সম্পাদকীয় ও মন্তব্য

পুলিশ নয়, রাষ্ট্রের ওপরই হামলা

জঙ্গিবাদ

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

পুলিশ নয়, রাষ্ট্রের ওপরই হামলা

  ড. জিয়া রহমান

সম্প্রতি কিছুদিনের ব্যবধানে ঢাকায় পুলিশের ওপর পাঁচটি বোমা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। প্রথমটি গুলিস্তানে, সর্বশেষটি সায়েন্স ল্যাবরেটরির মোড়ে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, সায়েন্স ল্যাবের বোমাটি ছিল রিমোট নিয়ন্ত্রিত। যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে আপাতত স্পষ্ট হওয়া গেছে, এ দুটি ঘটনাই ঘটিয়েছে উগ্রবাদী অর্থাৎ জঙ্গিরা। এর আগে এ ধরনের যেসব ঘটনা ঘটেছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এরই ধারাবাহিকতা বলে আমি মনে করি। এর আগে রাজধানীতেই এমন আরও যে ক'টি ঘটনা গত এক বছরে ঘটেছে সেসব ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, প্রতিপক্ষ হচ্ছে পুলিশ। কিছুদিন আগে শ্রীলংকায় জঙ্গি হামলা হয়ে গেল। ওই হামলার পর আমাদের মনে একটি ধারণা জন্মেছিল, এর বিরূপ প্রভাব বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে পড়তে পারে। বাংলাদেশে জঙ্গিদের অনেকটাই দমন করা গেছে- এটি অসত্য না হলেও একই সঙ্গে এও সত্য, এদের একেবারে নির্মূল করা যায়নি। সাম্প্রতিক পাঁচটি ঘটনার পর ফের জিজ্ঞাসার বিষয় হলো, পুলিশের ওপর কেন এই হামলা। সচেতন জনগোষ্ঠীর এই জিজ্ঞাসা অমূলক নয়। দেশে জঙ্গিবাদীদের অপতৎপরতা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে নিঃসন্দেহে নিয়ন্ত্রিত; কিন্তু তারা আপাতত অসংগঠিত হলেও সংগঠিত হওয়ার জন্য তৎপর রয়েছে, এমন খবরও সংবাদমাধ্যমেরই।

জঙ্গিবাদী প্রপঞ্চটি প্রকৃতপক্ষে একটি বৈশ্বিক বিষয়। সাধারণভাবে জঙ্গিবাদের উত্থানের পেছনে আমরা যে কারণগুলো প্রাধান্য দিয়ে থাকি, সেগুলোও বিশ্নেষণের মধ্যে রাখা প্রয়োজন। যেমন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা, তাদের গোয়েন্দা কার্যক্রম বৃদ্ধি এবং সার্বক্ষণিক জঙ্গি দমন প্রক্রিয়া বা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা। সমাজের মধ্য থেকে যাতে জঙ্গিবাদের বীজের বিস্তার না হতে পারে, সে অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি বা বিভিন্ন সংগঠনকে সচেতন করা। লক্ষণীয়, রাষ্ট্র ও সমাজ- এ দুটি ক্ষেত্র থেকেই জঙ্গিবাদ মোকাবেলার কৌশল উন্নত বিশ্ব খুবই দক্ষতার সঙ্গে বৃদ্ধি করেছে। তবুও এটাই বাস্তবতা যে, জঙ্গি আক্রমণ পৃথিবীর কোনো দেশেই থেমে নেই। আমরা যদি নিকট অতীতে নিউজিল্যান্ডে সংঘটিত বর্বরোচিত হামলার ঘটনাটি বিশ্নেষণ করি তখনও দেখব, এত সতর্কতা ও ব্যবস্থা নেওয়ার পরও সেখানে মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটল। প্রাণহানি ও রক্তপাতের ব্যাপকতাও ভয়ঙ্করভাবেই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় উন্নত-অনুন্নত কিংবা উন্নয়নশীল সমাজে এত কৌশল প্রচেষ্টার পরও থেমে নেই।

এ কারণেই বাংলাদেশের মতো একটি দেশ যেখানে ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমের দুর্বলতা এবং সমাজের মধ্যে অস্থিতিশীলতা তৈরির নানা উপাদান বিদ্যমান থাকলেও গত কয়েক বছরে ইতিবাচক অনেক কিছুই লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো যে দক্ষতার সঙ্গে জঙ্গিবাদ মোকাবেলা করেছে, তাও নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে ইন্টারপোল এ ব্যাপারে আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূয়সী প্রশংসা করেছে। রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-মনস্তাত্ত্বিক উপাদানগুলো পর্যালোচনা করে আমার কাছে তিনটি বিষয় এসব ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে হয়।

এই প্রেক্ষাপট বিশ্নেষণ করতে গেলে প্রথমত যে বিষয়টি সামনে আসে তা হলো, যে ধরনের আঘাত পুলিশের ওপর করা হয়েছে এটা দেখে স্পষ্টতই বোঝা যায়, এ কোনো সাধারণ পরিকল্পনার বহিঃপ্রকাশ নয়। জঙ্গিবাদী হামলা যেহেতু আমাদের দেশে আগেও হয়েছে, এর সঙ্গে তুলনা করে এটা বুঝতে খুব কষ্ট হয় না যে, এ ধরনের হামলার পেছনে জঙ্গিগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার বিষয়টি বেশ গভীরে প্রোথিত। পুলিশ যেহেতু জঙ্গিবাদী হামলা এবং এর উত্থান শক্তভাবে ঠেকিয়ে দিয়েছে, সেহেতু জঙ্গিগোষ্ঠীর প্রধান টার্গেট তারা, তা সহজেই অনুমেয়। দ্বিতীয়ত, পুলিশ বাহিনী রাষ্ট্রের একটি অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। পুলিশের প্রতি আঘাত মানেই রাষ্ট্রের প্রশাসন যন্ত্রের ওপর আঘাত। এমন আঘাত কোনো বেসামরিক আমলা বা সামরিক আমলার প্রতি হলে তাও একইভাবে রাষ্ট্রের প্রশাসন যন্ত্র কিংবা রাষ্ট্রের ওপর আঘাতের সমার্থক হিসেবেই বিবেচনা করা হতো। কাজেই যারা হামলা করেছে (হামলাগুলো যে আঙ্গিকেই হোক), তারা প্রশাসন যন্ত্র কিংবা রাষ্ট্রকে আঘাত করার শক্তি রাখে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের গত কয়েক বছরের রাজনীতির চালচিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীদের যেসব দল ও রাজনৈতিক শক্তি কার্যকর আছে, তারা নানাভাবে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করছে। তাদের মূল লক্ষ্য  হলো যেভাবে হোক এই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা।


এই সরকারবিরোধী অগণতান্ত্রিক শক্তি (অগণতান্ত্রিক শক্তি বললাম এ কারণে, গণতান্ত্রিক চিন্তাচেতনায় সমৃদ্ধ কেউই এমন চিন্তা করবে না) হয়তো এটাও বুঝেছে যে, সরকারের বিরুদ্ধে তাদের সব ষড়যন্ত্র, অগণতান্ত্রিক কার্যক্রম কিংবা অন্যভাবে আঘাত করার অপচেষ্টা পুলিশ ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নস্যাৎ করে দিচ্ছে। তাদের এমন ধারণাও থাকতে পারে, এ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বড় ভূমিকা রয়েছে। কাজেই এসব বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা এবং এ থেকে সৃষ্ট উৎকণ্ঠা এসব বাহিনীর মনোবল ভাঙার পাশাপাশি সরকারকে দুর্বল করে ফেলতে পারে। আমার মনে হয়, এভাবেই তারা একটি রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে। কাজেই এসব ঘটনায় যে বা যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদটা থেকেই যায়। ২ ও ৩ সেপ্টেম্বর সমকাল তাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ ব্যাপারে যে তথ্যচিত্র তুলে ধরেছে, তা আমলযোগ্য বলে মনে করি। এমন ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম যাতে অন্ধকারে ঘুরপাক না খায়, এদিকে নজর দিতে হবে।

এমন হামলার পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকাও বিচিত্র নয়। তবে এ থেকে যদি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সরকারের প্রতিটি স্তরে সতর্কতা কিংবা নজরদারির মাত্রা না বাড়ে এবং নিরাপত্তা চাদর নতুন করে না বিছায়, তবে অপশক্তি আরও বড় কোনো ঘটনা ঘটাতে পারে। জঙ্গিবাদ পুরোপুরিভাবে নির্মূল করতে উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করলেও এ থেকে কিন্তু কেউই রেহাই পায়নি। আমাদের তো অনেক মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতাই আছে। আমাদের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমলে নিয়ে এখানকার পরিস্থিতি আমাদের মতো করে পর্যবেক্ষণ করতে হবে, যথাযথ ব্যবস্থার পথ বাতলাতে হবে। কাজেই বিষয়গুলো আমলে রেখেই শক্তিশালী পরিকল্পনার ছক কষতে হবে, কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয়ে সরকার নজর রাখতে পারে- প্রথমত, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রো-অ্যাক্টিং পুলিশি কার্যক্রম জোরদার করা। মানে আরও বেশি দীর্ঘমেয়াদি গোয়েন্দা কার্যক্রম বাড়ানো; দ্বিতীয়ত, গোয়েন্দাদের সামর্থ্য বাড়ানো এবং ত্বরিত অ্যাকশন নেওয়া। হলি আর্টিসান ঘটনার পর আমরা যেসব নতুন প্রতিষ্ঠান গড়েছি এর সামর্থ্য বৃদ্ধির মধ্য দিয়েই জঙ্গিবাদ মোকাবেলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন ঘটানো প্রয়োজন।

যেহেতু এখন পর্যন্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর মধ্যে প্রো-অ্যাক্টিং পুলিশি ধারণা সীমিত, সেহেতু তা বিভিন্ন পর্যায় থেকে বৃদ্ধি করা জরুরি। এর একটি পদক্ষেপ হতে পারে জঙ্গি দমনে রাষ্ট্রের যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, তাদের মধ্যে সমন্বয়ে জোর দেওয়া। সেনা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইর একটি টেররিজম সেল, র‌্যাব, কাউন্টার টেররিজম ইউনিট, সোয়াট- এই বাহিনীগুলোর মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন সমন্বয় কিংবা যোগাযোগ এবং তথ্য আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে কার্যক্রম জোরদার করা। একটি বাহিনীর গোয়েন্দা ইউনিটের কাছে যে তথ্য আছে, তা অন্য ইউনিটের গোয়েন্দাদের কাছে নাও থাকতে পারে। কাজেই তাদের মধ্যে যদি তথ্যের আদান-প্রদান হয় এবং সমন্বয়ের কাজটি যদি হয় আরও নিবিড়, তাহলে সামগ্রিকভাবে আমরা এর সুফল পাব।

মূল কথা হলো, জঙ্গি দমনে সরকার ও আইন-শৃঙ্খরা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সফলতা থাকলেও এতে আত্মতুষ্টিতে ভোগার কারণ নেই। যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে, তারা নতুন নতুন ব্যানারে সংগঠিত হয়ে তাদের অপকৌশলের মাধ্যমে সমাজে আবার অশান্তির দাবানল জ্বালাতে পারে।

কাজেই কোনো ঘটনাকেই ছোট হিসেবে না দেখে কিংবা উদাসীনতা প্রদর্শন না করে এ ধরনের যে কোনো ঘটনাই জঙ্গিবাদের হুমকি হিসেবে বিবেচনায় রাখা উচিত। এ থেকে নতুন নতুন প্রো-অ্যাক্টিভ ধারণা-চিন্তার মধ্য দিয়ে জঙ্গি দমনের ধারাবাহিকতা জোরদার করা যেতে পারে।

অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, ক্রিমিনোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও  সমাজবিজ্ঞানী

মন্তব্য


অন্যান্য