অপরাধ

মিতু হত্যার ৩ বছর

সাগর-রুনির পথেই হাঁটছে তদন্ত

প্রকাশ : ০৪ জুন ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাগর-রুনির পথেই হাঁটছে তদন্ত

  আবদুল্লাহ আল মামুন, চট্টগ্রাম

তিন বছরেও কোনো অগ্রগতি নেই আলোচিত মিতু হত্যাকাণ্ডের তদন্তের; যেমন সাত বছরেও পুলিশ উদ্ঘাটন করতে পারেনি সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যারহস্য। পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা, সাগর-রুনি মামলার পথেই হাঁটছে সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যার তদন্ত।

আলোচিত মিতু হত্যা মামলায় পুলিশ এখন পর্যন্ত অভিযোগপত্র দিতে পারেনি। কার নির্দেশে তাকে হত্যা করা হলো- তা এখনও জানা যায়নি। পুলিশ এ মামলা তদন্তের কোনো অগ্রগতিই জানাচ্ছে না। এ হত্যার প্রধান আসামিও রহস্যজনক কারণে ধরাছোঁয়ার বাইরে। গ্রেফতার ছয়জনের মধ্যে দু'জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তার পরও থমকে আছে তদন্ত। মামলার বাদী বাবুল আক্তারও নীরব এ মামলার ক্ষেত্রে। সবকিছু মিলিয়ে মিতুর পরিবারও এখন হতাশ।

২০১৬ সালের ৫ জুন ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে গিয়ে চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড়ের কাছে ওআর নিজাম রোডে খুন হন মাহমুদা খানম মিতু। ছুরিকাঘাত ও গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে। এ ঘটনায় বাবুল আক্তার অজ্ঞাতপরিচয় তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেন। আগামীকাল বুধবার পূর্ণ হতে চলেছে মিতু হত্যার তিন বছর।

নগর পুলিশ কমিশনার মাহাবুবর রহমান সমকালকে জানিয়েছেন, 'তদন্ত শেষ পর্যায়ে। অচিরেই অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।' অবশ্য এক বছর আগে একই বক্তব্য দিয়েছিলেন সাবেক পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার। তবে বর্তমান পুলিশ কমিশনার বলছেন, 'নিখুঁত তদন্তের জন্য একটু বেশি সময় নেওয়া হচ্ছে, যাতে তদন্তে কোনো ফাঁকফোকর না থাকে।' বাবুল আক্তারের শ্বশুর সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেনের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'কে জড়িত, কে জড়িত না, তা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হবে। সুতরাং এ বিষয়ে এখন কিছু বলা যাচ্ছে না।'

এ প্রসঙ্গে মামলার বাদী সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোনকল রিসিভ করেননি। তবে মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন তদন্তে অসন্তোষ ও হত্যাকাণ্ডের জন্য বাবুল আক্তারকে দায়ী করে বলেন, 'দুই বছর ধরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। একজন কর্মকর্তার কাছে তিন বছর ধরে মামলাটি পড়ে আছে। তার তদন্ত প্রক্রিয়া সন্তোষজনক নয়। তদন্তের কোনো কার্যক্রম বা অগ্রগতিই জানতে পারছি না।'

মোশাররফ হোসেন জানান, বাবুল আক্তারের পরকীয়া ও মিতুর ওপর বিভিন্ন সময় নির্যাতনসহ নানা প্রসঙ্গে তারা তদন্ত কর্মকর্তাকে জানিয়েছিলেন। তবে কর্মকর্তা এসব বিষয় খতিয়ে দেখেছেন কি-না, তা তাদের জানা নেই। তবে তারা শতভাগ নিশ্চিত- বাবুল আক্তারের নির্দেশেই এ হত্যা হয়েছে। মোশাররফ প্রশ্ন করেন, 'সে যদি সম্পৃক্ত না হয়, তা হলে একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো কেন? তবে খুনের শাস্তি তো অব্যাহতি হতে পারে না। তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।' তিনি তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনেরও দাবি জানান।

এ মামলার তদন্ত করছেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) মো. কামরুজ্জামান। তিনি সমকালকে বলেন, 'মামলার তদন্ত চলমান। কিছু আসামি পলাতক। তাদের গ্রেফতারের অপেক্ষায় আছি। এর পর অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।'

মিতু হত্যাকাণ্ডের পর অনেকে ধারণা করেছিলেন, জঙ্গিরা এ হত্যায় জড়িত। কারণ জঙ্গিবিরোধী অভিযানে তার স্বামী বাবুল আক্তার বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। পরে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও আলোচনা হয় এবং তদন্ত কর্মকর্তা বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যও নেন। তবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে পুলিশ এসবের কোনো যোগসূত্র খুঁজে পায়নি।

অবশ্য মিতু হত্যার পর একটি মাজারের খাদেম আবু নছর ওরফে গুন্নু ও শাহজামান ওরফে রবিন নামে আরও এক যুবককে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। পরে তারা জামিনে বেরিয়ে আসে। হত্যার ২০ দিন পর তদন্ত ভিন্ন খাতে মোড় নেয়। ২০১৬ সালের ২৪ জুন মধ্যরাতে ঢাকার বনশ্রী এলাকার শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবুলকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। প্রায় ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তাকে। পরে তাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। এ সময় পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাহিনী থেকে পদত্যাগ করেছেন বাবুল আক্তার। তবে তার নিজের দাবি ছিল, তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেননি। ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন তিনি। নানা নাটকীয়তা শেষে ৬ সেপ্টেম্বর বাবুলকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

মিতু হত্যার ২১ দিন পর ২৬ জুন গ্রেফতার করা হয় ওয়াসিম ও আনোয়ারকে। আদালতে জবানবন্দি দেয় তারা। এর পর বেরিয়ে আসে হত্যায় জড়িতদের তথ্য। জবানবন্দিতে মুছার নেতৃত্বে ওয়াসিম, আনোয়ার, মো. রাশেদ, নবী, মো. শাহজাহান ও মো. কালু অংশ নেয় বলে তারা উল্লেখ করে। হত্যায় ব্যবহূত মোটরসাইকেলে ছিল ওয়াসিম, মুছা ও নবী। মিতুকে ছুরিকাঘাত করে নবী। অস্ত্র সরবরাহ করে এহতেশামুল হক ওরফে ভোলা। তবে কী কারণে, কার নির্দেশে তারা হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছে, তা নিয়ে কোনো তথ্য দেয়নি। একই বছরের ৪ জুলাই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের মধ্যে রাঙ্গুনিয়ায় পুলিশের সঙ্গে 'বন্দুকযুদ্ধে' নিহত হয় নবী ও রাশেদ। কারাগারে রয়েছে ওয়াসিম, আনোয়ার, ভোলা ও শাহজাহান। মুছা ও কালুকে এখনও গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। মুছাকে ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে পুলিশ।

মিতু হত্যাকাণ্ডের পর বাবুল আক্তারকে তুলে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৫ সালে ঝিনাইদহে এসআই আকরাম হোসেন নিহতের ঘটনায় বাবুল আক্তার জড়িত বলে ২০১৬ সালের শুরুতে অভিযোগ তোলে তার পরিবার। নিহত আকরামের স্ত্রী বনানী বিনতে বসির বর্ণির সঙ্গে বাবুলের পরকীয়ার অভিযোগ তোলেন তারা। ২০১৭ সালের ২৬ জানুয়ারি তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে এসে পারিবারিক টানাপড়েন ও পরকীয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে বলেন মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন। তবে তদন্তে এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হলেও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এসব অভিযোগের কোনো সম্পৃক্ততা পায়নি বলে জানায় পুলিশ।

এদিকে ২০১৬ সালের ২২ জুন চট্টগ্রাম নগরের বন্দর এলাকায় এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে পুলিশ মুছাকে ধরে নিয়ে গেছে বলে দাবি করে আসছে তার স্ত্রী পান্না আক্তার। তবে এ অভিযোগ শুরু থেকেই অস্বীকার করে আসছে পুলিশ।

মন্তব্য


অন্যান্য