অর্থনীতি

দায়ীদের চিহ্নিত করতে গোয়েন্দারা মাঠে

চামড়া সিন্ডিকেট

প্রকাশ : ১৬ আগষ্ট ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

দায়ীদের চিহ্নিত করতে গোয়েন্দারা মাঠে

  সাহাদাত হোসেন পরশ

কোমরে গোঁজা থাকত পিস্তল। ওই অস্ত্রের একটি অংশ বের করে রাখত পাড়া-মহল্লার ছিঁচকে মাস্তানরা; যাতে সাধারণ মানুষ তা দেখে ভয় পায়। ঈদের দিন এমন স্টাইলে মোটরসাইকেলে অনেক এলাকায় ঘুরত মাস্তানরা। তাদের টার্গেট ছিল কাঁচা চামড়া কেনা নিয়ে যেন প্রতিপক্ষের মধ্যে ভীতি তৈরি করতে পারে। এলাকার সব চামড়া কিনে নিজেদের হেফাজতে নিতে পারে। এমন অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন রাজধানীর মিরপুরের মনিপুরের স্থানীয় এক বাসিন্দা। একইসঙ্গে তিনি আক্ষেপ করে বললেন, এক সময় চামড়া কেনা নিয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল। আবার অনেকে স্থানীয় মাদ্রাসা, এতিমখানা ও মসজিদে কাঁচা চামড়া দিতেন। যাতে ওই চামড়া বিক্রি করে এতিম ও দুস্থরা জীবনের ব্যয় নির্বাহ করতে পারে। তবে এবার দেখা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য। কোরবানির চামড়া হঠাৎই হয়ে গেল তুচ্ছ বস্তু!

দিন দিন চামড়াজাত পণ্যের দাম বাড়লেও কাঁচা চামড়ার দাম অপ্রত্যাশিতভাবে পড়ে যাওয়ার বিষয়টি যে স্বাভাবিক নয়, এটা বলছেন সবাই। আর যারা সিন্ডিকেট করে চামড়ার বাজারদর এমন অস্বাভাবিক জায়গায় এনেছে তাদের ব্যাপারে তদন্তসাপেক্ষে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলছেন সংশ্নিষ্টরা। তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দুস্থ ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের পথে বসিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার আয়োজন করেছে। এটাকে তারা বলছেন, 'ইকোনমিক ব্ল্যাকমেইল'। এই সিন্ডিকেটে কারা জড়িত তা শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরই মধ্যে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা চামড়া সিন্ডিকেটের সদস্যদের শনাক্ত করতে মাঠে নেমেছে। সমকালের সঙ্গে আলাপকালে গতকাল বৃহস্পতিবার চামড়া খাতের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন তাদের ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছেন- এটা তারা জানতে পেরেছেন। অনেক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথাও বলেছেন। এ ছাড়া কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে রোববার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হবে। সেখানে চামড়া খাতের সংশ্নিষ্ট সবাই উপস্থিত থাকবেন।

জানতে চাইলে র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ সমকালকে বলেন, চামড়া নিয়ে যা ঘটেছে তা ক্রাইম। এটা গুরুতর 'ইকোনমিক ব্ল্যাকমেইল'। সরকার নির্ধারিত দামে ব্যবসায়ীদের চামড়া কেনা উচিত ছিল। এই চামড়ার সঙ্গে অনেক মানুষের ভাগ্য জড়িত। জাতীয় স্বার্থে চামড়াশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হবে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ইকোনমিক ক্রাইম বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, কোনো আড়তদার বা ব্যবসায়ী যদি হঠাৎ দাম কমিয়ে এবং বাড়িয়ে ছলচাতুরির মাধ্যমে অর্থ আয়ের চেষ্টা করেন তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। চামড়া নিয়ে কারসাজির ঘটনা খতিয়ে দেখার সুযোগ রয়েছে।

ঢাকায় চামড়া কেনা-বেচার বড় আয়োজন চলে পুরান ঢাকায়। সেখানে রয়েছে অনেক আড়ত। তাই এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে গতকাল পুলিশের লালবাগ বিভাগের ডিসি মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, প্রকৃত মূল্য না পেয়ে পোস্তা এলাকায় অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া রাস্তায় ফেলে গেছেন। যাওয়ার সময় তারা কান্নাকাটি করেছেন। তবে কেউ পুলিশের কাছে কোনো অভিযোগ করেননি। তিনি আরও বলেন, ঈদের আগে চামড়া ব্যবসায়ীরা পুলিশের কাছে এসেছিলেন। তাদের দাবি ছিল, যাতে ঈদের সময় লালবাগ এলাকায় চামড়ার ট্রাক বা অন্য গাড়ি ঢুকতে কোনো সমস্যা না হয়। এ ছাড়া চামড়া যেন ঢাকার বাইরে পাচার হতে না পারে। ওই দুই ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা তাদের জানানো হয়। শেষ পর্যন্ত কোনো চামড়ার ট্রাক ঢাকার বাইরে গেছে এমন কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএইচএসএমএ) মহাসচিব টিপু সুলতান সমকালকে বলেন, এবার কাঁচা চামড়া নিয়ে যে নজিরবিহীন নৈরাজ্য হয়েছে এর দায় ট্যানারি মালিকদেরই নিতে হবে। তাদের কাছে তিনশ' কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। ঈদের আগের দিন হঠাৎ তারা ঘোষণা দেন বকেয়া অর্থ দিতে পারবেন না। এতে অর্থ সংকটে পড়েন আড়তদাররা। চোখের সামনে শত শত চামড়া থাকলেও তা কিনতে না পারার যন্ত্রণা কীভাবে সইব। তিনি আরও বলেন, দেশের ইতিহাসে চামড়া নিয়ে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি আগে কখনও তৈরি হয়নি। অবশ্যই এর সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় নিতে হবে। একটি তদন্ত কমিটি হওয়া উচিত। তদন্ত শেষে দায়ীদের আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।

মাত্র তিনশ' কোটি টাকার জন্য চামড়ার এমন দরপতন হবে কেন- এমন প্রশ্নে টিপু সুলতান বলেন, ঈদের আগে একেকটি গরুর চমড়া ৪০০-৫০০ টাকায় কেনা হয়েছে। তবে মান ভালো হওয়ায় ঈদের সময় চমড়ার দাম প্রতি বছরই একটু বাড়ে। এবার সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কেনার প্রস্তুতি থাকলেও ট্যানারি মালিকদের কারসাজিতে সব পণ্ড হয়েছে। হঠাৎ করে চামড়া কেনার এত টাকা কোথায় পাবেন আড়তদাররা। যতক্ষণ টাকা ছিল ততক্ষণ চামড়া কিনেছেন তারা।

ট্যানারি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহিন আহমেদ বলেন, বকেয়া টাকার দোহাই দিয়ে ঈদে চামড়ার বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছেন আড়তদাররা। তারা দাম কমিয়ে আড়তে চামড়া মজুদ করেছেন। আবার সরকারও নজরদারি জোরদার করেনি।

গোয়েন্দারা সংস্থার সদস্যরা এরই মধ্যে সন্দেহভাজনদের কল রেকর্ড ও অন্যান্য যোগাযোগ খতিয়ে দেখতে শুরু করেছেন। এ ছাড়া তাদের ব্যাংকিং লেনদেন-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করা হবে। চামড়া শিল্পে বিনিয়োগের কথা বলে অন্যত্র অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটেছে কি-না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

দেশে বছরজুড়ে যে সংখ্যক পশু জবাই হয় তার অর্ধেক হয় ঈদুল আজহায়। সরকারি হিসাবে এবারও প্রায় সোয়া কোটি পশু জবাই করা হয়েছে। যারা কোরবানি দেন তাদের কাছ থেকে কাঁচা চামড়া কেনেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। এরপর তারা তা পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। পাইকাররা সেই চামড়ায় লবণ দিয়ে সংরক্ষণের প্রাথমিক কাজ সেরে ট্যানারিতে বিক্রি করেন।

সংশ্নিষ্টরা জানায়, বেশ কিছু ট্যানারি মালিক ঋণখেলাপি হয়ে আছেন। ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় অনেকেই এবার নতুনভাবে ঋণ পাননি। তাই চামড়া কেনার জন্য তারা আড়তদারদের অর্থ দিতে পারেননি। তবে অনেক ট্যানারির মালিক এক খাতে ঋণ নিয়ে অন্য খাতে ব্যবহার করেছেন। সব মিলিয়ে ট্যানারি খাতের ব্যবসায়ীরা অনেক বছর ধরেই ব্যাংকিং লেনদেন-সংক্রান্ত তাদের সুনাম হারিয়েছেন। ক্রিসেন্টের ঘটনার পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।

চামড়া শিল্প একটি চেইনের মতো। সেখানে সবার ওপরে রয়েছেন ট্যানারি মালিকরা। তারা দাম কম দিলে অন্যরা কম দিতে বাধ্য হন। এর প্রভাব পড়ে আড়তদার, মৌসুমি ব্যবসায়ীদের ওপর। কয়েক বছর ধরে বিশ্ববাজারে চামড়ার মূল্য কম- এই অজুহাতে ট্যানারি মালিকরা চামড়ার দাম কমিয়ে দিয়েছেন।

প্রতি বছর কোরবানির পশুর চামড়া বা চামড়া বিক্রির অর্থ মাদ্রাসা, এতিমখানা ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী পেয়ে থাকে। এ ছাড়া মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও লাভের আশায় চামড়া কেনেন। এবার মৌসুমি ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত। চামড়ার অর্থ থেকে বঞ্চিত হয়েছে এতিমখানা, মাদ্রাসাসহ দরিদ্র মানুষ। মূল্য না পেয়ে অনেকে নদী-খাল ও ময়লার ভাগাড়ে কাঁচা চামড়া ফেলে দিয়েছেন। তবে এবার চামড়া নিয়ে নৈরাজ্যকর ঘটনার ব্যাপারে পরস্পরকে দুষছেন আড়তদার ও ট্যানারি মালিকরা।

মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে চামড়ার মূল্যে ধস নামিয়েছেন। তারা বলছেন, কম দামে চামড়া কিনে লাভের গুড় পুরোটা পকেটে নেওয়ার আয়োজন করেছেন আড়তদার ও ট্যানারি মালিকরা। এবার গরুর কাঁচা চামড়ার দাম ঢাকায় নির্ধারণ করা হয় প্রতি বর্গফুট ৪৫-৫০ টাকা। ঢাকার বাইরে ৩৫-৪০ টাকা। সারাদেশে খাসির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় প্রতি বর্গফুট ১৮-২০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় প্রতি বর্গফুট ১৩-১৫ টাকা।

মন্তব্য


অন্যান্য