অন্যান্য

খেলাপি ঋণ

কয়েকটি ব্যাংকের জন্য বদনাম পুরো খাতে

প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

কয়েকটি ব্যাংকের জন্য বদনাম পুরো খাতে

  ওবায়দুল্লাহ রনি

হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি ব্যাংকের বড় কেলেঙ্কারির জন্য পুরো ব্যাংকিং খাতকে বদনামের তকমা নিয়ে চলতে হচ্ছে। কিছু ব্যাংকের কারণে খেলাপি ঋণ রয়েছে উচ্চ মাত্রায়। এসব কারণে আমানত পেতে প্রচুর কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে ব্যাংকারদের। ঋণ নিতে অনেক বেশি সুদ গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। ফারমার্স ব্যাংক এবং কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমানো টাকা ফেরত দিতে না পারার ঘটনায় পরিস্থিতি বেশি খারাপ হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে কার্যরত ৫৮টি ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। আলোচ্য সময় পর্যন্ত বিতরণ করা ৯ লাখ ১১ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা ঋণের যা ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ। অধিকাংশ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এক অঙ্কের নিচে থাকলেও ১২টি ব্যাংকের প্রভাবে সামগ্রিক খেলাপি ঋণ দুই অঙ্কে উঠেছে। এ তালিকায় রয়েছে সরকারি মালিকানার আটটি, বেসরকারি খাতের ফারমার্স, বাংলাদেশ কমার্স, আইসিবি ইসলামী ও বিদেশি ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান। ব্যাংক খাতের বড় অনিয়মের বেশিরভাগই ঘটেছে এসব ব্যাংকে। এই ১২ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৯ হাজার ৩৫১ কোটি টাকা। ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের যা ৭৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ। আর এসব ব্যাংকের বিতরণ করা এক লাখ ৯৬ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা ঋণের ৩৫ দশমিক ২২ শতাংশ।

বাকি ৪৬ ব্যাংকে মোট ঋণ রয়েছে সাত লাখ ১৪ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা। এসব ব্যাংকের ২৪ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, যা মাত্র ৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ। অর্থাৎ ১২টি ব্যাংক বাদ দিয়ে খেলাপি ঋণ হিসাব করলে পার্শ্ববর্তী অনেক দেশের তুলনায় ভালো অবস্থানে উঠে আসবে বাংলাদেশ। তাতে মূলধন পরিস্থিতি বর্তমানের চেয়ে ভালো হবে। আবার তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমে সুদহার নিম্নমুখী ধারায় আসবে। ব্যাংক খাতের সূচক যত ভালো হবে, গ্রাহকের এলসি খরচ তত কমবে। তখন আর এলসির জন্য বাড়তি কনফারমেশন চার্জ লাগবে না, যার প্রভাবে কমবে আমদানি ব্যয়ও।

ঋণ অনিয়মের কারণে সম্প্রতি সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পড়েছে জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটির ১৭ হাজার ২২৫ কোটি টাকার ঋণ এখন খেলাপি। এক বছর আগেও ব্যাংকটির মাত্র পাঁচ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি ছিল। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ক্রিসেন্ট ও এননটেক্স গ্রুপকে দেওয়া প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা আর ফেরত না আসায় বেকায়দায় পড়েছে ব্যাংকটি। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির ফলে ব্যাংকটির সার্বিক সূচকের অবনতি হয়েছে। এর আগে গ্রাহকের জমানো টাকা ফেরত দিতে না পেরে আলোচনায় ছিল ফারমার্স থেকে পদ্মা নামে রূপান্তরিত ব্যাংকটি। এ ব্যাংকের পাঁচ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা ঋণের ৬০ শতাংশ এখন খেলাপি। ব্যাংকটি বাঁচাতে সম্প্রতি বাধ্য হয়ে সরকারি চার ব্যাংক ও আইসিবি ৭১৫ কোটি টাকা জোগান দিয়েছে। এরপরও প্রচুর লোক আমানত তুলে নেওয়ায় গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির আমানত কমে তিন হাজার ৯৮৫ কোটি টাকায় নেমেছে। একই সময় শেষে যেখানে ঋণ রয়েছে পাঁচ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা।

জানতে চাইলে ফারমার্স ব্যাংকের (পদ্মা) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এহসান খসরু সমকালকে বলেন, খারাপ অবস্থার কারণে গ্রাহকরা শাখা ব্যবস্থাপকদের গায়েও হাত তুলছিলেন। ভয়ে অনেকে তখন শাখায় যাচ্ছিলেন না। আমানতকারীদের আক্রমণাত্মক ব্যবহার এখন আর নেই। এখন শতভাগ ক্লিয়ারিং হচ্ছে। গ্রাহক চাইলে কাউন্টার থেকেও টাকা তুলতে পারছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার আলোকে নিয়মিতভাবে সিআরআর সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। ঋণ আদায় কার্যক্রম জোরদার হয়েছে। তিনি আশা করেন, এ বছরই ব্যাংকটির আয় দিয়ে ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে। আর আগামী বছর হয়তো মুনাফায় নেওয়া সম্ভব হবে।

ব্যাংক খাতে আলোচিত আরেক নাম বেসিক ব্যাংক। আবদুল হাই বাচ্চুর নেতৃত্বাধীন পর্ষদের সময়ে জালিয়াতি করে বিপুল অঙ্কের টাকা বের করে নেওয়া হয়েছে। নানা চেষ্টা করেও বর্তমান পর্ষদ আগের অনিয়মের ঋণ আদায় করতে পারছে না। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির আট হাজার ৬৩২ কোটি টাকা বা ৫৮ শতাংশ ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এর আগে আলোচিত ছিল সোনালী ব্যাংক। হলমার্কসহ ছয় প্রতিষ্ঠান ঋণের নামে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা বের করে নেয়। জালিয়াতির ধাক্কা কিছুটা কাটিয়ে উঠলেও এখনও ভালো অবস্থানে আসতে পারেনি ব্যাংকটি। যদিও ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ কমে ১২ হাজার ৬১ কোটি টাকায় নেমেছে। আগের বছর শেষে ১৩ হাজার ৭৭১ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি ছিল।

নানা জালিয়াতি করে বিতরণ করা ঋণ আদায় করতে না পারায় বিদেশি ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের মোট ঋণের ৯৭ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। মালিকপক্ষের জালিয়াতির কারণে ওরিয়েন্টাল থেকে রূপান্তরিত আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি রয়েছে ৮২ শতাংশ ঋণ। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের খেলাপি রয়েছে ২৭ শতাংশ। খেলাপি ঋণ দুই অঙ্কের ঘরে থাকা অন্য ব্যাংকগুলো নানা অনিয়মের কারণে বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে। ব্যাংকগুলোর মধ্যে বিডিবিএলের মোট ঋণের ৫৭ শতাংশ এখন খেলাপি। পর্যায়ক্রমে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ২৩ দশমিক ১৬ শতাংশ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ১৮ দশমিক ৪৬, রূপালী ব্যাংকের ১৭ দশমিক ৯৫ ও অগ্রণী ব্যাংকের ১৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ ঋণ খেলাপি। আলোচিত এসব ব্যাংকের মধ্যে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ও ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান ছাড়া সব ব্যাংকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষক রয়েছে। আর খেলাপি ঋণ এক অঙ্কে থাকলেও নানা কারণে আলোচিত বেসরকারি খাতের এবি, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ন্যাশনাল ব্যাংক ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পর্যবেক্ষক দিয়ে রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সব ব্যাংকের জন্য একই রকম নির্দেশনা দিলে হবে না। ব্যাংকের পরিস্থিতি বুঝে কখনও কখনও আলাদা নির্দেশনা দিতে হবে। তিনি সমকালকে বলেন, ব্যাংক ধরে ধরে পরিস্থিতি বুঝতে হবে। সব ব্যাংকের জন্য একই সার্কুলার না দিয়ে খারাপ পরিস্থিতির ব্যাংকের জন্য আলাদাভাবে নির্দেশনা দিতে হবে। অনেক সময় ব্যাংকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের ঢালাও কোনো একটি নির্দেশনার সুযোগ নিয়ে খারাপ গ্রাহককে সুযোগ দেয়। এসব ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শক্ত অবস্থান নিতে হবে।

ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, একটা ব্যাংকের খারাপ বিষয় অন্য ব্যাংকেও প্রভাব ফেলে। ফারমার্স ব্যাংক নিয়ে ঝামেলার সময়ে বেসরকারি অন্য ব্যাংকগুলোও আমানত সংগ্রহে কিছু সমস্যার মধ্যে পড়েছিল। তখন অনেকে ঢালাওভাবে বলছিলেন, বেসরকারি ব্যাংকে টাকা রেখে ফেরত পেতে মুশকিল হবে। এখন যেমন ব্যাংকবহির্ভূত কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কারণে অনেকে বলছেন- ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, অর্থাৎ এনবিএফআইতে আর টাকা রাখা যাবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ১৬ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা। এক বছর আগে আমানত ছিল ১০ লাখ ৫ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। এতে এক বছরে আমানত বেড়েছে মাত্র এক লাখ ১১ হাজার ১০৬ কোটি টাকা, যা ১১ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। একই সময়ে মোট ঋণ এক লাখ ১৪ হাজার ২৯ কোটি টাকা বেড়ে ৯ লাখ ২৪ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা হয়েছে।

এদিকে, আমানত বৃদ্ধির বড় অংশই হচ্ছে সরকারি ব্যাংকগুলোতে। বেসরকারি খাতের বেশিরভাগ ব্যাংক আশানুরূপ আমানত না পাওয়ায় ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর) বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত সীমার ওপরে উঠেছে ২০টি ব্যাংকের। এ তালিকায় সরকারি খাতের রয়েছে শুধু বেসিক এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক। বাকি ব্যাংকগুলোর মধ্যে খুব খারাপ অবস্থায় রয়েছে বেসরকারি খাতের এবি ব্যাংক। বেশ কিছু অনিয়ম ধরা পড়ার পর অন্য অনেক সূচকের পাশাপাশি ব্যাংকটির আমানতে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। আর সাতটি রয়েছে ইসলামী ধারার ব্যাংক। ব্যাংক খাতের তারল্য পরিস্থিতি এখন আরও খারাপ হয়েছে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো ব্যাংক ধারের জন্য আসছে বাংলাদেশ ব্যাংকে। কলমানি থেকেও দৈনিক ধার করছে। অনেক ব্যাংক আবার ১০ শতাংশের চেয়ে বেশি সুদে আমানত নিচ্ছে।

ব্যাংকাররা জানান, অধিকাংশ ব্যাংক তার কর্মীদের আমানত সংগ্রহের একটি লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় চাপাচাপি করছে ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে আলোচিত এবং নতুন ব্যাংকগুলো। এসব ব্যাংক আমানতে অনেক বেশি সুদ দিয়েও আশানুরূপ সাড়া পাচ্ছে না। ফলে কর্মীদের ওপর সব সময় মানসিক একটা চাপ রাখা হচ্ছে। কর্মীদের পদোন্নতি, পদায়নের বিষয়টি নির্ভর করছে অনেকটা আমানত সংগ্রহের ওপর।

সব ব্যাংকই যে খারাপ করছে, তা নয়। বেশ কয়েকটি ব্যাংকের ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা ব্যবহার করে ঘরে বসেই ব্যাংকিং করছেন গ্রাহকরা। ১৯টি ব্যাংক এখন আন্তঃব্যাংক ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবার আওতায় এসেছে। এই ব্যাংকগুলোর গ্রাহকরা এক ব্যাংক থেকে আরেক ব্যাংকে পরিশোধ করতে পারছেন। এক ব্যাংকের এটিএম বুথ ব্যবহার করে আরেক ব্যাংকের গ্রাহক গত জানুয়ারিতে উত্তোলন করেছেন এক হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। আর বিভিন্ন কেনাকাটার পর আন্তঃব্যাংক পস মেশিনের মাধ্যমে পরিশোধ করেছেন ১২৬ কোটি টাকার বিল। এর বাইরে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে দৈনিক এক হাজার ১০০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আরটিজিএস, এনপিএসবি, বিএসিপিএস ব্যবহার করে দৈনিক ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিশোধ হচ্ছে।

ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি আনিস এ খান বলেন, কোনো ব্যাংক অনিয়ম করে আস্থার ঘাটতি তৈরি করলে সেটা রাখার দরকার নেই। সমকালকে তিনি বলেন, ব্যাংক জনগণের আস্থার জায়গা। এখানে তারা কষ্টার্জিত টাকা নিশ্চিন্তে সঞ্চয় করতে চান। ফলে সব সময় আস্থা নিয়ে চলতে হবে। কোনো একটি ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হলে অন্য ব্যাংকের ওপরও তার প্রভাব পড়ে। ফলে যে ব্যাংক আস্থা নষ্ট করবে ওই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, এমনকি ব্যাংকও রাখা উচিত না। অন্য ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করে দেওয়া উচিত বলেও তিনি মনে করেন।

মন্তব্য


অন্যান্য