অর্থনীতি

অবৈধভাবে বেচাকেনা বাড়ছে

আড়াই বছরে অর্ধশতাধিক উদ্যোক্তা-পরিচালক বিনা ঘোষণায় ৩০০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন

প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

অবৈধভাবে বেচাকেনা বাড়ছে

  আনোয়ার ইব্রাহীম

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের ঘোষণা ছাড়া শেয়ার কেনাবেচা বেড়েই চলেছে। আইনে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, ঘোষণা ছাড়া উদ্যোক্তা-পরিচালকরা শেয়ার বিক্রি করতে পারবেন না। কিন্তু সমকালের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত আড়াই বছরে অন্তত ৫৮ উদ্যোক্তা-পরিচালক বিনা ঘোষণায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) তাদের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় এমন অবৈধ শেয়ার কেনাবেচা বাড়ছে। মালিকরা এভাবে ঘোষণা ছাড়া গোপন শেয়ার বিক্রি করায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা।

জানা গেছে, গত আড়াই বছরে সিএনএটেক্স, ফ্যামিলিটেক্স এবং এমারেল্ড অয়েলের মতো রুগ্‌ণ কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকরা তাদের অধিকাংশ শেয়ার বিক্রি করেছেন। বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ সিএনএটেক্স এবং এমারেল্ড অয়েলের। বর্তমান কমিশনের অনুমোদনেই গত তিন থেকে পাঁচ বছরে কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। গত এক বছর সিএনএটেক্স শেয়ারহোল্ডিং তথ্য দিচ্ছে না। ফলে এর মালিকপক্ষ কতটা শেয়ার বিক্রি করে বের হয়ে গেছে, তাও জানা সম্ভব হচ্ছে না।

বিশ্নেষকরা জানান, কোম্পানিগুলো লোকসানি হওয়ায় এবং পরিস্থিতি উত্তরণে কোনো পথ না থাকার কারণেই হয়তো তারা শেয়ার বিক্রি করে থাকতে পারেন। আবার শেয়ার  কেনাবেচার মাধ্যমে মুনাফা করতেও এমন শেয়ার কেনাবেচা করেন তারা।

আইন অনুযায়ী, হিসাব বছর শেষ হওয়ার দুই মাস আগে থেকে লভ্যাংশ ঘোষণার আগ পর্যন্ত উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার কেনাবেচার সুযোগ নেই। অন্য সময় শেয়ার কেনাবেচা করতে আগাম ঘোষণা প্রদান বাধ্যতামূলক। তবে কেনার ঘোষণা দিলে শেয়ারদর বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে বলে বড় মুনাফা করার সম্ভাবনা কমে যায়। একইভাবে ঘোষণা দিয়ে শেয়ার বিক্রি করলে দরপতনেরও শঙ্কা থাকে। এ কারণেই গোপনে শেয়ার কেনাবেচা করেন তারা। আবার যারা কোম্পানি ছাড়তে চান, তারা বিষয়টি গোপনেই সারতে চান।

তবে এমন অবৈধ শেয়ার কেনাবেচা হচ্ছে কি-না, তা কঠোরভাবে নজরদারির ব্যবস্থা বিএসইসির নেই। স্টক এক্সচেঞ্জ বিচ্ছিন্নভাবে এ বিষয়টি নজরদারি করে এবং বিএসইসিকে তথ্য দেয়। কিন্তু সংস্থাটি ত্বরিত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে- এমন নজির খুব কম।

বিএসইসির এক কর্মকর্তা জানান, বিদ্যমান বিও অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থাপনায় উদ্যোক্তা-পরিচালকের শেয়ার পৃথকভাবে চিহ্নিত করার ব্যবস্থা নেই। ফলে কোনো উদ্যোক্তা-পরিচালক বিনা ঘোষণায় শেয়ার কেনাবেচা করলেন কি-না, তা ধরা কঠিন। শেয়ারের তথ্য সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান সিডিবিএলকে বিও অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এমন তথ্য সংযুক্ত করতে বলা হয়েছে। তবে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কথা বলে এড়াতে চাইছে প্রতিষ্ঠানটি।

শেয়ারবাজার বিশ্নেষক ও ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটির ব্যবসায় অনুষদ বিভাগের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ মূসা এ বিষয়ে সমকালকে বলেন, নজরদারির ব্যবস্থা না থাকলে অবৈধ শেয়ার লেনদেন কখনই বন্ধ হবে না। আবার ধরা পড়লেও এ নিয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন না করায় এমন লেনদেনে সাহস পাচ্ছেন মালিকপক্ষ। কমিশনের নিষ্ফ্ক্রিয়তাই এ ঘটনা বাড়ছে বলে মনে করেন তিনি।

তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সাইফুর রহমানের দাবি, শেয়ারবাজারের সব অনিয়ম বন্ধে তৎপর আছে বিএসইসি। অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে ব্যবস্থা কখনও নেওয়া হয়েছে কি-না, এমন প্রশ্নে তিনি জানান, বিনা ঘোষণায় শেয়ার লেনদেনের দায়ে প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ জানকে গত ১১ জুলাই সতর্ক করে চিঠি দেওয়া হয়েছে। একই কারণে এমারেল্ড অয়েলের পরিচালক মনিরুল ইসলাম ও নারায়ণ চন্দ্র পাল এবং সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের উদ্যোক্তা-পরিচালক সাইদুর রহমান খানকেও সতর্কপত্র দেওয়া হয়েছে।

তবে সমকালের অনুসন্ধানে জানা গেছে, সৈয়দ মোহাম্মদ জান বিনা ঘোষণায় শেয়ার কেনাবেচা করেছিলেন ২০১৫ সালে। এ ঘটনার তিন বছর পর চিঠি দেওয়া হয়েছে। বাকি দুইজন তারও আগে শেয়ার কেনাবেচা করেন। ঘটনার তিন বছর পর সতর্ক করে চিঠি দেওয়া যথেষ্ট শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কি-না এবং এর মাধ্যমে এমন অবৈধ লেনদেন বন্ধ হবে কি-না- এমন প্রশ্নে সাইফুর রহমান বলেন, কমিশনের আইনে সতর্কপত্র ইস্যুও একটি শাস্তি। অবৈধভাবে শেয়ার কেনাবেচার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা কেন নেওয়া হচ্ছে না- জানতে চাইলে বিএসইসির মুখপাত্র বলেন, 'শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। এতে কিছুটা সময় লাগে।'

এদিকে সমকালের অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৬ সালে অন্তত ১৬ কোম্পানির ২২ জন, ২০১৭ সালে অন্তত ২০ কোম্পানির ৩১ জন এবং চলতি বছরে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট কোম্পানির ১৪ উদ্যোক্তা-পরিচালক বিনা ঘোষণায় শেয়ার কেনাবেচা করেছেন।

একজনেরই পাঁচ দফায় শেয়ার বিক্রি : জানা গেছে, সিএনএ টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান রোকসান মোরশেদ গত বছর তার শেয়ারের বড় অংশ বিক্রি করেছেন। মোট চার দফায় ৫ কোটি ১৮ লাখ শেয়ার প্রায় ৫৬ কোটি টাকায় বিক্রি করেন তিনি। প্রথম দফায় গত বছরের জানুয়ারিতে ৭৯ লাখ ৪ হাজার শেয়ার বিক্রি করেন পৌনে দশ কোটি টাকায়। এ নিয়ে জবাবদিহি করতে হয়নি বলে দ্বিতীয় দফায় মার্চে একই পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করেন, তৃতীয় দফায় গত বছরেরই এপ্রিলে ৪০ লাখ ৪০ হাজার শেয়ার এবং অক্টোবরের একদিনে ৩ কোটি ১৯ লাখ ৩৯ হাজার শেয়ার প্রায় ৩৩ কোটি টাকায় বিক্রি করেছেন।

শুধু সিএনএ টেক্সটাইলেরই নয়, ফ্যামিলি টেক্সটাইলের শেয়ারও বিনা ঘোষণায় বিক্রি করেছেন রোকসানা মোরশেদ। তিনি এ কোম্পানিরও উদ্যোক্তা-পরিচালক। গত বছরের অক্টোবরে এ কোম্পানির ৯২ লাখ ৪০ হাজার শেয়ার সাড়ে সাত কোটি টাকায় বিক্রি করেছেন। জানা গেছে, তিনি এখন দেশেই থাকেন না।

চেয়ারম্যানের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন অন্যরা : শুধু রোকসানা মোরশেদই নন, তার সাবেক স্বামী ও ফ্যামিলি টেক্সটাইলের উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোরশেদও গত বছরের অক্টোবরে সোয়া ২৩ কোটি টাকার বিক্রি করেন। এছাড়া সিএনএ টেক্সটাইলের উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের মধ্যে রোকসানা মোরশেদসহ গাজি গোলাম জাকারিয়া জ্যোতি, ইফতেখার আব্দুল হাই, শারমিন আক্তার লাভলি এবং বাংলাদেশ সুজ তাদের প্রায় ছয় কোটি শেয়ার ৬৫ কোটি টাকায় বিক্রি করেন।

বন্ধ কোম্পানি এমারেল্ড অয়েলের ক্ষেত্রেও ঘটেছে এমন ঘটনা। কোম্পানিটির উদ্যোক্তা গীতা সাহা, প্রশান্ত কুমার সাহা এবং অঞ্জনা বসাক তাদের সমুদয় শেয়ার ২০১৬ ও ২০১৭ সালে বিক্রি করেন বিনা ঘোষণায়। বেসিক ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারি মামলায় কোম্পানিটির মূল উদ্যোক্তা সৈয়দ হাসিবুল গণি গালিব পলাতক।

বিদেশি প্রতিষ্ঠানও আছে এ তালিকায় : শুধু ব্যক্তি নয়, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও তাদের উদ্যোক্তা শেয়ার বিনা ঘোষণায় বিক্রি করেছে। এর মধ্যে ২০১৬ সালের এপ্রিলে ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিংয়ের ১০ লাখ শেয়ার সাড়ে নয় কোটি টাকায় বিক্রি হয় ভারতের মুম্বাইভিত্তিক ব্যাংক এইচডিএফসির কাছে। তালিকায় এ রকম আরও বন্ধ প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

এ ছাড়া কেডিএস এক্সেসরিজ কোম্পানির করপোরেট উদ্যোক্তা কেডিএস গার্মেন্টস বিনা ঘোষণায় শেয়ার কেনাবেচা করেছে। একই অভিযোগ এশিয়ান টাইগার সন্ধানী লাইফ ইন্স্যুরেন্স মিউচুয়াল ফান্ডের উদ্যোক্তা সন্ধানী লাইফ ইন্স্যুরেন্স এবং কেয়া কসমেটিক্সের করপোরেট উদ্যোক্তা কেয়া ইয়ার্নের বিরুদ্ধে। পরিমাণে অল্প হলেও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুডস ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন তালিকাভুক্ত শ্যামপুর সুগার মিলসের শেয়ার বিক্রি করেছে বিনা ঘোষণায়।

অভিযুক্ত যা বললেন : ফ্যামিলি টেক্সটাইল কোম্পানির চেয়ারম্যান মেরাজ-ই-মোস্তফা গত বছরের ১১ অক্টোবর তার নিজ নামের ১ কোটি ৬৯ লাখ ২৬ হাজার শেয়ার বিনা ঘোষণায় বিক্রি করেছেন, যা ওইদিনে ডিএসইতে কোম্পানিটির বিক্রি হওয়া শেয়ারের প্রায় ৯৩ শতাংশ। ডিএসইতে ওইদিন ১ কোটি ৮২ লাখ ৬৫ হাজার ৬৭৭টি শেয়ার বিক্রি হয়েছিল। বিনা ঘোষণায় শেয়ার বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সমকালকে বলেন, 'ঘোষণা দিয়ে এত শেয়ার বিক্রি করলে বড় দরপতন হতো। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হতেন।' অন্যদিকে সংশ্নিষ্ট এক ব্রোকারেজ হাউস জানিয়েছে, তারা জানতেনই না যিনি শেয়ার কেনাবেচা করছেন তিনি উদ্যোক্তা-পরিচালক।

আরও পডুন

মন্তব্য


অন্যান্য