শিক্ষা

প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করেও শিক্ষিত হতে চায় ওরা

পাবনার চরাঞ্চল

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করেও শিক্ষিত হতে চায় ওরা

  এবিএম ফজলুর রহমান, পাবনা

বিদ্যালয় বলতে ১৫ ফুট লম্বা ও ১০ ফুট চওড়া চারচালা টিনের ঘর। নেই কোনো চেয়ার বা বেঞ্চ। ছাত্ররা মেঝেতে বসে এবং শিক্ষক দাঁড়িয়ে পাঠদান করেন। ঝড়বৃষ্টি মাথায় নিয়ে দূরের চর থেকে বেশিরভাগ সময় কয়েক কিলোমিটার নৌকায় কিংবা হেঁটেই স্কুলে আসে অধিকাংশ শিক্ষার্থী। সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত এসব শিশুর পড়াশোনা চলে প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে। তারপরও পড়াশোনা করে শিক্ষিত হতে চায় পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের শিশুরা।

বেড়ার দ্বীপচর চরবোরামারা ছিটের মসলেম মিয়ার ছেলে তছির উদ্দিনের (৯) খুব ইচ্ছা উচ্চশিক্ষিত হওয়ার। ছাত্র হিসেবেও বেশ ভালো; কিন্তু চরবোরামারা ছিটের আশপাশে কোনো স্কুল নেই। তাকে যেতে হয় এনজিও পরিচালিত ধলতোবা প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। একই অবস্থা চরগংদিয়ার সাইফুল, চরদেওনাইয়ের রমিছা খাতুন ও চরগংরাজানির সাবানা খাতুনের। প্রবল আগ্রহ থাকার পরও শুধু স্কুল না থাকায় তাদের অনেকে পড়াশোনা করতে পারছে না।

চরনাগদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি কয়েক বছর আগে যমুনায় ভেঙে যাওয়ায় এখন তা নেওয়া হয়েছে তিন চর পরে মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয়ে। শিবালয় এলাকার চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এখন ওই স্কুলে পড়াশোনা করে।

বেড়া উপজেলার নতুনভারেঙ্গা ও পুরানভারেঙ্গা ইউনিয়নের ১১টি চরের শিশু শিক্ষার্থীদের একমাত্র ভরসা ধলতোবা প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়। যমুনা সমাজকল্যাণ সংস্থা নামে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ১০ বছর ধরে নিজ খরচে এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালাচ্ছে। এ স্কুলে বিনামূল্যে লেখাপড়া শিখছে চরাঞ্চলের দুই শতাধিক শিশু শিক্ষার্থী। ধলতোবা প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একমাত্র শিক্ষক রাবেয়া খাতুন জানান, দশম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন তিনি। স্বামীর সঙ্গে বর্তমানে চরে বসবাস করছেন। স্বামী নৌকা চালান। তিনি বলেন, চরের মধ্যে আমিই একমাত্র শিক্ষিত। তাই সবার অনুরোধে আমি বাচ্চাদের পড়াই।

চরবক্তারপুর গ্রামের ছৈমুদ্দিনের ছেলে আমিন (১০) বলে, 'তিন চর নৌকায় পাড়ি দিয়া আমি অ্যাহানে পড়বার আসি। আমার বাবা ঢাকায় মাটি কাটার কাজ করে। আমরা চার ভাইবোন। সবাই ছোট ছোট। বাপ অনেকদিন পরপর বাড়ি আসে। সংসারে অনেক কষ্ট। আমি পড়াশোনা করে বড় হয়ে পরিবারের দুঃখ ঘুচামু।'

যমুনা সমাজকল্যাণ সংস্থার চরাঞ্চলের মাঠকর্মী মো. মশিয়ুর রহমান বলেন, পুরানভারেঙ্গা ও নতুনভারেঙ্গা ইউনিয়নের ১১টি চরে কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। গত ১০ বছর আমরা এ অঞ্চলের কোমলমতি শিশুদের 'হাতেখড়ি' দিতে নিজেদের খরচে কার্যক্রম চালু রেখেছি।

আগবাগশোয়া চরের গণ্যমান্য ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত নুরুল মিয়া বলেন, 'ভোটের আগে চেয়ারম্যান-মেম্বাররা আইছিল। তার পরে আর কোনো খবর নাই। দেড় মাস আগে যে কঠিন বন্যা অইছিল, সব বাড়ি তলায়ে গেছিল। তহনও কেউ খবর নেয় নাই। চরের পড়াশোনার খবর আর নিবো কে?'

গত বুধবার কয়েকটি চরে সরেজমিন গিয়ে জানা যায়, বেড়া উপজেলার নয় ইউনিয়নের মধ্যে ছয়টিই চরবেষ্টিত। এগুলোর মধ্যে নতুনভারেঙ্গা ও পুরানভারেঙ্গা ইউনিয়নের ১১টি চরই দুর্গম। এ ছয়টি চরের লোকসংখ্যা এক লাখ ১৭ হাজার ৮৩৮। এর মধ্যে ৫২ শতাংশ পুরুষ এবং ৪৮ শতাংশ নারী। শিক্ষার হার মাত্র ৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

বেশিরভাগ পুরুষই মাটি কাটা, দিনমজুর ও শ্রমিকের কাজ করেন।

যমুনা সমাজকল্যাণ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মনজেদ আলী বলেন, চরের মানুষের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এখানকার শিশুরা শিক্ষা-স্বাস্থ্যবঞ্চিত, নারীরা প্রসবকালীন স্বাস্থ্য ঝুঁকিসহ নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এনজিওগুলোও আগের মতো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে না। ফলে জেলার অনেক এনজিও বন্ধ হয়ে গেছে।

পুরানভারেঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান এএম রফিকুল্লাহ বলেন, শিক্ষাসহ চরের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে সরকারের নজর দেওয়া উচিত। বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করলে চরের শিশুরা শিক্ষা পাবে, পাশাপাশি চরের মানুষেরও কর্মসংস্থান সম্ভব হবে।

পাবনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা খন্দকার মনছুর রহমান বলেন, চরাঞ্চলে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে অবকাঠামো নির্মাণে কিছু প্রস্তাবনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। চরে যারা শিক্ষকতা করবেন, তাদের বিশেষ ভাতা দেওয়ার বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে।

মন্তব্য


অন্যান্য