সম্পাদকীয় ও মন্তব্য

আঙুল ফুলে কলাগাছ এবং অতঃপর

দুর্নীতি

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

আঙুল ফুলে কলাগাছ এবং অতঃপর

  মামুনুর রশীদ

একবার এক অফিসে একজন কর্মকর্তাকে দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলতে শুনেছিলাম। বেশ কৌতূহলী হয়েই শুনেছিলাম। কারণ ওই অফিসটিতে দুর্নীতির প্রচুর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলছিলেন। তিনি এও বললেন, এক কাপ চা খাওয়ানোর মতো সঙ্গতি তার নেই। আমি মুগ্ধ হলাম। কিন্তু দু'দিন বাদেই আমার মুগ্ধতা হতাশায় পরিণত হলো, যখন দেখলাম ওই অফিসের সব দুর্নীতির হোতা তিনিই। তার মাধ্যমেই বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে যায় ঘুষ এবং এ ব্যাপারে তিনি খুবই সৎ। যার যতটুকু পাওনা, একেবারেই টাকা-আনা-পাই বুঝিয়ে দেন ওই ব্যক্তি। এক পর্যায়ে তিনি সাময়িকভাবে বরখাস্ত হলেন। তদন্ত হলো এবং তদন্তে বেকসুর খালাস পেয়ে গেলেন। তার একজন সহকর্মী অবশ্য আমাকে বলেছিলেন, কোনো অবস্থাতেই এই লোককে কেউ ঠেকাতে পারবে না। পুনর্বহাল হয়ে তিনি আবার দুর্নীতিবিরোধী বক্তৃতা শুরু করলেন। এবারে আরও জোরেশোরে। কারণ ইতিমধ্যে তদন্তে তিনি দোষী সাব্যস্ত হননি। তিনি অবসরে গেলেন। লম্বা দাড়ি রাখলেন। মসজিদে যাতায়াত ছাড়া সারাদিনে তার আর কোনো কাজ নেই। বছরখানেক পর কপালে কালো দাগ পড়ে গেল। হজব্রত থেকে ফিরে এসে তিনি একজন ধার্মিক হিসেবে জীবনযাপন করলেন। ইতিমধ্যে তিনি ঢাকা শহরে তিনটি ফ্ল্যাট ও বেশ কিছু জমির মালিক হয়ে গেছেন। এ রকম অসংখ্য উদাহরণ সত্ত্বেও বর্তমান সরকার ভাবল- বেতন দ্বিগুণ করে দিলেই দুর্নীতি শেষ হয়ে যাবে। শেষ হওয়া দূরের কথা বরং দুর্নীতির হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। হাজার-লাখ পেরিয়ে এখন দুর্নীতি কোটিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

দুর্নীতি কোনো ইচ্ছাকৃত বিষয় নয়, বরং একটি ব্যবস্থা। যে ব্যবস্থার মধ্য থেকে দুর্নীতি করা ছাড়া উপায় নেই। প্রধানমন্ত্রী ত্যক্ত-বিরক্ত হয়েই অফিসারদের সমাবেশে বলেছেন, আপনাদের তো বেতন বাড়িয়ে দ্বিগুণ করে দিয়েছি। এখনও দুর্নীতি করেন কেন? ওই সমাবেশে ক্ষীণ কণ্ঠেও কেউ প্রতিবাদ করেননি। সরকারের দপ্তর, অধিদপ্তর, করপোরেশন, ব্যাংক- সব জায়গায় দুর্নীতির জাল ছড়িয়ে আছে। কিন্তু শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের জায়গায় আজ থেকে ৩০-৪০ বছর আগে তেমন দুর্নীতির সংবাদ পাওয়া যেত না। কালক্রমে সেসব জায়গায়ও দুর্নীতিতে পাল্লা দিয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে। আমরা যখন স্কুলের ছাত্র ছিলাম, তখন শিক্ষকরা খুব কম বেতন পেতেন। তাই বলে কোচিং করে, স্কুল-কলেজের অর্থ আত্মসাৎ করার ঘটনা কখনও শুনিনি। অনেক জায়গায় এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজপ্রধানদের রীতিমতো শিক্ষক ও ছাত্রদের দ্বারা তিরস্কৃত হতে দেখা গেছে। সেসব স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা সঠিক শিক্ষার প্রতি অনুরাগী হওয়া কোনো কারণই খুঁজে পাবে না। সরকারি প্রাথমিক স্কুলের চাকরির জন্য যে শিক্ষকটি পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন, তার পক্ষে দুর্নীতি, অসদাচরণ বা মিথ্যার বিরুদ্ধে কথা বলাই হবে একটা অস্বস্তি। আর যদি বিন্দুমাত্র বিবেক তার মধ্যে অবশিষ্ট থাকে, তাহলে তার যাতনা সহ্য করা হবে আরও কঠিন।

প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যে দুর্নীতি ধাপে ধাপে ক্রমবিকাশমান, তাকে রুখবে কে? বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যপারে জেনেছি, এখন বেশ স্বচ্ছতা থাকে। কিন্তু পরীক্ষা ছাড়াই উপাচার্যের চিরকুট দিয়ে যে ভর্তি হওয়া যায়, তাও এখন জানা যাচ্ছে। এ সিদ্ধান্তটি যখন কোনো শিক্ষক নেন, তখন শিক্ষার প্রতি ছাত্রদের অনুরাগ ঘৃণায় পরিণত হওয়াই স্বাভাবিক। সেমিস্টার পরীক্ষায় শিক্ষকদের হাতে নম্বর থাকে এবং সেই নম্বরই অনেক দুর্নীতির জন্ম দেয়। শুধু তাই নয়; শিক্ষকদের নানা ধরনের যৌন হয়রানির সংবাদও এখন আর গোপন নেই। স্বাস্থ্য খাতে প্রচুর যন্ত্রপাতি আনতে হয় বিদেশ থেকে। এই কেনাকাটাও একটা বড় ধরনের দুর্নীতির উৎস। হৃদরোগীদের বুকে রিং লাগানোতেও হরহামেশা দুর্নীতি হচ্ছে। সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি থামানোর জন্য ব্যবস্থা ঘোষণা করে থাকে। তাতে দুর্নীতিবাজদের শাপে বর হয়। দেখা যায়, অঙ্কটা দ্বিগুণ হয়ে গেল। আমাদের জীবনের চালচিত্রে পুকুরচুরি, নদীচুরি, সাগরচুরি শব্দগুলো প্রচলিত এবং কোনোটাই অলীক ভাবনা নয়। একেবারে বাস্তব ঘটনা থেকেই এসব শব্দের উৎপত্তি। দেখা গেল, এক জায়গায় একটা বড় জলাশয় বিরাজ করছে। হঠাৎ সেখানে একদিন মাটি ভরাটের ধুম পড়ে গেল। ভাগ্য সুপ্রসন্ন; দিনভর বৃষ্টি হলো দু'দিন। তার পর পাহাড়ি ঢল নেমে আসে। তিন-চার মাস পর ঢল নেমে গেল, বৃষ্টিও থেমে গেল। রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে ৫০ লাখ টাকাও চলে গেল। জানা গেল, জলাশয় ভরাট হয়েছিল এবং পাহাড়ি ঢল আর বৃষ্টিতে সব ধুয়ে-মুছে গেছে। কিন্তু যা রইল তা হলো দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের প্রাসাদপ্রতিম অট্টালিকা। ওই বছর আরও কিছু নদী ও সাগরের উপকূল ভরাটের কাজ হয়েছিল কোটি কোটি টাকার।

কাজেই প্রাসাদ গড়ায় কোনো অসুবিধা হয়নি। মোগল আমলে কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিধান ছিল না। সে কারণে রাজকর্মচারীরা নানাভাবে লুকিয়ে-চুরিয়ে তাদের সম্পদ রক্ষা করতেন। কিন্তু ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে ব্যক্তিগত সম্পত্তির ব্যবস্থা করা হয়। মোগল আমলে দুর্নীতি মুষ্টিমেয় রাজকর্মচারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। আর দুর্নীতির অভিযোগ পেলে কঠোর শাস্তির বিধানও ছিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর সংখ্যালঘু ব্রিটিশরা রাজা-নবাব-জমিদারসহ বিপুল সংখ্যক মানুষকে দুর্নীতির বেড়াজালে আটকে রেখে দেশ শাসন করত। তারা একটি বিচার ব্যবস্থাও চালু করে, যেখানে মোক্তার, পেশকার, উকিল, বিচারক শ্রেণিও গড়ে তোলে। কখনও কখনও প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থের ব্যবস্থা হয়। আইন ব্যবসায়ীরা এবং আইনের সঙ্গে জড়িত সব কর্মচারীও বিস্তর অর্থের মালিক হয়ে ওঠেন। যে কারণে আইনজীবীরাই ব্রিটিশ শাসকদের বিকল্প হয়ে ওঠেন এবং ব্রিটিশের দেওয়া এই কালো কোট বিভক্ত ভারতবর্ষের শাসকগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। দুর্নীতি, আইন, বিচার ও শাসনব্যবস্থা একে অপরের সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হলে এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি যদি থেকে যায়, যদি পার পাওয়া যায় সবকিছুতেই, তবে দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব নয়। সরকারের কাজে এবং অর্থ ব্যয়ের বিষয়টিতে স্বচ্ছতা আনয়ন শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের হাতে না রেখে তাতে আদর্শ নাগরিকদের সম্পৃক্ত হওয়াও অত্যন্ত জরুরি বিষয়।

দুর্নীতির আরও একটি বড় কারণ সমাজে ক্রমবর্ধমান ধন বৈষম্য। যারা বিত্তের সুযোগ পায়নি, তাদের কাছে আদর্শ হয়ে যায় যারা আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। এই সুযোগের অপেক্ষায় সে দীর্ঘদিন বসে থাকবে না। তাই দুর্নীতির কালো পথ খুঁজে খুঁজে সে প্রথম মওকাতেই কিস্তিমাত করে ফেলবে। একবার এই পথ চেনা হয়ে গেলে আর কোনো কথা নেই; তরতর করে দুর্নীতির সিঁড়ি বেয়ে সেও আঙুল ফুলে বটগাছ হয়ে যাবে। আর এই আঙুল ফুলে কলাগাছ ও বটগাছ হওয়ার ফলে অনেক মানুষ বিত্তহীন হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা এর নাম দেবেন সার্ভাইভাল ফর দ্য ফিটেস্ট। অর্থনীতিবিদরা বড় বড় সেমিনারে এ ব্যবস্থাকে একটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কোনো একটি সূত্র দিয়ে প্রমাণ করবেন, এটিই সঠিক। এভাবেই পুঁজিবাদ বিকশিত হয়। আসলে পুঁজির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্কই নেই। কারণ কোনো উৎপাদনের সঙ্গে বিন্দুমাত্র যুক্ত নয় ওই লোকটি। সে এক অন্ধকারের পথ ধরে বিপুল ধন-সম্পত্তির মালিক হয়েছে। আমরা নিজেরাই দেখেছি, একসময় দুর্নীতিবাজ লোকদের সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক এড়িয়ে চলত। বরং আঙুল দিয়ে দেখাত, ওই লোকটা অসৎ পথে বিপুল অর্থের মালিক হয়েছে। কিন্তু আজকে কোটি টাকার গাড়ি থেকে কেউ নামলে তাকে লোকে সালাম দেয়, সামনের চেয়ারটি এগিয়ে দেয় এবং নানা স্তুতিবাক্য দিয়ে তার অন্তর ভরিয়ে দেয়। যদিও সবাই জানে, ওই কোটি টাকার মালিক সে কেমন করে হয়েছে। ওই আসরে সবচেয়ে নীতিবান লোকটি ছেঁড়া স্যান্ডেল পায়ে এক কোণে মোটামুটি উপহাসের পাত্র হয়ে বসে আছে। ওই গাড়ি থেকে নেমে আসা লোকটিও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বক্তৃতা দেবে, উপস্থিত দর্শকরা হাততালি দেবে এবং বক্তৃতা শেষেই লাখ টাকার টেলিফোন থেকে দুর্নীতির নির্দেশ দেবে। এসবের সমাধান ছিল একটি আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থা। সেটাও প্রবল ক্ষয়রোগে পেয়ে এখন ক্যান্সারে পরিণত হয়েছে। এ কথা সত্য জানা যে, সমাজের অধিকাংশ লোক সৎ, ন্যায়নীতিপরায়ণ। রাষ্ট্র কি দুর্নীতিকে উৎখাত করে সৎ মানুষদের মাথা উঁচু করে বাঁচার সুযোগ দেবে? সে আশা কি সুদূরপরাহত?

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

মন্তব্য


অন্যান্য