অন্যান্য

বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি

চার বছরেও তদন্ত শেষ হলো না

প্রকাশ : ২৪ জুলাই ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

চার বছরেও তদন্ত শেষ হলো না

  হকিকত জাহান হকি

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কেউই সঠিকভাবে জানেন না, কবে শেষ হবে বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির তদন্ত কার্যক্রম। এক প্রকার অনিশ্চয়তার দোলাচলে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকটির তদন্ত কার্যক্রম। প্রায় চার বছরেও শেষ হয়নি বেসিক ব্যাংকের অর্থ লোপাটের ৫৬ মামলার তদন্ত। ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর দুই মেয়াদে দুর্নীতির সব আলামত, দলিল, কাগজপত্র রয়েছে দুদকের হাতে। ওই সময়ের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত ও অর্থ আত্মসাতে যোগসাজশ থাকা ব্যাংকের গুলশানসহ কয়েকটি শাখার দুর্নীতি-সংক্রান্ত সব নথিও রয়েছে তদন্ত কর্মকর্তাদের ফাইলে। তবুও তদন্ত শেষ হচ্ছে না।

সংশ্নিষ্টরা জানান, চার বছরে একটি মামলারও তদন্ত শেষ হয়নি। তদন্ত কেন শেষ হয়নি- এ নিয়ে স্পষ্ট করে কোনো কথা বলছেন না তদন্ত কর্মকর্তারা। একাধিকবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বদল করা হয়েছে। এই তদন্তের পেছনে কোনো শক্তি কলকাঠি নাড়ছে কি-না- এ নিয়েও সন্দেহ রয়েছে অনেকের মনে। দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি মামলার তদন্ত করছে।

যদিও দুদকের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দাবি করছেন, ব্যাংকটিতে দুর্নীতি হয়েছে খুবই জটিল প্রক্রিয়ায়। ব্যাংক থেকে আত্মসাৎ করা টাকা অনেকের অ্যাকাউন্টে গেছে। ওই টাকা বহু এলাকায় নানা কাজে ব্যবহার হয়েছে। এগুলোর প্রমাণ বের করতে হবে। এই প্রমাণ বের করা খুব জটিল বিষয়। টাকা পাচার, লেয়ারিংয়ের তথ্য বের করতে দেরি হচ্ছে। আর সেইসব তথ্য ছাড়া আদালতে ওই ৫৬ মামলার চার্জশিট পেশ করা সম্ভব নয়।

দুদক ২০১৫ সালের ২১-২৩ সেপ্টেম্বর বেসিক ব্যাংকের ২ হাজার ৩৬ কোটি ৬৫ লাখ ৯৪ হাজার ৩৪১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৫৬টি মামলা করে। দীর্ঘ চার বছরেও ওই মামলাগুলোর তদন্ত শেষ করা সম্ভব হয়নি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সমকালকে বলেন, বেসিক ব্যাংকে যে ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে সেটাকে অবশ্যই অস্বচ্ছ ও নজিরবিহীন বলা যায়। অবস্থান ও পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ওই অর্থ কেলেঙ্কারির মূল হোতাকে চিহ্নিত করে আইনের কাছে সোপর্দ করতে হবে। এটাই মানুষের প্রত্যাশা। বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির তদন্ত ও অর্থ আত্মসাৎকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হলে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরে আসার একটি নজির তৈরি হবে।

২০১৭ সালের শেষ দিকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বাচ্চুসহ তৎকালীন পর্ষদ সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করে তদন্ত ও আদালতে চার্জশিট পেশের জন্য দুদকের প্রতি নির্দেশ দিয়েছিলেন। তদন্ত শেষ না হওয়ায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের ওই আদেশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

জালিয়াতি করে বেসিক ব্যাংকের সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের তদন্ত প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দুদকে পাঠানো হয় ২০১৩ সালে। পরে অভিযোগটি অনুসন্ধান করে ২ হাজার ৩৬ কোটি ৬৫ লাখ ৯৪ হাজার ৩৪১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদক ৫৬টি মামলা করে ২০১৫ সালের ২১-২৩ সেপ্টেম্বর। ৫৬ মামলায় ব্যাংকের সাবেক এমডি কাজী ফখরুল ইসলামসহ মোট ১২০ জনকে আসামি করা হয়। বাকি ২ হাজার ৪৬৩ কোটি ৩৪ লাখ ৫ হাজার ৬৫৯ টাকা আত্মসাতের অনুসন্ধান করে আর কোনো মামলা করা হয়নি।

ওই সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনার সময় দুই মেয়াদে শেখ আবদুল হাই বাচ্চু চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকলেও তাকে কোনো মামলায় আসামি করা হয়নি। শুধু তাই নয়, ওই সময়কার পর্ষদ সদস্যদের কারও নাম আসামির তালিকায় নেই। ওই ৫৬ মামলার বিপরীতে ২ হাজার ৩৬ কোটি ৬৫ লাখ ৯৪ হাজার ৩৪১ টাকা ঋণ প্রস্তাব ছিল জালিয়াতিপূর্ণ। অ্যাকাউন্ট খোলার আগেই টাকা হাতে পেয়েছেন লুণ্ঠনকারীরা, যা ছিল নজিরবিহীন।

ব্যাংকটির ওই সময়ের পর্ষদের ১৩ জন সদস্যের মধ্যে সাবেক চেয়ারম্যান বাচ্চুকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় ২০১৭ সালের ৪ ও ৫ ডিসেম্বর। এর আগে পর্ষদের অন্য সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তারা হলেন- সাবেক ডাক, তার ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব শ্যাম সুন্দর সিকদার, সাবেক বাণিজ্য সচিব (সাবেক পর্ষদ সদস্য) শুভাশীষ বোস, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক নিলুফার আহমেদ, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব কামরুন্নাহার আহমেদ, প্রফেসর ড. কাজী আখতার হোসেন, ফখরুল ইসলাম, সাখাওয়াত হোসেন, জাহাঙ্গীর আকন্দ সেলিম, একেএম কামরুল ইসলাম, মো. আনোয়ারুল ইসলাম (এফসিএমএ), আনিস আহমেদ এবং একেএম রেজাউর রহমান।

সংশ্নিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ওই সময়কার পর্ষদের অনেকেই বেসিক ব্যাংকের তদন্তে পরোক্ষভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছেন। লুটে নেওয়া টাকার বিপরীতে প্রতিটি ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করেছিল ওই সময়ের পর্ষদ। এই দায় তারা এড়াতে পারেন না। চার্জশিটে তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেই আদালতে চার্জশিট দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্ট।

দুদক সূত্র জানায়, বেসিক ব্যাংকের ওই জালিয়াতিপূর্ণ ঋণে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি। জামানতের মূল্য যাচাই করা হয়নি। ঋণ গ্রহীতার ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও ঋণের টাকা ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়নি। অধিকাংশ ঋণ গ্রহীতার কোনো ধরনের ব্যবসা ছিল না। কারও ক্ষুদ্র ব্যবসার অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও ব্যাংক থেকে নেওয়া ৫০, ৮০, ১শ' কোটি টাকার ঋণ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা তাদের ছিল না। ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ঋণ প্রস্তাবগুলোতে ওইসব তথ্য উল্লেখ করা হলেও পর্ষদ সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট এক দুদক কর্মকর্তা জানান, ক্ষমতার অপব্যবহার করে ত্রুটিপূর্ণ ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন দিয়ে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের দায় পর্ষদ সদস্যদেরও নিতে হবে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন।

জানা গেছে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে দুদকের কাছে পাঠানো এক আদেশে বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান বাচ্চুসহ ওই সময়কার পর্ষদ সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করে তদন্ত সম্পন্ন করে চার্জশিট পেশের কথা বলা হয়েছিল। সর্বোচ্চ আদালতের ওই নির্দেশনা এখন পর্যন্ত নির্দেশনা হয়েই আছে।

জানা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত দুই মেয়াদে ছয় বছর বেসিকের পর্ষদ চেয়ারম্যান ছিলেন বাচ্চু। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণ ছিল ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। পরে ২০১৩ সালের মার্চ পর্যন্ত দাঁড়ায় ৯ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকায়। ওই চার বছর তিন মাসে ব্যাংক থেকে মোট ৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা ঋণ প্রদান করা হয়। এর মধ্যে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকাই নিয়ম ভঙ্গ করে দেওয়া হয়েছে।

মন্তব্য


অন্যান্য