অন্যান্য

শেয়ারবাজার

টানা দরপতনে রেকর্ড

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

টানা দরপতনে রেকর্ড

  আনোয়ার ইব্রাহীম

আবারও ভয়াবহ ধসের পথে শেয়ারবাজার। গত ২৭ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া লাগাতার দরপতন ১২তম সপ্তাহে গড়িয়েছে। স্মরণকালের মধ্যে এত দীর্ঘ দরপতনের রেকর্ড নেই। এর আগে ২০০৮ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত টানা এগারো সপ্তাহ দরপতন হয়েছিল। দরপতন ভয়াবহ রূপ নিলেও এ পতন রুখতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। গত সপ্তাহে এ নিয়ে স্টেকহোল্ডার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থায় কয়েক দফায় বৈঠক হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন বাজার-সংশ্নিষ্টদের সহায়তা চান। বিএসইসির চাপে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর সহায়তায় সূচক কিছুটা বেড়েছিল। কিন্তু চলতি সপ্তাহে আবারও দরপতনের ধারায় বাজার। গতকাল কমিশনের চেয়ারম্যান তার কার্যালয়ে সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে কেউই দরপতনের যুক্তিগ্রাহ্য কোনো কারণ জানাতে পারেননি। এ অবস্থায় কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠকটি শেষ হয়।

এমন প্রেক্ষাপটে গতকাল মঙ্গলবার শেয়ারবাজারে বড় দরপতন হয়েছে। প্রধান শেয়ারবাজার ডিএসইতে ১৭ শতাংশ শেয়ারের দর বৃদ্ধির বিপরীতে ৭৩ শতাংশেরও বেশি শেয়ার দর হারিয়েছে। দ্বিতীয় শেয়ারবাজার সিএসইতে ৬৮ শতাংশ শেয়ারের দরপতন হয়েছে। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, জানুয়ারির পর থেকে চলতি দরপতনে তালিকাভুক্ত ৩৫৩ কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৩১৫টিই দর হারিয়েছে। দর হারানো শেয়ারগুলোর গড়ে প্রায় ১৫ শতাংশ দরপতন হয়েছে। এর মধ্যে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত দরপতন হয়েছে ১৩৬ কোম্পানির শেয়ারের।

গতকাল বাজারের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫২৪৮ পয়েন্টে নেমেছে। এর মধ্যে গতকালই সূচকটি ৬০ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ১৪ শতাংশ পতন হয়েছে। যদিও গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় লেনদেনের শুরু থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত টানা শেয়ারদর কমায় সূচকটি ৮৪ পয়েন্ট হারিয়ে ৫২২৫ পয়েন্টে নেমেছিল। গত বছরে ১৮ ডিসেম্বরের পর সূচকের এ অবস্থান সর্বনিম্ন। ওই দিন সূচকটির সর্বশেষ অবস্থান ছিল ৫২৩৩ পয়েন্ট।

এদিকে, দরপতনের প্রেক্ষাপটে গতকাল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এক ব্যাখ্যায় জানিয়েছে, শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের জন্য টিআইএন গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়নি, এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তও হয়নি। এ নিয়ে বিভ্রান্ত না হতে সকলের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে সংস্থাটি। চলতি দরপতন উস্কে দেওয়ার ক্ষেত্রে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের জন্য টিআইএন গ্রহণ বাধ্যতামূলক হচ্ছে- একাধিক গণমাধ্যমে এমন একটি খবর প্রকাশের পর এনবিআর এমন ব্যাখ্যা দিয়েছে।

চলতি দরপতনের কারণ বিষয়ে বাজার-সংশ্নিষ্টরা নানা মত দিচ্ছেন। মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর সংগঠন বিএমবিএর সহসভাপতি ও এমটিবি ক্যাপিটালের সিইও খাইরুল বাশার আবু তাহের মোহাম্মদ সমকালকে বলেন, গত ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের আগের দুই সপ্তাহ থেকে পরের চার সপ্তাহ পর্যন্ত বাজার সূচক ৭০০ পয়েন্টের বেশি বেড়েছিল। ওই দর বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে অনেকে মুনাফা তুলে নিয়েছেন। এরা পুনরায় বিনিয়োগ না করায় বাজারে বড় অঙ্কের তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা অর্থ সংকটে থাকায় নতুন করে বিনিয়োগ করতে পারছেন না। এর বড় কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংক শেয়ারবাজারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য যে এক্সপোজার (বিনিয়োগ) সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে, সে জন্য বিনিয়োগ করার সুযোগ পাচ্ছেন না। এ সমস্যা সমাধানে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নিজে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে চিঠি দিলেও তা সংশ্নিষ্টরা আমলে নেননি। এ বিষয়টির সুরাহা হলে মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলো অন্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করতে পারত। তাহলে দরপতন রুখতেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারত।

জানতে চাইলে আইডিএলসি সিকিউরিটিজ ব্রোকারেজ হাউসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাইফুদ্দিন সমকালকে বলেন, শেয়ারবাজারে দরপতন শুরুর আগে যেসব মানুষ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছিলেন, তারাও ওই পরিকল্পনা থেকে সরে যাচ্ছেন। দরপতনের আগে বাজারে যে হারে নতুন বিনিয়োগ আসার ধারা তৈরি হয়েছিল, তা একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। উল্টো অনেকে আরও দরপতনের ভীতি থেকে শেয়ার বিক্রি করছেন।

এর কারণ ব্যাখ্যায় এ কর্মকর্তা বলেন, এখানে লাভের চেয়ে লোকসানের শঙ্কা বেড়েছে, অর্থাৎ আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। তা ছাড়া যেসব কোম্পানির লভ্যাংশ ঘোষণা আসছে, সেগুলোর বেশিরভাগই গতবারের তুলনায় কম লভ্যাংশ দিচ্ছে। এ কারণে নিয়মিত বিনিয়োগকারীদের একটা অংশও শেয়ারবাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এর মধ্যে মার্জিন ঋণ প্রদানকারী কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের অর্থের সুরক্ষার স্বার্থে 'ফোর্স সেল' (ঋণে কেনা শেয়ার গ্রাহকের অনুমতি ছাড়াই বিক্রি) করে ঋণ সমন্বয় করছে। এতেও পরিস্থিতি কিছুটা নাজুক হচ্ছে। অবশ্য ২০১০ সালের ধসের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে এর বিকল্পও তাদের কাছে নেই।

একটি সূত্র জানিয়েছে, গত ২৭ জানুয়ারি লেনদেনের শুরুতে ৪২ পয়েন্ট বেড়ে ডিএসইএক্স সূচক ৫৯৯২ পয়েন্টে উঠলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবি আগ্রাসী শেয়ার বিক্রি করলে ওই দিন সার্বিকভাবে শেয়ারবাজারে দরপতন হয়, শুরু হয় সূচকের পতন। প্রতিষ্ঠানটি ওই দিনের পরও শেয়ার বিক্রি করলে সূচকের পতন ত্বরান্বিত হয়, যা এখনও চলছে। এ বিষয়ে আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার একটি সূত্র জানিয়েছে, বাজারে গুজব আছে, অর্থ মন্ত্রণালয় চায় না এ বছর বাজারসূচক (ডিএসইএক্স) ৬০০০ পয়েন্টের ওপরে যাক। বিষয়টি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার কারণেও কিছু বিনিয়োগকারীর মধ্যে ভীতি কাজ করছে। বড় বিনিয়োগকারীদের একটা অংশ নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। এটিও দরপতনের একটি কারণ হতে পারে।

এদিকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের এক পরিচালক জানান, কয়েক বছর ধরে বাজারে ভালো কোম্পানির আইপিও আসছে না; বরং এমন সব কোম্পানি আসছে, সেগুলোর দরপতন বাজারের স্বাভাবিক গতিধারাকে নষ্ট করছে। কোম্পানিগুলো যে শত শত কোটি টাকার প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করেছিল, সেসব শেয়ার বিক্রি করে প্লেসমেন্ট ব্যবসায়ীরা বাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়ে গেছেন। নিশ্চিত মুনাফার কারণে ব্যক্তিশ্রেণির বড় বিনিয়োগকারীরাও প্লেসমেন্ট ব্যবসায় ঢুকে গেছেন। অনেক মার্চেন্ট ব্যাংক ও মিউচুয়াল ফান্ডের বড় বিনিয়োগ যাচ্ছে প্লেসমেন্ট শেয়ার ব্যবসায়। ফলে হঠাৎ করে বাজারে তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে।

চলতি এ দরপতনের শেষ কোথায়- এমন প্রশ্নে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনালের অধ্যাপক মোহাম্মদ মূসা বলেন, সমস্যা চিহ্নিত না হলে সমাধান আসবে না। শেয়ারবাজারের এ বিশ্নেষক বলেন, অর্থবাজারের তারল্য সংকট সমাধানে শেয়ারবাজারকে ঢাল করা কোনোভাবেই উচিত হবে না।

বিএমবিএর মহাসচিব খাইরুল বাশার বলেন, সংকট সমাধানের তাৎক্ষণিক সমাধান হলো বাজারে তারল্য সরবরাহ বাড়ানো। অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ করার মতো অর্থ পাওয়ার ব্যবস্থা করা।

মন্তব্য


অন্যান্য