অন্যান্য

সহজে ব্যবসার সূচকে এক ধাপ অগ্রগতি

বিশ্বব্যাংকের 'ডুয়িং বিজনেস' রিপোর্টে বাংলাদেশ

প্রকাশ : ০১ নভেম্বর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

সহজে ব্যবসার সূচকে এক ধাপ অগ্রগতি

  জাকির হোসেন

কোনো দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ম-কানুন ও তার বাস্তবায়ন কতটুকু সহজ বা কঠিন তার ওপর বিশ্বব্যাংকের তৈরি সূচকে বাংলাদেশের এক ধাপ উন্নতি হয়েছে। তবে কোনো কোনো মানদণ্ডে বিশেষ করে ব্যবসা শুরু করার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতি হয়েছে। মূলত বিদ্যুৎ সংযোগের মানদণ্ডে উন্নতি হওয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান এক ধাপ এগিয়েছে। ডুয়িং বিজনেস-২০১৯ নামে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন গতকাল বুধবার ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দাঁড়িয়েছে ১৭৬তম। ১০০ স্কোরকে সর্বোত্তম ধরে এবার বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়িয়েছে ৪১ দশমিক ৯৭, যা আগের বছরে ছিল ৪১ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। গত বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭৭তম। গত বছর এক ধাপ পিছিয়ে যায় বাংলাদেশ। তার আগের বছর দুই ধাপ এগিয়ে ছিল। গুণগত মান বিবেচনায় কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ মোটামুটি একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে আছে। ভারতের ২৩ ধাপ অগ্রগতি হয়েছে। দেশটির অবস্থান ১০০ থেকে এবার ৭৭ হয়েছে। আফগানিস্তান ১৬ ধাপ উন্নতি করে ১৬৭তম অবস্থানে গিয়ে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে গেছে। ভারতে ৬টি ক্ষেত্রে সংস্কার হয়েছে। আফগানিস্তানে হয়েছে ৫টি ক্ষেত্রে। বাংলাদেশে কোনো ক্ষেত্রে সংস্কার হয়নি বলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

১০টি নির্দেশক বা মানদণ্ডের মধ্যে ৬টির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান পিছিয়েছে। এগুলো হচ্ছে- ব্যবসা শুরু করা,  নির্মাণ কাজের অনুমোদন, ঋণপ্রাপ্তি, ক্ষুদ্র শেয়ারধারী বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা, দেউলিয়াত্ব ঠেকানো ও সীমান্ত বাণিজ্য। অন্যদিকে বিদ্যুৎ সংযোগ, সম্পত্তি নিবন্ধন ও কর প্রদান মানদণ্ডে উন্নতি হয়েছে। ব্যবসায়িক চুক্তি কার্যকর বিষয়ে একই অবস্থান আছে। চলতি বছরের ১ মে পর্যন্ত ডাটা বা উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে নিউজিল্যান্ড। দেশটির স্কোর ১০০ এর মধ্যে ৮৬ দশমিক ৫৯। নিউজিল্যান্ডের পরে প্রথম ৫টি দেশের মধ্যে রয়েছে সিঙ্গাপুর, ডেনমার্ক, হংকং ও দক্ষিণ কোরিয়া। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলংকার অবস্থান ১০০তম, ভুটান ৮১তম, নেপাল ১১০তম, মালদ্বীপ ১৩৯তম এবং পাকিস্তানের অবস্থান ১৩৬তম।

মতামত জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী আমিনুল ইসলাম সমকালকে বলেন, বাংলাদেশের সামান্য উন্নতি হয়েছে। অন্যান্য দেশ বেশি উন্নতি করায় অবস্থানে মাত্র এক ধাপ এগিয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিটি মানদণ্ডে উন্নতির জন্য কোনো মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কী দায়িত্ব তা বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবায়ন পর্যায়ে আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। এবারের অবস্থান থেকে শিক্ষা নিতে হবে। আগামী ৫ বছর নাগাদ বাংলাদেশের অবস্থান ১০০-এর মধ্যে আসবে বলে তিনি আশাবাদী। কেননা বিনিয়োগকারীদের জন্য ওয়ানস্টপ সার্ভিস আইন পাস হয়েছে। এই সেবা খুব শিগগিরই চালু হবে।

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ মাশরুর রিয়াজ সমকালকে বলেন, গুণগতভাবে বাংলাদেশের অবস্থানের উন্নতি হয়নি। এর কারণ, যেসব সংস্কার কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে, তার অনেক কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি। অবস্থানের দৃশ্যমান উন্নতির জন্য ওয়ানস্টপ সার্ভিস আইন দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। বিডার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সমন্বয় বাড়াতে হবে। এখানে ঘাটতি আছে বলে মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর্যায়ে আছে। ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে বড় সংস্কারে না গেলে বাংলাদেশের এ অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে।

কোন মানদণ্ডে কী অবস্থা :ব্যবসা শুরু করার মানদণ্ডে গত বছর অবস্থান ছিল ১৩১তম। এবার পিছিয়ে ১৩৮তম হয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে কোনো ব্যবসা শুরু করতে ৯টি প্রক্রিয়া রয়েছে, যা অনেক বেশি। নিউজিল্যান্ডে মাত্র একটি প্রক্রিয়া রয়েছে। ব্যবসা শুরু করতে সময়ে লাগে ১৯ দশমিক ৫ দিন। অনেক দেশে এক্ষেত্রে মাত্র ১ দিনের মধ্যে অনুমোদন পাওয়া যায়। নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে অবস্থান গত বছরের ১৮৫তম থেকে কিছুটা উন্নতি হয়ে ১৭৯তম হয়েছে। আগে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে সময় লাগত ৪০৪ দিন। এখন তা কমে ১৫০ দিন হয়েছে। সম্পত্তি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে অবস্থান ১৮৫তম থেকে পিছিয়ে ১৮৩তম স্থানে বাংলাদেশ। তবে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে এখনও আগের মতো ৮টি প্রক্রিয়া রয়েছে। নিবন্ধনে সময় লাগে ২৭০ দিন। ব্যবসায়িক চুক্তি কার্যকরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে রয়েছে। এক্ষেত্রে ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮৯তম। ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডার বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় ৭৬তম থেকে পিছিয়ে ৮তম স্থান এবং দেউলিয়াত্ব পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষেত্রে ১৫২ থেকে পিছিয়ে ১৫৩তম অবস্থানে গেছে বাংলাদেশ। কর পরিশোধ মানদণ্ডে ১৫২ থেকে এগিয়ে ১৫১তম এবং ঋণপ্রাপ্তির মানদণ্ডে ১৫৯ থেকে ১৬১তম অবস্থানে নেমেছে বাংলাদেশ।


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

এবার বাড়ল ডালের দাম


আরও খবর

অন্যান্য
এবার বাড়ল ডালের দাম

প্রকাশ : ১৮ জানুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মিরাজ শামস

চড়া চালের বাজারের পাশাপাশি এবার বাড়ল ডালের দাম। দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকা এ পণ্যের মূল্য হঠাৎ অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বমুখী হয়ে পড়েছে। গত তিন দিনের ব্যবধানে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মসুর ডালের দাম বেড়েছে ২০ টাকা। আর অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি করা কম দামি ডাল অ্যাঙ্করের দাম বেড়েছে কেজিতে ১০ টাকা।

খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, দেশে উৎপাদিত ডালের মৌসুম ফুরিয়ে আসায় দাম বাড়ানোর সুযোগ নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। আমদানি করা বেশিরভাগ ডালই বিক্রি হওয়ায় আমদানিকারকরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। তবে আমদানিকারকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়ে যাওয়ায় ডালের দাম দেশেও বেড়েছে।

রাজধানীর খুচরা বাজার মিরপুর-১ নম্বরের শাহআলী মার্কেটের ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন, ফার্মগেটের ইন্দিরা রোড কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী ফয়জুর রহমান ও কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী জাকির হোসেন সমকালকে জানান, গত তিন দিনে পাইকারিতে মসুর ডালের দাম বস্তায় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এ কারণে খুচরা বাজারে ডালের দামও বেড়ে গেছে।

এসব বাজারে গতকাল বৃহস্পতিবার ভারত থেকে আমদানি করা এবং দেশি সরু মসুর ডাল ১১০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। এ ডাল তিন দিন আগেও ৯০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়। এ ছাড়া দেশি হাইব্রিড মাঝারি মসুর ডাল কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা থেকে আমদানি করা বড় মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা কেজিতে। এ ডাল ছিল ৪৮ থেকে ৫০ টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ডাল আমদানি বেড়েছে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ শতাংশ। অর্থবছরের এ সময় ১২ কোটি ৪৬ লাখ ডলার বা এক হাজার কোটি টাকার বেশি দামের ডাল আমদানি করা হয়। আগের বছরের এ সময় ১০ কোটি ডলারের ডাল আমদানি করা হয়। এর পরও এবার কম দামে আমদানি করা ডাল দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা।

গত বছর মসুর ডালের দাম দশ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছিল বলে জানান ডাল আমদানিকারকরা। একই কথা জানিয়েছেন পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা। গত ডিসেম্বরে প্রতি কেজি মোটা বড় মসুর ডাল ৪৫ থেকে ৪৭ টাকা এবং সরু মসুর ডাল মানভেদে ৬৫ থেকে ৭৫ টাকায় নেমে আসে। ব্যবসায়ীরা জানান, দেশি সরু মসুর ডালের মৌসুম শেষ পর্যায়ে থাকায় ডিসেম্বরের শেষ দিকে এর দাম কিছুটা বেড়ে ৮০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হয়। এ সময় অন্যান্য ডালের দাম স্থিতিশীল ছিল। এবার হঠাৎ করে সব ধরনের মসুর ডাল ও অ্যাঙ্কর ডালের দাম বেড়ে গেছে।

বাংলাদেশ লেনটিল অ্যান্ড ক্রাশি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি এবং নারায়ণগঞ্জ ডাল ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক নির্বাহী পরিচালক বিকাশ চন্দ্র সাহা সমকালকে বলেন, গত বছর জুনেই ডালের দাম অনেক কম ছিল। বছরের শেষভাগে ডালের দাম কমে গত এক যুগের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ডালের দাম কমে যাওয়ায় তখন দেশেও কমে যায়। তখন কয়েকটি শিল্প গ্রুপ হঠাৎ অতিরিক্ত ডাল আমদানি করে ক্ষুদ্র আমদানিকারকদের পথে বসিয়েছেন। এর পর প্রচলিত আমদানিকারকরা লোকসান দিয়ে আমদানির ব্যবসা থেকে সরে যান। এখন বড় গ্রুপের হাতে ডালের বাজারের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে। আমদানিও কম হয়েছে। এ কারণে বড় আমদানিকারকরা ডালের বাজার নিয়ে খেলা করছেন। এতে হঠাৎ ডালের দাম বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারেও ডালের দাম কিছুটা বেড়েছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। সবচেয়ে বেশি সরু মসুর ডাল আসে ভারত থেকে। সেখানে ডালের দাম বেড়েছে। এ কারণে এ দেশের বাজারেও দাম বেড়েছে।

দেশের বড় ডালের মোকাম নারায়ণগঞ্জে। এই পাইকারি আড়তে প্রতি কেজি মসুর ডালের দাম বেড়েছে ৫ থেকে ৭ টাকা। নারায়ণগঞ্জের আড়তে অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা থেকে আমদানি করা প্রতি কেজি বড় মসুর ডাল ৪৬ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভারত থেকে আমদানি করা ও দেশি সরু মসুর ডাল ৯০ থেকে ৯১ টাকা এবং মাঝারি মসুর ডাল ৮৫ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার অ্যাঙ্কর ডাল বিক্রি হচ্ছে ৩৬ টাকায়। এ ডাল পুরান ঢাকার রহমতগঞ্জে কেজিতে আরও ২ থেকে ৩ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। রাজধানীর খুচরা বাজারের ক্রেতাদের একই মসুর ডাল কিনতে ২০ টাকা বেশি দাম দিতে হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে গড়ে প্রতিবছর ডালজাতীয় শস্য উৎপাদন আট লাখ টনের কাছাকাছি। এর মধ্যে দেশে গড়ে এক লাখ ৭০ হাজার টন মসুর ডাল উৎপাদন হয়। প্রতিবছর মসুর ডালের চাহিদা আড়াই লাখ টনের বেশি। উৎপাদন ছাড়া বাকি চাহিদা আমদানি মিটছে। তবে ব্যবসায়ীদের মতে, মসুর ডাল আমদানির পরিমাণ চাহিদার চেয়ে অর্ধেকের বেশি।

পরের
খবর

কথা রাখেননি ব্যবসায়ীরা


আরও খবর

অন্যান্য
কথা রাখেননি ব্যবসায়ীরা

চালের দাম কমেনি

প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মিরাজ শামস

সম্প্রতি দেশে চালের দাম কেজিতে বেড়েছে ৩ থেকে ৭ টাকা। গত বৃহস্পতিবার খাদ্য মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠকে ধান ও চাল ব্যবসায়ীরা এক সপ্তাহের মধ্যে দাম কমানোর আশ্বাস দেন। কিন্তু কথা রাখেননি ব্যবসায়ীরা। এক সপ্তাহ পার হলেও চালের দাম কমেনি। সেই চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে। ফলে বাড়তি দামেই চাল কিনতে হচ্ছে সব শ্রেণিপেশার মানুষের।

জানা গেছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে সরকার গঠনের প্রাক্কালে বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। মনিটরিং জোরদার না থাকার সুযোগে বছরের শুরুতেই চালের দাম বাড়িয়ে দেন ব্যবসায়ীরা। অবশ্য ব্যবসায়ীরা অজুহাত দেখাচ্ছেন, অতি বৃষ্টিতে উৎপাদন ঘাটতির পাশাপাশি বোরো মৌসুম প্রায় শেষ পর্যায়ে। আমন মৌসুমে ধান এলেও সরকার বেশি দামে ধান-চাল কিনছে। এ কারণে বাজারে ধানের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। ধানের দাম বৃদ্ধির ফলে চালের দামও বেড়েছে।

যদিও এখন আমন মৌসুমের পর্যাপ্ত ধান রয়েছে। বাজার পর্যায়ে ধান ও চালের প্রচুর সরবরাহ আছে। ফলে চালের দাম বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নেই বলে মনে করেন ক্রেতারা।

বাজারে দাম বৃদ্ধির কয়েক দিনের মধ্যে মন্ত্রিসভা শপথ নেয়। গত ১০ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার মিল মালিক ও ধান ব্যবসায়ীদের সঙ্গে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার ও বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে ব্যবসায়ীরা আশ্বাস দেন চালের দাম কমানো হবে। ব্যবসায়ীদের আশ্বাসের ভিত্তিতে দুই মন্ত্রী সংবাদ মাধ্যমকে জানান, এক সপ্তাহের মধ্যে বেড়ে যাওয়া চালের দাম কমে আসবে। কিন্তু চালের বাজার আগের মতোই চড়া।

গত সোমবার বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি তার দপ্তরে এ বিষয়ে আলাপকালে সাংবাদিকদের জানান, নির্বাচনে পরিবহন বন্ধ থাকার কারণে চালের দামে প্রভাব পড়েছে। চালের দাম কমবে। কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। চাল মজুদ রেখে দাম বাড়ানো হচ্ছে কি-না খুঁজে দেখা হবে। চালের কোনো ঘাটতি নেই। চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন হচ্ছে। এর পরেও দাম কেন বাড়ল তা খুঁজে দেখা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে খাদ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এখনও রাজধানীর খুচরা বাজারে চড়া দামেই চাল বিক্রি হচ্ছে। খুচরা চাল বিক্রেতা মিরপুর-১ নম্বর বাজারের জহিরুল ইসলাম, পীরেরবাগের মো. মানিক ও কারওয়ান বাজারের মো. ইউনুস আলী সমকালকে জানান, খুচরায় চালের দাম কমেনি। পাইকারি বাজার থেকে বাড়তি দামে কিনে বিক্রি করতে হচ্ছে।

খুচরা বাজারে এখনও কেজিতে ৫ থেকে ৬ টাকা বেড়ে যাওয়া সরু চাল মিনিকেট ৫৫ থেকে ৫৬ টাকা ও নাজিরশাইল ৫২ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি চাল বিআর-২৮ আমন মৌসুমের নতুন চাল ৩ টাকা বাড়তি দরে ৪০ থেকে ৪২ টাকা ও বোরো মৌসুমের চাল ৫ টাকা বেড়ে যাওয়া দর ৪৫ থেকে ৪৮ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। মোটা চালে ৪ টাকা বেড়ে স্বর্ণা ৩৮ থেকে ৪০ টাকা ও গুটি ৩৫ থেকে ৩৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সুগন্ধি চালের কেজিতে ৬ থেকে ৭ টাকা বেড়ে এখন ৯৫ থেকে ১০০ টাকা হয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয় ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে খুচরা ও পাইকারি বাজারে চালের দাম কমাতো দূরের কথা, আরও বেড়েছে। সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে গড়ে ২ থেকে প্রায় সাড়ে ৬ টাকা। এর মধ্যে মোটা চালের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। পাইকারিতে কেজিপ্রতি স্বর্ণার দাম বেড়েছে ৬ টাকা ৪৫ পয়সা। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মাঝারি চাল বিআর-২৮-এর দাম বেড়েছে ৫ টাকা ও মোটা চাল স্বর্ণার দাম ৫ টাকা ২৬ পয়সা বেড়েছে।

পাইকারি চালের আড়ত মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের জাহান রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী মো. শাহ আলম স্বপন সমকালকে বলেন, মিল মালিকরা যে হারে দাম বাড়িয়েছেন সে তুলনায় দাম মোটেই কমাননি। সামান্য দাম কমালেও এখনও কম দামের চাল বাজারে আসেনি। প্রতি বস্তা মিনিকেট চালের দাম ২৫ থেকে ৫০ টাকা কমিয়েছেন। অন্যান্য চাল মিল থেকে বাড়তি দামেই আনতে হচ্ছে। এ মাসের শুরুতে বস্তায় চালের দাম বেড়েছিল ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা।

এ হিসাবে মিল পর্যায়ে শুধু মিনিকেট চালের দাম কেজিতে ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা দাম কমেছে। তবে রাইস মিল মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, কেজিতে দুই-এক টাকা কমে মিল থেকে মিনিকেট চাল ৪৬ থেকে ৫০ টাকা এবং বিআর-২৮ চাল ৪১ থেকে ৪২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া মোটা চালের দাম কেজিতে ৩ টাকা কমেছে।

বাংলাদেশ অটো-মেজর ও হাসকিং রাইস মিল মালিক সমিতির সভাপতি ও রশিদ এগ্রো ফুডের স্বত্বাধিকারী আবদুর রশিদ সমকালকে বলেন, 'মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে চালের দাম কমানোর আশ্বাস দিয়েছিলাম। সে অনুযায়ী মিল পর্যায়ে সব চালের দাম কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে না কমলে সে ক্ষেত্রে মনিটরিং জোরদার করা উচিত।' তিনি দাবি করেন, নির্বাচনের আগে হঠাৎ বাজারে চালের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ধানের চাহিদা বেড়ে যায়। বাজারে ধানের দাম বেড়ে যাওয়ায় মিলগুলোতে চালের দাম সামান্য বাড়ানো হয়। কিন্তু খুচরায় তুলনামূলক অস্বাভাবিক দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এখন বাজারে চালের চাহিদা স্বাভাবিক হয়েছে। ধানের দামও কমছে। তাই মিলগুলোতে চালের দামও কমানো হয়েছে বলে তিনি জানান।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে চাল উৎপাদন বেড়েছে। গত মৌসুমে আমন চাল উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৩৬ লাখ ৫৬ হাজার টন। এবার উৎপাদন আরও বেশি হবে। গত মৌসুমে বোরো চাল উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৯৫ লাখ ৭০ হাজার টন ও আউশ চাল উৎপাদন হয়েছে ২৭ লাখ টন। তিন মৌসুমে চালের উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৫৯ লাখ টন, যা বর্তমান চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারি গুদামে চালের মজুদ রয়েছে ১২ লাখ ২৯ হাজার টন। চলতি অর্থবছরে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার টন। ২০১৭ সালে বন্যায় হাওরে ফসল নষ্ট হওয়ায় সরকারি হিসাবে ৯ লাখ টন ঘাটতি ছিল। তখন ব্যবসায়ীদের দাবি ছিল ২০ লাখ টন উৎপাদন কম হয়েছে। ফলে আমদানিতে শুল্ক্ক কমানোয় ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চাল আমদানি হয়েছিল প্রায় ৩৯ লাখ টন। এদিকে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে চাল আমদানিতে ২৮ শতাংশ শুল্ক্ক ও কর পুনরায় আরোপ করা হয়। যাতে কৃষকদের ধান-চালের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হয়। তখন এক দফায় ব্যবসায়ীরা মোটা চালের দাম কেজিতে ৪ থেকে ৫ টাকা বাড়িয়েছিল।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক (সরেজমিন) ড. মো. আবদুল মুঈদ সমকালকে বলেন, কৃষিপণ্যের যৌক্তিক মূল্যে কেনাবেচা হওয়া প্রয়োজন। যাতে কৃষকরা উৎপাদন খরচ পান। তারা যৌক্তিক দাম না পেলে আবাদে নিরুৎসাহিত হবেন। আবার বাজারে অস্বাভাবিক দামে বিক্রি হলেও এর সুবিধা কৃষকরা পান না। উল্টো ক্রেতাদের ভোগান্তি বাড়ে। এসব বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো উচিত। তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতিকেজি ধানের গড় উৎপাদন খরচ ২৫ টাকা ৩০ পয়সা ও চালের গড় উৎপান খরচ ৩৭ টাকা ৯০ পয়সা। এই হিসাবে যৌক্তিক বাজার দাম হওয়া প্রয়োজন।

কয়েকদিন ধানের দাম কমেছে। এখন কৃষকরা বিক্রি করে স্বর্ণা জাতের ধানে মণপ্রতি ৭৩০, বিআর-২৮ জাতের ধান ৯২০ ও সরু ধানের দাম ১ হাজার ১০০ টাকা পাচ্ছেন। এ হিসাবে ধানের কেজিতে বর্তমান গড় দাম ২২ টাকা ৮৮ পয়সা। এ দামে ধান বিক্রিতে কৃষকরা প্রতি কেজি ধানে উৎপাদন খরচের চেয়ে গড়ে ২ টাকা ৪৩ পয়সা কম পাচ্ছেন। কৃষকরা কম পেলেও ক্রেতাদের অনেক চড়া দামেই চাল কিনতে হচ্ছে। নানা হাত ঘুরে এর বাড়তি মুনাফা তুলছেন ব্যবসায়ীরা।

পরের
খবর

মোবাইল হ্যান্ডসেট আমদানিতে কর ফাঁকির অভিনব কৌশল


আরও খবর

অন্যান্য
মোবাইল হ্যান্ডসেট আমদানিতে কর ফাঁকির অভিনব কৌশল

প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

  রাশেদ মেহেদী

বাংলাদেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট আমদানিতে কর ফাঁকি দেওয়ার অভিনব পদ্ধতির সন্ধান পাওয়া গেছে। এ পদ্ধতিতে তিনটি চীনা ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধে গত এক বছরে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা কর ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে কর ফাঁকির নতুন পদ্ধতির কারণে দেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদনে যাওয়া আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়ছে।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে মুখ থুবড়ে পড়বে দেশের মোবাইল হ্যান্ডসেট উৎপাদন শিল্প। বিটিআরসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে জানান, তারাও কর ফাঁকির অভিনব পদ্ধতি সম্পর্কে অভিযোগ পেয়েছেন। এ ব্যাপারে আরও অনুসন্ধান চলছে। অনুসন্ধান শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

যে পদ্ধতিতে কর ফাঁকি :এই অভিনব পদ্ধতি সম্পর্কে জানা যায় সম্প্রতি বিটিআরসিতে জমা পড়া একটি অভিযোগ থেকে। বিটিআরসির চেয়ারম্যান বরাবর এ অভিযোগ দিয়েছে বাংলাদেশে মোবাইল  হ্যান্ডসেট উৎপাদন ও আমদানিকারকদের সংগঠন 'বিএমপিআই'।

ওই অভিযোগের সঙ্গে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রমাণ ও দলিল সংযুক্ত করে বলা হয়, বাংলাদেশে কয়েকটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান অবৈধ কার্যকলাপের মাধ্যমে শুল্ক্ক ফাঁকি দিয়ে মোবাইল ফোন আমদানি করছে। অভিযোগে সুনির্দিষ্টভাবে তিনটি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়। এ তিনটি প্রতিষ্ঠানের পরিবেশকরা মূল কোম্পানির কাছ থেকে সরাসরি আমদানি না করে অজানা তৃতীয় পক্ষের কোম্পানির মাধ্যমে আমদানি করছে। অভিযোগে বলা হয়, মূল কোম্পানি 'অপো ইলেকট্রনিক করপোরেশন'-এর কাছ থেকে আমদানি না করে 'সিনসিয়ার ওর্থ' নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অপো ব্র্যান্ডের হ্যান্ডসেট আমদানি করছে 'অপো বাংলাদেশ'। একইভাবে ভিভো বাংলাদেশ 'ভিভো টেকনোলজি'র পরিবর্তে 'কালার টাইফুন গ্লোবাল' এবং হুয়াওয়ে ব্র্যান্ডের হ্যান্ডসেট 'এডা হোল্ডিংস লিমিটেড, হংকং' নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আমদানি করা হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মূল ওপো, ভিভো কিংবা হুয়াওয়ের সম্পর্ক নেই এবং এগুলোর আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক পরিচিতি কোনো স্বীকৃত মাধ্যমে পাওয়া যায় না। এই প্রতিষ্ঠানগুলো কেবলমাত্র বাংলাদেশেই তিনটি ব্র্যান্ডের পণ্য রফতানির জন্য খোলা হয়েছে।

এ অভিযোগের ব্যাপারে অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায়, মূলত কর ফাঁকি দেওয়ার জন্যই আন্তর্জাতিকভাবে অচেনা কোম্পানির নাম ব্যবহার করা হচ্ছে হ্যান্ডসেট আমদানির জন্য। এই তিনটি ব্র্যান্ডের হ্যান্ডসেট আমদানির ক্ষেত্রেই কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সামনে প্রকৃত আমদানি মূল্যের চেয়ে কম মূল্য দেখানো হচ্ছে। কম মূল্য দেখিয়ে কর ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে; কিন্তু গ্রাহকের কাছ থেকে আন্তর্জাতিক খুচরো মূল্য হিসেবেই দাম নেওয়া হচ্ছে।

অনুসন্ধানে সাম্প্রতিক সময়ে অপো ব্র্যান্ডের হ্যান্ডসেট আমদানির তথ্য থেকে দেখা যায়, অপো এফ৯(৬/৬৪ জিবি) হ্যান্ডসেট আমদানির ক্ষেত্রে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে আমদানি মূল্য দেখানো হয়েছে ১৭ হাজার ১১১ টাকা ১০ পয়সা, অথচ এই হ্যান্ডসেটটির বাজারে খুচরো মূল্য ৩১ হাজার ৯৯০ টাকা। ফলে আমদানি মূল্য এবং খুচরো বিক্রয় মূল্যের মধ্যে পার্থক্য দাঁড়াচ্ছে ১৮৭ শতাংশ। কিন্তু সাধারণভাবে এ দুটি দামের পার্থক্য হওয়ার কথা ৬৫ থেকে সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ। কারণ আমদানি মূল্যের সঙ্গে সরকারি শুল্ক্ক ও কর এবং বাজারজাতকরণে অন্যান্য ব্যয় ধরা হয়। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে আমদানি মূল্যের চেয়ে খুচরো মূল্য ৬৫ শতাংশ বেশি হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হয়। এক্ষেত্রে স্বাভাবিক হিসেবে অপোর এই হ্যান্ডসেটটির আমদানি মূল্য হওয়ার কথা ছিল ২০ হাজার ৭৯৩ টাকা থেকে ২২ হাজার ৩৯৩ টাকার মধ্যে। কিন্তু আমদানি মূল্য ১৭ হাজার ১১১ টাকা দেখানোর ফলে প্রতি হ্যান্ডসেটে কমপক্ষে এক হাজার টাকার কর ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভিভো ওয়াই৯ মডেলের হ্যান্ডসেট আমদানির ক্ষেত্রে আমদানি মূল্য দেখানো হয়েছে ১১ হাজার ১১১ টাকা ৪২ পয়সা, আর বাজারে খুচরো মূল্য ২২ হাজার ৯৯০ টাকা। অর্থাৎ, আমদানি মূল্য এবং খুচরো মূল্যের মধ্যে পার্থক্য ২২১ শতাংশ। অথচ খুচরো মূল্য অনুযায়ী স্বাভাবিক নিয়মে এই হ্যান্ডসেটের আমদানি মূল্য হওয়ার কথা ১৪ হাজার ৯৯৩ টাকা। এক্ষেত্রেও আমদানি মূল্য প্রায় চার হাজার টাকা কম দেখিয়ে এক হাজার টাকার বেশি কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।

চীনা অপর ব্র্যান্ডের একটি মডেলের হ্যান্ডসেটের আমদানি মূল্য দেখানো হয়েছে ৩২ হাজার ৪৭৯ টাকা, অথচ বাজারে এর খুচরো মূল্য ৮৯ হাজার ৯৯০ টাকা, অর্থাৎ, আমদানি ও খুচরো মূল্যের পার্থক্য ২৭৭ শতাংশ!

অনুসন্ধানে দেখা যায়, তিনটি চীনা ব্র্যান্ডের গত বছরে প্রায় ১৩ লাখ হ্যান্ডসেট বাংলাদেশে এসেছে। প্রতি হ্যান্ডসেটে এক হাজার টাকা কর ফাঁকি দিলে বছরে কর ফাঁকির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৩০ কোটি টাকা।

দায় এড়ানোর কৌশল :  বিটিআরসি সূত্র জানায়, বাংলাদেশে বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্যের স্থানীয় পরিবেশক নিয়ম অনুযায়ী যে কোনো প্রতিষ্ঠান হতে পারে। কিন্তু পরিবেশক আমদানি করে সরাসরি মূল প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে, এটাই দীর্ঘদিনের রীতি। কিন্তু মূল প্রতিষ্ঠান বাদ দিয়ে তৃতীয় একটি প্রতিষ্ঠানের নামে এলসি খুলে আমদানি করার বিষয়টি অস্বাভাবিক। এ কারণেই বিটিআরসি বিএমপিআইর অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে অনুসন্ধান করছে। এক্ষেত্রে অনিয়ম পাওয়া গেলে অবশ্যই নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সংশ্নিষ্ট অপর একটি সূত্র জানায়, মূল প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আমদানির ক্ষেত্রে এভাবে প্রকৃত আমদানি মূল্যের তথ্য গোপন করে কম মূল্য দেখানো যায় না। এ কারণেই কৌশল হিসেবে তৃতীয় আর একটি কোম্পানি খোলা হয়েছে যার আন্তর্জাতিক পরিচিতি নেই। কখনও এসব তৃতীয় পক্ষের প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকির তথ্য প্রকাশ হলে তার দায় মূল প্রতিষ্ঠানের ওপর পড়বে না। আসলে কর ফাঁকির দায় এড়ানোর জন্যই অস্বাভাবিকভাবে মূল প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে তৃতীয় পক্ষের প্রতিষ্ঠানের নামে এলসি খোলা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভারতে হ্যান্ডসেট আমদানির ক্ষেত্রে বন্দরেই শুল্ক্ক কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতি মডেলের হ্যান্ডসেটের খুচরা মূল্য উল্লেখ করতে হয়। কর্তৃপক্ষ খুচরা মূল্য থেকে আমদানিকারকদের অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ বাদ দিয়ে প্রকৃত আমদানি মূল্য নির্ধারণ করে কর ধার্য করে। কিন্তু বাংলাদেশে আমদানি পর্যায়ে খুচরো মূল্য উল্লেখের বাধ্যবাধকতা নেই।

সংশ্নিষ্টদের বক্তব্য :  এ বিষয়ে জানতে চাইলে অপো বাংলাদেশের ইমপোর্ট ইনচার্জ (কমার্শিয়াল) মোহাম্মদ ইকবাল পাটোয়ারি বলেন, ২০১৪ সাল থেকে অপো বাংলাদেশে 'অপো' ব্র্যান্ডের হ্যান্ডসেট বাজারজাত করছে। আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের সব নিয়ম-নীতি এবং প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, আমদানি সম্পর্কে কাস্টমস গোয়েন্দা অধিদপ্তর থেকে 'অপো'র আমদানি প্রক্রিয়ার বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয়। সেখানেও অপো স্বচ্ছতার সঙ্গে সব তথ্য দিয়েছে। অপো সম্পর্কে অন্যান্য কর্তৃপক্ষও তথ্য চাইলে তা দেওয়া হবে। আমদানি প্রক্রিয়ায় অপো সব সময়ই স্বচ্ছতার নীতি অনুসরণ করে।

এ ব্যাপারে ভিভো বাংলাদেশের কর্মকর্তা তানজীব আহমেদ সমকালকে বলেন, বৈধ এবং লাইসেন্সড অংশীদারের কাছ থেকেই ভিভো ব্র্যান্ডের হ্যান্ডসেট বাংলাদেশে আমদানি করা হচ্ছে। আমদানির ক্ষেত্রে ভিভো বাংলাদেশের স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়ম কঠোরভাবে অনুসরণ করে। আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভিভো সর্বোচ্চ নীতি অনুসরণ করে গ্রাহককের কাছে সেরা পণ্য পৌঁছে দিচ্ছে।

এ ব্যাপারে জানতে চেয়ে যথাযথ প্রক্রিয়ায় বার বার যোগাযোগের পরও হুয়াওয়ের আমদাকিারক এডা ট্রেডিং, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।