শিক্ষা

ঘুম নেই ছাপাখানায়

 প্রকাশের পথে সাড়ে ৩৫ কোটি পাঠ্যবই

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঘুম নেই ছাপাখানায়

তেজগাঁওয়ের একটি প্রেসে পাঠ্যবই বাঁধাইয়ে ব্যস্ত কর্মীরা- সমকাল

  সাব্বির নেওয়াজ

আগামী শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপার কাজে ব্যস্ত সারাদেশের চার শতাধিক প্রিন্টিং প্রেস। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে এসব বই তুলে দেবে সরকার। ২০২০ শিক্ষাবর্ষে সারাদেশের চার কোটি ২৭ লাখ ৫২ হাজার ১৯৮ ছাত্রছাত্রী বছরের প্রথম দিনেই হাতে পাবে ৩৫ কোটি ৩১ লাখ ৫৪ হাজার ৬৩৮ কপি পাঠ্যবই। এসব বই ছাপতে লাগবে ৮৮ হাজার টন কাগজ। বই মুদ্রণের এ কাজে সরকারের মোট ব্যয় হবে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা।

বরাবরের মতোই আগামী বছরের পহেলা জানুয়ারি শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনে সারাদেশে উদযাপিত হবে পাঠ্যপুস্তক উৎসব। ওই দিন শিশুরা খালি হাতে স্কুলে গিয়ে নতুন ক্লাসে উঠে ঝকঝকে বই নিয়ে ফিরবে বাড়িতে। বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে সময়মতো তাদের হাতে বই তুলে দিতে। গভীর রাতেও প্রিন্টিং প্রেসগুলোর মেশিনের আওয়াজ পাচ্ছেন আশপাশের মানুষ। সারাদেশের প্রায় ৪০০ মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানে (প্রিন্টিং প্রেস) রাত জেগে ৯৮ হাজার কর্মী পাঠ্যবই ছাপা, কাটিং ও বাইন্ডিংয়ের কাজে জড়িত হয়েছেন। এসব বই ছেপে জেলা ও  উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে দিতে কাজ করছে ১৬ হাজার ৪০০ ট্রাক। দেশজুড়ে পাঠ্যবই মুদ্রণ ও পরিবহন কাজের তদারক করছেন জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ২২টি টিমের ৬৬ কর্মকর্তা। এর বাইরেও এনসিটিবির চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় মনিটরিং টিম, এনসিটিবির কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং টিম মিলিয়ে আরও ২১২ কর্মকর্তা-কর্মচারী এই মহাযজ্ঞে শ্রম দিচ্ছেন।

আর তিন মাস পরেই ফুরোবে শিক্ষার্থীদের প্রতীক্ষার পালা। ২০২০ সালের পহেলা জানুয়ারি নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে তারা হাতে পাবে ঝকঝকে নতুন পাঠ্যবই। নতুন বইয়ের সোঁদা গন্ধে মাতোয়ারা শিশুরা উল্লাস করে ফিরবে বাড়িতে। তাদের জন্য সাড়ে ৩৫ কোটি পাঠ্যবই ছাপতে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে এনসিটিবি। তিন কোটি বই এরই মধ্যে ছাপা হয়ে পৌঁছে গেছে জেলা ও উপজেলায়। বাকি বই ছাপার কাজ চলছে দুর্বার গতিতে।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা সমকালকে বলেন, সব বই ছাপার কাজ পুরোদমে চলছে। তিন কোটি বই চলে গেছে মাঠ পর্যায়ে। বাকিগুলোও নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ছাপা হয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ১৫-২০ দিন পর প্রতিদিন এক কোটি করে বই পৌঁছতে শুরু করবে উপজেলা পর্যায়ে। আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যেই সব বই ছাপার কাজ শেষ হবে।

কয়েকটি প্রেস ঘুরে দেখা গেছে, মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহ কার্যক্রম দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। অতীতের যে কোনো বর্ষের তুলনায় অনেক বেশি পরিকল্পিতভাবে ও সাফল্যের সঙ্গে এবার সময়মতো সব বই মুদ্রণ সম্ভব হচ্ছে বলে জানান এনসিটিবির কর্মকর্তারা। মানসম্মত বই ছাপতে এবার আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে এনসিটিবি। সংস্থার চেয়ারম্যান, সদস্য ও অন্য কর্মকর্তারা নিয়মিত সারাদেশের ছাপাখানা পরিদর্শন করছেন। কোথাও কোনো বিচ্যুতির খবর পেলেই ত্রুটি সারাতে ছুটে যাচ্ছেন। এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, 'এবার বইয়ের মান আরও ভালো হচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ে এরই মধ্যে সরবরাহ শুরু হয়েছে। মান রক্ষায় কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।'

এ প্রসঙ্গে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মো. ফরহাদুল ইসলাম বলেন, বইয়ে কাগজের মানের পাশাপাশি এবার বাঁধাইকেও গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ্য করা হচ্ছে। বই বিতরণের পর প্রচুর অভিযোগ আসে, বইয়ের আঠা উঠে বই খুলে যায়। কারণ বাজারে ৯০০ টাকা কেজির গ্লু যেমন আছে, আবার দেড়শ' টাকা কেজির গ্লুও আছে। তাই এবার মুদ্রণকারীদের ভালো মানের গ্লু ব্যবহার করতে বলা হচ্ছে।

এনসিটিবির সদস্য (অর্থ) মীর্জা তারিক হিকমত বলেন, ২০২০ শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের বই ছাপতে সরকারের ৯২৯ কোটি টাকা ব্যয় হবে। মাধ্যমিক ও মাদ্রাসার দাখিল স্তরের বই ছাপতে খরচ হবে ৪৬৯ কোটি টাকা। মাধ্যমিক স্তরের প্রায় আট কোটি বইয়ের কাগজ কিনে দেওয়া হয় এনসিটিবি থেকে। এতে আরও ব্যয় হবে ১৯৭ কোটি টাকা। আর প্রাথমিক স্তরের বই ছাপতে খরচ হবে ২৬৪ কোটি টাকা।

কোন স্তরে কত বই : এনসিটিবি সূত্র জানায়, আগামী শিক্ষাবর্ষের প্রাক-প্রাথমিক স্তরের ৩২ লাখ ৭২ হাজার ১৮৬ কোমলমতি ছাত্রছাত্রীর জন্য ৬৬ লাখ ৭৫ হাজার ২৭৬ কপি বই ছয়টি লটে ছাপানো হচ্ছে। প্রাথমিক স্তরের (প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি) দুই কোটি চার লাখ ৪১ হাজার ৫৯৫ ছাত্রছাত্রী পাবে ৯ কোটি ৮৫ লাখ পাঁচ হাজার ৪৮০ কপি বই। এগুলো ছাপানো হচ্ছে ৯৮টি লটে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ৯৭ হাজার ৫৭২ শিশুর জন্য প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির জন্য পাঁচটি ভাষায় রচিত দুই লাখ ৩০ হাজার ১০৩ কপি বই ছাপানো হচ্ছে একটি লটে। ইবতেদায়ি (মাদ্রাসার প্রাথমিক) স্তরের ৩২ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৫ শিশুর জন্য দুই কোটি ৩২ লাখ ৪৩ হাজার ৩৫ কপি বই ছাপানো হচ্ছে। এর সঙ্গে সারাদেশের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ৭৫০ শিক্ষার্থীর জন্য ছাপানো হচ্ছে ৯ হাজার ৫০৪টি বই। আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে কার্যাদেশ দেওয়া এসব বইয়ের কাগজ ছাপাখানার মালিকরাই কিনে সরবরাহ করবেন।

মাধ্যমিক স্তরে মোট ছাপা হচ্ছে ২৪ কোটি ৭৭ লাখ ৪২ হাজার ১৭৯ কপি বই। এর মধ্যে এনসিটিবি সাত কোটি ৫৮ লাখ ৩২ হাজার ৭৩৭ কপি বইয়ের কাগজ কিনে দিয়েছে। এসব বইয়ের জন্য সংস্থাটি প্রায় ২১ হাজার ৯০০ টন কাগজ কিনে ছাপাখানাগুলোকে সরবরাহ করেছে। বাকি ১৭ কোটি ১৮ লাখ ৯৯ হাজার ৯৩৮ কপি বইয়ের কাগজ ছাপাখানার মালিকরাই কিনে সরবরাহ করছেন।

এর বাইরে কারিগরি স্তরের জন্য ১৬ লাখ তিন হাজার ৪১১ কপি বই, এসএসসি ভোকেশনালের জন্য ২৭ লাখ ছয় হাজার ২৮ কপি ও দাখিল ভোকেশনাল স্তরের জন্য এক লাখ ৬৭ হাজার ৯৬৫ কপি বই ছাপানো হচ্ছে।

এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক ফরহাদুল ইসলাম জানান, ৩২০টি লটে মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবই ছাপার কাগজ কিনেছেন ব্যবসায়ীরা। আর একই স্তরের ৩৪০টি লটের বই ছাপার কাগজ কিনে ব্যবসায়ীদের সরবরাহ করেছে এনসিটিবি নিজে। মোট ২৫৩টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান মাধ্যমিকের বই ছাপার কাজ পেয়েছে। ইতিমধ্যে ৩৪০ লটের প্রায় ৫০ শতাংশ বই ছেপে নির্দিষ্ট উপজেলাগুলোতে সরবরাহ করেছেন মুদ্রণকারীরা।

এ ছাড়া প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার কাজ পেয়েছে ৪৩টি প্রতিষ্ঠান এবং প্রাক-প্রাথমিক বই ছাপার কাজ পেয়েছে চারটি প্রতিষ্ঠান। প্রাক-প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গত ৭ আগস্ট চুক্তিপত্রে সই করেছেন এনসিটিবির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। এই প্রতিষ্ঠানটিও ছাপার কাজ শুরু করেছে।

এবার এনসিটিবির পাঠ্যবই মুদ্রণের কাজ তদারকির দায়িত্ব পেয়েছে 'ব্যুরো ভেরী টাস'। প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই মুদ্রণের জন্য থার্ড পার্টি ইন্সপেকশনের দায়িত্ব পেয়েছে 'কন্টিনেন্টাল' নামের প্রতিষ্ঠান।

খরচ কমেছে ১০০ কোটি টাকা : এনসিটিবির সদস্য (অর্থ) মীর্জা তারিক হিকমত জানিয়েছেন, গতবারের চেয়ে এবারের দরপত্র থেকে তুলনামূলক কম দরে কাজ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এতে সরকারের প্রায় ১০০ কোটি টাকা খরচ কমেছে।

তবে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও প্রাথমিক স্তরে এ বছর দেশের বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠান পাঠ্যবই মুদ্রণের কাজ পায়নি। এর আগে টানা চার-পাঁচ বছর বিদেশি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বই মুদ্র্রণের কাজ পেয়েছিল। তবে দেশীয় ছাপাখানা শিল্পের সক্ষমতা ও দক্ষতা বেড়ে যাওয়ায় এবার সব কাজ দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোই পেয়েছে। বই মুদ্রণের কাজ পাওয়া মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে গত ১৮ আগস্ট থেকে চুক্তিপত্রে সই করছে এনসিটিবি। এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মো. ফরহাদুল ইসলাম সমকালকে বলেন, আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের বইয়ের চুক্তিপত্র সইয়ের মাধ্যমে এ কার্যক্রম শেষ হবে। তিনি জানান, এই স্তরের বইয়ের দরপত্র পুনঃআহ্বান করতে হয় বলে একটু দেরি হয়ে গেছে। তবে সবাই-ই নির্ধারিত সময়ে বই হাতে পাবে।

২০১০ শিক্ষাবর্ষ থেকে সরকার ধারাবাহিকভাবে সাফল্যের সঙ্গে নতুন বছরের শুরুতেই সারাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ করে আসছে। চলতি ২০১৯ সাল পর্যন্ত মোট ২৯৬ কোটি সাত লাখ ৮৯ হাজার ১৭২টি বই বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড প্রতিবছর সরকারের বিশাল এই কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়ন করছে, যা সারাবিশ্বে নজরকাড়া সুনাম বয়ে এনেছে।

মন্তব্য


অন্যান্য