অপরাধ

সবজির বস্তায় মাদক যেত চট্টগ্রাম কারাগারে

রিমান্ডে চাঞ্চল্যকর তথ্য সোহেল রানার

প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

সবজির বস্তায় মাদক যেত চট্টগ্রাম কারাগারে

  সাইফুল হক মোল্লা দুলু, কিশোরগঞ্জ

বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেন থেকে ফেনসিডিল, নগদ অর্ধকোটি টাকা ও বিভিন্ন ব্যাংকের চেক-এফডিআরসহ আটক হওয়া কোটিপতি কারাধ্যক্ষ (জেলার) সোহেল রানা বিশ্বাস দু'দিনের রিমান্ডে ভৈরব রেলওয়ে পুলিশকে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। গত ৩০ ও ৩১ অক্টোবর রিমান্ডে নেওয়া হয় তাকে। ভৈরব রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল মজিদ গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছেন সাংবাদিকদের।

ভৈরব রেলওয়ে থানার ওসি মো. আব্দুল মজিদ জানান, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার সোহেল রানা বিশ্বাসকে দু'দিনের রিমান্ডে আনা হয়। পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি বিভিন্ন অপকর্মের কথা স্বীকার করেছেন। সোহেল রানা পুলিশকে জানান, তিনি নিজেই একজন মাদকসেবী, কারাগারের অধিকাংশ দায়িত্বপ্রাপ্তরাও মাদক সেবনে জড়িত রয়েছেন। বিভিন্ন সময় কারা অভ্যন্তরে তারা মাদক সেবন করার কারণে টালমাটাল হয়ে যেতেন। তাদের সঙ্গে কয়েদি, কারারক্ষীসহ কারাগারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ঠিকাদারদের খাদ্য সরবরাহের পিকআপ ভ্যানে পেঁয়াজ, রসুন ও সবজির বস্তার ভেতর করে বন্দিদের কাছে ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য পৌঁছাত। পরে কয়েদিদের মাধ্যমে তা বিক্রি করা হতো বন্দিদের কাছে। মাদক বিক্রির টাকা মাস শেষে স্টাফসহ কারাগারের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাঝে পদমর্যাদা অনুযায়ী বণ্টন করা হতো। জেলার সোহেল রানার কাছ থেকে উদ্ধারকৃত টাকাগুলো মাস শেষে বণ্টন থেকে প্রাপ্ত। বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি সেসব টাকা। প্রতি মাসে চট্টগ্রাম কারাগারে কোটি কোটি টাকার মাদক বন্দিদের মাঝে বিক্রি করে মোটা টাকা উপার্জন করা হতো।

এ ছাড়া বন্দিদের জিম্মি করে কাশিমপুর কারাগারে পাঠানোর হুমকি দিয়ে টাকা সংগ্রহ করতেন জেলার সোহেল রানা। কারা অভ্যন্তরে বন্দিরা টাকা দিলে সশ্রম কারাদণ্ড হয়ে যেত বিনাশ্রম ও টাকা না দিলে বিনাশ্রম কারাদণ্ড হয়ে যেত সশ্রম। অন্যদিকে, বন্দিদের যারা টাকা দিত রাতে তাদের রাখা হতো হাসপাতালের বেডে। টাকা না দিলে ১শ'র অধিক বন্দিকে একসঙ্গে রাখা হতো ১২ ফুটের একটি কক্ষে। অভিযুক্ত জেলারের ভাষায় সেটাকে বলা হতো 'ইলিশ বেড'। পুলিশকে তিনি আরও জানিয়েছেন, আগামী ৯ নভেম্বর চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে কারারক্ষী পদে নিয়োগ বাণিজ্যের কথা। ওই নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে কোথা থেকে কীভাবে টাকা আসবে সে তথ্যও দেন। কারাগারে বিভিন্ন অপকর্মে জড়িতদের অনেকের নাম প্রকাশসহ আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন তিনি। তদন্তের স্বার্থে ওই নামগুলো পুলিশ আপাতত প্রকাশ করতে পারছে না বলে জানান ওসি।

ঘটনার দিন জেলার সোহেল রানা বিশ্বাস বিজয় এক্সপ্রেসে ময়মনসিংহ শহরের ১১৯, আরকে মিশন রোডে তার বাসায় যাচ্ছিলেন। এ সময় জিআরপি ট্রেনের একটি বগিতে সোহেল রানার শরীর ও ব্যাগ থেকে নগদ ৪৪ লাখ ৪৩ হাজার টাকা, বিভিন্ন ব্যাংকের চেক, স্ত্রী হোসনে আরা পপির নামে এক কোটি টাকার এফডিআর, শ্যালক রকিবুল হাসানের নামে ৫০ লাখ টাকার এফডিআর ও ১২ বোতল ফেনসিডিল জব্দ করা হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ভৈরব জিআরপি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আশরাফ উদ্দিন ভূঞা জানান, জেলার সোহেল রানা অকপটে সবকিছু পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন। মানি লন্ডারিং আইনের মামলাটি যেহেতু দুদক তদন্ত করবে, তাই আজ ১৬৪-এর জন্য আবেদন করা হয়নি। পরবর্তীতে প্রয়োজনে ১৬৪ এবং রিমান্ড মঞ্জুরের আবেদন করা হবে।

আদালত পরিদর্শক (কোর্ট ইন্সপেক্টর) মো. তৌফিকুল ইসলাম জানান, রিমান্ড শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার তাকে সিনিয়র বিচারিক হাকিম ইকবাল মাহমুদের আদালতে হাজির করে জামিনের প্রার্থনা করা হয়। কিন্তু আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠিয়ে দেন।

উল্লেখ্য, এই চাঞ্চল্যকর আটক ঘটনায় ভৈরব রেলওয়ে থানার এসআই আশরাফ উদ্দিন ভূঁইয়া বাদী হয়ে মাদকদ্রব্য ও মানি লন্ডারিং আইনে পৃথক দুটি মামলা করেছেন। তদন্তের প্রয়োজনে রেলওয়ে পুলিশ আদালতে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করলে মঙ্গলবার কিশোরগঞ্জ বিচারিক আদালত-২-এর বিচারক হাকিম ইকবাল মাহমুদ দু'দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

মন্তব্য


অন্যান্য