নয়। এটা অনেক চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু এক পা দু'পা করে হেঁটে যখন এ পর্যায়ে এসেছি, তখন মনে হয়েছে সবকিছু ছেড়ে সঙ্গীত ভুবনে পা রেখে ভুল করিনি। 

কখনও কি মনে হয় শিল্পী হিসেবে কিছু অপূর্ণতা রয়ে গেছে?

মাঝে মাঝেই মনে হয়, আরও অনেক কিছু করার ছিল, যা এখনও করতে পারিনি। এক ধরনের অপূর্ণতা থেকে গেছে আজও। যদিও নাম-যশ-খ্যাতির মোহে কখনও গান করিনি। তারপরও অগণিত মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি, যা আমার কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া। রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি পুরস্কার এবং সম্মাননাও পেয়েছি অনেক। কিন্তু এসব প্রাপ্তির পেছনে কখনও ছুটে যাইনি। অংশ নিইনি প্রতিযোগিতায়। যখন কেউ কোনো গান নিয়ে ভালো লাগার কথা প্রকাশ করেছেন, তখন সেটা আমার কাছে বড় পুরস্কার বলে মনে হয়েছে। শ্রোতার জন্যই তো শিল্পীজীবন বেছে নেওয়া। তাদের জন্যই দিনরাত একাকার করে সঙ্গীতে ডুবে থাকা। তারপরও মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করি, আসলেই কি তাদের প্রত্যাশামাফিক কিছু করতে পেরেছি? না, আরও অনেক কিছুই বাকি রয়েছে, যা এক জীবনে করে শেষ করা যাবে না। কে যেন বলেছিল, 'কোনো শিল্পীর জন্য এক জীবন দীর্ঘ নয়। আরও অনেক জীবন চাই'- এই কথা কতটা সত্যি তা এখন বুঝতে পারি।

শিক্ষক, প্রযোজক ও শিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদীর চিন্তা-চেতনায় বিশেষ কোনো মিল বা পার্থক্য খুঁজে পান?

পেশাগত দিক থেকে কাজের ধরন আলাদা; কিন্তু চিন্তা-চেতনায় কোনো পার্থক্য ছিল- এমন মনে হয় না। যখন শিক্ষকতা করেছি, তখন শিক্ষার্থীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন তা করার চেষ্টা করেছি। যখন বিটিভির প্রযোজক ছিলাম, তখন নতুন কিছু করে দেখানোর চেষ্টা ছিল। কুইজ প্রোগ্রাম, বিজ্ঞাননির্ভর আয়োজন, ভিন্ন আঙ্গিকের সঙ্গীতানুষ্ঠান থেকে নানা ধরনের কাজ করতে চেয়েছি। এখন যাকে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান বলা হয়, সেই তেমনই বিনোদননির্ভর অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেছি। গানের ক্ষেত্রেও চেয়েছি, নিজেকে ভেঙে প্রতিবার নতুন করে উপস্থাপন করতে। 

নতুন কিছু করার প্রয়াসেই কি আবার টিভি অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ও উপস্থাপনায় আসা?

আসলে প্রতিনিয়ত ভাবি নতুন কী করা যায়। সেটা গান, অ্যালবাম, টিভি আয়োজন- যাই হোক না কেন।তবে 'গানে গানে দেশে দেশে' অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেছি মূলত তরুণ শিল্পীদের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দেওয়ার জন্য। তারকা কিংবা প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের তো সুযোগের অভাব নেই। নতুন শিল্পীরা কতটুকু সুযোগ পায় তাদের প্রতিভা তুলে ধরার? এই প্রশ্ন মনকে নাড়া দিয়েছিল বলেই নতুনদের জন্য কিছু করতে চেয়েছি। আর কিছু না হোক অন্তত এই একটি অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তাদের সুযোগ দিতে চেয়েছি। 

'গানে গানে দেশে দেশে'র পাশাপাশি নতুন কোনো আয়োজনের কথা ভেবেছেন? 

পরিকল্পনা তো থেমে নেই। নতুন আর কী আয়োজন করা যায়, তা নিয়ে ভাবতেই থাকি। 'গানে গানে দেশে দেশে' অনুষ্ঠান ছাড়াও আরও ভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান হতে পারে- এটা কেবল কথায় নয়, সময়-সুযোগ পেলে করেও দেখাতে চাই। যদিও অনেকে বয়সের দোহাই দিয়ে নতুন কিছু করার বিষয়ে পিছিয়ে আসেন। কিন্তু আমি সে দলের নই। যদিও মাঝে মাঝে কষ্ট পাই তরুণদের কাছে নতুন কিছু না পেয়ে। তার চেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, নতুনরা অনেকে একই অনুষ্ঠানের আদলে বিভিন্ন আয়োজন সাজাচ্ছেন। এটা দেখে এক সময় নিজেও টিভি আয়োজন থেকে সরে দাঁড়াতে চেয়েছি। কারণ তারা শুধু 'গানে গানে দেশে দেশে' নয়, জনপ্রিয় আরও কিছু অনুষ্ঠানের আদলে টিভি আয়োজন করছে। যেখানে তাদের মৌলিক চিন্তার অভাব স্পষ্ট। অথচ তাদেরই উচিত সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আরও নতুন কী করা যেতে পারে- তার উদাহরণ তুলে ধরা। তবে আমি বিশ্বাস করি, এই দৈন্যতা কেটে যাবে। 

সঙ্গীতাঙ্গনেও কি এই চিত্র চোখে পড়ছে? 

খুঁজতে গেলে প্রতিটি সময়ে কাজের ভালো-মন্দ দুটি দিক চোখে পড়বে। আমাদের সময়ে যে সস্তা ও নকল গান তৈরি হয়নি, তা কিন্তু নয়। আশির দশকে চলচ্চিত্রে প্রচার নকল গান স্থান পেয়েছে। ধীরে ধীরে তা কমে গেছে- এটা আশার কথা। এখন যেটা সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হলো গানের রকমারিতা। প্রায় একই ধাঁচের গান তৈরি হচ্ছে, কোনো ভিন্নতা নেই। সৃষ্টিশীলতা কমে যাচ্ছে। গান যে সাধনার বিষয়, দিনের পর দিন সাধনা করে একে আত্মস্থ করতে হয়- এই কথাটি অনেকে মানছে না। তারকাখ্যাতির মোহ অনেকের পেয়ে বসেছে। তারপরও কিছু ভালো কাজ হচ্ছে। সেটুকু না হলে হয়তো সঙ্গীত ভুবন নীরব নিস্তব্ধ হয়ে যেত। কোনো কিছু একেবারে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার আগে নতুন করে জ্বলে ওঠে। আমাদের গানের ভুবনও নতুন করে প্রজ্বলিত হবে- এই আমার বিশ্বাস। 

মন্তব্য


অন্যান্য