অন্যান্য

খাদের কিনারে শেয়ারবাজার

প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

খাদের কিনারে শেয়ারবাজার

  আনোয়ার ইব্রাহীম

লাগাতার দরপতন ঠেকাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি, বিভিন্ন প্রভাবশালী সংস্থা, ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংককে চাপ দিয়ে শেয়ার বিক্রি বন্ধে বহু চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু তাতে কোনো ফল হয়নি। গতকাল সোমবারও বড় দরপতন হয়েছে শেয়ারবাজারে। একপর্যায়ে একশ'র বেশি পয়েন্ট কমে যায়। অবশ্য দিন শেষ হয় ৬৭ পয়েন্ট হারিয়ে। পুঁজি হারিয়ে অধিকাংশ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী মতিঝিলে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন গতকাল। কিন্তু সরকার বা বাজার  নিয়ন্ত্রক সংস্থা নির্বিকার।

এখন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা রীতিমতো আতঙ্কিত। মুনাফার স্বপ্ন তো দূরে থাক, লসেই শেয়ার বিক্রি করছেন। কারণ অনেকের আশঙ্কা, লসের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। যারা ঋণ করে শেয়ার কিনেছেন, তাদের অবস্থা আরও খারাপ।

রাস্তায় নেমে বিনিয়োগকারীরা উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) দায়ী করছেন। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সংগঠনগুলোর দাবি, সংস্থার চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন এবং তার নেতৃত্বাধীন সংস্থা বাজারের দরপতন ঠেকাতে ব্যর্থ। এ অবস্থায় তার পদত্যাগ বা অপসারণ দাবি করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বিক্ষোভ করেছেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর দেওয়া স্মারকলিপিও দিয়েছেন তারা।

দরপতন ও ঠেকানোর চেষ্টা :নানা সংকট নেতৃত্বে দুর্বলতার পরও রোববার সপ্তাহের শুরুতে দেড় বছরের রেকর্ড দরপতনের পর অনেকের মধ্যে আশা ছিল, সোমবার যাতে দরপতন না হয়, তার জন্য সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি তৎপর থাকবে। ছিলও তাই। কিন্তু কিছুই হয়নি।

গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় ঊর্ধ্বমুখী ধারায় দিনের লেনদেন শুরু হয়। তবে তা স্থায়ী হয়েছিল মাত্র সাত মিনিট। শুরুতে অনেক শেয়ারের দর বৃদ্ধি পাওয়ায় সকাল ১০টা ৩৭ মিনিটে আগের দিনের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স থেকে ২১ পয়েন্ট বেড়ে ৫০৫৫ পয়েন্ট ছাড়িয়েছিল। এরপরই আসে শেয়ার বিক্রির চাপ। পরের আধা ঘণ্টায় সূচকটি ১০০ পয়েন্ট হারিয়ে ৪০৫৫ পয়েন্টে নেমে আসে। সকাল ১১টা ৪১ মিনিটে দিনের শুরুর তুলনায় প্রায় ১০৯ পয়েন্ট এবং সর্বোচ্চ অবস্থানের তুলনায় ১৩০ পয়েন্ট হারিয়ে ৪৯২৪ পয়েন্টে নামে সূচকটি।

পরিস্থিতি এমন ভয়ানক পর্যায়ে নেমেছিল, ভালো ভালো অনেক শেয়ারের ক্রেতাও কমে গিয়েছিল। সূত্র জানায়, পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিলে বিএসইসির অনুরোধে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবি শেয়ার কিনে পতন ঠেকানোর চেষ্টা করে। প্রতিষ্ঠানটি সূচকের পতন কিছুটা কমাতে সক্ষম হয়।

দিনের লেনদেন শেষে দেখা গেছে, ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৫৩ শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ২৭৭টিই দর হারিয়েছে, বেড়েছে মাত্র ৬০টির দর। প্রায় একই চিত্র ছিল দ্বিতীয় শেয়ারবাজার সিএসইতে। অবশ্য শেষ পর্যন্ত ডিএসইএক্স ৬৭ পয়েন্ট হারিয়ে ৪৯৬৬ পয়েন্টে নেমেছে।

গত ২৭ জানুয়ারি বাজার সূচকটি ৫৯৯২ পয়েন্টে ওঠার পর যে পতন শুরু হয়েছে, তা প্রায় ছয় মাসে গড়িয়েছে। এ সময়ে সূচকটি হারিয়েছে এক হাজারের বেশি পয়েন্ট। বাজার-সংশ্নিষ্টদের দাবি, ২০১০ সালের মতো সূচক গণনা করা হলে সূচকের বর্তমান অবস্থান ৩০০০ পয়েন্টের ওপরে নয়।

কেন এই দরপতন? :নাম প্রকাশ না করার শর্তে শীর্ষ স্টেকহোল্ডারদের অনেকে কথা বলেছেন, বিএসইসির অদক্ষতার কারণে পুরোপুরি ডুবতে বসেছে এ বাজার। বিনিয়োগকারী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, ২০১১ সালে ড. এম খায়রুল দায়িত্ব গ্রহণের সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বাজারকে কারসাজিমুক্ত করতে এবং শৃঙ্খলায় ফেরাতে ব্যর্থ হলে তিন মাসের মধ্যে পদত্যাগ করবেন। ২০০৯-১০ সালে যাদের বিরুদ্ধে কারসাজির অভিযোগ ছিল, এমন কিছু ব্যক্তি ব্রোকারেজ হাউস কিনে মালিক বনেছেন। বর্তমান কমিশন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি অতি সম্প্রতি কারসাজির দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে একটি ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষ পদে বসার বিষয়ে অনুমোদন দিয়েছেন। পূর্বের কোনো অনিয়ম ও কারসাজির ধারা বন্ধ হয়নি, উল্টো নতুন অনেক কারসাজির হোতার সৃষ্টি হয়েছে।

২০১০ সালের শেয়ারবাজার কারসাজির ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে 'বাজার ফেলে দেবে' এমন অজুহাত দেখিয়ে গত আট বছরের অসংখ্য কারসাজির ঘটনায় কারও বিরুদ্ধেই কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি বিএসইসি।

বর্তমান কমিশনের সময় আইপিও এবং প্লেসমেন্ট শেয়ারের অবৈধ বাণিজ্য অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। গত আট বছরে বর্তমান কমিশন ৯০টির অধিক কোম্পানির আইপিও অনুমোদন করেছে। এর সিংহভাগই মানহীন। উল্টো প্রভাবশালীদের পক্ষ নিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জকে তালিকাভুক্ত করে নিতে চাপ দিয়েছে বিএসইসি।

তালিকাভুক্তির পর মানহীন কোম্পানিগুলোর মালিকপক্ষ নিজেরা এবং প্লেসমেন্ট প্রক্রিয়ায় শেয়ারের ক্রেতারা নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে বড় অঙ্কের মুনাফা লুটে নিয়েছে। এমন বেশ কিছু কোম্পানি এখন বন্ধ, মালিকদের হদিস নেই। কোম্পানির ব্যবসা বন্ধ থাকলেও শেয়ারগুলো এখনও লেনদেন হচ্ছে। স্টক এক্সচেঞ্জ এসব কোম্পানিকে তালিকাচ্যুত করতে চাইলেও বাদ সেধেছে খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। মালিকপক্ষের গোপন শেয়ার কেনাবেচা বন্ধ করতে পারেনি।

ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের আর্থিক প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া সরকারের ৯০০ কোটি টাকা কমিশনের অব্যবস্থাপনার কারণে কেন কাজে আসেনি। কেউ ওই ঋণ নিতে আগ্রহী ছিল না। নতুন করে সরকার ওই অর্থকে পুনরায় ঘূর্ণায়মান তহবিল হিসেবে প্রদান করেছে। সম্প্রতি ওই তহবিলের প্রায় ৭৬১ কোটি টাকা আইসিবিকে দেওয়া হলেও এর ফল বাজারে নেই।

চলতি বছরের শুরুতে ব্যাংকগুলোকে বিনিয়োগে ফেরাতে তাদের শেয়ারবাজার এক্সপোজার সীমা সংশোধন করে সুযোগ দেওয়া হলেও তারা বিনিয়োগে আসেনি। আনার চেষ্টাও দেখা যায়নি। বাজারে বড় বিনিয়োগকারীদের তীব্র সংকট। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তারল্য সংকটে থাকার কারণে এ বাজারে অর্থের প্রবাহ কমেছে।

২০১১ সালে বাজারে শেয়ারের ক্রয় চাহিদা বাড়াতে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ এবং পরিচালকদের এককভাবে ২ শতাংশ শেয়ার থাকা বাধ্যতামূলক করেছিল। আট বছরেও এ বিধান কার্যকর করতে পারেনি বিএসইসি। এখনও মালিকারা গোপনে শেয়ার বিক্রি করছে বলে অভিযোগ আছে।

গত আট বছরে বিএসইসি বহু আইন করেছে, যার বেশিরভাগই ছিল উন্নয়ন সহযোগীর পরামর্শে। বাজারের প্রয়োজনে আইন হয়েছে খুবই কম। আইপিও আইন পাঁচ দফায় সংশোধন হয়েছে, তারপরও আইপিওতে অনিয়ম বন্ধ হয়নি।

বিএসইসির বক্তব্য : সংস্থার মুখপাত্র সাইফুর রহমান সমকালকে বলেন, বর্তমান দরপতনের কারণ অযথা ভীতি। দরপতন আরও বাড়বে- এমন গুজবে একজনের দেখাদেখি অন্যরা শেয়ার বিক্রি করছেন। কেউ ইচ্ছাকৃত দরপতনকে উসকে দিচ্ছে কি-না, তা খতিয়ে দেখতে বিএসইসি তদন্ত কমিটি করেছে। গতকাল এ কমিটি শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে কমিশনে ডেকে তাদের বক্তব্য শুনেছে।

এছাড়া সরকারের ঘূর্ণায়মান তহবিল থেকে ৮৫ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্রোকার ডিলার, মার্চেন্ট ব্যাংক ও সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানির নামে দ্রুত ছাড় করতে গতকালই বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়েছে বিএসইসি। এছাড়া বাজারের উন্নয়নে কমিশন যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে। কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

বিশ্নেষকদের মত : বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, বর্তমান কমিশন আট বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করছে। তারা যে অনেক ক্ষেত্রে সফল নয়, তা দৃশ্যমান। তিনি বলেন, দরপতনের নেপথ্যে অনেক কারণ রয়েছে। কমিশনও কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে, তবে তা কাজ করছে না। হয়তো পদক্ষেপগুলো বাস্তবভিত্তিক না।

২০১০ সালের কারসাজির ঘটনায় সরকার গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ সমকালকে বলেন, ওই তদন্তের সুপারিশে বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নিলেও আমাদের কোনো সুপারিশই তারা বাস্তবায়ন করেনি। এমনকি এরপরও যে কারসাজি হয়েছে, তা বন্ধে সক্রিয় ছিল বলে মনে হয় না।

বর্তমান অবস্থায় করণীয় কী- এমন প্রশ্নে ইব্রাহিম খালেদ উল্টো প্রশ্ন করে বলেন, কমিশনের শীর্ষ পদগুলোর মেয়াদ আইন দ্বারা নির্দিষ্ট হওয়ার পরও কী করে চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা এ পদে বহাল আছেন, এদের প্রতি মানুষের আস্থা আছে বলে মনে হয় না। বাজারের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দক্ষদের নিয়োগ দিতে হবে। অন্যথায় বাজার পুনরায় ধসের পথেই যাবে বলে মত দেন এ বিশ্নেষক।

মন্তব্য


অন্যান্য