বিনোদন

সুবর্ণার পঞ্চাশ...

প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮ | আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

সুবর্ণার পঞ্চাশ...

সুবর্ণা মুস্তাফা

  মীর সামী

আশির দশকের প্রথম ভাগে প্রথা ভাঙার গল্প নিয়ে নির্মিত 'ঘুড্ডি' কিংবা নব্বই দশকের প্রথম ভাগে ইতিহাস সৃষ্টিকারী 'কোথাও কেউ নেই' ধারাবাহিকের মায়াবী 'মুনা'। অভিনয়ের জন্য ভালোবাসা, আন্তরিকতাই তাকে আজকের অবস্থানে তুলে এনেছে। তিনি আর কেউ নন, সুবর্ণা মুস্তাফা। মাত্র নয় বছর বয়সে শিশুশিল্পী হিসেবে বেতার নাটকে অভিনয় করেন। চলতি মাসে সব্যসাচী এ তারকা অভিনয়ের ৫০ বছর পূর্ণ করলেন। 

বাবা গোলাম মুস্তাফা ছিলেন টিভি নাটক, চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা। আবৃত্তিকার হিসেবেও খ্যাতিমান। মা হোসনে আরাও ছিলেন অভিনেত্রী, নাট্যকার ও রেডিও প্রযোজক। তাই তো জন্মগতভাবেই সুবর্ণা বেড়ে উঠেছেন সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে। ছোটবেলা থেকেই নানা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে তার প্রবল আগ্রহ ছিল। ভিকারুননিসা নূন স্কুল আর হলি ক্রস কলেজে পড়ার সময় এসব কাজে তিনি ছিলেন সবার সেরা। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হন, ততদিনে তিনি হয়ে উঠেছেন টিভি নাটকের পরিচিত মুখ। তারও আগে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন বেইলি রোডের মহিলা সমিতির মঞ্চে। মূলত গত শতকের সত্তর দশকের শেষে তিনি অভিনয়ে নিয়মিত হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে নিজের অভিনয় দক্ষতা দিয়ে জাদুর মতো টানতে শুরু করেন এ দেশের সর্বস্তরের টিভি দর্শককে। 'বরফ গলা নদী', 'হাজার বছর ধরে', 'পারলে না রুমকি' থেকে শুরু করে 'আজ রবিবার', 'কোথাও কেউ নেই'সহ অসংখ্য টিভি নাটক দিয়ে তিনি জয় করেছেন দর্শকচিত্ত। একবাক্যে বলতে গেলে- টেলিভিশনের এক এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী নায়িকা আজও সুবর্ণা মুস্তাফাই। 

শৈশবে সুবর্ণা মুস্তাফা

ছোটবেলার স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হবেন। আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করবেন। কিন্তু রক্তে যার অভিনয়, তার পক্ষে ক্যামেরা-লাইট আর অ্যাকশনের হাতছানি এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। অভিনেতা বাবারও ইচ্ছে ছিল না মেয়ে ছুরি, কাঁচি আর রক্ত নিয়ে দিন-রাত পড়ে থাকুক। ফলে বাবার আগ্রহ আর নিজের অনন্য সাধারণ প্রতিভার কাছে নিজেকে সঁপে দিয়ে কলেজের চৌকাঠ না পেরোতেই অষ্টাদশী সুবর্ণা মুস্তাফা নেমে যান অভিনয়ে। ১৯৭১ সালের আগ পর্যন্ত শিশুশিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালে 'বরফ গলা নদী'তে অভিনয় দিয়ে আবার যাত্রা শুরু। ধীরে ধীরে টেলিভিশনে জনপ্রিয়তা পেতে থাকলেন। একই সময় আফজাল-সুবর্ণা জুটিও জনপ্রিয় হতে থাকল। দর্শকরা পর্দায় তাদের একসঙ্গে দেখতে পছন্দ করত।

আফজাল-সুবর্ণার অনেক নাটকই জনপ্রিয় হয়েছিল, তবে 'পারলে না রুমকি' বাংলাদেশের টিভি নাটকে একটা নতুন মাত্রা নিয়ে এসেছিল। ধীরে ধীরে টেলিভিশনের অনেক কালজয়ী নাটকের সঙ্গেই সুবর্ণা জড়িয়ে ছিলেন। এ দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নাটক ধরা হয় হুমায়ূন আহমেদের 'কোথাও কেউ নেই'। এটি লেখার আগে হুমায়ূন আহমেদ সুবর্ণাকে বলেছিলেন, যদি 'মুনা' চরিত্রটি সুবর্ণা করতে রাজি থাকেন তাহলেই কেবল তিনি নাটকটি নির্মাণ করবেন। 'সংশপ্তক' ধারাবাহিকেও নিজের দ্যুতি ছড়িয়েছিলেন। এ ছাড়া সুবর্ণার উল্লেখযোগ্য নাটক 'অয়োময়', 'বারো রকম মানুষ', 'অচিনবৃক্ষ', 'শিল্পী', 'তুমি', 'ভাঙনের শব্দ শুনি', 'আজ রবিবার', 'কাছের মানুষ', 'ডলস হাউজ', 'আমার বউ সব জানে', 'গহীনে' প্রভৃতি। 

টেলিভিশনের সঙ্গে সঙ্গে সেই সময়ে মঞ্চেও সমান পারফর্ম করে গিয়েছিলেন সুবর্ণা। টানা ২৫ বছর ছিলেন ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গে। তিনি বলেন, 'যখন আমার বয়স ১৪ বছর, সেই সময় বেলাল ভাই [আল মনসুর] বললেন যে, থিয়েটার করবি? আমি বললাম 'হ্যাঁ'। এরপর বিষয়টি ভুলে গিয়েছি। তখন টিভিতে অভিনয় করি। একদিন টেলিভিশনে বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। বেলাল ভাই পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, ও হচ্ছে বাচ্চু মানে নাসির উদ্দীন ইউসুফ। তুই থিয়েটার করবি, বললি না? ও হচ্ছে টিম লিডার। এখনও মনে আছে, বাচ্চু ভাই কেমন একটু বাঁকা হয়ে আমার দিকে তাকাল, আমিও ইকোয়ালি বাঁকাভাবে তার দিকে তাকালাম।

 ১৯৯০ সালে 'কোথাও কেউ নেই' নাটকে আসাদুজ্জামান নূরের সঙ্গে সুবর্ণা

এর বেশ কয়েকদিন পর বেলাল ভাই ফোন করে টিএসসিতে আসতে বললেন। তখন আমি টিএসসি চিনি না। বোবা [বাবা, গোলাম মুস্তাফা] বললেন, চিনিস না আবার কী? রিকশাওয়ালারাও চেনে। ওদের বললেই তোকে নিয়ে যাবে। সময়টা কী সুন্দর ছিল একবার ভেবে দেখুন! রিকশাওয়ালা চেনে বলে বাবা আমাকে একা রিকশায় ছেড়ে দিলেন। ঢাকা থিয়েটারে কাজ শুরু হওয়ার অনেক দিন পর আফজালের [আফজাল হোসেন] কাছ থেকে শুনেছি, ঢাকা থিয়েটারে আমি যেদিন প্রথম যাই, সেদিন সবাই নাকি আমাকে দেখার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। গোলাম মুস্তাফার মেয়ে বলে কথা। অন্যদিকে 'বরফ গলা নদী' করেছে যে সুবর্ণা মুস্তাফা, সেই সুবর্ণা আসছে। সেই সময়ে আমার ঢাকা থিয়েটারের বন্ধুদের ধারণা ছিল, আমি সাইকেল-টাইকেল চালিয়ে যাব। কিন্তু আমি গিয়েছিলাম স্কুল ড্রেস পরে।' 

ঢাকা থিয়েটারে সুবর্ণার প্রথম নাটক ছিল সেলিম আল দীনের 'জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন'। নাটকটিতে অভিনয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "আমি যখন থিয়েটার করতে রাজি হয়েছি। এরপর একদিন বোবা একটা স্যুভেনির এনে হাতে দিলেন। রঙটা মনে আছে, কমলা রঙের। প্রথম জাতীয় নাট্যোৎসব। সেখানে লেখা ঢাকা থিয়েটারের 'জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন' নাটকে ছেলের ভূমিকায় আফজাল হোসেন, মেয়ের ভূমিকায় সুবর্ণা মুস্তাফা অভিনয় করবে। 'জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন' প্রথমে কিছুই বুঝিনি। কিসের জন্ডিস? কিসের বিবিধ বেলুন? কী একটা কথোপকথনের পরে ছেলেটি চিঠি চায়, আমি ব্যাগ থেকে একটা নীল রঙের বেলুন বের করে দিয়ে বলি, এখন থেকে এটাই দেব। নাটকটির সব সংলাপ মুখস্থ করে এসে দাঁড়িয়ে যখন মহড়া করছি- 'এখন থেকে এটাই দেব' বলে আমি তাকিয়ে দেখি বাচ্চু ভাই আর সেলিম আল দীন দু'জনেই ভ্রু উঁচু করে তাকিয়ে ছিলেন। তখন বুঝেছিলাম, মহড়া ভালো হয়েছে। এরপর অভিনয় করলাম 'মুনতাসির ফ্যান্টাসি'। তারপর 'শকুন্তলা' নাটকে মেনকাও করলাম, শকুন্তলাও করলাম। এই নাটকটি করার সময় দারুণ একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল।

সেলিম আল দীনের অত কঠিন বাংলা। কিছুই তো বুঝি না। একদিন পাণ্ডুলিপিটি নিয়ে বোবার কাছে গিয়ে বললাম, একটু তোমার সঙ্গে পড়তে চাই? আর বোবা তখন বলল- কেন? আমার সঙ্গে কেন? সেলিম আল দীন তো তোমাদের দলের। তার সঙ্গে বস, বাচ্চুর কাছে যাও। কাজ যেখানে করছ ওখান থেকে বুঝবে।"

সুবর্ণা মুস্তাফা

১৯৮০ সালে সৈয়দ সালাউদ্দীন জাকীর 'ঘুড্ডি'র মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় তার। এরপরই অভিনয় করেন 'নতুন বউ' এবং 'নয়নের আলো'। 'নতুন বউ' ছবিতে অভিনয়ের জন্য তিনি পার্শ্ব অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পান। যদিও তিনি সে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর নিয়মিত চলচ্চিত্রে অভিনয় না করলেও বিচ্ছিন্নভাবে অভিনয় মূলধারার চলচ্চিত্রে। যেমন 'পালাবি কোথায়', 'লাল সবুজের পালা', 'সুরুজ মিঞা, 'স্ত্রী','কমান্ডার', 'রাক্ষস', 'অপহরণ', 'আজকের হিটলার', 'ফাঁসি', 'শঙ্খনীল কারাগার', 'দূরত্ব, 'হেডমাস্টার', 'খণ্ডগল্প ৭১'। চলচ্চিত্রে তার সর্বশেষ উপস্থিতি ছিল 'গহীন বালুচর'। তার অভিনীত বেশিরভাগ চলচ্চিত্র ব্যবসাসফল হওয়ার পরেও সিনেমায় নিয়মিত না হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, 'শর্টকাটে কোনো কাজ করতে পারি না; যা করি তা শতভাগ ভালোবাসা আর মনোযোগ দিয়ে করি। যে কারণে আমার অভিনীত সিনেমার সংখ্যা কম। সিনেমা করতে আমার আপত্তি নেই। প্রয়োজন ভালো গল্প আর চরিত্র।'

বাংলাদেশে দশকের পর দশক ধরে কয়েক প্রজন্মের প্রিয় অভিনেত্রী হয়ে থাকার বিরল কৃতিত্ব শুধু সুবর্ণা মুস্তাফার। অভিনয়ই শুধু নয়, আবৃত্তিতে দারুণ। অভিনয়ের মতো আবৃত্তিতেও বাবাই তার প্রথম গুরু। নিতান্তই আবেগের বশে যে কলা তিনি শিখতে শুরু করেন অল্পদিনের মধ্যেই সেই আবৃত্তি তার সবচেয়ে প্রিয় শখ হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাশ, উইলিয়াম শেকসপিয়র, জসীম উদদ্‌ীনের কবিতা তার সবচেয়ে পছন্দের। উনিশ শতকের আধুনিক ইংরেজ কবি টিএস ইলিয়টের কবিতা তাকে জাদুর মতো টানে। তার লেখা 'দি ওয়েস্টল্যান্ড' অনেকবার আবৃত্তি করেছেন। 

এ ছাড়া একজন ক্রিকেট ফ্যান হিসেবে ২০১৫ সাল থেকে 'রেডিও ভূমি'তে ধারাভাষ্যকারের কাজটাও করে চলেছেন। শুধু বিনোদন জগতে নয়, একজন সুনাগরিক হিসেবেও নিজের দায়িত্ব সবসময় পালন করে গিয়েছেন তিনি।

আরও পডুন

মন্তব্য


অন্যান্য