অন্যান্য

কঠোর তদারকিতে ১৭৭ ঋণখেলাপি

নীতিমালা চূড়ান্ত করতে কাল বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈঠক

প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

কঠোর তদারকিতে ১৭৭ ঋণখেলাপি

ফাইল ছবি

  শেখ আবদুল্লাহ ও ওবায়দুল্লাহ রনি

দেশের শীর্ষ ১৭৭ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানকে কঠোর তদারকিতে আনা হচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপি। ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে, যার পরিমাণ ৪১ হাজার ৯০ কোটি টাকা। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিগত এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিগগিরই এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার বা নির্দেশনা সংশ্নিষ্ট ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হবে বলে দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, কঠোর তদারকির মূল উদ্দেশ্য হলো দ্রুত খেলাপি ঋণ আদায়ের মাধ্যমে এই ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনা। বছরের পর বছর আটকে থাকা খেলাপি ঋণ আদায়সহ প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি কঠোর ও গভীর অনুসন্ধানের জন্য ঋণ প্রদানকারী ব্যাংকে আলাদা সেল গঠন করার নির্দেশনা দেওয়া হবে। আবার খেলাপি ঋণ তদারকিতে বিদ্যমান ব্যবস্থাও অব্যাহত থাকবে।

জানা গেছে, শীর্ষ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আলাদাভাবে তদারকির জন্য গত মার্চে কাজ শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। যেসব প্রতিষ্ঠানের কাছে একশ' কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে, সেগুলোর তদারকিতে আরও কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যায়- সে বিষয়ে মতামত চেয়ে ব্যাংকগুলোকে চিঠি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ। ব্যাংকগুলো থেকে মতামত পাওয়ার পর তা পর্যালোচনা শেষে নীতিমালা চূড়ান্ত করতে আগামীকাল সোমবার একটি বৈঠক ডেকেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক শিগগিরই এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে ব্যাংকগুলোতে পাঠাবে। এরপরই ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিরা শীর্ষ খেলাপি প্রতিষ্ঠান তদারকিতে নামবে এবং নিয়মিত বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রতিবেদন পাঠাবে।

খেলাপি ঋণ কমানোর এ উদ্যোগকে সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। তিনি সমকালকে বলেন, এটা সঠিক সিদ্ধান্ত। কেননা, খেলাপি ঋণের বড় অংশই আটকে আছে শীর্ষ খেলাপিদের কাছে। আবার টাকা-পয়সা বেশি হওয়ার কারণে নানা উপায়ে তারা পার পেয়ে যান। তাদের থেকে আংশিক টাকা আদায় করতে পারলেও খেলাপি ঋণ অনেক কমে যাবে। তবে শুধু সেল গঠন করলে হবে না, এসব সেল ঠিকভাবে কাজ করছে কি-না কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তা কঠোরভাবে দেখতে হবে।

নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে খেলাপি ঋণ কমানোর বিষয়ে সরব আ হ ম মুস্তফা কামাল। শুরুর দিকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আগামীতে খেলাপি ঋণ আর এক টাকাও বাড়বে না, বরং কমবে। তবে গত ডিসেম্বরের তুলনায় মার্চে খেলাপি ঋণ প্রায় ১৭ হাজার কোটি বেড়ে এক লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা হয়। এ রকম পরিস্থিতির মধ্যে ঋণখেলাপিদের জন্য বিশেষ সুবিধার ঘোষণা দেন তিনি। অর্থমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী গত ১৬ মে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের বিশেষ নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত মন্দমানে খেলাপি হওয়া ঋণ মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সুদহার ধার্য করা হয় ৯ শতাংশ। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্দেশনার ওপর স্থগিতাদেশ দেন আদালত। পরে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের বিষয়টি আপিল বিভাগে গড়িয়েছে।

ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ নিয়ে নানামুখী আলোচনার মধ্যে গত ২২ জুন জাতীয় সংসদে শীর্ষ ৩০০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫০ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা। গত এপ্রিলভিত্তিক সিআইবির (ঋণ তথ্য ব্যুরো) প্রতিবেদনের আলোকে প্রকাশিত তালিকায় দেখা যাচ্ছে, এর মধ্যে একশ' কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠান ১৭৭টি। এ তালিকায় রয়েছে দেশের বহুল সমালোচিত হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, ক্রিসেন্ট, এননটেক্স, এসএ গ্রুপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৯০ কোটি টাকা। গত মার্চ পর্যন্ত সাব স্ট্যান্ডার্ড ১০ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বাদে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ ২৬৮ কোটি টাকা। অবলোপন করা খেলাপি ঋণ ছিল ৩৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। এসব খেলাপি ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রয়েছে শীর্ষ ১৭৭ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের কাছে।

ঋণখেলাপিদের তদারকিতে আলাদা সেল গঠনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পূবালী ব্যাংকের এমডি এম এ হালিম চৌধুরী সমকালকে বলেন, প্রতিটি ব্যাংকের ঋণ আদায়ে আলাদা বিভাগ রয়েছে। এর মধ্যে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তদারকির জন্য আলাদা সেল রয়েছে। তবে এসব খেলাপির থেকে টাকা আদায় করা অত্যন্ত দুরূহ কাজ। এখন দেখা যাক, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন করে কী নির্দেশনা দেয়। তিনি বলেন, বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে টাকা আদায়ে সামাজিক চাপ তৈরি করতে হবে।

সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংকগুলোতে গঠিত আলাদা সেল থেকে শীর্ষ এসব ঋণখেলাপির বর্তমান ব্যবসায়িক অবস্থা, ঋণ আদায়ের আদৌ সম্ভাবনা রয়েছে কি-না এসব যাচাই-বাছাই করা হবে। প্রকৃত সমস্যার কারণে খেলাপি হলে প্রয়োজনে ওই গ্রাহককে নতুন সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে ঋণ আদায়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ঋণ আদায়ে কোনো সম্ভাবনা না থাকলে খেলাপির সম্পত্তি বিক্রির মাধ্যমে আদায়ের উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। ঋণ আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ ও নিয়মিত তদারকির ত্রৈমাসিক অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, শীর্ষ ঋণখেলাপিদের বিশেষ তদারকিতে আনার বিষয়টি খুবই ভালো উদ্যোগ। তবে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কী হবে, তা দেখার বিষয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধা দেওয়া হয়। অনেক সময় ঋণখেলাপিরা উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধা দেন। এর মাধ্যমে আইনি দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করা হয়। ফলে এসব সমস্যা দূর না করে শুধু তদারকি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে লাভ হবে বলে মনে হয় না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্নিষ্টরা জানান, বর্তমানে ব্যাংকভিত্তিতে খেলাপি ঋণের তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। এ ছাড়া প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির কার কাছে কী পরিমাণ পাওনা রয়েছে, তার তথ্য নেওয়া হয়। যদিও বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া এসব তথ্য আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা হয় না। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বাক্ষরিত এমওইউতে শীর্ষ খেলাপিদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দেওয়া হয়। প্রতি তিন মাস অন্তর আদায় অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হলেও প্রত্যেক গ্রাহককে আলাদা তদারকি করা হয় না। এখন থেকে সেটি করা হবে।

মন্তব্য


অন্যান্য