অপরাধ

অপারেশন গর্ডিয়ান নট

কে এই দুর্ধর্ষ জঙ্গি আবদুল্লাহ

প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

কে এই দুর্ধর্ষ জঙ্গি আবদুল্লাহ

  সাহাদাত হোসেন পরশ, ঢাকা ও জামির হোসেন,(কালীগঞ্জ) ঝিনাইদহ

নরসিংদীর শেখেরচরে ভগীরথপুরে অপারেশন গর্ডিয়ান নট পরিচালনায় নিহত জঙ্গি আবু আবদুল্লাহ আল বাঙ্গালীর আসল পরিচয় কী? কীভাবে সে জঙ্গিবাদে জড়াল? কীভাবেই বা আরেক দুর্ধর্ষ নারী জঙ্গি আকলিমা আকতার মনিকে বিয়ে করল? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে এলো আবদুল্লাহর প্রকৃত নাম গোলাম মোস্তফা। ডাক নাম রুবেল। তার বাড়ি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের বেজপাড়া গ্রামে। সে যশোর এমএম কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিল। ২০১৫ সালের শেষদিকে আরেক দুর্ধর্ষ জঙ্গি হাদিসুর রহমান সাগরের মাধ্যমে জঙ্গিবাদে জড়ায় আবদুল্লাহ। তখন থেকে নিজের প্রকৃত নাম আড়াল করে সাংগঠনিক ছদ্মনাম আবদুল্লাহ বাঙ্গালী হিসেবে পরিচিতি পায়। এ ছাড়া তার গ্রামে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সে আহলে হাদিসের মতানুসারী ছিল। ৮-৯ মাস আগে থেকে তার চালচলন ছিল অস্বাভাবিক। গত মঙ্গলবার শেখেরচরে অভিযানে সস্ত্রীক নিহত হওয়ার আগে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আবদুল্লাহর গ্রেফতারের তথ্য পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ মাসখানেক আগে গ্রামে মা মর্জিনা বেগমকে ফোন করেছিল সে। মাকে সে বলেছিল, মাসখানেক তাকে ফোনে পাওয়া যাবে না। এর পর পরিবারের কারও সঙ্গে তার কোনো ধরনের যোগাযোগ ছিল না। শেখেরচরে অভিযানের পর গত বুধবার ছেলের নিহত হওয়ার খবর জানতে পারেন তার মা।

কালীগঞ্জে তার গ্রামে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আবদুল্লাহর মা মর্জিনা বেগম ও বাবা মৃত রবিউল ইসলাম। তার দুই বোন। আর কোনো ভাই নেই। বাবা মারা যাওয়ার পর একই গ্রামের আবদুল মান্নান ওরফে খোকনের সঙ্গে তার মায়ের বিয়ে হয়। তখন থেকে সে তার দাদা আক্কাছ আলী ও মায়ের সংসারে যৌথভাবে বসবাস করত। কালীগঞ্জ থেকে এইচএসসি পাস করার পর যশোর এমএম কলেজে ভর্তি হয় সে। সেখানে মেসে থাকত। পাশাপাশি সেখানে একটি ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ দানকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করত। সর্বশেষ মাসতিনেক আগে একবার মাকে দেখতে বাড়ি যায় সে।

কালীগঞ্জ থানার ওসি ইউনুচ আলী সমকালকে বলেন, নরসিংদীতে অভিযানে নিহত আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে থানায় কোনো মামলা নেই। প্রায় চার মাস আগে আরেক জঙ্গি নারীকে বিয়ে করে সে। বিয়ের বিষয়টি পরিবারকে সে জানিয়েছিল। নরসিংদীর অপারেশনের পর আবদুল্লাহর মা, সৎপিতা ও বোনদের ডেকে এনে তার ব্যাপারে জানতে চাওয়া হয়েছে।

পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ দায়িত্বশীল কর্মকর্তা সমকালকে জানান. মূলত ২০১৫ সালের শেষদিকে জেএমবির নেতা হাদিসুর রহমান সাগরের মাধ্যমে জঙ্গিবাদের পথে পা বাড়ায় আবদুল্লাহ। সাগর এক সময় জেএমবির ঝিনাইদহ ও খুলনা অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ছিল। ২০১৬ সালের আগস্টে গুলশানে হলি আর্টিসানে হামলার আগে নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরী ঝিনাইদহে গিয়ে সাগরের আস্তানায় অবস্থান করে। চলতি বছরের মার্চে বগুড়া থেকে সাগরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাকে গ্রেফতারের পর নব্য জেএমবির কার্যক্রমে আরও মনোযোগী হয় আবদুল্লাহ। সংগঠনের একাধিক সাইটের অ্যাডমিন হিসেবে সে দায়িত্ব পালন করে আসছিল। মূলত নব্য জেএমবির মিডিয়া শাখার প্রধান ছিল আবদুল্লাহ।

কালীগঞ্জের বেজপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফিরোজ আহমেদ বলেন, কয়েক মাস ধরেই মোস্তফার (আবদুল্লাহ) চলাফেরা সন্দেহজনক ছিল। তাকে অনেকবার নিষেধ করেছি, কিন্তু কথা শোনেনি। আবদুল্লাহর মামাতো ভাই সাগর জানান, মনির দুলাভাই তাদের ফোন করে নিশ্চিত করেছেন, তারা দু'জনই মারা গেছে।

দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, তামিম চৌধুরী নব্য জেএমবির দায়িত্বে থাকার সময় যারা সংগঠনের ছোটখাট নেতা ছিল তারাই এখন বড় নেতা হয়ে উঠছে। এ ছাড়া অনেক জঙ্গি জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর আবার সক্রিয় হচ্ছে। ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট রাজধানীর মগবাজার ও গাজীপুর থেকে চার নারী জঙ্গিকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। তারা হলো- ইসতিনা আক্তার ঐশী, আকলিমা আখতার মনি, ইশরাত জাহান মৌসুমী ওরফে মৌ ও খাদিজা পারভীন মেঘলা। ঐশী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ছিল। অপর তিনজন মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে অধ্যয়নরত। ২০১৭ সালের শুরুর দিকে জামিনে বেরিয়ে আবারও জঙ্গিবাদী কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে আকলিমা, মৌ ও মেঘলা। তারা মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা সম্পন্ন করে ইন্টার্ন করার জন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে জীবন-বৃত্তান্ত জমা দেয়। এরই মধ্যে আকলিমা হঠাৎ আরেক জঙ্গি আবদুল্লাহকে বিয়ে করে।

আবদুল্লাহর সঙ্গে বিয়ের পর আকলিমা গাজীপুরে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকত। তাদের গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বুরুঙ্গি এলাকায়। বাবার নাম শহিদুল ইসলাম। তবে আবদুল্লাহ একবার তার স্ত্রীকে নিয়ে যশোরে গিয়েছিল। ৩ অক্টোবর আকলিমাকে নিয়ে যশোর ত্যাগ করে সে। যশোর ছাড়ার আগে আবদুল্লাহ ইন্টারনেট সেবাদানকারী যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করত, সেখানে গিয়ে ১২ দিনের ছুটি চায়। তবে ওই প্রতিষ্ঠান ছুটি দিতে রাজি না হওয়ায় চাকরি ছেড়ে স্ত্রীকে নিয়ে যশোর থেকে চলে যায় আবদুল্লাহ। এর পর তার খোঁজ পায়নি পরিবার।

সূত্র জানায়, র‌্যাবের হাতে গ্রেফতারের পর জেলখানায় থাকার সময় আকলিমা, মৌ ও মেঘলা নানা ধরনের শলাপরামর্শ করতে থাকে। জামিনে বেরিয়ে কীভাবে আবার সংগঠনের জন্য কাজ করবে, সেই ফন্দি আঁটে তারা। এর পর জামিনে বের হওয়ার পর শুরু হয় তাদের জঙ্গিবাদের দ্বিতীয় পর্ব। এমনকি জেল খাটার পরও তাদের মধ্যে পরিবর্তন না আসায় এ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মনোমালিন্য তৈরি হয়। জঙ্গিবাদে জড়াতে রাজি না হওয়ায় মৌ-এর সঙ্গে তার ছোট ভাইয়ের ঝগড়া পর্যন্ত হয়েছিল বলে সূত্র নিশ্চিত করে।

মন্তব্য


অন্যান্য