অর্থনীতি

ডিসিসিআই সমকাল চ্যানেল টোয়েন্টিফোর প্রাক-বাজেট আলোচনা

করহারে ছাড় আসছে

প্রকাশ : ১২ মে ২০১৮

 করহারে ছাড় আসছে

শনিবার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ডিসিসিআই, সমকাল ও চ্যানেল টোয়েন্টিফোর আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় প্রধান অতিথি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতসহ অতিথিরা -সমকাল

  সমকাল প্রতিবেদক

আগামী অর্থবছরের বাজেটে করপোরেট করহার কমানোর ঘোষণা একাধিকবার দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া। বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত এ দুই কারিগর শনিবার করপোরেট করহারের পাশাপাশি আরও কিছু ক্ষেত্রে ছাড়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তারা বলেছেন, আগামী বাজেট অধিকতর বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব হবে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, প্রচুর তরুণ এখন কর দিচ্ছেন। তাদের ওপর বিশ্বাস রেখেই তিনি করপোরেট করহার কমাচ্ছেন। সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী বাজেট পেশের পর এটি পর্যালোচনা করা হবে।

শনিবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই), সমকাল এবং চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের যৌথ আয়োজনে দীর্ঘ ২ ঘণ্টা প্রাক-বাজেট আলোচনায় তারা আগামী বাজেট নিয়ে সরকারের নানা ভাবনা তুলে ধরেন। সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। স্বাগত বক্তব্য দেন ডিসিসিআই সভাপতি আবুল কাসেম খান। আলোচনায় কর ও ভ্যাট, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, শিল্প, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ, আর্থিক খাত ও পুঁজিবাজার- এই চারটি বিষয়ের ওপর আলোচনা হয়। প্রত্যেক বিষয়ে প্যানেল আলোচনার পর সে বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানান অর্থমন্ত্রী ও এনবিআর চেয়ারম্যান।

অর্থমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় নতুন শিল্পকে এখনও সংরক্ষণ করছে সরকার। এ কারণে এবারও আমদানি পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক থাকবে। তবে ধীরে ধীরে এ সংরক্ষণমূলক অবস্থা থেকে বাংলাদেশকে বেরোতে হবে। কোম্পানির লভ্যাংশের ওপর একাধিকবার কর আরোপ না করার যে দাবি ব্যবসায়ীরা তুলেছেন, তা সমাধানে কাজ চলছে। অগ্রিম আয়কর যাতে ঠিকমতো রিফান্ড বা ফেরত পায় তার উদ্যোগ থাকবে। সঞ্চয়পত্র প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকের তুলনায় সঞ্চয়পত্রের সুদহার একটু বেশি রাখা সরকারের নীতি। তবে এখন তা অনেক বেশি হয়ে গেছে। বাজেট পেশের পর এ বিষয়ে পর্যালোচনা করা হবে।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, আগামী বাজেটে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা দেওয়া হবে। আয়করে কিছু নতুন বিষয় আসবে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ছাড় দেওয়া হবে। মোবাইল ফোনের ফোর জি প্রযুক্তি বিকাশে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ও হালকা প্রকৌশল খাতকে উৎসাহিত করা হবে। বিশেষ পদক্ষেপ থাকবে বিনিয়োগ বাড়াতে। তিনি জানান, হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। অন্যান্য বছরের তুলনায় আগামী বাজেট ভালো হবে।

সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার অনুষ্ঠানের সামপনী অংশে সংবাদপত্রের নিউজপ্রিন্টের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানান। তিনি বলেন, সংবাদপত্র শিল্প বড় ধরনের সমস্যার মধ্যে আছে। নিউজপ্রিন্টের দাম এক বছরে দ্বিগুণ হয়েছে। এ শিল্প এখন অস্তিত্ব সংকটের মুখে। তিনি আজকের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দেন।

কর ও ভ্যাট: কর ও ভ্যাট বিষয়ে প্যানেল আলোচনায় ঢাকা চেম্বারের প্রস্তাব তুলে ধরেন সংগঠনের সাবেক সভাপতি হোসেন খালেদ। ব্যক্তিশ্রেণি করমুক্ত আয়ের সীমা বর্তমানে বার্ষিক আড়াই লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ টাকায় উন্নীত করা, লভ্যাংশের ওপর মাল্টিপল কর প্রত্যাহার, আগামী তিন বছর করপোরেট করহার পর্যায়ক্রমে ৫, ৭ ও ১০ শতাংশ কমানোসহ কিছু প্রস্তাব করেন তিনি।

আলোচনায় এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, করপোরেট কর কমানোর প্রস্তাব ভালো। তবে অনেক বেশি কমানো ঠিক হবে না।

গবেষণা সংস্থা পিআরআইর নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে কম। দেশের উন্নয়ন যাত্রাকে এগিয়ে নিতে হলে এ অনুপাত অনেক বাড়াতে হবে। তিনি ভ্যাট আইনে সংস্কারের দাবি করেন।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, আমদানিতে অগ্রিম আয়কর দিয়ে এ অর্থ শেষ পর্যন্ত 'রিফান্ড' পাওয়া যায় না। তিনি এ হার ২ শতাংশ নির্ধারণের দাবি করেন।

আইসিএবির সাবেক সভাপতি আদিব এইচ খান বলেন, প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বার্ষিক আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে তার দায়ভার নিয়োগকারী সংস্থা কেন নেবে বলে প্রশ্ন তোলেন। তিনি এ নিয়ম বাতিলের দাবি করেন।

ফরেন চেম্বারের সাবেক সভাপতি রূপালী চৌধুরী বলেন, শিল্প খাতে কর্মসংস্থান আগের চেয়ে কমে গেছে। এটা উদ্বেগের বিষয়। তিনি বলেন, যারা নিয়মিত কর দেন, তাদের ওপর বাড়তি বোঝা না চাপিয়ে করের আওতা বাড়াতে হবে।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি হাজি আবদুস সালাম প্যাকেজ ভ্যাটের পরিমাণ বছরে ২৮ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ১৪ হাজার টাকা ও দোকানপাটে ইসিআর মেশিন না বসানোর প্রস্তাব দেন।

প্রতিক্রিয়ায় অর্থমন্ত্রী কোম্পানির কর্মকর্তারা আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহি করার যে নিয়ম করা হয়েছে, তা পুনর্বিবেচনার আশ্বাস দেন। এ ছাড়া লভ্যাংশের ওপর একাধিক স্তরে কর আরোপ প্রত্যাহারের দাবি নিয়েও এনবিআর কাজ করছে বলে জানান তিনি।

অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি: এ বিষয়ে ঢাকা চেম্বারের প্রস্তাব তুলে ধরেন সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম। আলোচনায় বুয়েটের অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেন, আমদানি করা এলএনজি ও বিদ্যুতের দাম নিয়ে ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন। শোনা যাচ্ছে, এলএনজির ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট নেওয়া হবে। কিন্তু দেশীয় গ্যাসের ওপর ১০০ শতাংশ কর আছে। যদি দেশীয় গ্যাসের ওপর কর তুলে নিয়ে শুধু ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করে দুই গ্যাসের মিশ্রণ করা হয় তাহলে গ্রাহক পর্যায়ে দাম সহনীয় থাকবে। এতে অবশ্য সরকারের কিছু রাজস্ব কমবে। তবে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সূচনা হবে। শিল্প-কারখানার প্রসার ঘটবে।

ডিসিসিআইর পরিচালক হুমায়ুন রশিদ বলেন, একটা পর্যায়ে বাংলাদেশে ৫০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। এজন্য স্থানীয় ইপিসি কন্ট্রাক্টরদের (বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাতা কোম্পানি) সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কিন্তু ট্যাক্স-ভ্যাটের কারণে তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পিডব্লিউসি বাংলাদেশের ম্যানেজিং পার্টনার মামুন রশিদ বলেন, বাংলাদেশে অবকাঠামো অর্থায়ন মাত্র জিডিপির ২ শতাংশ। এটাকে ১০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। এ জন্য বেশি প্রয়োজন বিদেশি বিনিয়োগের। তবে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে প্রচলিত আইন-কানুনে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে।

কনফিডেন্স সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমরান করিম বলেন, বিদ্যুতের মতো অন্যান্য খাতেও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দিতে হবে। দেশে কিছু অবকাঠামো পণ্য তৈরি হচ্ছে, বাইরের বিভিন্ন দেশে এসবের চাহিদা রয়েছে। এ খাতে প্রবৃদ্ধির জন্য সরকারের কিছু সহযোগিতা প্রয়োজন।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় বাড়ানো হলে খরচও বেড়ে যায়। ফলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায় না। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্প শেষ হয়েছে কিছুদিন আগে। অথচ এখন শোনা যাচ্ছে, এর সংস্কারের জন্য আরেকটি প্রকল্প নেওয়া হবে। এর মানে, প্রকল্প বাস্তবায়ন যথাযথভাবে হয়নি। তিনি বলেন, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না। সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে এবং গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে।

অর্থমন্ত্রী এ পর্বে বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হয় সত্য। তবে আগের চেয়ে কিছু কিছু উন্নতি হয়েছে। গুণগত মান নিয়ে সন্দেহ আছে। অবস্থার উন্নতিতে আরও পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে পায়রা বন্দর প্রকল্পের কাজ শেষ হবে না। এ বছর ডিসেম্বর নাগাদ হবে।

শিল্প, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বাণিজ্য: এ অধিবেশনে ঢাকা চেম্বারের প্রস্তাব তুলে ধরেন সাবেক সভাপতি হোসেন খালেদ। তিনি বলেন, কর্মসংস্থানের জন্য শিল্প-বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিকল্প নেই। এজন্য শিল্পে ও ব্যবসায় জামানতবিহীন ঋণের সীমা বাড়াতে হবে। সুদহার এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনতে হবে। ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি মতিউর রহমান বলেন, এখন সময় এসেছে মোটরগাড়ি তৈরিতে নীতিমালা করার। মোটরগাড়ি বিষয়ক নীতিমালা না থাকায় অনেক বিদেশি বিনিয়োগ পার্শ্ববর্তী ভারত, মিয়ানমার, কম্বোডিয়ায় চলে গেছে। নীতিমালা করা হলে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নিস্কণ্টক জমি না-পাওয়ার কারণে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। এজন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। এখন অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে। বন্দরের সঙ্গে এসইজেডের সংযোগ থাকতে হবে।

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সিনিয়র ইকোনমিস্ট মাশরুর রিয়াজ বলেন, বাংলাদেশকে এখন এলডিসি-পরবর্তী সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। এজন্য দরকার বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। রফতানি বহুমুখীকরণের মাধ্যমে তা করা যেতে পারে। এজন্য শুধু বাজেট নয়, অন্যান্য নীতিমালায়ও রফতানি বহুমুখীকরণে জোর দিতে হবে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন এফআইসিসিআইর সভাপতি শেহজাদ মুনিম বলেন, নিম্ন ক্ষমতার প্রযুক্তি থেকে বাংলাদেশ এখন উচ্চ ক্ষমতার প্রযুক্তিতে যাচ্ছে। কিন্তু উচ্চ কারিগরি প্রযুক্তিজ্ঞান আনতে ব্যয় হচ্ছে অনেক বেশি। এক্ষেত্রে ২০ শতাংশ অগ্রিম আয়কর রয়েছে। তিনি এ কর কমানোর প্রস্তাব করেন। মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে ব্যবসায়ী সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন রাবার বোর্ডের জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখার পাশাপাশি রাবারকে কৃষিপণ্য বিবেচনা করে এর রফতানিতে ২০ শতাংশ নগদ সহায়তা দাবি করেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ওয়ান স্টপ সার্ভিস আইন করা হয়েছে। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) নতুন করে গঠন করা হয়েছে। এখন উদ্যোক্তারা বিডায় আসবেন। এ কারণে বিনিয়োগে গতি পাবে বলে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, সবে শুরু হয়েছে, এখন আমাদের দেখতে হবে। মোটরগাড়ির জন্য নীতিমালা করা হবে বলে জানান তিনি।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, অগ্রিম আয়কর (এআইটি) বাংলাদেশের রাজস্বে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক খাত আছে যেখানে এআইটি নেওয়া না হলে নজরের বাইরে চলে যায়। এনবিআর ট্যাক্স রিফান্ডের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেবে জানিয়ে তিনি বলেন, যথাযথভাবে হিসাব করে যারা ট্যাক্স রিফান্ড পাবে তাদের জুনের পরে ফেরত দেওয়া হবে।

বিনিয়োগ, আর্থিক খাত ও শেয়ারবাজার: বিষয়ের ওপর উপস্থাপনায় ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম বলেন, ঋণ প্রদানে ব্যাংকিং নিয়ম-কানুন কঠোরভাবে অনুসরণের মাধ্যমে খেলাপি বা মন্দ ঋণের পরিমাণ কমাতে হবে। আইডিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ খান বলেন, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সুযোগ বেশি নেন মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা। সামাজিক সুরক্ষার নামে এটা অপচয়। এ মুহূর্তে সঞ্চয়পত্রের সুদহার সংশোধন করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে ৩০০ কোম্পানি আছে; কিন্তু খুব বেশি ভালো কোম্পানি নেই। বিদেশিরা বিনিয়োগ করার জন্য ২০ থেকে ২৫টির বেশি কোম্পানি খুঁজে পান না। সরকারি, বহুজাতিক ও বেসরকারি খাতের ভালো ও বড় কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনতে কী ধরনের উৎসাহ দিলে কাজ করবে, তা নিয়ে ভাবতে হবে।

গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাইকেল ফোলি বলেন, মাত্র ২১ শতাংশ ব্যবহারকারী মোবাইল ডাটা ব্যবহার করেন। এটা করহার সংক্রান্ত নীতি সংশোধন করে সহজেই ৫০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব। এখন ভাবার সময় হয়েছে, অধিক সংখ্যক মানুষের জীবনমান উন্নয়নে মোবাইল ফোন ব্যবহার আরও সহজলভ্য করা ভালো, নাকি উচ্চ কর নেওয়া ভালো।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগ কিছু গ্রুপের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। এভাবে কেন্দ্রীভূত হওয়ার কারণে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বড় ব্যবসায়িক গ্রুপ এখন মুড়িও বানায়, আবার গাড়িও বানায়। ফলে ছোট ব্যবসায়িক গ্রুপগুলো প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।

বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্স ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, অধিক সংখ্যক নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে বিশেষ তহবিল অন্তত ৫০০ কোটি টাকা হোক। তিনি বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের ঋণের সুদহার বড় বিষয় নয়। জামানতবিহীন ঋণ পাওয়াটা বড় বিষয়।

সমকালের উপ-সম্পাদক অজয় দাশগুপ্ত বলেন, অর্থনীতির অনেক উন্নয়ন হচ্ছে। তবে এর মধ্যেও একটি বড় সমস্যা হলো খেলাপি ঋণ। এ সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নিতে হবে।

ভ্যানগার্ড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াকার এ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে এখনও কার্যকর বন্ড বাজার নেই। আবার সঞ্চয়পত্রের উচ্চ সুদহার থাকলে কার্যকর বন্ড বাজার তৈরি করাও সহজ হবে না।

এ পর্বে মির্জ্জা আজিজ বলেন, আর্থিক খাতে বড় সমস্যা ব্যাংক খাতের উচ্চ মাত্রার খেলাপি ঋণ। কিছু ব্যাংকে ঋণ কেলেঙ্কারি হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যাংক খাতের অভ্যন্তরীণ ও কর্মীদের দক্ষতা নিয়ন্ত্রণ কীভাবে বাড়ানো যায় সেদিকে নজর দিতে হবে। ব্যাংকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ে বিচারিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে। পুঁজিবাজারে সরকারি কোম্পানি আনার উদ্যোগ পিছিয়ে গেছে। এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ফোরজি মোবাইল অপারেশন ও অটোমোবাইল শিল্পের জন্য কিছু ছাড় থাকবে। সঞ্চয়পত্রকে অটোমেশন প্রক্রিয়ায় আনা হচ্ছে, যাতে বড় বিনিয়োগকারীরা আসতে না পারে। ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংক খাতের একটি বড় সমস্যা হলো, পরিচালকদের মধ্যে যোগসাজশে ঋণ বিতরণ, যেখানে অনেক সময় অনিয়ম হয়। খেলাপি ঋণ আদায় প্রসঙ্গে বলেন, বিচারিক ব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্যের সমস্যা আছে। তিনি বলেন, সরকারি কোম্পানির শেয়ার পুঁজিবাজারে আনার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে পুঁজিবাজারে সংস্কার কর্মসূচি চলার কারণে প্রক্রিয়া বন্ধ ছিল। ২৬টি কোম্পানির তালিকা করা হয়েছে। এখন এ বিষয়ে নজর দেবেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট খবর


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

নির্বাচনী বছরে গুরুত্ব পাবে মেগা প্রকল্প


আরও খবর

অর্থনীতি
নির্বাচনী বছরে গুরুত্ব পাবে মেগা প্রকল্প

৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব

প্রকাশ : ২৩ মে ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আবু কাওসার ও শেখ আবদুল্লাহ

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অবকাঠামো খাতের বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য আসন্ন বাজেটে এসব প্রকল্পে বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব থাকছে। রাজধানীর গুলশানে ২০১৬ সালের জুনে হলি আর্টিসানে জঙ্গি হামলার পর মেট্রোরেল, মাতারবাড়ীসহ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন গতিহীন হয়ে পড়ে। অবশ্য সে অবস্থা এখন আর নেই। বর্তমানে আগ্রাধিকারমূলক মেগা প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলেছে। এর মধ্যে দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে পদ্মা সেতুর কাজ। স্বপ্নের মেট্রোরেলের কাজ শুরু হয়েছে গত বছর থেকে। নানা দীর্ঘসূত্রতা ও অনিশ্চয়তার পর পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পও অনুমোদন করা হয়েছে একনেকে। এরই মধ্যে অর্থায়ন নিশ্চিত করেছে চীন। অন্যান্য মেগা প্রকল্পের কাজও হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে মেগা প্রকল্পগুলো গতি পেয়েছে। আরও দ্রুতগতিতে কাজ করে যথাসময়ে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের জন্য ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে। চলতি বাজেটে বরাদ্দ রয়েছে ২৪ হাজার কোটি টাকা।

অর্থনীতিদিরা বলেছেন, মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়ন নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এসব প্রকল্প নেওয়ার মূল লক্ষ্য হচ্ছে :দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি বাড়িয়ে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত করা। সে জন্য আগামী বাজেটে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মেগা প্রকল্পের জন্য আলাদা বাজেট করছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে এটি ঘোষণা করে তিনি বলেন, মেগা প্রকল্প জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে 'গতি সঞ্চালক' হিসেবে কাজ করবে।

যোগাযোগ করা হলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, সরকার সার্বিক বাজেট বাড়চ্ছে। যদিও বাস্তবায়ন সেভাবে হচ্ছে না। প্রতিবছর মূল বাজেটে বরাদ্দ বেশি থাকে। পরে সংশোধিত বাজেটে কমানো হয়, কিন্তু সেই কমানো অঙ্কও পুরোটা খরচ হয় না। প্রাধিকারপ্রাপ্ত মেগা প্রকল্পের বেলায়ও তাই হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

বিআইডিএসের সাবেক গবেষণা পরিচালক, বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জায়েদ বখত বলেন, নির্বাচনী বছরে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোতে বরাদ্দ বেশি রাখা হচ্ছে। সরকার চাইবে, অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এসব প্রকল্পের অনেক কাজ এগিয়ে নিয়ে মানুষের সামনে দৃশ্যমান করতে। এটা খারাপ কিছু নয়, এতে প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন হবে। তবে বাস্তবায়নে গুণগত মান বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর সমকালকে বলেন, সরকার মূল বাজেটের ৮২/৮৩ শতাংশ বাস্তবায়ন করে। সংশোধিত বাজেটের ৯৫ ভাগ হয়। হঠাৎ করে তো সরকারের বাস্তবায়ন দক্ষতা বাড়বে না। ফলে বরাদ্দ বেশি দিলেও বাস্তবায়ন মোটামুটি একই রকম হবে। কিছু প্রকল্প আছে, যেগুলোর কারিগরি কারণে হঠাৎ একসঙ্গে অনেক ব্যয় হতে পারে। তবে দৃশ্যমান কাজের গতি একই ধরনের থাকবে।

সূত্র জানায়, মূলত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ফাস্টট্র্যাকভুক্ত (দ্রুততম সময়ে) প্রকল্পগুলো মেগা প্রকল্প হিসেবে ধরা হয়। প্রথম দিকে ১০ প্রকল্প এর আওতায় থাকলেও পরবর্তী সময়ে এলএনজি টার্মিনাল ও পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর এ তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। অন্যদিকে, পায়রা বন্দরকে গভীর সমুদ্রবন্দরে রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপন থেকে সরে এসেছে সরকার। এর বাইরে অন্যান্য প্রকল্প হচ্ছে :পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ ও চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে ঘুমদুম পর্যন্ত ১২৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প।

পদ্মা সেতু :৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা। এরই মধ্যে প্রকল্পের ৫৩ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হয় চার হাজার ৭০৩ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ ৬ শতাংশ বাড়িয়ে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা প্রস্তাব করা হচ্ছে।

মেট্রোরেল :২০ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেল প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। নকশা প্রণয়ন, জমি অধিগ্রহণসহ মেট্রোরেলের মূল কাজ চলছে। এ জন্য চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৩৪০ কোটি টাকা। মেট্রোরেলের কাজ দ্রুত শেষ করার লক্ষ্যে আসন্ন বাজেটে বরাদ্দ প্রায় ১২ গুণ বাড়িয়ে চার হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হচ্ছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র :প্রায় সোয়া এক লাখ কোটি টাকার প্রাক্কলিত ব্যয়ের এ প্রকল্পে আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ১১ হাজার ১০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ ৬০০ কোটি টাকা।

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ :ঢাকা-ভাঙ্গা ও ভাঙ্গা-যশোর রেললিংক (পদ্মা সেতু রেল সংযোগ) প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার কোটি টাকা। এই রেলপথ নির্মাণ সম্পন্ন হলে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত দূরত্ব হবে ১৬৬ কিলোমিটার। ঢাকা থেকে যশোর যেতে সময় লাগবে মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টা। আসন্ন বাজেটে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে।

দোহাজারী-ঘুমদুম রেল প্রকল্প :দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের ঘুমদুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্পটির সার্ভে করতেই শত বছরের বেশি সময় চলে গেছে। এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। এডিবি দেবে ১৪ হাজার কোটি টাকা। বাকি টাকা দেবে সরকার। চলতি বাজেটে এ প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৬৩২ কোটি টাকা। আগামী বাজেটে দেড় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে।

পায়রা সমুদ্রবন্দর :দক্ষিণাঞ্চলে পটুয়াখালী জেলায় পায়রা সমুদ্রবন্দরের কাজ এগিয়ে চলছে। চলতি অর্থবছরে এ প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয় ৪৫০ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে।

এর বাইরে বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কক্সবাজারের মহেশখালীতে মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নাধীন। জানা যায়, আগামী বাজেটে মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র্রের জন্য দুই হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বরাদ্দের পরিমাণ জানা যায়নি। কারণ, কোম্পানির মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। ভারত ও বাংলাদেশ যৌথ অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

পরের
খবর

চট্টগ্রামে লেদারের পণ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করল এনেক্স বাংলাদেশ


আরও খবর

অর্থনীতি

  চট্টগ্রাম ব্যুরো

লেদারের তৈরি পণ্য নিয়ে চট্টগ্রামে যাত্রা শুরু করেছে এনেক্স বাংলাদেশ। নগরীর মিমি সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় মঙ্গলবার বিকেলে লেদার পণ্যে সাজানো বিশেষায়িত এ শো-রুম উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।

এ সময় মেয়র বলেন, 'দেশিয় পণ্যকে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে পরিচিত করতে পারে তরুণ উদ্যোক্তারা। তারা যদি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে তবে দূর হবে দেশের বেকার সমস্যাও।' শুধু লেদারের পণ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা বিশেষায়িত এ শো-রুম জনপ্রিয় হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

উদ্বোধনের সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এনেক্স বাংলাদেশের উদ্যোক্তা মো. মোস্তফা দিপু, তোফাজ্জল হোসেন, আরিফ মৃধা, শোয়েব তানবির, সাখাওয়াত হোসেন, অনিক তানভীর প্রমুখ। এ সময় উদ্যোক্তা মোস্তফা দিপু বলেন, 'চট্টগ্রামে এনেক্স বাংলাদেশের এটি প্রথম শো-রুম। এর আগে আমাদের আরও দুটি শো-রুমের কার্যক্রম শুরু হয়েছে ঢাকায়। আশা করছি চট্টগ্রামে জনপ্রিয় হবে লেদার পণ্য।'

পরের
খবর

লক্ষ্য এবার হাজার কোটি


আরও খবর

অর্থনীতি

সরেজমিন :কেরানীগঞ্জ পোশাকপল্লী

লক্ষ্য এবার হাজার কোটি

প্রকাশ : ২২ মে ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

  দীপন নন্দী ও রায়হান খান কেরানীগঞ্জ থেকে ফিরে

লোহালক্কড়ের দোকানের সামনে মানুষের ভিড় ঠেলে বাবুবাজার ব্রিজে উঠতেই যানজট। বৃষ্টিতে সেই যানজট আরও প্যাঁচালো। এসব পেরিয়ে কেরানীগঞ্জের পূর্ব আগানগরে পৌঁছতেই দেখা গেল ভিড় আর ব্যস্ততা সবখানে। এখানকার ব্যবসায়ী ও তাদের প্রতিনিধিরা আশা করছেন, এমন ভিড় থাকবে আগামী ২৫ রমজান অবধি। এবার এ পোশাকপল্লীর বিক্রি ছাড়িয়ে যাবে এক হাজার কোটি টাকার ঘর।

গতকাল সোমবার কেরানীগঞ্জ জেলা পরিষদ মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল মুন্সীগঞ্জের পারভেজ হোসেনের সঙ্গে। নিজের এলাকায় পোশাকের ছোটখাটো দোকান তার। পারভেজ জানান, পাইকারি পোশাক কেনার জন্য কেরানীগঞ্জই তার ভরসা। কারণ, এখানে স্বল্পমূল্যে উন্নতমানের পোশাক পাওয়া যায়। একই কথা বললেন দোহারের মো. আনোয়ার। শবেবরাতের আগেও একবার এসে এখান থেকে পণ্য নিয়ে গেছেন তিনি। কেরানীগঞ্জ তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী ও দোকান মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও স্বল্পমূল্যের মানুষের ভরসার স্থল এ মার্কেট। তাদের দাবি, দেশের পোশাকের চাহিদার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই কেরানীগঞ্জ থেকে সরবরাহ করা হয়। স্থানীয় এই পোশাকের মান ভালো হওয়ায় প্রতি বছরই এর চাহিদা বাড়ছে।

তবে কেরানীগঞ্জে ঠিক কতটি তৈরি পোশাক কারখানা ও বিপণিবিতান এবং দোকান আছে, সে সম্পর্কে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ও দোকান মালিক সমবায় সমিতিও এ সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেনি। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও দোকান মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখানে প্রায় পাঁচ হাজার তৈরি পোশাকের কারখানা রয়েছে। আর বিপণিবিতানের সংখ্যা শ'দুয়েক। এতে দোকান রয়েছে হাজার তিনেক। আবার অনেকের মতে, এখানে তৈরি পোশাকের কারখানা ছয় থেকে সাত হাজার, আর দোকানের সংখ্যা নয় থেকে দশ হাজারের মধ্যে। এগুলোতে দুই থেকে আড়াই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ঘটেছে বলে জানান তারা।

কেরানীগঞ্জের জিলা পরিষদ মার্কেট, এস আলম সুপার মার্কেট, তানাকা মার্কেট, হাজী আনোয়ার কমপ্লেক্স, নূর সুপার মার্কেট, চৌধুরী মার্কেট, ইসলাম প্লাজা, আলম সুপার মার্কেট, আনোয়ার সুপার মার্কেট, কদমতলী গোলচত্বর এলাকার লায়ন সুপার মার্কেট ও জিঞ্জিরার ফ্যামিলি শপিং মলের ব্যবসায়ীরা জানালেন, পাঞ্জাবি, শার্ট, ফতুয়া, শিশুদের কাপড় থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের পোশাক পাওয়া যায় এখানে। এর মধ্যে জিন্স ও গ্যাবার্ডিন প্যান্ট এবং পাঞ্জাবির জন্য কেরানীগঞ্জের গার্মেন্টপল্লীর সুনাম বেশি। এখানে দুইশ' টাকা থেকে শুরু করে হাজার টাকার মধ্যে ছোট ও বড়দের জিন্স প্যান্ট পাওয়া যায়। তবে চাহিদা বেশি তরুণদের ৪০০-৬০০ টাকার জিন্স প্যান্টের। এ ছাড়াও এখানে ১৫০-৩০০ টাকার মধ্যে ফতুয়া, ২০০-৬০০ টাকার মধ্যে পাঞ্জাবি, ১৫০-৫০০ টাকার মধ্যে শার্ট, ২০০-৪০০ টাকার মধ্যে বাচ্চাদের পোশাক, ৩০০-৮০০ টাকার মধ্যে মেয়েদের সালোয়ার-কামিজ পাইকারি হিসেবে বিক্রি হয়। তাই ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা ছাড়াও সারাদেশের খুচরা ব্যবসায়ীরা এখানে পাইকারি দরে পোশাক কিনতে আসেন। বারো মাস কম-বেশি ব্যবসা হলেও এখানকার সারা বছরের ব্যবসার ৬০-৭০ শতাংশই রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে।

জিলা পরিষদ মার্কেটের আল-আমিন প্লাসের স্বত্বাধিকারী জালাল আহমেদ জানান, এবারের বিক্রিও ভালো। শবেবরাতের এক সপ্তাহ আগে থেকেই তারা বিক্রি শুরু করেছেন। দূরের জেলার ক্রেতারাই বেশি কিনছেন।

তবে বিক্রি নিয়ে খুব একটা খুশি নন মাস্টার অ্যাপারেলের স্বত্বাধিকারী মো. শামীম হোসেন। তিনি বলেন, এ বাজারে এখন চায়না পণ্য ঢুকেছে। রফতানি পণ্য উৎপাদকরাও ঢুকে গেছে। ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সংকটে পড়ছেন।

হাজী আনোয়ার কমপ্লেক্সের মুক্তা বেবি ফ্যাশনের ব্যবস্থাপক বাবুল হোসেন জানান, রোজার শুরুতে বৃষ্টিতে বেচা-বিক্রিতে ভাটা পড়েছিল। তবে শবেবরাতের পর থেকে বিক্রি খুবই ভালো। একই রকম সন্তোষ প্রকাশ করলেন তাজমহল পাঞ্জাবির স্বত্বাধিকারী লাবলু সরদার।

তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতেও এখনও চলছে বিরামহীন কাজ। মোস্তাক গার্মেন্টসের স্বত্বাধিকারী মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক বলেন, শবেবরাতের মাসখানেক আগে থেকেই এখানে পণ্য উৎপাদনের কাজ শুরু হয়েছে; যা এখনও চলছে। গত বছরের তুলনায় এবারের বিক্রি ভালো বলে মনে করেন তিনি।

কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ও দোকান মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি শেখ আবদুল শেখ ও সাধারণ সম্পাদক স্বাধীন শেখ সমকালকে বলেন, দেশে এখনও স্বল্প আয়ের মানুষের সংখ্যা বেশি। তাদের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টি মাথায় রেখেই কেরানীগঞ্জের পল্লীতে পোশাক তৈরি করা হয়। এখানকার পোশাকের চাহিদা সব সময়ই বেশি। তবে শীত ও ঈদ মৌসুমই ব্যবসার সবচেয়ে বড় মৌসুম। গত বছরের তুলনায় এবারের বিক্রি বেশি। আশা করা যাচ্ছে, এবারের বিক্রি এক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। সমিতির উদ্যোগে ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয় বলে জানান তারা।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, কেরানীগঞ্জের পোশাকপল্লীতে স্থানীয় পোশাকের পাশাপাশি চীন ও থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা বিভিন্ন ধরনের পোশাকপণ্যও পাইকারি হিসেবে পাওয়া যায়। ক্রেতাদের সুবিধার জন্য এখানে দুই ডজনেরও বেশি ব্যাংকের শাখা ও এটিএম বুথ এবং গোটা ত্রিশেক পরিবহন কোম্পানির শাখা রয়েছে। কাপড়, বোতাম, হ্যাঙ্গার এবং পলিব্যাগের বাজারও রয়েছে এখানে। ফলে এসব পণ্য কিনতে আর ইসলামপুর যেতে হয় না। এতে পোশাক তৈরির খরচও কমে আসছে।