অপরাধ

আন্ডারওয়ার্ল্ডে অস্ত্র নিয়ে সরব 'হাতকাটা' হাসিব

এ কে-২২ রাইফেল উদ্ধার মামলার তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য

প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

আন্ডারওয়ার্ল্ডে অস্ত্র নিয়ে সরব 'হাতকাটা' হাসিব

  আতাউর রহমান

কুমিল্লা সদরের শুভপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হাই হাসিব। তবে আন্ডারওয়ার্ল্ডে তাকে সবাই চেনে 'হাতকাটা হাসিব' নামেই। লোকমুখেও তার পরিচয় 'হাতকাটা হাসিব' হিসেবে। সম্প্রতি ঢাকা থেকে অত্যাধুনিক এ কে-২২ স্বয়ংক্রিয় রাইফেলসহ দু'জনকে গ্রেফতারের পর তার নামটি নতুন করে বেরিয়ে আসে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, এই হাসিব আন্ডারওয়ার্ল্ডে অস্ত্র ব্যবসায়ী হিসেবে চিহ্নিত। বর্তমানে জমজমাটভাবে অস্ত্রের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি এর আগে কুমিল্লার শুভপুরে গড়ে তুলেছিলেন অস্ত্র তৈরির কারখানা। তাছাড়া সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র এনেও দেশের অপরাধ জগতে বিক্রি করতেন। অন্ধকার জগতের ভয়ঙ্কর এই পলাতক হাসিবকে আইনের আওতায় নিতে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।

পুলিশ জানায়, রাজধানীর স্বামীবাগ থেকে গত ৩০ জুন এ কে-২২ রাইফেল ও ৩০ রাউন্ড গুলিসহ কামাল হোসেন ও সাইদুল ইসলাম মজুমদার ওরফে রুবেল নামে দু'জনকে গ্রেফতার করে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের আর্মস এনফোর্সমেন্ট টিম। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে অস্ত্রের মালিক হিসেবে বেরিয়ে আসে হাসিব ও কুমিল্লার একই এলাকার কাজী গোলাম কিবরিয়াসহ চারজনের নাম। ওই ঘটনায় রাজধানীর ওয়ারী থানায় মামলাটি কাউন্টার টেররিজম ইউনিটই তদন্ত করছে।

তদন্ত সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, এ কে-২২ রাইফেলের উৎস খুঁজতে গিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। অস্ত্রের মালিক হাসিব ও তার বন্ধু কাজী গোলাম কিবরিয়া দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র আন্ডারওয়ার্ল্ডে সরবরাহ করে আসছিলেন। এর মধ্যে ২০১৬ সালে কুমিল্লার শুভপুরের একটি বাড়িতে অস্ত্রের কারখানার সন্ধান পায় পুলিশ। সেখান থেকে অস্ত্র তৈরির ২৬ ধরনের সরঞ্জাম ও ১৬টি অস্ত্রের অংশবিশেষ উদ্ধার করা হয়। ওই কারখানার অন্যতম মালিক ছিলেন পলাতক হাসিব। দেশে অস্ত্র তৈরির কারখানা ছাড়াও প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে তার গ্রুপ অবৈধ অস্ত্র এনে দেশের অপরাধীদের কাছে সরবরাহ করে। তার ঘনিষ্ট সহযোগী কাজী গোলাম কিবরিয়া। হাসিব আন্ডারওয়ার্ল্ডে থাকলেও তিনি প্রকাশ্যেই চলাফেরা করেন।

কুমিল্লায় স্থানীয় সূত্রের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসিব এক সময় শিবিরের কুখ্যাত ক্যাডার ছিলেন। শিবিরের হয়ে অস্ত্র চালাতে গিয়ে তার দুটি হাতের কবজি থেকে অংশবিশেষ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপরই তিনি হাতকাটা হাসিব নামে পরিচিতি পান। তার বন্ধু কাজী গোলাম কিবরিয়াও এক সময়ের শিবির ক্যাডার। পরে তিনি স্থানীয় পর্যায়ে জামায়াতের নেতা হন। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলরও এই কিবরিয়া। দু'জনই আবার শিবিরের সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য আবদুল্লাহ মো. তাহেরের অনুসারী। হাসিব আগে থেকেই আত্মগোপনে থাকলেও ঢাকার ওয়ারী থানায় হামলা হওয়ার পর থেকে কাজী গোলাম কিবরিয়া আত্মগোপনে চলে যান।

কুমিল্লার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে র‌্যাব-১১ হাসিবকে গ্রেফতার করেছিল। জামিনে বের হয়ে ফের তিনি অস্ত্র ব্যবসা শুরু করেন। তার বিরুদ্ধে কুমিল্লার বিভিন্ন থানায় অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ম্ফোরক আইনে অন্তত ৭টি মামলা রয়েছে। তিনি কুমিল্লার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর খাতায় অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত। কাজী গোলাম কিবরিয়ার নামে অবৈধ অস্ত্র আইনে দুটি মামলা ছাড়াও জ্বালাও-পোড়ায় ও নাশকতার আরও অন্তত ১২টি মামলা রয়েছে।

ঢাকার কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের আর্মস এনফোর্সমেন্ট টিমের প্রধান অতিরিক্ত উপ-কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম সমকালকে বলেন, হাসিব দীর্ঘ দিন ধরেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসা করে আসছেন। তাদের হাতে উদ্ধার হওয়া এ কে-২২ রাইফেলটি ছাড়াও তিনি এ ধরনের অস্ত্র আন্ডারওয়ার্ল্ডে ছড়িয়েছেন বলে তথ্য রয়েছে। পলাতক হাসিবসহ অন্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

আর্মস এনফোর্সমেন্ট টিমের প্রধান মেজবাহ উদ্দিন আহম্মেদ জানান, স্বয়ংক্রিয় রাইফেল উদ্ধারের সময় গ্রেফতার কামাল ও রুবেলকে দু'দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তারা হাসিবের অন্ধকার জগতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। এসব তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।

তদন্ত সংশ্নিষ্ট অপর এক কর্মকর্তা বলেন, এখন পর্যন্ত তদন্তে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশ এলাকায় বড় ধরনের নাশকতা করার জন্য অস্ত্র-গুলি আনা হয়েছিল বলে তারা মনে করছেন। তবে এ অস্ত্রের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট ছয়জনই এক সময় শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ জন্য বিষয়টি বেশি ভাবিয়ে তুলেছে। তাই ঘটনাটির গভীর অনুসন্ধানে কাজ করছেন তারা।

মন্তব্য


অন্যান্য