অন্যান্য

শিগগিরই বিশেষ সুযোগ পাচ্ছেন ঋণখেলাপিরা

অর্থ মন্ত্রণালয়ের খসড়া পরিপত্র কেন্দ্রীয় ব্যাংকে, মাত্র ২% ডাউন পেমেন্টে ৯% সুদে ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিলের প্রস্তাব

প্রকাশ : ০৩ মে ২০১৯ | আপডেট : ০৩ মে ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

শিগগিরই বিশেষ সুযোগ পাচ্ছেন ঋণখেলাপিরা

  ওবায়দুল্লাহ রনি

ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর ঘোষণার পর এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে একটি পরিপত্রের খসড়া পাঠানো হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকে। ঋণখেলাপিদের কোন কোন সুবিধা দিতে হবে উল্লেখ করে মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে গত মঙ্গলবার এ খসড়া পাঠানো হয়। অর্থমন্ত্রীর ঘোষণায় ১২ বছর মেয়াদে ঋণ পুনঃতফসিলের কথা বলা হলেও খসড়ায় ১০ বছরের প্রস্তাব রয়েছে। তবে ঘোষণার আলোকে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট এবং ৯ শতাংশ সুদহার চেয়েছে মন্ত্রণালয়। এ খসড়ার ওপর এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। শিগগিরই ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে সার্কুলার বা পরিপত্র জারি করা হবে বলে জানা গেছে।

সাধারণভাবে বিভিন্ন ইস্যুতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অর্থ মন্ত্রণালয় পরামর্শ দিলেও সরাসরি সার্কুলারের খসড়া প্রস্তুত করে পাঠানোর নজির নেই। অবশ্য অনেক ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত শুধু নির্দেশনা আকারে জারি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে ব্যাংকগুলোর বিধিবদ্ধ জমা সংরক্ষণের (সিআরআর) হার কমানো, নতুন ব্যাংকের অনুমোদন, ব্যাংকে এক পরিবার থেকে চারজন পরিচালক এবং পরিচালকদের মেয়াদ বাড়ানোর মতো সংশোধনীর ক্ষেত্রে তেমনই ঘটেছে।

জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো পরিপত্রের খসড়ার শুরুতে অর্থমন্ত্রীর নির্দেশনার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে 'খসড়া পরিপত্র' নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে অস্বস্তি রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো নির্দেশনা হুবহু জারি করা হবে, নাকি কিছুটা পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হবে, তা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে সুদহার ৯ শতাংশ নির্ধারণের পরিবর্তে বাজারভিত্তিক করার পক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান নিয়মে সব মিলিয়ে একটি মেয়াদি ঋণ সর্বোচ্চ তিনবারে ৩৬ মাসের জন্য পুনঃতফসিল করা যায়। আর পুনঃতফসিলের জন্য ডাউন পেমেন্ট হিসেবে মোট বকেয়ার প্রথমবার ১০ শতাংশ, দ্বিতীয়বার ২০ শতাংশ এবং তৃতীয়বার ৩০ শতাংশ অর্থ জমা দিতে হয়। কোনো গ্রাহককে এর অতিরিক্ত সুবিধা দিতে চাইলে সংশ্নিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে অনুমোদনের পর পাঠাতে হয় বাংলাদেশ ব্যাংকে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ সমকালকে বলেন, 'এখন যারা আছে, কী করবে জানি না। আমি থাকলে এমন সার্কুলার ইস্যু করতাম না। অর্থ মন্ত্রণালয় এভাবে খসড়া করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠাতে পারে না। এটা বেআইনি। এটা ব্যাংক খাতের জন্য খুব ক্ষতিকর।

তিনি বলেন, এর আগে ২০১৫ সালে বড় ঋণ গ্রহীতাদের ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়। তাদের অধিকাংশই টাকা-পয়সা দেয়নি। ওই লোকগুলোই এখন আবার সুবিধা নেবে। এর মানে, একটি শক্তিশালী খেলাপি চক্র ঘুরে-ফিরে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। বারবার এ রকম সুযোগ দেওয়া ঠিক হবে না।

আ হ ম মুস্তফা কামাল অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে নানা হুঁশিয়ারি দেন। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি বলেন, যারা ইচ্ছাকৃত খেলাপি, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তি দেওয়া হবে। আর যারা অনিচ্ছাকৃত খেলাপি, তাদের ঋণ পুনঃতফসিলের নীতিমালা শিথিল করা হবে। ঋণখেলাপিদের বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া নিয়ে ব্যাংকগুলোর মধ্যেও অস্বস্তি রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারাও বিষয়টি নিয়ে বিব্রত। বারবার ঋণখেলাপিদের বাড়তি সুবিধা দিলে নিয়মিত টাকা পরিশোধ করা ভালো গ্রাহকরা নিরুৎসাহিত হবেন বলে মনে করেন অনেকে। এর আগে গত ২২ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে ঋণখেলাপি হওয়ার সময়সীমা বাড়িয়ে একটি সার্কুলার জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন নীতিমালায় বিভিন্ন পর্যায়ে খেলাপি হওয়ার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে।

সংশ্নিষ্টরা জানান, এর আগে নানান ছাড় দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন করা হলেও খেলাপি ঋণ কমানো যায়নি। বরং সুবিধা নিয়ে ঋণখেলাপিরা কিছুদিন খেলাপি থেকে বিরত থাকার সুযোগ নিয়েছেন মাত্র। এর আগে সুদহার কমিয়ে, ডাউন পেমেন্ট ও মেয়াদের শর্ত শিথিলসহ নানা সুবিধা দিয়ে ২০১৫ সালে ১১টি গ্রুপের ১৫ হাজার ২১৭ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করা হয়। তবে দু'একটি গ্রুপ ছাড়া অধিকাংশই টাকা ফেরত দেয়নি। আর ২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে বিশেষ বিবেচনায় ডাউন পেমেন্ট ও মেয়াদের শর্ত শিথিল করে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোট ৯৭ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে। বিশেষ বিবেচনায় পুনঃতফসিল করা ঋণের বেশিরভাগই নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে আবার খেলাপি হয়েছে। ফলে খেলাপি ঋণ না কমে বরং বেড়েছে। ২০১৮ সালে খেলাপি ঋণ ১৯ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা বেড়ে গত ডিসেম্বর শেষে ৯৩ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা হয়েছে। আর অবলোপন ঋণ রয়েছে আরও ৩৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা।

মন্তব্য


অন্যান্য