অপরাধ

কারা করছে অপহরণ কে চাইছে মুক্তিপণ

প্রকাশ : ১০ মে ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

কারা করছে অপহরণ কে চাইছে মুক্তিপণ

  ইন্দ্রজিৎ সরকার

রাজধানীর মিরপুর ও তেজগাঁও থেকে এক মাসের ব্যবধানে দুই প্রকৌশলী অপহরণের ঘটনায় রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পর একই কৌশলে দুই পরিবারের কাছে চাওয়া হয়েছে মুক্তিপণ। এর মধ্যে একজনের পরিবার মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এক লাখ টাকা দিলেও ছেড়ে দেওয়া হয়নি অপহৃত ব্যক্তিকে। তদন্ত-সংশ্নিষ্টদের ধারণা, মুক্তিপণ নেওয়ার সঙ্গে জড়িত রয়েছে একটি প্রতারক চক্র। তবে তারা অপহরণে সম্পৃক্ত নয়। সে ক্ষেত্রে কে বা কারা, কেন দুই প্রকৌশলীকে অপহরণ করেছে- স্পষ্ট নয় সেটাও। দুটি ঘটনায় একই চক্র জড়িত থাকতে পারে বলে মনে করছেন স্বজনরা।

গত ১ এপ্রিল মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার কর্মস্থল থেকে বের হওয়ার পর খোঁজ মেলেনি সফটওয়্যার প্রকৌশলী কামরুল হাসানের। আর কম্পিউটার প্রকৌশলী আতাউর রহমান শাহীনকে ২ মে তুলে নেওয়া হয় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থেকে। প্রথম ঘটনায় পল্লবী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং পরের ঘটনায় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় মামলা হয়েছে।

তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ওসি আলী হোসেন খান সমকালকে বলেন, 'দুটি অপহরণের ঘটনায় একই চক্র জড়িত কি-না, তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে। তবে এখন পর্যন্ত অপহরণকারীদের ব্যাপারে কোনো তথ্য মেলেনি। প্রকৌশলী আতাউর রহমান শাহীনকে তুলে নেওয়ার সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে। সেখানে অপহরণকারীদেরও দেখা গেছে।'

অপহৃত শাহীনের শ্যালক রবিউল ইসলাম জানান, অপহরণের পরদিন দুপুরে শাহীনের ফোন নম্বর থেকে একটি কল এলে বিস্মিত হন স্বজনরা। এ সময় ফোনের অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তি দাবি করেন, শাহীন তার হেফাজতে আছেন। দেড় লাখ টাকা দিলে ছেড়ে দেওয়া হবে তাকে। স্বজনরা তার সঙ্গে কথা বলিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করলেও তাতে রাজি হননি মুক্তিপণ চাওয়া ব্যক্তি। মোবাইল ব্যাংকিং সেবা 'নগদ'-এর একটি নম্বরে দুই দফায় মোট এক লাখ টাকা পাঠান তারা। তারপর ওই ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। শাহীনেরও সন্ধান মেলেনি। পরে দেখা যায়, ওই ফোন নম্বরটি প্রকৃতপক্ষে শাহীনের ছিল না। সম্ভবত ক্লোনিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে কল করা হয়েছিল। তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা জানতে পেরেছেন, যে নম্বরে তারা টাকা নিয়েছে, সেটিতে আগে 'বিকাশ' অ্যাকাউন্ট ছিল। সেটি ঢাকার লালমাটিয়ার ঠিকানা ব্যবহার করে নিবন্ধন করা হয়। বছরখানেক আগে ওই নম্বরটি ব্যবহার করে অপহৃত আরেক ব্যক্তির স্বজনের কাছ থেকে এক লাখ টাকা আদায় করা হয়। এর সপ্তাহখানেক পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল তাকে।

অপহরণ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার এসআই ইমাম হোসেন বলেন, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাবে না। তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা জানান, বিভিন্ন সময়ে কেউ নিখোঁজ বা অপহৃত হলে প্রতারক চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা স্বজনদের ফোন করে বলে যে অপহৃত ব্যক্তি তাদের কাছে আছে। নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা পেলে ছেড়ে দেওয়া হবে তাকে। তবে মূলত টাকাই হাতিয়ে নেয় তারা। অপহরণের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ থাকে না। প্রকৌশলী শাহীনের ঘটনায় ব্যবহূত ফোন নম্বরটির সর্বশেষ অবস্থান ছিল চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া।

মিরপুর থেকে নিখোঁজ প্রকৌশলী কামরুল হাসানের স্ত্রী শারমীন আক্তার জানান, সিসিটিভি ফুটেজে তার স্বামীকে অফিস থেকে বের হতে দেখা গেছে। এরপর আর খোঁজ মেলেনি। তার সঙ্গে কারও শত্রুতা ছিল না। তাই কাউকে সন্দেহও করা যাচ্ছে না। নিখোঁজের কয়েক দিন পর কামরুলের বাবা রুস্তম আলীর কাছে এবং দুই সপ্তাহের ব্যবধানে শারমীনের কাছে ফোন করে দেড় লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়। এ ক্ষেত্রেও অপহূতের মোবাইল ফোন নম্বর ক্লোন করে কল করা হয়। স্বজনরা কামরুলের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেওয়ার শর্তে টাকা দিতে সম্মত হন। তবে মুক্তিপণ দাবিকারী কথা বলিয়ে দিতে পারেননি, তারাও কোনো টাকা দেননি। ফোনের অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তি এমনটাও বলেছেন, প্রকৌশলী কামরুলকে কিছু কথা শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে। ছেড়ে দেওয়ার পর তিনি সেগুলোই গণমাধ্যমসহ সবাইকে বলবেন। পরিবারের অন্যরাও যেন একই কথা বলেন।

পল্লবী থানার ওসি নজরুল ইসলাম জানান, প্রকৌশলীর স্বজনরা এ বিষয়ে একটি জিডি করেছেন। ঘটনাটি অপহরণ নাকি অন্য কোনো ব্যাপার, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি এখনও। থানা পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য সংস্থাও তদন্ত করছে এ ঘটনার।

মন্তব্য


অন্যান্য