শিক্ষা

শিশুরা বলল, শুনলেন নীতিনির্ধারকরা

চাই নির্যাতনমুক্ত শিক্ষাঙ্গন

জাতীয় শিশু ফোরাম সমকাল ও ওয়ার্ল্ড ভিশনের আয়োজন

প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

চাই নির্যাতনমুক্ত শিক্ষাঙ্গন

প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল- সমকাল

  সমকাল প্রতিবেদক

'পড়ালেখা চাপ নয়, আনন্দ। পরীক্ষা যন্ত্রণা নয়, উৎসব'- এমন শিক্ষার স্বপ্ন ওদের চোখে। সেই স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে হাঁটছে ওরা। চাইছে প্রতিষ্ঠিত হোক নির্যাতনমুক্ত নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন। এ স্বপ্নই জাগিয়ে রাখছে ওদের। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দূর হবে শিক্ষার জঞ্জাল- এটাই ওদের প্রত্যাশা। আর সব সময়ের মতো বাঙালির পথিকৃৎ সব ব্যক্তিত্বই তাদের প্রেরণা।

সোমবার রাজধানীর গুলশানের স্পেকট্রা কনভেনশন হলে আয়োজিত 'শিশু সংলাপ'-এ দেশের আইনপ্রণেতাদের যুক্তিতর্ক ও আলোচনার আদলে এসব কথা বলে অর্ধশত শিশু। তাদের কথা গভীর মনোযোগের সঙ্গে শুনেছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। একজন 'শিশু স্পিকারে'র সঞ্চালনায় জাতীয় শিশু ফোরাম, ওয়ার্ল্ড ভিশন ও সমকালের সম্মিলিত উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি ছিল সংসদীয় আবহে সরগরম। 'বরং সংসদের আলোচনা থেকে তোমাদের কথা আরও বেশি প্রাণবন্ত'- এমন স্বীকৃতি এসেছে স্বয়ং শিক্ষা উপমন্ত্রী ও অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের কাছ থেকে।

'শিশুর চোখে মানসম্মত শিক্ষা ও করণীয়' শীর্ষক এ সংলাপে স্বাগত বক্তব্য দেন সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি। আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা, সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) আবু মাসুদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ রফিক উল ইসলাম, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের ন্যাশনাল ডিরেক্টর ফ্রেড উইটিডিন, ইউনিসেফের শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ শাবনাজ জাহেরীন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের উপপরিচালক এম রবিউল ইসলাম ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের দেলোয়ার হোসেন। সঞ্চালনা করে জাতীয় শিশু ফোরামের সদস্য দূর্বার শামিত আদি। অনুষ্ঠানে শিশুরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক পরিস্থিতি, মাদ্রাসা শিক্ষা, শিক্ষকদের পাঠদান, শারীরিক ও মানসিক শাস্তি, বিদ্যালয়ে প্রবেশগম্যতা, কোচিং ক্লাস ইত্যাদি বিষয়ে তাদের খোলামেলা মত তুলে ধরে।

শিশুদের উদ্দেশে শিক্ষা উপমন্ত্রী বলেন, 'তোমরাই আগামীর ভবিষ্যৎ। তোমরা একদিন সম্পদে পরিণত হবে। নেতৃত্ব দেবে দেশ ও জাতিকে। সে জন্য তোমাদের দক্ষ ও যোগ্য করে গড়ে তুলতে সরকার বদ্ধপরিকর। সম্পদের সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে শিক্ষা খাতে বাজেট তাই উত্তরোত্তর বাড়ানো হচ্ছে।'

শিশু-কিশোরদের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার উপবৃত্তি, মিড ডে মিল, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, বহুতল ভবনের ব্যবস্থা করেছে। অতীতের দরিদ্রতাকে ছাপিয়ে সমৃদ্ধির পথে হাঁটছে দেশ।

শিশুদের ওপর নির্যাতন মানা হবে না জানিয়ে শিক্ষা উপমন্ত্রী বলেন, শারীরিক শাস্তি না দিলে শিশুরা বেয়ারা হয়ে যাবে- এমন চিন্তা সঠিক নয়। ভালো-মন্দ যাচাই করার বোধশক্তি শিশুদের মধ্যে জাগ্রত করাই হচ্ছে তাদের জন্য উত্তম 'শাসন'। এসব বিবেচনায় শিক্ষাঙ্গনে শারীরিক শাস্তি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই সর্বপ্রথম মন্ত্রিসভায় বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তবে বিদ্যায়তনে নির্যাতন সমূলে উৎপাটন করতে একটি সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। শিশু ধর্ষণকারী ও যৌন হয়রানিকারীদের শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারেও দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

দেশে পাঠ্যক্রমের মান উন্নত হয়েছে জানিয়ে নওফেল বলেন, এ কারণে বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ শিশুরা সরাসরি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকে ভর্তি হতে পারে। তবে পাঠ্যপুস্তকের মান আরও বাড়ানো হবে। এতে কোচিং নির্ভরতা কমবে।

মুস্তাফিজ শফি বলেন, 'লড়াই করে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি বাঙালির সবচেয়ে বড় প্রাণশক্তি। এভাবেই পেয়েছি ভাষা, স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। শিক্ষার জঞ্জাল দূর করতেও এ পথে হাঁটতে হবে। শিশু-কিশোরসহ সবাইকে যে যার ভূমিকা পালন করতে হবে।'

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা বলেন, যে শিক্ষা প্রজন্মকে যুগোপযোগী করে গড়ে তুলবে, সেটিই মানসম্মত শিক্ষা। স্বাস্থ্য, পুষ্টি, যোগাযোগের মতো বিষয়গুলো সম্পৃক্ত করে শিক্ষাকে মানসম্মত করতে হবে।

টঙ্গীর একটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী রবিউল ইসলাম জানায়, ২০১৮ সালের রমজান মাসের এক রাতে হঠাৎ করেই মাদ্রাসার একটি কক্ষ থেকে কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায়। গিয়ে দেখা যায়, তারেক নামের এক ছাত্রকে শিক্ষক এমনভাবে বেত দিয়ে পিটিয়েছেন যে ছেলেটার হাতের দুই আঙুল ফেটে গেছে। ওর পিঠেও আঘাতের দাগ রয়েছে। এর পর থেকে ছেলেটাকে আর মাদ্রাসায় দেখা যায়নি। এই মারধরের ঘটনায় ছেলেটা লেখাপড়াই ছেড়ে দিয়েছে। দেশের মাদ্রাসাগুলোতেও শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানায় সে।

শিক্ষকরা নিজে শাস্তি না দিয়ে সহপাঠীকে দিয়ে শিক্ষার্থীদের মারধর করায়- এমন অভিযোগ করেছে আরেক ছাত্রী শিখা।

আনিকা জানায়, স্কুলে প্রতিদিন অনেক 'হোমওয়ার্ক' দেওয়া হয়। সাতটি ক্লাসের সাত ধরনের 'হোমওয়ার্ক'। দেখা যায়, অনেক সময় সেই 'হোমওয়ার্ক' করতে করতে তার অবসর ও খেলাধুলার সময়ও চলে যায়। অতিরিক্ত 'হোমওয়ার্ক' না দিয়ে শিক্ষকরা যেন ক্লাসের পড়া ক্লাসেই করিয়ে দেন- এমন দাবি জানায় সে।

ঢাকার শিশু দোলা জানায়, তাদের স্কুল-কলেজগুলোতে মেয়েদের কোনো মাসিক ব্যবস্থাপনা নেই। এর ফলে প্রতি মাসেই মেয়েদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এমনকি দীর্ঘ সময় ক্লাস করতে হয় অব্যবস্থাপনার মধ্যে। তাই এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

'না ডাকলে কোনো কোনো শিক্ষক ক্লাসে আসেন না' বলে অভিযোগ করে সিলেট থেকে আসা শিক্ষার্থী ফুয়াদ।

আরেক শিক্ষার্থী নুসরাত জানায়, স্কুলে অভিযোগ বাক্সের ব্যবস্থা নেই। এমন জায়গায় এটা স্থাপন করা দরকার, যাতে তারা নিঃসংকোচে অভিযোগ তুলে ধরতে পারে।

শিশুদের বক্তব্য শুনে ওয়ার্ল্ড ভিশনের ফ্রেড উইটিডিন বলেন, 'তোমরা ভালো বলেছ। তোমাদের কথা সবাইকে উৎসাহিত করেছে। অনেক কিছু শিখেছি। কথা বলা অব্যাহত রাখতে হবে।'

ইউনিসেফের শাবনাজ জাহেরীন বলেন, শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার্থীরা নিজেদের জন্য 'সেফটি ক্লাব' গঠন করতে পারে। সেখানে নিরাপত্তাজনিত বিভিন্ন বিষয়ে তারা তথ্য আদানপ্রদান করবে। 

শিশুরা যদি কোনো নির্যাতনের শিকার হয়, সে বিষয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে লিখিতভাবে ও টেলিফোনে জানানোর আহ্বান জানান সংস্থার উপপরিচালক এম রবিউল ইসলাম।

রফিক উল ইসলাম বলেন, ইসলাম শিশুদের স্নেহ-ভালোবাসার বিষয়ে নির্দেশনা দিলেও মাদ্রাসাগুলোতে যথাযথভাবে তা অনুসরণ করা হয় না। মূলত ইসলামী শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে এ রকম হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। 

আবু মাসুদ বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তর প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য সহায়ক শিক্ষা উপকরণ তৈরি করছে। তাদের জন্য উপযোগী নীতিমালা ও আইন প্রণীত হয়েছে। 

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের দেলোয়ার হোসেন বলেন, দু-একটি বিদ্যালয়ের শিশু নির্যাতনের ঘটনাকে সারাদেশের চিত্র হিসেবে দেখানো ঠিক হবে না।

মন্তব্য


অন্যান্য